রাতপরি – রাজীব দত্ত

সবুজে ঘেরা সােনার বাংলা – এক গ্রাম হল ইছামতি গ্রাম। নবান্নের ধানের থেকে শুরুকরে উচ্ছে আলু সবই ফলত এ গ্রামে। সেই গ্রামেরই মেয়ে মানিক চাষির মেয়ে হল মহিনি। বেশি পড়াশুনাে না জানলেও চাষবাদে দক্ষছিল মহিনি। পুথিগত বিদ্যা বলতে ক্লাস সেভেন কিন্তু বইয়ের বাইরে বর্তমান যুগের সব খবরই থাকতাে মহিনির কাছে যে স্যাটেলাইট থেকে রাজনিতি, ওকে দেখতে ছিল বেশ ভাল।

কিন্তু তাতে কি গরিবের মেয়ে বেশি দিন আর মেয়ে হয়ে থাকা হল না মহিনির। আর পাড়ার লােক তাে আছেই। মেয়ে যদি একটু বড় হয়ে যায় তাহলে বেয়ে দিয়ে দাও বেয়ে দিয়ে দাও সব যেন স্বদর্পে ঘােষনা করতে থাকে শুরু করল, তাই মানিক অর্থাৎ মহিনির বাবা ভেবে দেখল মেয়ের বয়স হচ্ছে বেয়ে তাে দিতে হবে, তাই বেশি দেরি করা ঠিক হবে না।

এছাড়া আরাে তাে দুটো মেয়ে আছে, পাড়ার লােকেরাই বা কি বলবে, সেই কথা ভেবেই মানিক চেনা যানা সবাইকে ভাল পাত্র দেখতে অনুরােধ শুরু করে দিল। মাস দেড়কের মধ্যে এক অধটা সমন্ধ আসতে শুরু করল, কিন্তু সমস্যা অন্য জায়গায় কেউ চায় টাকা কেউ আবার সােনা, কিন্তু মানিকের কোনটাই দেওয়ার সামর্থ যে নেই। তাই যত ভাল সমন্ধ আসুক না কেননা মহিনির বিয়ে টা আর দেওয়া হচ্ছে না।

কন্যা দায় যে বড় দায়। সেটাতাে আর অস্বিকার করা চলবেনা, তাই মানিক কয়েক জনের সাথে আলােচনা করে ওর নিজের দুবিঘে জমির মধ্যে এক বিঘে জমি ওপাড়ার চ্যাটুজে মশাইয়ের কাছে বেচে দিল। আর মনে মনে ভাবতে লাগলাে এবার আর মেয়েটার বেয়ে দিতে অসুবিধা হবে না।

এই ভাবে কটা দিন যেতে না যেতেই একটা ভালাে পাত্রের সন্ধান এলাে, তবে পাত্র এ এলাকা আর এ জেলার না। সে অন্য জায়গা থেকে এখানে এসছে ব্যবসা করতে। পাত্রের পয়সার অভাব নেই কিন্তু বাইরের ছেলে সে বিষয় নিয়ে মানিকের আর মানিকের বৌয়ের একটু অমত ছিল, তবুও যেহেতু নােক মুখে শােনা পত্র ভাল আর ইনকামও ভাল তাই দেখা যেতেই পারে।

কারন মেয়েটা কে মানিক সে ভাবে আবদার মেটাতে পারেনি তাই যদি একটা ভাল ছেলে পাওয়া যায় সে আশাতেই… আর তাছাড়া এক দেখাতেই তাে আর বিয়ে হচ্ছেনা সে জন্য খবর পাঠানাে হল, দিন সময় অনুযায়ী সে পাত্র এসে হাজির, পাত্রকে দেখে মানিক আর মহিনির বৌ দুজনেরই ছেলে কে বেশ পছন্দ হয়েছে।

পাত্রের মস্ত বড় ব্যবসা আর তাছাড়া পাত্র নিজে মুখে বলে গেছে মেয়ে। যখন পছন্দ হয়েছে, তখন শুধু মেয়েকেই বৌ করে নেবাে কোন দেনাপাওনা আমার দরকার নেই’, মানিক ভাবলাে আজকের দিনে এমন পাত্র আর দুটো হয়তাে পাবােনা তাই মানিক এ পাত্র আর হাত ছাড়া করতে চাইলাে না,

সে নিজেই বলল তাহলে বাবা তােমার বাবা মাকে নিয়ে একদিন আমাে তারাও দেখুক’ পাত্র এককথায় রাজি সেই মতাে সপ্তা দুয়েক পর পাত্র তার বাবা মাকে নিয়ে হাজির হল। সেই দিনই পাকা কথা হল ও বিয়ের দিনক্ষনও ঠিক করা।

হল, সেই দিন পাত্র মহিনিকে একটা আংটি দিল, আর তা দেখে গ্রামের সকলে বলতে লাগলাে যে মহিনির কপালে সুভাগ্যের সিকে ছিড়লাে, মেয়ে টাকে আর কষ্ট সহ্য করে দিন কাটাতে হবে না। দেখতে দেখতে বিয়ের দিনও চলে এলাে অনুষ্ঠানের কোন খামতি রইলা মানিক তার সাধ্য মতাে সবই । করেছিল, ধুমধাম করে অনুষ্ঠান না হলেও বেশ ভালােই হয়েছিল অনুষ্ঠান।

বিয়ের দিন চারেক পর মানিক কে তার জামাই জানায় যে তাকে ব্যবসার কাজে মাস তিনেকের মতাে বাইরে যেতে হবে। আর তাই মহিনিকেও তার সঙ্গে নিয়ে যেতে চায় সে, এদিকে মানিক ভেবে দেখলাে মেয়েটার নতুন বিয়ে, এ অবস্থায় মহিনির একা থাকাটা ভাল দেখায় না।

তাই মানিক ও জামাইকে, মহিনিকে সঙ্গে করে নিয়ে যেত বলল। মহিনিও কখন বইরে যায়নি ঘুরতে, তাই মহিনিরও ঘােরাও হবে আর ওর বরেরও কাজ মিটবে সে ভেবে মহিনিও বেশ উৎফুল্য হয়েছিল। এক দুদিনের মধ্যে রওনা দিল নতুন জায়গার উদ্দেশ্যে। 

| আর এদিকে দিন যায় সপ্তাহ যায়, আর কোন খবরই পায়না মানিক, জামাইয়ের ফোন নম্বরটাতেও যােগযােগ করা যাচ্ছেনা। মানিকের নিজের ফোন না থাকায় রােজ রােজ ফোন করাটাও সম্ভব না,

তাই কেবলই শধু অপেক্ষাই ওর এক মাত্র সম্বল। আর জামাইয়ের মা বাবা রাও দেশের বাড়ি ফিরে গেছে তাই তাদের সাথেও আর যােগাযােগ করা সম্ভব হচ্ছেনা। ওনারা কোথায় থাকে তাও ভাল ভাবে জানা নেই শুধু জেলার নামটই জানে, কিন্তু 

জেলার নাম দিয়ে তাে আর কারুর ঠিকানা খুঁজে বের করা সম্ভব নয়। 

|অন্য দিকে, মহিনি বরের সাথে নতুন জায়গায় চলে এসেছে দিন চার পাঁচেক হল। সেও তার বাবা মার কোন খবরই পাচ্ছেনা ,বর কেবলই বলছে যে মহিনির গ্রামের কারুর কাছেই ফোন যাচ্ছেনা, আর ওর বরের বেশির ভাগটাই বাইরে কেটে যায় ওর বর আর কতক্ষনই বা বাড়ি থাকে।

কটা দিন এভাবেই কেটে যায় মহিনির। হাটাৎ একদিন রাতে ওর বর বলল ‘তােমার জামা কাপড় গুছিয়ে রাখাে কাল আমাদের আর এক জায়গায় যেতে হবে,’মহিনি সরল মনে জিজ্ঞেসা করে কোথায় গাে’, তার উত্তরে বলে চলাে দেখবে খুব ভাল জায়গা খুব ভালাে লাগবে।

সেই মতাে ওরা বেড়িয়ে পরলাে, একটা গাড়ি নিয়ে ওর শশুর এসে ওদের নিতে চলে এলাে মহিনি শশুর কে প্রনাম করলাে আর জিজ্ঞেসা করলাে‘মা আসেননি ওর শশুর বলল মা আগে থেকে ওখানে চলে গেছে,

ওরাও রওনা দিল সেই জায়গার উদ্দেশ্যে, মাঝ পথে ওর বরের একটা ফোন আসে এবং তার পর বর মহিনিকে জানায় তুমি বাবার সাথে এগাও আমি একটা দরকারি কাজ মিটিয়ে আসছি, তার পর অনেক সময় কেটে যায় গাড়ি যখন থামে তখন বেশ রাত ১১টা ১২টা হবে,

খিদেও পেয়ে যায় ওর, কিন্তু মহিনি বরের কথা জানতে চাইলে ওর শশুর বলে ‘খােকা কাজে আটকে গেছে ওর আসতে আসতে কাল সকাল হবে। খুবই ক্লান্ত মহিনি তাই দুটো খেয়ে একটা ঘরে শুয়ে পরে মহিনি নিজের অজান্তেই ঘমিয়ে পরে।। 

পরের দিন ভরের নতুন সূর্য ওঠার সাথে সাথে ওর জীবনের সূর্যাস্তের শুরু হতে থাকে, এ এক অন্য ধরনের জীবন। মহিনি ঘুম ভাঙলাে এক অচেনা গলার স্বর শুনে, ও চোখ খুলে দেখলাে একজন চেহারা সম্পন্ন মহিলা দাড়িয়ে ওর সামনে পরনে দামি শাড়ি, হাতে গলায় ভারি গহনা, সেই মহিলা বলল “ কি নাম’মহিনি বলল ‘মহিনি’ সে মহিনির পাশে বসে বলল আমি হলাম সাথি,

এখানে সবাই সাথি মাসি বলে ডাকে আমায়, তুই ও তাই বলবি আমাকে, আর হ্যা তুই তাে নতুন দুদিন সময় দিচ্ছি সব কিছু বুঝে নে পড়ে আমার নাটক সহ্য হয়না। মহিনি অবাক হয়ে একটাই প্রশ্ন করে মানে সাথি উত্তরে বলে সবকিছুর মানে হয়না, মানে বুঝতে একুট সময় লাগবে 

সুন্দরি। এই বলে সাথি যেতে না যেতেই, মহিনির থেকে একটু বড় একটা মেয়ে ওর কাছে আসে, তাকে দেখে মহিনি একটু ভরসা করে জিজ্ঞেসা করে দিদি আমার বর কোথায়? আর মেয়ে টি অট্টো হাসি হেঁসে বলে কার বর তাের ? শালা ওতাে অলােক দুবছর আগে আমারও বর ছিলাে, আর এই দুবছরের মধ্যে আরাে চোদ্দ জনের বর হয়েছে, তুই ওর পনেরাে নম্বর কেস। এই কথা শুনে মহিনির আর বুঝতে অসুবিধা হলনা যে সে এক অন্ধকার গলির রাত পরির ঠিকানায় নিজের বাসা বাঁধতে চলেছে।

তবুও মহিনির যেন কোন একটা হিসাব মিলছিল না তাই আবার জিজ্ঞেসা করল দিদি তােমর নাম? সে বলল “আমি চম্পা, এখানকার ম্যানজার আর যে একটু আগে বেড়িয়ে গেল সে হল সাথি মাসি, এখান কার শেষ কথা আমাদের। সবার মালিক। মহিনি বলল তাহলে আমার শশুর মানে অলকের বাবা এখানে যে নিয়ে এল কাত রাতে, আবর চম্পা হেসে বলল কে স্বপন?

ওতাে শালা দালাল মাসির খাস লােক, তােকে ওরা প্লান করে এখানে এনেছে দুটো মিলে মাসির থেকে ভাল মাল্লু ঝেড়েছে। যা ওসব বাদদে তুই গিয়ে স্নান করে ফ্রেস হয়ে গায়ে সেন্ট মেরে আমার সাথে বেড়বি সব ঘুরে দেখানাের দায়িত্ব দিয়েছে মাসি আমাকে। দুদিন চোখের নিমিষেই চলে গেল। এই দুদিনে 

মহিনি আনেক চোখের জল ঝড়িয়েছে বাপ, মা, ভাই-বােনের কথা বার বার ভেবেছে কিন্তু শুধু চোখের জলটাই শুকিয়ে গেছে তাই আজ আর কাদছেনা, আজ ওর নতুন জীবনের হাতেখরি ওর শরিরটাকে শিয়াল-কুকুরের মত ছিড়ে খেয়েছে চার-পাঁচ জন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত। মহিনি ভালাে মতাে 

বুঝেগেছে হাজার কাঁদলেও এখান থেকে কোন মতেই ছাড় পাওয়া যাবে না। তাই সেই কান্নাও আজ হড়িয়েগেছে। দেখতে দেখতে সাত-সাতটি মাস কেটে গেল মহিনিও রাতপরিদের এক ভাললা সদস্য হয়ে উঠেছে, বদলে গেছে ওর জীবন বদলে গেছে ওর স্বভাব, আচরন ও এখন অন্য মহিনি।

সে দিন বেশ বৃষ্টি পড়ছিল ওর খােদ্দেরও নেই, তাই ওপরের বারান্দায় দাড়িয়ে ছিল, আর রাস্তার উল্টোদিকের দোকানে একটা ছেলে অনেক ক্ষন ধরে মহিনিকে দেখছে সেটা মহিনি বুঝতে পারছে আর মনে মনে ভাবছে হয়তাে পুরােনাে কোন খােদ্দের হবে তাই দেখছে, ঠিক আবার বেশ কিছু দিন পর এই ভাবে ঐ 

ছেলেটাই মহিনিকে অবাক হয়ে দেখছে, আজ মহিনি আগের দিনের মতাে ছেড়ে না দিয়ে ওকে ইশারায় ডাকলাে, ছেলেটা সেটা বুঝতে পেরে সেখান থেকে পালিয়ে গেল। মাস খানেক পর একদিন বিকালে হাজির হল মহিনিদের ঘরে ছেলেটা সাথি মাসির সাথে কথা বলছে আর মহিনিকে দেখাচ্ছে, মহিনি বুছতে পারে যে ছেলেটা মহিনিকে বুক করছে। সেই মতাে মহিনির ঘরে এসে লাজুক চোখে মহিনির দিকে তাকায়, মহিনি নিজের মতাে করে বলে কাজ মিটিয়ে তাড়াতাড়ি বেড়িয়ে যেতে কারন, বাজার ভাল নেই। 

সে উত্তর দেয় এখানে আমি তােমার সাথে কথা বলতে এসেছি’, মহিনি। হাসতে হাসেত বলে আমাদের সাথে কথা কম কাজ বেশি, তাড়াতাড়ি পাতলা হও ডায়লক বাজি বন্ধ। ছেলেটি উত্তরে বলে আমাকে আর পাঁচ জনের সাথে গুলিয়ে ফেলনা, আমি আলাদা। মহিনির দুহাত ধরে বলে আমি তােমাকে সত্যি কিছু বলতে চাই, আমি তােমার অতিত, বর্তমান কিছু জানতে চাই না, শুধু ভবিষ্যৎ টা তুমি কি আমার হয়ে কাটাতে পাড়বে?

মহিনির মনটা ঠান্ডা হয়ে এলেও ও উত্তরে জানায় না কক্ষন না শালা আমি তােদের ভাল মতাে চিনি, আমার এখানে আসা তাের মতাে কোন ছেলের জন্য, আমাকে বিয়ে শাদির গল্প দিতে আসিস না। ঘর থেকে ছেলেটাকে মহিনি বের করে দেয়, আজ আবার অনেক দিন পরে মহিনির চোখে জল চলে আসে। এর পর ছেলে টা অনেক বারই আসে মহিনির কাছে, কিন্তু হটাৎ কিছু দিন মহিনি ছেলে টাকে আর দেখতে পায় না, তাকে দেখার জন্য মহিনি বেশ উতলা হয়ে ওঠে, আর নিজের অবচেতন মনে আবার ভালবাসতে শুরু করে।

আবার। ছেলেটা মহিনির কাছে একদিন উত্তর জানার জন্য আসে, ঐ দিন মহিনি ওর মনের কথা যানায় অমিতকে, সেদিনই ওরা সিদ্ধান্ত নেয় পালিয়ে গিয়ে এক নতুন জীবন শুরু করবে। সেই মতাে এক গভির রাত্রে মহিনি ব্যালকনি থেকে শাড়ি বেঁধে নিচে নেমে আসে আর অমিত বড় রাস্তার মুখে গাড়ি নিয়ে দাড়িয়ে থাকে, সেই গাড়িতেই রওনা দেয় স্টেশনের উদ্দেশ্যে, ঠিক সময় মতাে ষ্টেশনে পৌছে ট্রেনে করে নানান স্বপ্ন দেখতে দেখতে পৌছায় নতুন শহর মুম্বাই। সেখানে পৌছে আগে থেকে রিজার্ভ করা গাড়িতে ভাড়া বাড়ির উদ্দেশ্যে চলা শুরু করে, বেশ কিছুটা যাওয়ার পর ড্রাইভার বলে আগে 

আমার ভাই আর ভাইয়ের বৌ আছে তাদের কি গাড়িতে নিতে পারি, গাড়ির বেশ কিছু সিট খালি আছে,অমিত এক কথায় বলে “হ্যা নিন। সেই ছেলে মেয়ে টা গাড়িতে উঠে অমিতের হাতে একটা কালাে সুটকেশ দিয়ে বলে 

দেখলে ভাই পুরাকা পুরা দো লাখ হ্যায়’। সঙ্গে সঙ্গে মহিনি বুঝতে পারে নতুন স্বপ্ন না সে নতুন মাসির ঠিকানায় চলে যাচ্ছে। অমিত গাড়ি থেকে নেমে মহিনিকে বলে তাহলে আসি আবার নতুন জীবন শুরু কর, আবার তাের মতাে কাউকে স্বপ্ন দেখাতে হবে। মহিনি আজ বাকরুদ্ধ হয়ে গেছে, দ্বিতীয় বার আবার একই ভাবে সে ঠোকেছে, চোখের জলটাও শুকিয়ে গেছে। আবার মহিনি চলে গেল নতুন অন্ধকার গলির রাতপরি হবে বলে৷৷ 

ফেসবুক মন্তব্য

Published by Story And Article

Word Finder

Leave a Reply

%d bloggers like this: