মৃত্যুহীন – ৪ – সুব্রত মজুমদার

ডাক্তারবাবু  বললেন, “মেন্টালি শক পেয়েছেন। আর শরীরেও যথেষ্ট আঘাত রয়েছে। এ পুলিশ কেস বিক্রমবাবু । ভালোমন্দ কিছু হয়ে গেলে আমাকে যেন জড়াবেন না। “- “না না আপনি নিশ্চিন্ত হতে পারেন।”ডাক্তার চলে গেলে বিক্রম বসল অঘোরবাবুর শুশ্রূষায়।

অঘোরবাবু সারারাত অঘোরের ঘুমোলেন। সকালে যখন উঠলেন তখন দিব্যি সুস্থ মানুষ। তবে গায়ে হাতে পায়ে একটু ব্যাথা আছে। ঘুম থেকে উঠেই হাঁক ছাড়লেন, ” মাধবদা আমার চা কই ?”


-“এই তো দাদাবাবু আপনার চা আর ব্রেকফাস্ট রেডি।”মাধবদা চা ব্রেকফাস্ট নামিয়ে দিয়ে যেতেই অঘোরবাবু গোগ্রাসে খেতে শুরু করলেন। ইতিমধ্যে বিক্রম আর আমিও এসে হাজির। আমাদের দিকে ড্যাবড্যাব করে একবার তাকিয়েই আবার হেঁটমুখো হয়ে খেতে শুরু করলেন। বিক্রম অঘোরবাবুর প্লেট হতে একখানা বাটারটোস্ট নিয়ে চিবোতে লাগল। তারপর অঘোরবাবুর দিকে গভীর দৃষ্টিনিক্ষেপ করে বলল, “ব্যাপারটা কি অঘোরবাবু ?”


                  অঘোরবাবু ফৌঁস করে উঠলেন।  “ব্যাপার আমার মাথা আর মুণ্ডু। নির্ঘাত যমের দুয়োর হতে ঘুরে এসেছি মশাই । সেই যে আপনি বললেন……”পরশু বিক্রম অঘোরবাবুর কানে কানে কিছু কথা বলেছিলেন যেটা নিয়ে আমার চরম কৌতুহল থাকলেও জানার উপায় ছিল না। আজ অঘোরবাবুর কথায় সেই গুপ্ততথ্য ফাঁস হয়ে গেল।

বিক্রম সেদিন অঘোরবাবুকে বলেছিলেন একটা মানসিক হাসপাতালে গিয়ে কিছু তথ্য সংগ্রহ করে আনতে। পরদিন সকালেই অঘোরবাবু বেরিয়ে পড়লেন মিশন সাকসেসফুল করতে। কিন্তু সবকাজ গুবলেট করে দেওয়া অঘোরবাবুর অভ্যাস। আর হলও তাই ।


বিক্রম বলেছিল রোগীর আত্মীয় হিসেবে যেতে কিন্তু অঘোরবাবু ওই অ্যাসাইলামের সামনে ভিখারী সেজে ভিক্ষা করতে শুরু করলেন। ছেঁড়া জামা, হাতে বাটি আর দু’বগলে দুটো ক্র্যাচ। মাধবদার কাছ হতে চেয়ে আনা ডনের বেল্টটা আছে ঝোলার ভেতরে। সূযোগ পেলেই  কুকুরের বেল্ট গলায় বেঁধে পাগলা সেজে অ্যাসাইলামে ঢুকে পড়বেন ও তথ্য বের করে আনবেন।


              কিন্তু বিধাতাপুরুষ বড়ই রসিক, তিনি ভেবে রেখেছেন অন্যকিছু। আর কর্তার ইচ্ছাতেই কর্ম, সুতরাং সেরকমই কিছু হল। সেই সকালেই অ্যাসাইলাম হতে পালাল বিখ্যাত সিরিয়াল কিলার ভবেশ দত্ত। দীর্ঘদিন এই অ্যাসাইলামে ছিল সে। অনেকগুলো খুনের মামলা তার মাথায় ঝুলছে, কিন্তু সরকারি চিকিৎসক তাকে মানসিকভাবে অসুস্থ ঘোষনা করাতে জজসাহেবের নির্দেশে ভবেশ দত্তর ঠাঁই হয় এই মেন্টাল অ্যাসাইলামে।   

             ভবেশ দত্ত পালাতেই গোটা অ্যাসাইলাম জুড়ে তৎপরতা শুরু হয়ে যায়। পাগলাঘণ্টি বেজে ওঠে। পাগলাঘণ্টির আওয়াজ শুনেই মাথায় বিদ্যুৎ খেলে যায় অঘোরবাবুর। একটু আগেই  যে দীর্ঘকায় ষণ্ডামতো চেহারার লোকটা তাকে ধাক্কা দিয়ে পালিয়ে গেল সেই কি ভবেশ দত্ত ? বিক্রম তো ওর খবর নিতেই পাঠিয়েছে। তাহলে সঠিক জায়গাতেই এসেছেন অঘোরবাবু।


               সব জায়গাতেই কিছু কিছু এমন লোক থাকে যারা পরোপকারের সূযোগ পেলেই কোমর বেঁধে ঝাপিয়ে পড়ে । ফটিক হালদারের নেতৃত্বে তিনজনের এই গুপ্তসংগঠনটিও এইরকম।

ফটিক হালদার আগে একটা ক্লাবের সেক্রেটারি ছিল । পরোপকারে তার জুড়ি ছিল না। একদিন এক রাজনৈতিক নেতাকে কিডন্যাপারদের হাত হতে বাঁচাতে গিয়ে আড়ংধোলাই খেয়ে মানসিক সুস্থতা হারিয়ে ফেলে, আর ঠাঁই হয় এই অ্যাসাইলামে । ফটিক জানতই না যে নেতামশাই নিজে নিজেই কিডন্যাপ হয়েছেন।

             একদিন ভবেশ দত্ত ফটিকের হালদারের কাছে এসে একটু কান্নাকাটি করতেই ফটিকের মন গলে গেল । গুপ্তসংগঠনের সদস্যরা  বসে গেল  ভবেশ দত্তকে কিভাবে অ্যাসাইলাম হতে মুক্তি দেওয়া যায় সেই আলোচনায়। আলোচনা শেষে পরিকল্পনা পেশ ও মঞ্জুর হল।

আর সেই পরিকল্পনা সার্থকভাবে রুপায়িত হল আজ।ভবেশ দত্ত অ্যাসাইলাম হতে পালিয়ে যাওয়ার পর গুপ্তসংগঠনটি আবার পর্যালোচনায় বসল। আলোচনা শেষে সিদ্ধান্ত হল ভবেশ দত্তকে ফিরিয়ে আনার। অ্যাসাইলামে একজন পাগল কমে যাওয়া মানে পাগলদের ভোট কমে যাওয়া। ভোট কমা মানেই গনতন্ত্রের ক্ষতি। সুতরাং ভবেশ দত্তকে ধরে আনতে হবে।


                  বিশৃঙ্খলার সূযোগ নিয়ে বাইরে আসতেই ফটিক অ্যান্ড কোম্পানির নজরে পড়লেন অঘোরবাবু।  ফটিকের দরকার ভোট, সুতরাং একটা পাগল হলেই যথেষ্ট। ভবেশ দত্তকে ধরার হাঙ্গামা তাদের পোষাবে না। তারা পাকড়াও করল অঘোরবাবুকে।অঘোরবাবু কাঁদ কাঁদ হয়ে বললেন, “ও মশাই, ও মশাই, আমাকে ছেড়ে দেন, আমি  পাগল নই।”-“কিচ্ছু চিন্তা করবেন না, আপনাকে একঘন্টায় পাগল বানিয়ে দেব।”


                    ফটিকের শুনে অঘোরবাবু হাত পা ছুড়তে ছুড়তে বললেন, “তা হয় না মশাই। আমায় ছেড়ে দেন…….!!”ফটিকের এক সঙ্গী বলল, “আলবাত হয়। পাগল ঐক্য….”-“জিন্দাবাদ! “-” পাগল ঐক্য…. “” জিন্দাবাদ! “
এরপর অঘোরবাবুকে নিয়ে গেল অ্যাসাইলামের ভেতর। বরফের উপর শুইয়ে কাতুকুতু দেওয়া হল, ইলেকট্রিক শক দেওয়া হল, অঘোরবাবুকে ঘিরে হুলাহুলা নাচগান হল, এবং শেষে একপ্রস্থ যষ্ঠিপ্রয়োগও হল।

সব চিকিৎসা ব্যর্থ দেখে ফটিক সিদ্ধান্ত নিল অঘোরবাবুর মাথার শল্যচিকিৎসা করে মাথার ভেতরের কয়েকটা স্ক্রু ঢিলে করে দিতে। অপারেশন বেড হতে ছিনি হাতুড়ির মতো প্রয়োজনীয় সার্জারি ইকুইপমেন্টের জোগাড়ও হল। কিন্তু শেষমেষ অ্যাসাইলামের লোকজন এসেপড়ায় সার্জারিটা আর হল না।


               অঘোরবাবু অ্যাসাইলামের স্টাফদের বুঝিয়ে সুঝিয়ে কোনোক্রমে বাড়ি ফিরে এসেছেন।অঘোরবাবু অভিযানকাহিনী শুনে বিক্রম হেসেই বাঁচে না। আমার অবস্থাও তদ্রুপ। বিক্রম বলল, “আমার মনে হয় সার্জারিটা হলে ভালোই হত। বলা তো যায় না এমনিতেই হয়তো কিছু স্ক্রু ঢিলে হয়ে আছে । হয়তো টাইট হয়ে যেত।”


              অঘোরবাবু ব্রেকফাস্ট শেষ করে আবার শুয়ে পড়লেন। বিক্রমের কথায় যথেষ্টই কষ্ট পেয়েছেন ভদ্রলোক। আমি বললাম, “এটা তোমার উচিত হয়নি বিক্রম, হাজার হোক বয়স্ক মানুষ। “বিক্রম বলল,”অঘোরবাবুর মতো তুমিও কবে হতে বেরসিক হয়ে পড়লে ?

অঘোরবাবু বুদ্ধি দিয়ে কোনো কাজই করেন না, আবেগে চলেন, এটাই হল তার বড় সমস্যা। তবে যে তথ্য আমার দরকার সেটা আমি পেয়ে গেছি। অঘোরবাবু এখন বিশ্রাম নিক। তুমি উনার দিকে নজর রাখো, ততক্ষণে আমি একটু ঘুরে আসি।”


               বিক্রম বেরিয়ে গেল। কোথায় গেল জানি না তবে ছটফটানিটা আমার খুব চেনা। কোনও রহস্যের উপর হতে যবনিকা সরিয়ে আনার আগে ও এরকম একটু ছটফট করে। যাই একবার রান্নাঘর হতে ঘুরে আসি। মাধবদা কি রেঁধেছে একটু দেখে আসা দরকার। অঘোরবাবু সুস্থ থাকলে আগেই গিয়ে হাজির হতেন, তবে কি আর করা একাই যাই নুনমশলাটা পরীক্ষা করে আসি।

চলবে ……

ফেসবুক মন্তব্য

Published by Story And Article

Word Finder

Leave a Reply

%d bloggers like this: