রহস্য নদীর গর্ভাদেশ : ডালিয়া কর্মকার

আমি বরাবর ভ্রমণ পিপাসু। সময় পেলেই বেরিয়ে যাই এদিক ওদিক,কখনো পাহাড়,কখনো জঙ্গল,তো কখনো সমুদ্র।আবার এমনও হয়েছে ট্রেনে চেপেছি হঠাৎ কোনো যাত্রীর মুখে শুনেছি কোনো রোমাঞ্চকর জায়গার কথা সেখান থেকেই পথ ঘুরিয়ে চলে গেছি সেই জায়গায়।

এমনি এক রহস্য ভ্রমণ ছিল পশ্চিম মেদিনীপুরের এক জঙ্গল ঘেরা নদীর ধারের বন বাংলোর। বেরিয়ে ছিলাম দীঘা যাওয়ার জন্য।কিন্তু পথে একজন বয়স্ক মানুষের কাছে এই জঙ্গলের কথা জানতে পারি। বহু পুরোনো এই জঙ্গলের মধ্যে হারিয়ে গেছে একটি প্রাচীন নদী। কোনো এক সময় এই নদীর আশীর্বাদে গড়ে উঠেছিল এক সভ্যতা।

সেই নেশাতেই ছুটে গেলাম। ট্রেন থেকে নেমে অনেকটা পথ হেঁটে আসার পরে রিক্সা করে পৌঁছে গেলাম বাংলোর কাছে। এখন মাঝে মাঝেই ঘুরতে লোকজন আসে বলেই বাংলোটিকে গুছিয়ে রাখা হয়েছে। বাইরে ছোটো বাগান। বাকি জঙ্গলের অদ্ভুত গাছপালায় ঘেরা। নদীর কথা জানতে চাইলাম ওখানের কেয়ার টেকারের কাছে। এক প্রকার এড়িয়ে গেলেন তিনি। চোখে এক অদ্ভুত ভয় আর অপ্রস্তুত দেখে আমি কিছু জানতে চাইনি। 

ডিসেম্বর মাসের মাঝামাঝি শীত টাও জমিয়ে পড়েছে। সন্ধ্যার হালকা একটা দিনান্তের আলো, ঝাঁক ঝাঁক পাখির, অজানা পতঙ্গের আর কিছু অন্যরকম জানোয়ারের ডাকে বেশ রোমাঞ্চকর পরিবেশ তৈরি করে দিল। বেলকনিতে বসে গরম চায়ে চুমুক দিতেই কানে এলো এক নদীর কলকল শব্দ। যেন অনেক জল বয়ে যাচ্ছে সামনেই কোনো নদীতে।

এক অদ্ভুত মুগ্ধতায় ডুবিয়ে দিলো আমাকে। উঠে পড়লাম সেই শব্দ কে অনুসরণ করে এগিয়ে চললাম। পাতার খোষখসানি শব্দ সঙ্গে নদীর কল্লোল ঘোরের মধ্যে হেঁটে চললাম। এক বিশাল নদীর সামনে এসে দাড়ালাম। আকাশে তখনো একটু আলো বাকি। নদীর রঙ হঠাৎ রক্তের মত লাল হয়ে উঠলো।

বিশাল ঢেউ দিয়ে আমাকে টেনে নিয়ে গেল জলের গভীরে, সাঁতার কাটার চেষ্টা বৃথা হলো। চোখের সামনে খুলে গেলো বহু প্রাচীন সভ্যতার এক পাথরের বিশাল ফটক। চারিদিকে নানারকম শিল্প কারুকার্য। ব্যবহারের বহু জিনিস, পাথরের দেওয়ালে খোদিত নানান কাহিনীর চিত্র, বড়ো বড়ো ঘরায় কত কত খাবার। এগিয়ে চলতে চলতে চোখের সামনে ভেসে উঠলো হাজার হাজার মৃত মানুষের লাশ, রক্তাক্ত। কত শত শিশুদের মৃত শরীর, সেই রক্তে লাল হয়ে উঠলো জলদেশ…আমার সারা শরীরে এসে সেই লাল রক্তের দাগ। হঠাৎ কেউ আমার হাত ধরে টেনে তুলে নিলো সেখান থেকে।

ঘুম ভাঙতেই দেখি আমার সামনে বাংলোর কেয়ার্টেকার অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। পাশে একজন অল্প বয়সী ছেলে বুঝলাম সে ডাক্তার। গ্লাসে করে একটু নুন জল খেয়ে বমি করে পেটের ভিতরে জমে থাকা জল টা বের হলো। ডাক্তার আমাকে একটা ওষুধ দিয়ে চলে গেলেন। সকালের মিষ্টি আলো এসে পড়েছে বেলকনিতে।

এসে দাঁড়াতেই কেয়ারটেকার কাকুটি এসে আমাকে আজই বাড়ি চলে যেতে বললেন।আমি কৌতূহল নিয়ে জানতে চাইলাম কাল আমাকে ওই নদীর ভিতর থেকে কিভাবে উদ্ধার করেছো? কাকু অবাক হয়ে বললো আপনাকে নদীর ভিতর থেকে তো উদ্ধার করিনি, আর এখানে ১০কিমির মধ্যেও কোনো নদী নেই।

ছিল শুনেছি সে বহু বছর আগে, যুগের সঙ্গে সে হারিয়েছে, বা গতিপথ বদলেছে। কিন্তু আমি তো কাল নদীর জলের তলায় অনেকটা নীচে, তুমিই তো আমাকে টেনে তুললে; এসব কি বলছেন আপনি কাল পাশের ওই চৌবাচ্চার জলে নিজের মুখ ডুবিয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করছিলেন দেখে আমি তাড়াতাড়ি বাঁচাতে গেছিলাম। 

আমি তো হতভম্ভ হয়ে তাকিয়ে থাকলাম, কিছু বলার মত আর কথা থাকলো না। সেদিন বিকেলের ট্রেনেই বাড়ি ফিরলাম। তারপর থেকে রোজ রাতে দুঃস্বপ্নের মত আসে ওই জলের নীচের হারিয়ে যাওয়া সভ্যতার ধ্বংসাবশেষ এর দৃশ্য।

কাহিনী সম্পূর্ণ কাল্পনিক …….

ফেসবুক মন্তব্য

Published by Story And Article

Word Finder

Leave a Reply

%d bloggers like this: