রবীন্দ্রনাথ – ১ বাংলাদেশে রবীন্দ্রনাথ // পীযূষ কান্তি বড়ুয়া

বাংলাদেশের রবীন্দ্রনাথ:

.

.

রবীন্দ্রনাথ বাঙালির চেতনার বাতিঘর। বাঙালির সঙ্কটে সন্তাপে সঙ্কোচে রবীন্দ্রনাথ এখনো অনন্য আশ্রয়। বাংলার প্রকৃতির সাথে রবীন্দ্রনাথ জড়িয়ে আছেন চেতনার নির্যাসরূপে। এদেশের নদী-নিসর্গ, পাখি-পল্লবে রবীন্দ্রনাথের সুর ও ছন্দ মিশে আছে শেকড়ের অনুষঙ্গ হয়ে। ‘পদ্মা’ বোটে চড়ে রবীন্দ্রনাথ পদ্মা,গড়াই, ইছামতি, নাগর,

.

.

আত্রাই,করতোয়া, চলনবিল হয়ে ঘুরেেছেন তাঁর জমিদারিতে। পতিসরের নাগর নদীকে রবীন্দ্রনাথ তাঁর ভ্রাতুষ্পুত্রী ইন্দিরাকে লিখিত পত্রে গ্রাম্য নদী বলে উল্লেখ করেছেন।

.

.

রবীন্দ্রনাথ বাংলাদেশে বালকরূপে এসেছেন। এসেছেন জমিদাররূপে। রাজনীতির নেতা হয়ে এসেছেন আবার কবি হয়ে এসেছেন। এসেছেন নোবেল বিজয়ীরূপে কিংবা এসেছেন সংসারের কর্তারূপে সপরিবারে।

.

.

রবীন্দ্রনাথ প্রথম বাংলাদেশে এসেছেন শৈশবে মা সারদা সুন্দরী দেবীর সাথে খুলনার দক্ষিণডিহি গ্রামে মামাবাড়িতে এবং পরবর্তীতে আসেন চৌদ্দ বছর বয়সে তৎকালীন পূর্ববঙ্গের শিলাইদহে তাঁর পিতা মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাথে ১২৮২ বঙ্গাব্দের অগ্রহায়ণ মাসে যা ইংরেজি ১৮৭৫ খ্রীস্টাব্দের ছয় ডিসেম্বর।সে দফায় কিশোর রবি বাইশে ডিসেম্বর অব্দি শিলাইদহে ছিলো।

.

.

আবার একই বঙ্গাব্দের ফাগুন মাসে তথা ১৮৭৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে রবীন্দ্রনাথ তাঁর সেজদাদা জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাছে শিলাইদহে বেড়াতে আসেন। মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর পিতার সূত্রে পাওয়া জমিদারিতে পূর্ববঙ্গে তিনটি পরগণার মালিক ছিলেন। একটি পরগণা তৎকালিন নদীয়া জেলার বিরাহিমপুর যা বর্তমানে কুস্টিয়া জেলা। এই জমিদারির কাছারি কুমারখালি উপজেলার শিলাইদহ গ্রামে। তৎকালিন শিলাইদহে মুসলিম প্রজার সংখ্যা ছিল শতকরা চুয়ান্নভাগ।

.

.

 

একটি পরগণা তৎকালিন পাবনা জেলার শাহজাদপুর যা বর্তমানে সিরাজগঞ্জ জেলার অন্তর্গত এবং এর কাছারি ছিল শাহজাদপুর।
তৃতীয় পরগণাটি ছিল তৎকালিন রাজশাহীর অন্তর্গত যা বর্তমানে নওগাঁ জেলায় এবং এর কাছারি ছিল আত্রাই উপজেলার পতিসর গ্রামে। পতিসরে মুসলিম প্রজার সংখ্যা ছিল শতকরা ষাট ভাগ। রবীন্দ্রনাথের পিতা পূর্ববঙ্গে জমিদারি দেখভাল করার জন্যে একসময় রবীন্দ্রনাথের ভগ্নিপতি সারদাচরণকে দায়িত্ব দেন। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের বিয়ের দিনেই সারদাচরণ মৃত্যুবরণ করেন।

.

.

পরবর্তীতে উপযুক্ত উত্তরসুরি না পেয়ে দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর কনিষ্ঠ পুত্রকেই পূর্ববঙ্গের জমিদারিতে পাঠান। রবীন্দ্রনাথ তাঁর পিতার নিকট নিজের ব্যাপারে মৃদু আপত্তি জানালেও ১৮৮৯ সালে তিনি পূর্ববঙ্গে জমিদারি দেখভাল করার জন্যে আসেন।

.

.

শিলাইদহে রবীন্দ্রনাথ:

.

.

বর্তমান কুষ্টিয়া জেলার কুমারখালী উপজেলার একটি গ্রাম শিলাইদহ। পদ্মা নদীর কোল ঘেঁষা এ গ্রামের সাবেক নাম কসবা। রবীন্দ্রনাথের ঠাকুরদাদা প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর ১৮০৭ সালে এ অঞ্চলের জমিদারি পান। রবীন্দ্রনাথ এখানে ১৮৮৯ সালে জমিদার হয়ে এসে ১৯০১ সাল পর্যন্ত জমিদারী পরিচালনা করেন। এখানে বসেই তিনি রচনা করেন সোনার তরী কাব্যগ্রন্থের কবিতাগুলো।কবি ১৮৯৮ সালে সপরিবারে এখানে বাস করেন কিছুদিন।

.

.

পরে রথীর পরীক্ষা আর রেণুকার বিয়ে দিতে হবে বিধায় পরিবারকে কোলকাতা পুনরায় পাঠিয়ে দেন। ১৯১২ সালে গীতাঞ্জলি কাব্যের অনুবাদের কাজও শুরু করেন শিলাইদহে। এসময় তিনি অসুস্থতার কারণে বিলেত যেতে পারেননি বলে শিলাইদহে এসে কিছুদিন অবস্থান করেন। কবি নোবেল পুরস্কার পাওয়ার পর ১৯২২ সালে শিলাইদহে সংবর্ধনা গ্রহণ করেন।

.

.

শাহজাদপুরে রবীন্দ্রনাথ:

.

.

রবীন্দ্রনাথ শাহজাদপুরে প্রথম জমিদারি দেখতে আসেন ১৮৯০ সালে। রবীন্দ্রনাথ ১৮৯০ থেকে ১৮৯৬ সাল পর্যন্ত মোট ৭ বছর জমিদারির কাজে শাহজাদপুরে অবস্থান করেছিলেন।
‘পোস্ট মাস্টার’ গল্পের ‘রতন’ চরিত্রও শাহজাদপুরে বসেই লেখা। চিত্রা, শীতে ও বসন্তে, নগর সঙ্গীতে এবং চৈতালীর ২৮টি কবিতা, ছিন্ন পত্রাবলীর ৩৮টি, পঞ্চভূতের অংশবিশেষ এবং বিসর্জনের নাটক তিনি শাহজাদপুরে বসেই রচনা করেছেন।

পতিসরে রবীন্দ্রনাথ:

১৮৯১ সালে রবীন্দ্রনাথ জমিদারি দেখাশোনার জন্য পতিসরে আসেন। এই কাছারিতে অবস্থানকালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বেশ কিছু কবিতা, গল্প ও প্রবন্ধ রচনা করেন। এই স্থানটির চারপাশেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পরিবার কর্তৃক স্থাপিত বেশ কিছু স্থাপনা রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল,কালীগ্রাম রথীন্দ্রনাথ ইন্সটিটিউশন নামে একটা বিদ্যালয়, দাতব্য হাসপাতাল ও পুরানো একটি কৃষি ব্যাংক যা ১৯০৫ সালে স্থাপিত হয়েছিল। এছাড়াও রবীন্দ্রনাথ এখানে গড়ে তুলেছিলেন মৃৎশিল্প।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নোবেল প্রাপ্তির পর ১৯১৪ সালে একবার সংবর্ধনা গ্রহণ করেন এবং সর্বশেষ ১৯৩৭ সালে পতিসরে আসেন এবং দ্বিতীয় বারের মতো প্রজা-সাধারণের সংবর্ধনা গ্রহণ করে তাদের উত্তরে কিছু করতে না পারার আক্ষেপ ব্যক্ত করেন।

রবীন্দ্রনাথ ও কালীগ্রাম:

.

.

কালীগ্রাম পরগণার আয়তন ছিলো ২৩০ বর্গ মাইল এবং নাগর নদীর তীরে অবস্থিত।রবীন্দ্রনাথ কালীগ্রামে একটি ‘হিতৈষী সংঘ’ প্রতিষ্ঠা করেন যার উদ্দেশ্য ছিল কালীগ্রামবাসীর হিতসাধন। শিক্ষা বিস্তারের জন্যে তিনি এখানে রাতোয়াল,

.

.

পতিসর ও কামতায় তিনটি মধ্য ইংরেজি স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। কালীগ্রামে বসে কবি যে তালগাছটি নিয়ে ‘তালগাছ একপায়ে দাঁড়িয়ে/সব গাছ ছাড়িয়ে’ কবিতাটি লিখেছিলেন সেই গাছটি ১৯৬১ সালের ঝড়ে ভেঙ্গে যায় ও মরে যায়। পরবর্তীতে তার স্মৃতি হিসেবে মাটি স্তূপাকৃতি করে রাখা হয়। ইদানীং একটা শিশু তালগাছ রোপন করা হয়েছে।

 

বরিশালে রবীন্দ্রনাথ:

.

.

১৯০৬ সালের ১৫ এপ্রিল বরিশালে কংগ্রেসের প্রাদেশিক সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
বরিশালে কবিগুরু তার মেয়ে মীরা দেবীকে বিয়ে দিয়ে এবং আখের কল স্থাপন করে চরম খেসারত দিয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথের বরিশালের সঙ্গে আত্মীয়তার সম্পর্ক আরও অনেক ছিল। রবীন্দ্রনাথ তার ১৪ বছর বয়স্কা কনিষ্ঠ কন্যা মীরা দেবীকে বিয়ে দিয়েছিলেন নগরীর হাসপাতাল রোডের ব্রাহ্মণ সমাজের নেতা শ্রী বামুন দাশ গঙ্গুলীর পুত্র নগেন্দ্রনাথ গাঙ্গুলীর সঙ্গে।

.

.

১৯০৭ সালের জুন মাসে এ বিয়ে সম্পন্ন হয়। জামাইবাড়িতে রবীন্দ্রনাথ বেড়াতে এসে এক সপ্তাহ কাটিয়েছিলেন। তখন বরিশালের স্থানীয় গুণীজনদের সঙ্গে আলোচনা করে তিনি একটি সাহিত্য পরিষদ খোলার উদ্যোগ নিয়েছিলেন।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর চন্দ্রদ্বীপের (বরিশাল) রাজা রামচন্দ্র রায়ের স্ত্রী বিভাবতীকে নিয়ে ‘বৌ-ঠাকুরানীরহাট’ নামের একটি উপন্যাস রচনা করেছেন।

.

.

চট্টগ্রামে রবীন্দ্রনাথ:

.

.

দুদিনের সফরে চট্টগ্রামে এসেছিলেন ১৯০৭ সালের ১৭ জুন সোমবার। সেদিন ভোরে খুব বৃষ্টি হচ্ছিল। তার সফর সঙ্গী ছিলেন ভাইপো সুরেন্দ্রনাথ ঠাকুর ও বন্ধু কেদারনাথ দাশগুপ্ত।

রবীন্দ্রনাথের চট্টগ্রাম আসার উদ্দেশ্য ছিল বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের শাখা খোলার জন্য চট্টগ্রামের কবি সাহিত্যিকদের উৎসাহিত করা ও সুহৃদ যামিনীকান্ত সেনের আমন্ত্রণ রক্ষা।
১৯০৭ সালের ১৮ জুন মঙ্গলবার সকালে কবি কয়েকজনকে সঙ্গে নিয়ে শহর দেখতে বের হন এবং কর্ণফুলী নদীর তীরে জাহাজঘাটে গিয়ে কয়েকজন জাহাজের মাঝি-মাল্লার সাথে কথা বলেন।

.

.

১৯০৭ সালের ১৮ জুন বিকেলে নগরীর সদরঘাট এলাকায় সে সময়ের কমলবাবুর থিয়েটার হলে,যা পরবর্তীতে লায়ন সিনেমা হলে পরিণত হয়,সেখানে রবীন্দ্রনাথের সংবর্ধনার আয়োজন করা হয়।
১৮ জুন রাতে সফরসঙ্গীদের নিয়ে ট্রেনে করে চট্টগ্রাম ত্যাগ করেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।

.

.

তৎকালীন চট্টগ্রাম কলেজের আইনের অধ্যাপক ও সাহিত্যিক রজনীরঞ্জন সেনের পার্সিভিল হিলের ‘দ্যা প্যারেড’ এর বাসভবনে নির্ভেজাল আড্ডায় মেতে ওঠেন কবি। এই আড্ডা চলাকালীন স্থানীয় কবি-সাহিত্যিকদের সমর্থনে চট্টগ্রামে সাহিত্য পরিষদ স্থাপনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়।

.

.

চট্টগ্রামের কবি, লেখক, সাহিত্যিক ও বিশিষ্ট নাগরিকগণের মধ্যে এই সভায় আবদুল করিম সাহিত্য বিশারদ, নবীন চন্দ্র সেন, পূর্ণ চন্দ্র চৌধুরী, মৌলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী, যাত্রা মোহন সেন, রামচন্দ্র বড়ুয়া, হরিশচন্দ্র দত্ত, আবদুর রহমান দোভাষ, মাহিমচন্দ্র গুহ, কাজেম আলী ও ব্রজ মোহন সেনের মতো চট্টগ্রামের প্রখ্যাত ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন।

.

.

সিলেটে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর :

.

.

১৯১৯ সালের ৪ নভেম্বর রবীন্দ্রনাথ সিলেটের উদ্দেশ্যে আসেন এবং কুলাউড়া স্টেশনে রাত যাপন করে সিলেটে পৌঁছান। সিলেটে তিনি ৭ নভেম্বর পর্যন্ত অবস্থান করেন ।
সিলেটের মনিপুরি পল্লী মাছিমপুরে রবীন্দ্রনাথ প্রথমবারের মতো মণিপুরি নৃত্য- রাসনৃত্য অবলোকন করেন । নৃত্য দেখে তিনি এতটাই মুগ্ধ হয়েছিলেন যে, পরবর্তীকালে শান্তিনিকেতনে মনিপুরি নৃত্যশিক্ষার কোর্স প্রবর্তন করেন। এরপর থেকে চিত্রাঙ্গদা, চণ্ডালিকা, মায়ার খেলা, নটীর পূজা, শাপমোচন নৃত্যনাট্যে মনিপুরি নৃত্যেকে তুলে ধরেন। মনিপুরি নৃত্যকে মণ্ডপের পরিমণ্ডল থেকে বের করে রবীন্দ্রনাথই বিশ্বমণ্ডলে স্থান করে দিয়েছেন।

টাউন হলে সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে কবি ‘ বাঙ্গালীর সাধনা’ বিষয়ের উপরে দেড় ঘণ্টা বক্তৃতা প্রদান করেন। পরবর্তীতে রবীন্দ্রনাথ নিজেই ইংরেজিতে ‘Towards the future’ নামে অনূদিত রূপ মডার্ণ রিভিয়ু পত্রিকায় প্রকাশ করেন। এমসি কলেজে শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে দেয়া তার বক্তব্য ‘আকাঙ্ক্ষা’ নামে উত্তরকালে পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

১৪ বছরের এক সিলেটি কিশোর সে বক্তব্য শুনে অনুপ্রাণিত হয়ে রবীন্দ্রনাথের কাছে চিঠি লিখে জানতে চেয়েছিলো, ‘আকাঙ্ক্ষা উচ্চ করতে হলে কি করা প্রয়োজন?’ রবীন্দ্রনাথও উত্তর দিয়েছিলেন। এরপর তৈরি হল গুরু শিষ্য যোগাযোগে নতুন ইতিহাস। সেই অনুসন্ধিৎসু কিশোরটি ছিলেন সৈয়দ মুজতবা আলি যিনি শান্তি নিকেতনে কলেজ পর্যায়ে প্রথম ‘বিদেশী’ ছাত্র।
রবীন্দ্রনাথ সিলেটে এসেছিলেন তিনটি সংগঠনের আমন্ত্রণে, ব্রাহ্মসমাজ, সিলেট মহিলা সমিতি ও আঞ্জুমানে ইসলামী।

.

.

কুমিল্লায় রবীন্দ্রনাথ:

.

.

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কুমিল্লা আসেন, ১৯২৬ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারী। অভয় আশ্রমের তিন বৎসর পুর্তিতে। এসময় মহাত্মা গান্ধীও এসেছিলেন। রবীন্দ্রনাথ অভয় আশ্রমের ত্রি-বার্ষিক সভায় সভাপতিত্ব করার আমন্ত্রণ গ্রহণ করে কবিপুত্র ও পুত্রবধুসহ শান্তি নিকেতনের অনেককেই সাথে এনেছিলেন।

কোলকাতা থেকে ট্রেনে গোয়ালন্দ, ষ্টিমারে চাঁদপুর তারপর ট্রেনে করে রাতে কুমিল্লা এসে পৌঁছেন। কবি তখন, কিছুটা অসুস্থ ছিলেন, তাই আগেই জানিয়েছেন, কোন সম্বর্ধনা অনুষ্ঠানের আয়োজন যেনো করা না হয়।
কবিগুরু ১৯ ফেব্রুয়ারি রাত থেকে ২২ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যা পর্যন্ত কুমিল্লায় ছিলেন। ২০ ফেব্রুয়ারি অভয় আশ্রমের কর্মীরা কবিকে একটি মানপত্র অর্ঘ্য দেন।

.

.

ঢাকায় রবীন্দ্রনাথ:

.

.

রবীন্দ্রনাথ ঢাকা আসেন দুইবার।
প্রথমবার তিনি বঙ্গীয় প্রাদেশিক পরিষদের সম্মেলনে যোগ দিতে ১৮৯৮ সালের ৩০ মে হতে ১জুন ঢাকা অবস্থান করেন। এসময় তিনি ঢাকার ক্রাউন থিয়েটারে বক্তব্য প্রদান করেন।
দ্বিতীয়বার কবিগুরু ১৯২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের ৭ তারিখে ঢাকার করোনেশন পার্কে বক্তব্য প্রদান করেন। এসময় তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আহ্বানে বাংলাদেশে আসেন। তিনি কোলকাতা হতে স্টীমারযোগে গোয়ালন্দ ভায়া চাঁদপুর হয়ে নারায়ণগঞ্জ পৌঁছান। নারায়ণগঞ্জ হতে মোটর শোভাযাত্রায় তাঁকে ঢাকায় নিয়ে আসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। অতঃপর তিনি নবাবের ‘তুরাগ’ বোটে চড়ে প্রমোদ বিহার উপভোগ করেন।

৭ ফেব্রুয়ারি ঢাকা করোনেশন পার্কে গান পরিবেশন করেন।
৮ ফেব্রুয়ারি ঢাকা আহসান মঞ্জিলে চা-চক্রে অংশ নেন।
৯ ফেব্রুয়ারি বিশ্ব ভারতী সম্মিলনী, ঢাকার সংবর্ধনা গ্রহণ করেন।
৯ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় ঢাকা ইন্টারমিডিয়েট কলেজ প্রাঙ্গণে তিনি ‘ প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য সংস্কৃতি ও সভ্যতার স্বরূপ’ বিষয়ে বক্তব্য দেন।
১০ফেব্রুয়ারি সকালে পূর্ববঙ্গ ব্রাহ্ম সমাজ পাটুয়াটুলি,ঢাকায় বক্তব্য দেন। সন্ধ্যায় কার্জন হলে ‘মিনিং অফ আর্ট’ এর উপর বক্তৃতা প্রদান করেন।
বিকেলে মুসলিম হল ছাত্র ইউনিয়নের সংবর্ধনা গ্রহণ করেন।
১১ ও ১২ ফেব্রুয়ারি কবি অসুস্থ বোধ করায় কোথাও যাননি।
১৩ ফেব্রুয়ারি কার্জন হলে দ্য রুল অফ জায়ান্ট এই বিষয়ে বক্তৃতা দেন।
১৪ ফেব্রুয়ারি ঢাকা ইন্টারমিডিয়েট কলেজের অধ্যক্ষের বাসভবনে সংবর্ধনা ও কবিকণ্ঠে আবৃত্তিতে অংশ নেন।
১৫ ফেব্রুয়ারি জগন্নাথ হলের বার্ষিকী ‘বাসন্তিকা’র জন্যে গান লিখে দেন। এই কথাটি মনে রেখো,তোমাদের হাসি খেলায় আমি ত গান গেয়েছিলেম।
১৫ তারিখ দুপুরে ময়মনসিংহের উদ্দেশ্যে ট্রেনযোগে ঢাকা ত্যাগ করেন।

.

.

বলধা গার্ডেনে রবীন্দ্রনাথ:

.

.

রবীন্দ্রনাথ ১৯২৬ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি দুপুরে ঢাকার ওয়ারীতে অবস্থিত গাজীপুরের বলধার জমিদার নরেন্দ্র নারায়ণ রায় চৌধুরী প্রতিষ্ঠিত ‘বলধা’ গার্ডেন পরিদর্শন করেন। তিনি এখানে ‘জয় হাউস’ এ একরাত অবস্থান করেন। বলধা গার্ডেনে তিনি ক্যামেলিয়া ফুল দেখে বিস্ময়াভিভূত হন এবং এর প্রভাবে ঢাকা থেকে ফিরে ১৩৩৯ বঙ্গাব্দের ২৭ শ্রাবণ বিখ্যাত ‘ক্যামেলিয়া’ কবিতাটি রচনা করেন যা ‘পুনশ্চ’ কাব্যগ্রন্থের অর্ন্তভূক্ত। পরবর্তী সময়ে এ কবিতা নিয়ে সজল সমদ্দার কর্তৃক চলচ্চিত্রও নির্মিত হয়েছে।

বলধা গার্ডেন দেখে রবীন্দ্রনাথ বলে উঠেছিলেন, ‘পৃথিবীর বহু রাজা-মহারাজার বাড়িতে কত রকম ফুলের বাগানই তো দেখলাম কিন্তু বলধা গার্ডেনের মতো বাগান কোথাও দেখিনি।’
তিনি একটি কাঁটাওয়ালা ফুল দেখে তাৎক্ষণিক লিখেছিলেন,
‘কাঁটায় আমার অপরাধ আছে
অপরাধ নেই ফুলে
কাঁটা ওগো মোর থাক প্রিয়তম
ফুল নিও তুমি তুলে।’

 

ময়মনসিংহে রবীন্দ্রনাথ:

 

কবিগুরু ট্রেনযোগে ঢাকা হতে ১৫ ফেব্রুয়ারি ১৯২৬ সালে ময়মনসিংহ পৌঁছেন। তিনি বিখ্যাত আলেকজান্দ্রা প্যালেসে জমিদার জগৎ কিশোর চৌধুরীর আতিথেয়তা গ্রহণ করেন।
১৫ ফেব্রুয়ারি বিকেলে ময়মনসিংহ মিউনিসিপ্যালিটির পক্ষ থেকে কবিকে বিশাল সংবর্ধনা দেওয়া হয়।

১৬ ফেব্রুয়ারি সকাল আটটায় ময়মনসিংহ ব্রাহ্ম সমাজের অনুষ্ঠানে কবি উপস্থিত হন।
১৭ ফেব্রুয়ারি কবি মুক্তাগাছা জমিদারবাড়ি পরিদর্শন করেন। মুক্তাগাছা সাহিত্য সংসদ ত্রয়োদশ সম্মেলনী তাকে আনুষ্ঠানিক সংবর্ধনা দেয়। ওইদিনই বিকেলে ময়মনসিংহ টাউন হল প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত হয় বিশাল নাগরিক সংবর্ধনা। স্থানীয় জনতা ও সাহিত্য সম্মেলনী কবিকে অভিনন্দন পত্র দেয়।
১৮ ফেব্রুয়ারি কবি ঈশ্বরগঞ্জ এর আঠারোবাড়ির উদ্দেশ্যে ময়মনসিংহ ত্যাগ করেন।

চাঁদপুরে রবীন্দ্রনাথ:

চাঁদপুরে রবীন্দ্রনাথের যেন নাড়ির টান ছিলো। চাঁদপুর শহর হতে ছয় কিলোমিটার দূরে বাজাপ্তি গ্রামে রবীন্দ্রনাথ এসেছিলেন ১৯২৬ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি তাঁর অতি ঘনিষ্ট এবং পল্লী উন্বয়ন কর্মসূচির সহায়ক কর্মবীর কালীমোহন ঘোষের বাড়িতে। কালীমোহন ঘোষের জ্যেষ্ঠপুত্র শান্তিময় ঘোষের নাম রবীন্দ্রনাথ শান্তিদেব ঘোষ করেন। শান্তিদেব ঘোষ শান্তি নিকেতনে বিশ্বভারতীর অধ্যক্ষ ছিলেন। কালীমোহন ঘোষের কনিষ্ঠ পুত্র সাগরময় ঘোষ রবীন্দ্রনাথের সরাসরি ছাত্র ছিলেন। রবীন্দ্রনাথকে চাঁদপুরে বর্তমান নিউমার্কেট এলাকায় তৎকালিন অবস্থিত পৌরসভার পার্কে সংবর্ধনা প্রদান করা হয়। রবীন্দ্রনাথ চাঁদপুর হতে ২৮ তারিখ নারায়ণগঞ্জে গমন করেন।

লালন ও রবীন্দ্রনাথ:

 

রবীন্দ্রনাথ ছিলেন লালনের তত্ব ও গানের এক মহান ভক্ত। ১৮৮৯ সালে রবীন্দ্রনাথ যখন কুষ্টিয়ার শিলাইদহে আসেন তখনই কোন এক সময়ে লালন সাঁইজির সাথে তাঁর দেখা হয়। তিনি লালন ফকিরের ২০টি গান প্রবাসী পত্রিকায় হারামনি বিভাগে প্রকাশিত করেছিলেন। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে দেওয়া তাঁর বক্তৃতায় তিনি লালনের ‘খাঁচার ভিতর অচিন পাখি’ গানের ইংরেজি অনুবাদ বিদেশি শ্রোতাদের শুনিয়েছিলেন।

 

লালনের গানে রবীন্দ্রনাথ দারুণভাবে প্রভাবিত হয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার এক লেখায় বলেছেন ‘লালন ফকির নামে একজন বাউল সাধক হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, জৈন ধর্মের সমন্বয় করে কী যেন একটা বলতে চেয়েছেন। আমাদের সবারই সেদিকে মনোযোগ দেওয়া উচিত।’ ‘খাঁচার ভেতর অচিন পাখি কমনে আসে যায়/ধরতে পারলে মনো-বেড়ি দিতাম পাখির পায়’- লালনের এই গানটি শুনে রবীন্দ্রনাথ এমনই মুগ্ধ হলেন, দেহতত্ত্বের এ গানটিকে রবীন্দ্রনাথ ইংরেজিতে অনুবাদ করলেন। ১৯২৫ সালের ভারতীয় দর্শন মহাসভায় ইংরেজি বক্তৃতায় এই গানের উদ্ধৃতিও দিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। রবীন্দ্রনাথ নিজে স্বপ্রণোদিত হয়ে লালনের ২৮৯ টি গান সংগ্রহ করেন। রবীন্দ্রনাথই বাঙালির লালনকে ছড়িয়ে দিয়ে বিশ্বমায়ের লালনে পরিণত করেন।

খুলনার দক্ষিণডিহিতে রবীন্দ্রনাথ:

 

 

রবীন্দ্রনাথ বাইশ বছর বয়সে ১৮৮২ সালে তার মেজবৌদি ও সেজ বৌদির সাথে খুলনা জেলার দক্ষিণডিহি গ্রামে এসেছিলেন। কবির মামাবাড়ি এবং শ্বশুরবাড়ি উভয়ই খুলনা জেলার ফুলতলা থানার দক্ষিণডিহি গ্রামে। রবীন্দ্রনাথের মা সারদা সুন্দরী দেবী ও কাকীমা ত্রিপুরা সুন্দরী দেবী এই গ্রামেরই মেয়ে। রবীন্দ্রনাথের স্ত্রী মৃণালিনী দেবীও তাই। ১৮৮২ সালে পুজার ছুটির সময় সত্যেন্দ্রনাথের স্ত্রী জ্ঞানদানন্দিনী দেবী উৎসাহী হয়ে বাস্তভিটা দেখবার অযুহাতে কাছাকাছি পীরালী পরিবারের কোন কন্যাকে বধু হিসেবে বরণের জন্যে আসেন।

 

জ্ঞানদানন্দিনীর সঙ্গে কাদম্বরী দেবী, বালিকা ইন্দিরা, বালক সুরেন্দ্র নাথ ও রবীন্দ্রনাথ আসেন পুরান ভিটা দেখতে। সে সময় ফুলতলা গ্রামের বেণীমাধব রায় চৌধুরীর কন্যা ভবতারিনীকে তারা নির্বাচন করেন যার নাম বিয়ের পরে হয় মৃণালিনী। শৈশবে কবি কয়েক বার তাঁর মায়ের সঙ্গে দক্ষিণডিহি গ্রামের মামা বাড়িতে এসেছিলেন। এখানে কবিগুরু ও কবিপত্নীর আবক্ষ মূর্তি স্থাপন করা হয়েছে।

.

.

পিঠাভোগে রবীন্দ্রনাথ:

পিঠাভোগ গ্রামটি বাংলাদেশের খুলনা জেলার ভৈরব নদের অববাহিকায় অবস্থিত একটি গ্রাম। এটি রবীন্দ্রনাথের পিতৃপুরুষের ভিটা। একবার খুলনায় সাক্ষ্য দিতে এসে তিনি পিঠাভোগ গ্রামে যাওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন। তবে তিনি আদৌ পিঠাভোগ গ্রামে যেতে পেরেছিলেন কিনা তা জানা যায়নি।

রবীন্দ্রনাথের স্তন্যমাতা বাংলাদেশ :

রবীন্দ্রনাথ জন্ম নিয়েছেন জোড়া সাঁকোতে কিন্তু তাঁর মানস নির্মাণের মুখ্য কাজটি সম্পন্ন করেছে বাংলাদেশের নদী-নিসর্গ। বাংলাদেশের শ্যামল প্রকৃতি রবীন্দ্রনাথকে দিয়েছে অনুভূতির প্রগাঢ়তা আর আধ্যাত্মিক চিন্তার সক্ষমতা। জমিদার রবীন্দ্রনাথ বাংলাদেশে না আসলে কৃষিবীর রবীন্দ্রনাথের জন্ম হতো না।

.

.

মানবিক জমিদার রবীন্দ্রনাথের নির্মাণে বাংলাদেশের সহজ সরল মানুষগুলোর অবদান অধিক। এমনকি রবীন্দ্রনাথের নোবেলের মুকুলও জন্মেছে বাংলাদেশে।

.

.

তাই যথার্থ অর্থেই বাংলাদেশ যেন রবীন্দ্র মননের স্তন্যমাতা বা অন্য অর্থে বাংলাদেশই রবীন্দ্রনাথের মা যশোধরা যার বুকে দশ বছরের টানা বিচরণ একজন মানবশিশুকে করে তুলেছে চেতনার বটতলারূপে। বাংলাদেশের জাতীয় চেতনায় রবীন্দ্রনাথ তাই সর্বদা প্রাসঙ্গিক এক অনুষঙ্গ।

 

Facebook Comments

Published by Story And Article

Word Finder

0 0 vote
Article Rating

Leave a Reply

0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x
%d bloggers like this: