রাবেক ও ভ্রমণের ভূত // যাকারিয়া আহমদ

zakaria ahmed

শাহবাগ হাওরের জোড়া গাছের গলা চেপে ধরেছে এখন বর্ষার জল। চারদিকে শুধু জল। আছে ঢেউয়ের ছলাৎছলাৎ ধ্বনি। বছরের আটমাস রাখালিরা কিলবিল করে গাছের তলায় পিঁপঁড়ের মতো। কিন্তু জলের নির্যাতনের দিনে দেখবার কেউ নেই দু’চারটে বক ছাড়া। স্বার্থ না থাকলে তারাও বসত না। গাছদু’টোর অনেক ডালপালা। গাছের ডাল আর পানি কাছাকাছি। বকের মাছ ধরতে সুবিধে। এই স্বার্থে বসে।
রাখালিরা হারিয়ে গেছে। আসলে ইচ্ছে করে হারায় নি। হারাতে হল জলের কারণে। রাখাল বালক গুলোর খুব কষ্ট হচ্ছে। তারা এখন বাঁশি বাজাতে পারছে না নির্জনে হিজল গাছে বসে।
শতবছরের ঐতিয্য বহন করে এ গাছ দু’টি। এ গাছ দু’টিকে শাহবাগ হাওরের চারপাশের মানুষ জোড়া গাছ ডাকে। কারণ শত বছর আগে জন্ম নেওয়া গাছ দু’টো জোড়া হিসেবেই জন্মে ছিল। হিজল গাছ হলেও হিজল ডাকে না জোড়া জনমের ফলে।
ওই তো সেদিন বর্ষা ছিল না। রাবেক গরু ছেড়ে বাঁশি বাজাতে বাজাতে ঘুমিয়ে পড়েছে ছিল জোড়া হিজল তলার নিচে। গোধুলি বেলায় গরু ঘাস খেতে খেতে বাড়ির গোয়ালে পৌঁছে যায় তবু রাবেকের ঘুম ভাঙে নি। যেন চিরনিদ্রায় গেছে সে। হঠাৎ কানে বাঁধে পাখির কিচিরমিচির। ঘুম ভাঙে। আবার ঘুম চেপে ধরে তাকে।এমন হতে হতে সুর্য পাশ্চিম আকাশে ডুবে গেল। ঘুমের অতিথিসেবা এড়াতে পারে না রাবেক।
অতঃপর ঘুম ভেঙে দেখে চারদিক অন্ধকার। গরু নেই। দিন নেই। রাখালি নেই। তার পর চোখ কচলাতে কচলাতে ওঠে দাঁড়ায়। শোনতে পায় গাছে ফিসফিস শব্দ। চোখ তোলে চায় গাছের মগ ডালের দিকে। দেখে মানুষের মতো কারা বসে গল্প করছে। সাদা কাপড় গায়। মাথায় লম্বা চুল। প্রথমে ভেতরটা দুর দুর করে কেঁপে ওঠে। বুকে সাহস নিয়ে জিজ্ঞেস করে কে তোমরা এতো রাতে গাছে বসে গল্প করছ? কথা নেই। আবার জিজ্ঞেস করে কে তোমরা কথা বলছ না কেন? উত্তর এলো আমরা ভূত! ভ্রমণে এসেছি। আফ্রিকা আমাদের দেশ। শুনেছি বাংলাদেশ আমাদের দেশের মতো সবুজ শ্যামল। তাই দেখতে এসেছি।
এদের কথা শোনে রাবেক দুর্ভাবনাগ্রস্ত হয়ে পড়ে। কী করবে খোঁজে পাচ্ছিল না। হঠাৎ মনে হল ভূতের ডানা আছে। পাখির মতো ওড়তে জানে। হয় তো হাটতেই জানে না! আর জানলে পিলপিল ককর হাটবে। আর আমি দৌড়ে পালিয়ে যাব। যেই কথা সেই কাজ।
এদিকে রাবেকের মা ছেলেকে খোঁজতে খোঁজতে একবার হাওরের পথে আবার ঘরের দোয়ারে আসছেন। দোয়ারে বসে মেয়েকে জিজ্ঞেস করে কীরে আমার ছেলে এসেছে? মেয়ে বেরিয়ে উত্তর দেয় মা ভাই তো এখনও এলো না! মা মেয় মিলে চিৎকার করে ডাকতে থাকেন রাবেক রাবেক এ! কোনো সাড়া নেই রাবেকের। পাড়ার লোকে লোকারণ্য বাড়ি। কেউ এসে বলছে “কল্লা কাটার মরশুম চইলছে, কই বা পাইবা, বেডায় হয় তো কাটিয়া কত দুরই লইয়া গেছে আল্লাহই ভালা জানে। 
আরে মাই কান্নদিয়া লাভ নাই আল্লারে কও”। কেউ বলছে “মর্জিদের মাইকে একবার মুল্লারে কইয়া ডাকা যাইতে পারে, গেরামের মানষে যেমন জানিবে তেমনি কল্লা কাটটা শুনিলে গেরামের সবাই জানি গেছে ভাবিয়া রাবেককে রাখিয়া পালাইতে পারে”! এদিকে কে একজন ইমাম সাহেবকে ফোন দিয়ে সারা ঘটনা বলে মসজিদের মাইকে নিখোঁজের কথা ঘোষণা করার জন্য বলেছে।
 ইমাম সাহেব সঙ্গে সঙ্গে ঘোষণা করলেন “লামাপাড়া গেরামের প্রবাসী আবুল মিয়ার ছেলে বারেক না না রাবেককে খোঁজে পাওয়া যাচ্ছে না আপনারা কেউ কোনো সন্ধান পেয়ে তার বাড়িতে জানাবর অনুরোধ রইল”। এই ঘোষণা শোনে গেরামের সবে নিজ সন্তানের খবরগিরি আগে করল। এর পর রাবেকের কথা জিজ্ঞেস করল।
রাবেক দৌড়ায় আর পেছন ফিরে চায় ভ্রমণের ভূত তার পিছু ধরল কি না। কিছু দূর এসে দেখে বিলের পারে আসমান জমিন লম্বা হয়ে কে একজন দাঁড়িয়ে আছে! ‘বাপরে বাপ এখন কোন দিকে যাই’ জোরে বলে ওঠে রাবেক। দাঁড়িয়ে গেল রাবেক, বুকেরপাটা ভেঙে গেল। হঠাৎ মনে হল ওপর পার দিয়ে তো যাওয়া যাবে ঘাড়ফিরিয়ে যেতেই দেখে এই পারে আরও তিনজন। এখন উপায়? নিজের কাছে প্রশ্ন রাখে রাবেক।
রাবেকের মায়ের কাছে গেরামের অন্যান্য মানুষের মতো রাখাল বালক গুলো আসছে। কারও স্বরণ হচ্ছে না আমরা রাবেকে হিজল তলায় ঘুমন্ত রেখে এসেছি। ওখানে খোঁজ নিলে হয় তো পাওয়া যেতে পারে। রাবেকের মায়ের চেঁচামেচি আর চিৎকারে গেরামের বুড়োমানুষ ও বিছানা ছেড়ে আসতে হচ্ছে। লামাপাড়া গেরামের সবচেয়ে বেশবয়সি পুরুষ আকল মিয়া। তিনিও পিতলের লাঠি ভাঙতে ভাঙতে এসে পৌঁছলেন এদের দোয়ারে। জিজ্ঞেস করেন তোমাদের কী হয়েছে এতো চেঁচামেচি কর? আজকে যারা গরু নিয়ে হাওরে গিয়ে ছিল এদেরকে ডাক, বললেন আকল মিয়া। 
বলে শেষ করতে না করতে রাখাল গুলো এক সঙ্গে চিৎকার করে বলে ওঠল, ওহ আচ্ছা রাবেক তো জোড়া হিজল গাছের নিচে ঘুমিয়ে ছিল আর আমরা তা তো ভুলে গেছি! হায় হায় করতে করতে হাওরের দিকে দৌড়তে লাগল বালক গুলো। রাত তখন ০২ টা বাজে ৩০।পেছনে পেছনে রাবেকের মা, বোন, ও গেরামের দশ বারোজন জোয়ান বুড়ো। যেতে যেতে কতরকম কথাবার্তাই হল পথে। এসব শোনে মায়ের দুশ্চিন্তার অন্ত রইল না।
কিছু দূর যেতে না যেতে একটি কাটা গরুর গলার ধ্বনি শোনতে পাওয়া গেল। প্রথমে সবাই থমকে দাঁড়ালো। পরে এই ভেবে হাটতে লাগল যে আমরা অনেক মানুষ, দু’চারটে ভূত হলে তাড়াবার শক্তি রাখি।
রাবেক ভাবনায় পড়ে গেল। কী করবে। তিনজনকে ডিঙিয়ে যাবে না একজনকে। সিদ্ধান্তে পৌঁছল তিন হারামির বেটাকে ডিঙিয়ে যাওয়ার চেয়ে একটাকেই যাওয়া নিরাপদ হবে। ফিরে গেল পুরান পথে। যত এগুয় তত ভূতের রাজা ছোট হতে থাকে। একেবারে নিকটে আসতেই বলতে লাগল ‘আমাদেরকে রেখে একা বাড়ি চলে যাচ্ছিস কেন আমাদেরকে নিবি না’? ভূতের এই কথাগুলো মনে আছে রাবেকের। এর পর কী ঘটেছে সে বলতে পারে না।
বিড়াখাইর পারে উঠতে উঠতে রাবেকের মা বলতে লাগলেন আর কত দূর জোড় গাছের তল। শিরিন রাগ করে বলে ওঠল “মা এইসব কী বলিছ, যতদূর হোক ভাইকে খোঁজাইয়া বাহির করিব।” মা কোমলকণ্ঠে বললেন “শিরিন মায়া না থাকিলে কীরে এই বয়সে এইসব করিতাম”। শিরিন রাবেকের বড় বোন। তারা দুই ভাই-বোন। রবেক ও শিরিন।
বিড়াখাইর দক্ষিণপার মুখি হতেই একজনের নজরে ভাসল সামনে কে যেন উপুড় হয়ে শুয়ে আছে। দেখামাত্র এই মনে হয় রাবেক বলতে বলতে সবাই দৌড় মেরে তার ওপর ঝাপিয়ে পড়ল। তাদের অনেক ডাকাডাকি আর মা বোনের অনেক চুমাচুমিতে রাবেক চোখ মেলে চাইল। ভ্রমণে আসা ভূতগুলোর কথা বলতে বলতে আবার ভূতগ্রস্ত হয়ে পড়ে রাবেক।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *