যার কোন ব্যাখ্যা নেই : সুদীপ ঘোষাল

পর্ব- তিন 

অখন্ডতার বাণী আমরা ভুলে যাই।আকাশ চিরদিন অখন্ডই থাকে।তাকে খন্ডিত করার অকারণ অপচেষ্টা না করাই ভালো।তবু কাঁটাতার হয়,সীমানা ভাগ হয়। অদ্ভূত মূর্খতার অন্ধকারে ডুবে আছে প্রাণীকুল।আলোর অন্তরে বাদ্য বাজে, ‘অনন্ত নাদ’ এর ভেরী।সূক্ষ্ম তরঙ্গে মিশে যায় তার অস্তিত্ব,ভুলে যায় তার  অবস্থান।

এ অনুভূতি ঝর্ণার মত,কবিতার মত,ভালোবাসার মত, নদীর প্রবাহের মত। জোর করে সে গতি পাল্টায় না। সৃষ্টির সবাই ভয়ে কাজ করি। অস্তিত্ব বিনাশের ভয়ে।পৃথিবী ঘোরে ভয়ে,তা না হলে সে ধ্বংস হবে। সূর্য তাপ দেয় ভয়ে, তা না হলে তার অস্তিত্ব বিপন্ন হবে।

সৃষ্টি মানুষের প্রশ্বাস,স্থিতি মানুষের ক্ষণিক ধারণ ,প্রলয় মানুষের নিশ্বাস।আলোর অনুসন্ধানীর  ভয় নেই, তাই অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার লড়াই নেই।  লোভ নেই, তাই অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা নেই।অকাল বার্ধক্য নেই।

 আছে শুধু আনন্দ,ছেলেমানুষি,বোকামি,সরলতা,সোজা পথে হাঁটার সোজা রাস্তা…বন্ধু, জাতপাত নির্বিশেষে অখন্ডতার অসীম ভালোলাগায়  মনসায়রে আপনি ডুব  দিতেই পারে।মনোজ জানত,অভিনবকে সবাই নার্ভলেস বয় বলেই ডাকে। ছোটো থেকেই সে প্রচন্ড সাহসী। নদীতে সাঁতার কাটা কিংবা উঁচু গাছ থেকে লাফিয়ে পুকুরের জলে ঝাঁপ দেওয়া তার কাছে জলভাতের মত সহজ। তার বন্ধু চিনু বলছে বন্ধুদের আড্ডায় আত্মার অবস্থানের কথা।

 দ্বিতীয় স্তরে কেউ যদি দেহ ত্যাগ করেন এবং তাঁর মৃত্যু হয়, তিনি সেই ফেজ-এ প্রবেশ করেন, যেখানে চৈতন্য মন থেকেও বিচ্ছিন্ন হয়। মনের প্রকাশ চিন্তায়। চিন্তাই আমাদের জগৎকে তৈরি করে।

এই পর্যায়ে চৈতন্য সেই জগৎ থেকে বিচ্ছিন্ন হয় এবং নিজেকে বিযুক্ত অবস্থায় দেখতে পায়। এই স্তরে আরও একটা ঘটনা ঘটে, যিনি যে ধর্মের মানুষ, যে বিশ্বাসের মধ্যে জীবন কাটিয়েছেন, তিনি সেই বিশ্বাস অনুযায়ী অভিজ্ঞতাপ্রাপ্ত হবেন। খ্রিষ্ট-বিশ্বাসী জিশুকে, কৃষ্ণ-বিশ্বাসী কৃষ্ণকে দেখতে পাবেন।

স্বর্গ বা নরকের যে ধারণা তাঁরা পোষণ করে এসেছেন, তেমন স্বর্গ বা নরক তাঁদের সামনে প্রতীয়মান হবে। যিনি নাস্তিক, তাঁর কাছে এই স্তরটি একটি পাসিং ফেজ হিসেবেই থাকবে। তিনি পরবর্তী স্তরের দিকে এগিয়ে যাবেন।এই দুই স্তরের সমান্তরালে আসবে তৃতীয় স্তর। মনে রাখতে হবে, এই স্তরগুলি ‘পর পর’ ঘটে না। এগুলি সমান্তরাল। কারণ ‘সময়’ বলে কিছুই হয় না। কোনও ঘটনা আগে বা পরে ঘটে না। আমরা জীবদ্দশায় ঘটনা দিয়ে সময়ের ক্রমিকতা তৈরি করি।

সেটা একেবারেই ইলিউশন। মৃত্যু-পরবর্তী তৃতীয় স্তরে এক আলোকসম্ভব অস্তিত্বের মুখোমুখি হই আমরা। এই অস্তিত্বই মহাচৈতন্য। আমরা বুঝতে পারি, আমদের আত্মা বলে যে বিষয়কে আমরা লালন করে এসেছি, তা-ও ‘আমার’ নয়। সে সেই আলোকসম্ভব মহাঅস্তিত্বেরই অংশ। আমাদের আত্মা বলে আলাদা কিছু হয় না। তা বিশ্বাত্মা। তার আমি-তুমি-সে-তাহারা ভেদ নেই। তার ক্ষয় নেই, নাশ নেই।এর একটু পরেই চলে এল নার্ভলেস বয় অভিনব। সে এসেই বসল বন্ধুদের মাঝে। বন্ধুদের বড় প্রিয় এই নার্ভলেস।

সে এলেই বন্ধুদের আড্ডায় চারটে চাঁদ নেমে আসে। আলোচনা আরও জমে ওঠে। নার্ভলেস শুরু করে তার পাহাড়ে ওঠার গল্প।একবার মটর সাইকেলে ভারত ভ্রমণে বেড়িয়েছিল নার্ভলেস বয়। উত্তর ভারত ঘুরতে তার সময় লেগেছিল একমাস। সব জায়গা ঘোরা না হলেও বেশির ভাগ স্থান ঘোরা হয়েছিল। স্বামী চলে যাওয়ার পরে একদম একা হয়ে পরেছিলেন, কবিতা।

মনে পরতো ফুলশয্যা,  আদর।   কি করে যে একটা একটা করে রাত, দিন পার হয়ে যায়, বোঝাই যায় না। তবু বুঝতে হয়, মেনে নিতে হয়। একটা ঘুঘু পাখি তার স্বামী মরে যাওয়ার পর থেকেই এবাড়িতে আসে। আম গাছের ডালে বসে আপন মনে কত কথা বলে। ঘুঘুর ঘু,ঘুঘুর ঘু। সবিতাদেবীর সঙ্গে পাখিটার খুব ভাব।তার মনে হয় স্বামী, ঘুঘুর রূপ ধরে আসেন। তিনি আম গাছের তলায় খুদকুড়ো ছিটিয়ে দেন।

ঘুঘু পাখিটা খায় আর গলা তুলে কবিতাকে দেখে । কিছু বলতে চায়। তিনি বোঝেন। আর আপনমনেই পাখিটার সঙ্গে বকবক করেন। পুরোনো দিনের কথা বলেন। ছেলের বৌ বলে,বুড়িটা পাগলী হয়ে গেছে। প্রতিবেশীরা অতশত বোঝে না। হাসাহাসি করে। শুধু তার ছেলে বোঝে মায়ের অন্তরের কথা, ব্যথা। ঘুঘু পাখিটা সারাদিন ডেকে চলে। এবার আয়, এবার আয়। কবিতার বয়স হল আশি।

 একদিন সবাই দেখলো, বুড়ি ফুলশয্যার রথে শ্মশানে গেলো বোধহয় স্বামীর কাছে। ঘুঘু পাখিটা ডেকে চলেছে তখনও,, ঘুঘুর ঘু… দাদুর বাবার লাঠি। যত্ন করে তুলে রাখা আছে বাঙ্কে। কার জন্য?  বৃদ্ধ আমার জন্য। কত সুখস্মৃতি জড়িয়ে লাঠির অঙ্গ প্রত্যঙ্গে। দাদামশাই লাঠি ধরে পথ চলতেন। লাঠিকে বলতেন, বাবা ভাল করে ধরে রাখিস। ফেলে দিস না এই বুড়ো বয়সে। কোমর ভেঙ্গে যাবে তাহলে।

বিশ্বস্ত লাঠি তার দায়ীত্ব পালন করেছে পলে পলে। এবার তার নাতির পালা।স্মৃতিকন্ঠ গ্রামের মান্যগণ্য লোক। বংশগত একটা বিরাট আভিজাত্য তার চলনে বলনে প্রস্ফুটিত। স্বভাবতই সবাই তাকে সমীহ করে চলেন। তার একটিমাত্র পুত্র সন্তান। তার পড়াশোনার জন্য গ্রামের স্কুলে নিজের অর্থে সাজিয়ে তুলেছেন লাইব্রেরী রুম। যতরকমভাবে  স্কুলকে সাহায্য করা যায় তিনি করেন। তার ছেলের নাম রতন। স্কুলে ছেলে মেয়ে একসঙ্গেই পড়াশুনা করে। রতন পড়ে এখন ক্লাস নাইনে।

আর শুভ বাবুর মেয়ে পড়ে ক্লাস সেভেনে। গ্রাম্য রাজনীতিতে রেষারেষি লেগেই আছে এই গ্রামের তিনটি পাড়ার লোকজন স্বচ্ছল। টাকা পয়সার অভাব নেই। স্মৃতিকন্ঠবাবুর পাড়ায় আভিজাত্যের লড়াই লেগেই আছে। এক বাড়িতে গাজনে একটা পাঁঠা থাকলে অন্য বাড়িতে বাঁধে দুটো। পাঁঠার ঝোল আর মদ। একদম কম্পিটিশন। প্রয়োজনে চার পাঁচটা পাঁঠা এনেও বড়লোকি দেখানোর ব্যাপারটা লেগেই থাকে।

বাকি গ্রামবাসীদের ভুরিভোজ ভালোই হয়। তারা মজামারা দল। একজনকে বাহাদুরি দিয়ে তাতিয়ে দেয় তো অন্য বাবুর জেদ বেড়ে যায়। ব্যবসায়ী যারা তারা এই সুযোগটাই কাজে লাগায়। এক গানের দল হঠাৎ একদিন শুভ বাবুর নাটমন্দিরে ডেরা বাঁধল। তারা ধর্মিয় নানা গানের মধ্য দিয়ে পালাগান শোনায়। রামায়ণ, মহাভারতের ঘটনা, যীশুখ্রীষ্টের ঘটনা গান আর নাটকের মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলে।

মনোজ জীবনের কথা ভুলতে পারে না মরে গিয়েও। কত জীবনের কথকথা তার মনে পড়ছে তৃতীয় স্তরের আত্মা হয়ে। হয়ত কোনদিন প্রথম স্তরের আত্মা তাকে টেনে নেবে স্বর্গদ্বারে।

তাদের গ্রামে রাত বাড়লে নাট মন্দির লোকের ভিড়ে ভরে যায়। শুরু হয় নাটক। দেবতার গলায় গাঁদা ফুলের মালা।অভিনয় দেখে সকলেই মোহিত হয়ে যায়। নাটকের শেষে দেবতার গলায় থাকা মালা নিয়ে দরাদরি শুরু হয়। স্মৃতিকন্ঠ হাঁকেন, আমি মালার দাম দশ হাজার দিলাম।

শুভবাবু পারিষদদল নিয়ে বসে আছেন। তিনি ভাবলেন,এ মালা আমাকেই নিতে হবে। তা না হলে মান সম্মান থাকবে না। তিনি মালার দর হাঁকলেন কুড়িহাজার টাকা।এইভাবে চলতে থাকল নীলামের খেলা। এদিকে নাটকের দলের মহিলা একজন বলছেন, আপনাদের গ্রামের লোক এত কৃপণ কেন।

এই তো পাশের গ্রামে মালার দর পেয়েছি এক লক্ষ টাকা।শুনে মালার দর আরও বেড়ে গেল। এক লক্ষ কুড়ি হাজার টাকায় নীলামে একটা গাঁদার মালা কিনল গাধার দল।মুচকি হাসি আগত অভিনেত্রীর চোখেমুখে। তিনি সফল আপন কারবারে।এইভাবে  বেশ কয়েকদিন টাকা কামিয়ে নাটকের দল চলে যেত আরও মুরগির সন্ধানে….

—ওরে যাস না ওদিকে, পুকুর আছে ডুবে যাবি

—– না মা, কিছু হবে না

ছোট থেকে চিনু দুরন্ত, একরোখা ছেলে। ভয় কাকে বলে সে জানে না। এই নিয়ে তার পরিবারের চিন্তা দিন দিন বেড়েই চলেছে। মনোজের বন্ধু চিনু। মনোজ জানে এই চিনুর আত্মা তাকে উদ্ধার করবে মরার পরে।

এইভাবে প্রকৃতির কোলে বড় হয়ে যায় মানুষ । কত কি শেখার আছে প্রকৃতির কাছে। কিন্তু কজনে আমরা শিক্ষা নিতে পারি। কিন্তু চিনু সেই শিক্ষা নিয়েছিল। গ্রামের সকলে তাকে একটা আলাদা চোখে দেখত।বেশ সম্ভ্রমের চোখে। পরিবারের সকলে জানে না, কি করে চিনু শিক্ষা পেল। প্রথাগত শিক্ষা সে পায় নি। তবু বাড়িতে দাদুর কাছে লেখাপড়া শিখেছে। বই পড়া শিখেছে।

চিনু বলত, দাদু কি করে তুমি বই পড়। আমি পারি না কেন?  দাদু বলতেন, নিশ্চয় পারবি। মনে মনে  বানান করে পড়বি। দেখবি খুব তাড়াতাড়ি বইপড়া শিখে যাবি।হয়েছিল তাই। দুমাসের মধ্যে চিনু গড়গড় করে বই পড়ত।কোনো উচ্চারণ ভুল থাকত না।দুপুরবেলা হলেই চিনু বন্ধুদের নিয়ে কদতলা, বেলতলা, আমতলা, জামতলা দৌড়ে বেড়াত।

কাঁচা কদ কড়মড় করে চিবিয়ে খেত। লাঠিখেলা,কবাডি সব খেলাতেই তার অদম্য উৎসাহ। গ্রামের লোকের উপকারে তার দল আগে যায়।এই দাপুটে ছেলে চিনু একদিন এক সাধুর সঙ্গে ঘরছাড়া  হল। বাড়ির সকলে কান্নায় ভেঙ্গে পরলো। কিন্তু চিনুকে আর খুঁজে পাওয়া গেল না। একদিন গ্রামের একজন গিয়ে দেখল, সাধুর আশ্রমে সবুজ গাছ যত্নের, কাজ করছে চিনু  ।

Published by Story And Article

Word Finder

Leave a Reply

%d bloggers like this: