মৃত্যুহীন – ২ সুব্রত মজুমদার

প্রথম কেসটায় মৃতার নাম জয়িতা সরকার। সন্দেহভাজন ছিল তিনজন। মৃতার মামা, মামি আর পাশের বাড়ির ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ছাত্র ঈশান। ঈশান পাকড়াশি। মৃতার বাবা মা অনেকদিন আগেই মারা গেছেন। এখন জয়িতা মারা গেলে সমস্ত সম্পত্তির আইনত উত্তরাধিকারী হবেন তার মামা ও মামি।


            “আপনার কোথাও ভুল হচ্ছে মিস্টার মুখার্জ্জী”   জয়িতার মামা বললেন, “জয়িতার মৃত্যুতে আমরা কোনোভাবেই লাভবান হব না। জামাই বাবু স্পষ্টই উইল করে দিয়ে গেছেন। জয়িতা  তার বাবার সম্পত্তির মালিক হবে প্রথম সন্তানের জন্মের পর। অর্থাৎ জয়িতা যদি অবিবাহিত  ও  নিঃসন্তান অবস্থায় মারা যায় এবং তাহলে সমস্ত সম্পত্তি একটা অনাথ আশ্রমে চলে যাবে। “
             “কি বলছেন মশাই ? তাহলে চিরকুমারী থাকলে বা বাঁজা হলে তো একটা কাণাকড়িও  পেত না ! কি নিষ্ঠুর বাবা মা দেখেছেন !” অঘোরবাবু উত্তেজিত হয়ে উঠলেন। উত্তেজনার চোটে হাতের ঘুঁসিটা এমনভাবে এগিয়ে গেল যে জয়িতার মামা চোয়ালে হাত দিয়ে কাতরাতে লাগলেন।ভদ্রলোক ব্যাথানাশক স্প্রে লাগিয়ে আবার চেয়ারে গিয়ে বসলেন।

ব্যাথাটা একটু কমতেই বললেন,”এই বয়সে বেশি উত্তেজিত হওয়া ভালো নয় স্যার। আমার চোয়ালটা গেল বোধহয়। যাইহোক জয়িতা তার ৩৮ বছর বয়স হলেই  সব সম্পত্তির মালিক হত, কোনও শর্ত প্রযোজ্য হত না।”


                      আসার সময় বিক্রম বলল, “ভদ্রলোক নির্দোষ সেটা স্পষ্টই বোঝা যায়, নচেৎ অঘোরবাবুর আজ হাজতদর্শন হত। তাছাড়া খুনের কোনও মোটিভ এদের নেই। বাদ রইলো ঈশান। জয়িতার মামার বক্তব্য অনুসারে ছেলেটা বারকয়েক প্রেমপ্রস্তাব দিয়েছিল, কিন্তু একটু মেন্টাল বলে পাত্তা দেয়নি জয়িতা। এই ছেলেটার একটা মোটিভ আছে। “


               “তাহলে এখন…. ” আমি বিক্রমের দিকে তাকালাম। বিক্রম বলল,”ওখানেই চলো, হাতে যখন সময় আছে। “ঈশানের মা সরকারি আমলা। অত্যন্ত মেজাজী ও দাম্ভিক। অপরদিকে ঈশানের বাবা একজন স্কুল শিক্ষক, অত্যন্ত নম্র ও ভদ্র।

ছেলে মাঝখান দিয়ে গেছে। বাপের মতো নম্রও নয় আবার দাম্ভিকতা ওর চরিত্রের সঙ্গে কেমন যেন বেমানান। আমাদের সবকথা শোনার পর ঈশান চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলো। ব্যালকনিতে আমরা পাঁচটা লোক, কিন্তু ঈশানের সেই নৈশব্দ বাকি চারজনের উপস্থিতিকে রীতিমত উপেক্ষা করল।


                একসময় নৈশব্দ ভেঙ্গে ঈশান বলল, “আচ্ছা গোয়েন্দা, ম্যাকবেথ পড়েছেন ? আমার সারাক্ষণের চেষ্টা ওইরকম একটা খুনে হয়ে উঠতে।  All the perfumes of Arabia will not sweeten this little hand. Oh, Oh, Oh! I still have the smell of blood on my hand. All the perfumes of Arabia couldn’t make my little hand smell better. Oh, oh, oh!”আরও কিছুক্ষণ কথা বলার পর আমরা বেরিয়ে এলাম।

বিক্রম ঈশানের মাকে বলল,” কিছু মনে করবেন না ম্যাডাম, আপনার ছেলে নিজের চেষ্টায় ফাঁসির দড়িতে মাথা ঢোকাতে চাইছে। ভালো মনোবিদ দেখে কাউন্সেলিং করান। একদম গন কেস। আপনাকে নিয়েই ডুববে ও। “
                    ভদ্রমহিলা আমাদের দিকে কটমট করে কিছুক্ষণ চেয়ে রইলেন, তারপর মুখের উপর দরজা বন্ধ করে দিলেন। অঘোরবাবু বললেন,”ভাগ্যিস বিয়ে করিনি মশাই, নাহলে ওই মাস্টারমশায়ের মতো চিরকাল ঘাড় নিচু করে চলতে হত।

কি দজ্জাল মশাই ! “”আপনার পুরোনো রাগ আছে মনে হচ্ছে। ” বিক্রম অঘোরবাবুর দিকে কৌতুহলী হয়ে তাকাল। অঘোরবাবু চটজলদি উত্তর দিলেন, “হ্যাঁ মশাই, একবার ভোট ডিউটিতে এই ভদ্রমহিলা বড়সড় দায়িত্বে ছিলেন। আমাদের চোখের সামনে বিরিয়ানির প্যাকেট গিয়েছে এদের ঘরে। দেখিয়ে দেখিয়ে খেয়েছে মশাই।”
                     বিক্রম হো হো করে হাসতে লাগল। এই কথার প্রত্যুত্তরে বলার মতো কোনও শব্দ তার কাছে নেই।  আমলাতন্ত্রের ভয়াবহ রুপ সে দেখেছে। কিকরে অপরের কাঁধে বন্দুক রেখে গুলি চালাতে হয় তা, আর কিভাবে ক্ষমতার আড়ালে থেকে অপরকে  হেয় প্রতিপন্ন করতে হয় তা সুবিধাবাদীরা জানে।

অতবড় মারাঠা সাম্রাজ্যের পতনের মূল কারণও এই আমলাতন্ত্র। শিবাজীরাজের পর আর কোনও যোগ্য শাসক জন্মাননি বলে গোটা শাশনক্ষমতা পেশোয়াদের হাতে চলে যায়।  সামন্ততন্ত্র রাজতন্ত্রের  চেয়েও বেশি বিপদজনক । এখন তো এক রাজার জায়গায় একশ রাজা রাজত্ব করছে।
দোকান হতে মাটনকষা কিনে নিলাম। অঘোরবাবু আবার রসমালাইয়ের ভক্ত। সেটাও নেওয়া হল।
                     বিক্রম কিন্তু যথেষ্টই আনমনা। জিজ্ঞাসা করতেই বলল, “কেসটা নিয়েই ভাবছি রে। জয়িতার মামা মামিকে চোখ বন্ধ করে ছেড়ে দেওয়া যায়। সমস্যা হল ওই ঈশান ছেলেটাকে নিয়ে। ওর মাথায় গণ্ডগোল আছে। যদিও এটুকুই সিরিয়াল কিলার হবার পক্ষে আদর্শ তবুও আমার মন বলছে ছেলেটা নির্দোষ। তাহলে খুনি কে ? অন্যকেউ ?  আপাতত  ঘরে গিয়ে রুটি মাটন সাবড়ানো যাক।

কি বলেন অঘোরবাবু ? “অঘোরবাবু ততক্ষণে ফুচকার স্টলের দিকে পা বাড়িয়েছেন। আমাদের হাত নেড়ে ডেকে নিলেন।  ফুচকাওয়ালার কাছে পৌঁছতেই অঘোরবাবু বললেন,”ইচ্ছামতো। বিল আমার। “
                                      পরেরদিন সকালে আবার বেরিয়ে পড়লাম। এবার কেস নাম্বার টু, অপরাজিতা দাস। অপরাজিতার বাবা মা কান্নায় ভেঙ্গে পড়লেন। তাদের একটাই দাবি, অপরাধী যেন ধরা পড়ে। চরম শাস্তি হয় তার।

যেটুকু জানা গেল তাতে মেয়েটা বেশ পরিশ্রমী ও মেধাবী ছিল। পড়াশোনার পাশাপাশি বাবাকে আর্থিকভাবে সাহায্য করার জন্য একটা সেলাইয়ের দোকানে পার্টটাইম কাজ করত।সেলাইয়ের দোকানের মালকিন যথেষ্টই ঘাবড়ে গিয়েছেন। তাকে জেরা করে খুব একটা আশাব্যঞ্জক কিছু উঠে এল না।

তবে সেলাইয়ের দোকানের একটা মেয়ে বলল, “কিছুদিন হতেই অপরাজিতাকে একটা ছেলে ফলো করছিল। ছেলেটা পেছন পেছন আসত, কিছু বলত না। একবার অপরাজিতা খুব গালাগালি করেছিল ছেলেটাকে।”
 “ছেলেটাকে দেখলে চিনতে পারবে ?” বিক্রম জিজ্ঞাসা করল।”হ্যাঁ স্যার পারবো।””তুমি থানায় চল, স্কেচ আর্টিস্টকে ডিটেইলস বলবে। দেখি ছেলেটা কে। “থানায় যখন গেলাম তখন বেলা এগারোটা। দীর্ঘক্ষণের প্রচেষ্টায় স্কেচ আঁকা কমপ্লিট হল।

ছবিটা দেখেই  উত্তেজিত হয়ে উঠলেন।  “আমি জানতাম মশাই, ও ছেলে ভালো হতেই পারে না। খুন করা নিয়ে কাব্য করে ! ওকে তাড়াতাড়ি অ্যারেস্ট করুন মশাই… তাড়াতাড়ি।

“ছেলেটি যে কে তা নিশ্চয়ই আর বলে দেওয়ার আবশ্যকতা নেই। দারোগাবাবু একটু কেশে নিয়ে বললেন, “এজন্যই তো আপনার কদর করি। বিক্রম মুখার্জী মানেই কেস সলভড। যাই ধরে আনি হারামিটাকে। “
             বিক্রম রিলাক্স হয়ে বসল।  আড়মোড়া ভেঙ্গে টেবিলের উপর ঝুঁকে পড়ে বলল,” আপাতত অ্যারেস্ট করতেই পারেন। যেটুকু তথ্যপ্রমাণ পাওয়া গেছে তাতে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করা যেতেই পারে।

তবে আমার মনে হয়না এতে কিছু লাভ হবে। “” আলবাত হবে। আমি এদিকটা দেখছি। আপনি তদন্ত এগিয়ে নিয়ে যান।” দারোগাবাবু  দরজার দিকে এগিয়ে গেলেন । অগত্যা আমরাও উঠে পড়লাম।

চলবে …………

ফেসবুক মন্তব্য

Published by Story And Article

Word Finder

Leave a Reply

%d bloggers like this: