মৃত্যুহীন – শেষ পর্ব – সুব্রত মজুমদার

বিক্রম এল দুপুরে খাওয়ার আগে। খাওয়ার টেবিলে কেসটা নিয়ে বিশেষ উচ্চবাচ্য করল না। সন্ধ্যার সময় চা খেতে খেতে বলল, “দুপুরে তো তোমারা ভালোই ঘুম দিয়েছ দেখছি, রাতে অঘোরবাবুকে নিয়ে তৈরি থেকো একজায়গায় যাবো।”বললাম, “কোথায় ?”-“দেখতেই পাবে। আগে হতে বললে সব মজা নষ্ট হয়ে যায়। পারলে সন্ধ্যাতেও একটু ঘুমিয়ে নিও। আর হ্যাঁ, অঘোরবাবুকে একটু তোষামোদ করবে। খুব ক্ষেপে আছেন উনি।”

             ঠিক রাত বারোটা নাগাদ বিক্রমের ফোন এল। আমি আর অঘোরবাবু বেরিয়ে পড়লাম । বিক্রমের কথামত হাঁটতে লাগলাম। বিক্রম বলেছে রাস্তা বেশি নয়, গাড়ি ভাড়া করার প্রয়োজন নেই । তবে আমার মনে হয় বিক্রম কৃপণ বলে এরকম করেছে। চট করে পয়সা ভাঙ্গার পক্ষপাতী ও নয়।

 এদিকে অঘোরবাবু কিন্তু নিয়ম মেনেই বকরবকর করে চলেছেন। আমি তার একটা বা দুটো কথার উত্তর দিচ্ছি। ভদ্রলোকের কিন্তু একটুও বিরক্তি নেই। একসময় থমকে দাঁড়িয়ে বললেন, “আচ্ছা সায়ক আজ অমাবস্যা না ?”


-“হ্যাঁ, অমাবস্যাই তো। তবে কলকাতার আলোতে অমাবস্যা পূর্ণিমা বোঝা দায়। কেন বলুন তো ?” অঘোরবাবু আমার দিকে একটা আতঙ্ক মেশানো দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন, “নরবলি।” -“নরবলি ?” -“হ্যাঁ, আমার দৃঢ় বিশ্বাস ওই খুনেটার সঙ্গে বিক্রমের কোনও একটা যোগ আছে। আমাদের বোধহয় নরবলি হবে।”অঘোরবাবুর কথায় আমারও যে একটু আধটু ভয় হল না তা নয় তবে বিক্রম আর অঘোরবাবু দুজনকেই আমি হাড়ে হাড়ে চিনি।

একটু আধটু কৃপণ হলেও মোটেই কাপালিক নয় বিক্রম। আর অঘোরবাবু ? উনি একটু বেশি বেশিই চিন্তা করেন। তাই অঘোরবাবুর কথার উত্তর না দিয়ে এগোতে লাগলাম। মিনিট দশেক চলার পর একখানা  হুণ্ডাই আই20 গাড়ি আমাদের পাশে দাঁড়াল।
            গাড়ি হতে  একটা মুখোশ পড়া লোক বের হয়ে এসে আমাদের সামনে দাঁড়াল। বলল, “বিক্রম পাঠিয়েছে। চটপট উঠে পড়ুন।” বাক্যব্যয় না করে গাড়িতে উঠে বসলাম। গাড়ি চলতে শুরু করল। কিন্তু সামনের সবকিছুই যেন ঝাপসা হয়ে আসছে। চোখ বুজে আসছে গভীর ঘুমে। অঘোরবাবুরও তাই। ঘুম যখন ভাঙল তখন একটা টেবিলের উপর শুয়ে আছি।

হাত পা অবশ। আমার পাশেই অঘোরবাবু। কথা বলতেও কষ্ট হচ্ছে। তিনি অনেক কষ্টে বললেন, “আমার কথা মিলল তো……” এ কি করলে বিক্রম ? এরকম ব্যবহার তোমার কাছে আশা করিনি। আমি এখনো বিশ্বাস করতে পারছি না যে এ সবকিছুর পেছনে তুমি আছ।

যদি তাই হয় তবে মৃত্যুই শ্রেয়। বিদায় বন্ধু…. বিদায়। আমি যখন এসবকিছু ভাবছি ঠিক তখনই ঘরের দরজাটা খুলে গেল। দরজা খুলে ঘরের ভেতরে ঢুকল একটা  লোক। বয়স আন্দাজ করা মুশকিল। পরনে শান্তিনিকেতন স্টাইলের পাজামা-পাঞ্জাবী আর মুখে মুখোশ । পাঞ্জাবীতে বিভিন্ন রং ইতস্তত কিছু টাটকা রং লেগে আছে। সম্ভবত লোকটা একটা আর্টিস্ট। ছবি আঁকে।


             খুব অস্পষ্ট স্বরে অঘোরবাবু বললেন, “ঈশান পাকড়াশি….” আমাদের দিকে তাকিয়ে লোকটা হো হো করে হেসে উঠল। বলল, “কেমন আছো টিকটিকি বিক্রমের শাগরেদদ্বয় ? আমার পেছনে টিকটিকিগিরি হচ্ছে ? এখন শুয়ে থাকো নিশ্চল হয়ে যতক্ষণ না আমার কাজ শেষ হয়।” 

আমাদের ধমকিয়ে লোকটা যেই দরজার দিকে ঘুরতে যাবে অমনি বাইরে হতে একখানা হাত এগিয়ে এল। হাতে একখানা পিস্তল। পিস্তলটা লোকটার কানের পাশে ঠেকিয়ে পিস্তলের মালিক বলল,”ইওর গেম অভার মিস্টার সাইকো। নড়লেই গুলি চলবে। বুদ্ধিমানের মতো হাতদুটো উপরে তুলে দাঁড়াও।

মিস্টার সান্যাল ভেতরে আসুন। “গলাটা বিক্রমের। ঘরের আলো জ্বলে উঠল। দারোগাবাবু তার দলবল নিয়ে ঘরে ঢুকলেন। লোকটাকে পিছমোড়া করে হাতে হ্যাণ্ডকাফ পরানো হল।


       “কি ভবেশ দত্ত, তোমার সব পরিকল্পনা ভেস্তে গেল তো ? ” এই বলে এক ঝটকায় লোকটার মুখোশটা  খুলে দিল বিক্রম। অঘোরবাবুর চোখ কপালে উঠল। অনেক কষ্টে মাথা উঁচু করে সবকিছু দেখছেন। হাত পা কোমর অসাড়। অস্ফুটস্বরে বললেন, “ভবেশ পাগলা… কিন্তু….””জানি অঘোরবাবু  আপনি এখন কি ভাবছেন।

আপনি ভাবছেন  যে ভবেশ দত্ত এই গতকাল মেন্টাল অ্যাসাইলাম হতে ছাড়া পেল সে কিভাবে খুনি হতে পারে। হতে পারে অঘোরবাবু, হতে পারে। তবে সে কথা কাল সকালেই বলব। আপাতত মিস্টার সান্যাল আপনার আসামীকে নিয়ে যান। আর ঈশানকে ছেড়ে দেবেন। ওকে শুধু শুধু আটকে রাখলেন। সেদিন আমার কথা শুনলে ভালো হত। “


                        দারোগাবাবু একটু লজ্জা পেয়ে গেলেন বোধহয়। “আই এম এক্সট্রিমলি স্যরি।” বলে তড়িঘড়ি বেরিয়ে গেলেন। আমাদের জন্য এল অ্যাম্বুলেন্স। পরদিন হসপিটালের বেডে শুয়ে শুনলাম সব ঘটনা।বিক্রম আর দারোগাবাবু আমাদের দেখতে এসেছেন। আমরা এখন পুরোপুরি সুস্থ। বিছানার উপর উঠে বসেছি। অঘোরবাবুই শুরু করলেন। 

“এবার খোলাসা করে বলুন তো মশাই ঘটনাটা কি।”বিক্রম বলল, “ঘটনার প্রধান চরিত্র হলেন ভবেশ দত্ত। ইনি একজন সিরিয়াল কিলার। এই খুনগুলো একটা সিরিয়াল কিলিংয়ের দিকেই নির্দেশ করছিল। আমি পুরোনো ইনসিডেন্টগুলো মিলিয়ে দেখতে লাগলাম। হতেও তো পারে এই অপরাধী কোনও পুরোনো খিলাড়ি।


             আর হলও তাই । আগের একটা কেসের সঙ্গে খুনের স্টাইল একদম মিলে গেল। আসামী ভবেশ দত্ত। পেশায় আর্টিস্ট। বছর সাতেক আগে এরকম ভাবেই সে খুন করতে শুরু করে। পুলিশের কপালে রীতিমত চিন্তার ভাঁজ ফেলে দেয়। পুলিশ যখন তাকে গ্রেফতার করে কোর্টে পেশ করে তখন কোর্ট ভবেশ দত্তকে মানসিক রোগী বলে চিকিৎসাধীন রাখার নির্দেশ দেন।

এখন প্রশ্ন হল যে লোকটা মেন্টাল অ্যাসাইলামে আছে সে কি করে খুন করছে ? তাহলে কি ওর স্টাইলে অন্য কেউ ? উত্তরটা খোঁজার জন্য অঘোরবাবুকে পাঠালাম ওই মানসিক হাসপাতালে। তারপর যা কেলেঙ্কারি হল তা হল। আমি কিন্তু আমার প্রশ্নের উত্তর পেয়ে গেলাম।””কিরকম ?” দারোগাবাবু প্রশ্ন করলেন।
             বিক্রম বলল,”ফটিক হালদার অ্যণ্ড কোম্পানি। এই ফটিকের দলই ভবেশ দত্তকে অ্যাসাইলাম হতে বেরিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করে দিত। সবই ছিল পাগলামি। খুন করে ভবেশ দত্ত আবার ফিরে আসত অ্যাসাইলামে। ফটিক দত্ত এই খুনটুনের ব্যাপারে কিছুই জানে না।

সে শুধুই পরোপকার করার চেষ্টা করে।কিন্তু যেদিনই অঘোরবাবুকে ওই অ্যাসাইলামে পাঠালাম সেদিনই ভবেশ দত্তকে পালিয়ে যেতে দেখে ফেলে এক ওয়ার্ডেন । পাগলাঘণ্টি বেজে উঠল। ভবেশের আর ফেরা হল না। “


                    “কিন্তু খুনের মোটিভ ? নিছকই মানসিক ভারসাম্যহীনতা ?”  দারোগাবাবু জিজ্ঞাসা করলেন।বিক্রম বলল,”ভবেশবাবু যে মানসিক ভারসাম্যহীন তাতে ডাউট নেই। তবে একটা মোটিভ তো আছেই। সেটা হল পোট্রেট। “


-“পোট্রেট ?” আমরা তিনজনেই একসঙ্গে অবাক হয়ে বললাম।বিক্রম এর উত্তর দিল। বলল,”ভবেশ দত্ত তার আর্টিস্ট জীবনের প্রথমদিকে খুব ভালো পোট্রেট আঁকত। কিন্তু কোনও একটা অজ্ঞাত কারনে একটা সময়ের পর তার আঁকা পোট্রেটগুলো রিজেক্ট হতে থাকল। খুবই নিম্নমানের আঁকা।

ভবেশ দত্তর মনে হতে লাগল যে তার হাত নয়, সমস্ত দোষ তার মডেলদের। তাই পোট্রেট আঁকার পরপরই রাগে ঘৃণায় অন্ধ হয়ে খুন করতে থাকল মডেলদের। প্রথমে ড্রাগ দিয়ে অবশ করে তারপর পলিথিন শিট দিয়ে দমবন্ধ করে মারতে ওদের। “-“আর ঈশান ? “


                  আমার প্রশ্ন শুনে বিক্রম হো হো করে হেসে ফেলল। বলল,” ঈশানের সাথে অঘোরবাবুর বন্ধু পাইয়ে দিতে হবে। ও আমাদের অনেক আগেই ভবেশকে ট্রেস করতে পেরেছিল। কিন্তু কি কারনে ও কথাগুলো বলল না সেটা আমারও জিজ্ঞাসা।

“বিক্রমের কথা শেষ হওয়ামাত্রই ওষুধের টেবিল হতে একটা বোতল তুলে নিয়ে বিক্রমের দিকে ছুঁড়ে মারলেন অঘোরবাবু। বিক্রম একটু জন্য রক্ষা পেল। দারোগাবাবু হেসেই বাঁচেন না।  এরপর একদিন থানায় ডেকে ঈশানকে জেরা করা হয়েছে। ও যা বলল তা রীতিমতো বিস্ময়কর।

ভবেশ নাকি ঈশানকে বলেছিল মৃত্যুকে জয় করার কথা। মৃত্যুর ওপারে যে রাজ্য আছে সেখানে সঙ্গী হবে ওই হতভাগ্য মেয়েগুলো। সেজন্যই ওই মেয়েগুলোকে চাকু ছুরি দিয়ে না মেরে দমবন্ধ করে মারা হয়েছে। দেহ যেন অক্ষত থাকে।


            সবশুনে বিক্রম বলল, “পাগল আর কাকে বলে। ওরকম পাগল অ্যাসাইলামের ভেতরে থাকাই নিরাপদ। মৃত্যুহীন কেউ হয় না অঘোরবাবু, তবে দ্বেষ হীন হওয়া যায়। আজ বদ্ধ পূর্ণিমার দিন। আসুন ভগবান বুদ্ধের কাছে এই কামনা করি, তিনি যেন আমাদের দ্বেষহীন বিকারহীন জীবন প্রদান করেন।                                 

সমাপ্ত

Published by Story And Article

Word Finder

Leave a Reply

%d bloggers like this: