লকডাউনের দিনগুলিতে — দীপ্তপ্রতিম মিদ‍্যাচৌধুরী

লকডাউনের দিনগুলিতে     --  দীপ্তপ্রতিম মিদ‍্যাচৌধুরী

২২শে মার্চ, ২০২০তে অনেক রাতে (মাঝরাতে) বাড়ি ফিরেছি কর্মস্থল থেকে। এরপরেই আমার একঘেঁয়ে দিনগুলোর শুরু হবে। আজ ৩রা এপ্রিলে আমি লিখতে বসেছি। Parker Company-এর Fountain Pen- লেখার লোভ সামলাতে পারলাম না। ইতিমধ্যে দেশ জুড়ে Lock Down ঘোষণা করেছেন আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী। সময়কাল নির্ধারিত হয়েছে ২৪শে মার্চ থেকে ১৪ই এপ্রিল পর্যন্ত।

এই নির্ধারিত সময়কালের দুএক সপ্তাহ আগে থেকেই সরকারিভাবে সতর্কতা জারি করা হয়ে গেছে প্রায় সমস্ত রাজ্যে  সবাই ধীরে ধীরে নিজেকে লুকিয়ে ফেলছে বাড়ির মধ্যে কেউ দুদিন আগে, কেউ বা দুদিন পরে। এর মধ্যে আবার ২২শে মার্চ পুরো ভারত বন্ধ ছিল একরকম। 

বাড়ি ফেরার তোড়জোড় করতে গিয়ে থালা বাজাতে ভুলে গেছি দিন সন্ধ্যায়। কর্তব্যরত সমাজসেবী, ডাক্তার, নার্স অন্যান্য শুভানুধ্যায়ীদের মহান কাজের 
উদ্দেশ্যকে অভিবাদন জানাতেই নাকি ছিলো এই থালা, ঘন্টা, কাঁসর বাজানোর পরিকল্পনা। বাড়ি ফিরে     ব্যাপারে শুনেছি পরে মনোযোগ দিয়ে।

এবার একটু অন্ততঃ আসল  ব্যাপারটা বলে নিই। যে কারণে এই Lock Down অর্থাৎ এক ধরনের গৃহবন্দী অবস্থা।
নীল নব ঘনে আষাঢ় গগণে তিল ঠাঁই আর নাহি রে,/ ওগো আজ তোরা যাসনে ঘরের বাহিরে।

সেই কবেই রবিঠাকুর একথা বলে গেছেন। আজ কিন্তু ঘন মেঘকে দেখে ভয় হচ্ছে না মানুষের। তার ভয় আজ এক চীনাদানবকে। নাম তার COVID-19 ; কুখ্যাত করোনা ভাইরাস। এই ভাইরাস থেকে পশুজগতের কোনো ভয় নেই। এর থেকে ভয় পেতে হবে একমাত্র মনুষ্যজগৎকে। আমার আপনার মতো মানুষকে। আমরাই নাকি এই ভাইরাসের বাহক। চীন থেকে এই ভাইরাসের উৎপত্তি। আবার, চীন দোষ দেয় আমেরিকাকে।

ইতিমধ্যে বাজারে নেমে পড়েছে অনেক গবেষক। একজন আমাকে পাঠালো ২০১৮এর একটি Web Series-এর কিছু অংশ, যেখানে দেখলাম Series-এর কিছু চরিত্র Corona Virus-এর উল্লেখ করেছে এবং তার কার্যকলাপ ্যাখ্যা করেছে। এরপর হাতে এলো একটি পুরনো বই একটি Paper Presentation-এর কিছু অংশ। সেখানেও কিন্তু করোনা ভাইরাসের উল্লেখ রয়েছে। অতএব, যা বুঝলাম তা হলএই Virus-এর ব্যাপারটি নতুন নয়। কেউ কেউ বললো যে, এটি নাকি চীনের জৈব অস্ত্র। তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ নাকি এবার শুরু হলো বলে। চীন নাকি সারা বিশ্বে নিজের অস্তিত্ব কায়েম করতে চায়। 

সে যেন পৃথিবীকে অন্ধকারে আচ্ছন্ন করতে চায় জনপ্রিয় হিন্দি সিরিয়াল “Shaktimaan”-এর নেগেটিভ চরিত্র কিলবিশের মতো। কেউ আবার বললো যে, এটি তো দুহাজার বিশ, তাই বিষের দ্বারা অক্ত বা বিষাক্ত তো হবেই এই সালটি।
প্রথম কয়েকদিন এই Lock Down-এর ্যাপারটি নিয়ে অনেক meme-এর ছড়াছড়ি হতে লাগলো। একটা meme ছিলো এরকম :-

বুম্বাদা (বাংলা সিনেমার জনপ্রিয় নায়ক প্রসেনজিৎ) বিদেশ থেকে ফিরে দুহাত তুলে নাচছেন

বিদেশ থেকে ফিরলে দেশে কার না ভালো লাগে“;
তা শুনে আমাদের সবার শ্রদ্ধেয়া দিদি বুম্বাদাকে সতর্ক করে বলছেন
আগে বেলেঘাটা আইডিতে যাও, ভালখারাপ লাগা পরে শোনা যাবে বুম্বা।
সত্যি বলতে কি, আমি নিজেও কখনো বেলেঘাটা আইডি নাম শুনিনি অজ্ঞানতাবশতঃ। এটিকে নিয়ে একটি মারাত্মক হাস্যকর meme আমাকে এটি চিনিয়ে ছাড়লো। কেউ একজন লিখেছে

যাঁরা এতোদিন বিদেশফেরত জামাই খুঁজছিলেন, তাঁরা এবার থেকে বেলেঘাটা আইডিতে যান।” শুনতে হাস্যকর লাগলেও ততোদিনে বিদেশ থেকে ফিরে অনেকেই Corona-পজিটিভ হিসেবে ধরা পড়ে বেলেঘাটা আইডি থেকে শুরু করে বড়ো বড়ো হাসপাতালে ভর্তি হতে শুরু করেছেন। ঠিক এই সময়ে, যখন সবাই ভয়ে তটস্থ, কোনো একবিদেশফেরত বাবু” (জনৈক আমলার ছেলে বলে শুনেছি) নাকি করোনাকে তোয়াক্কা না করেই দেশে ফিরে বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়িয়েছে। ভাইটিকে নিয়েও কম meme রচিত হয়নি।

এরই মাঝে সেই বিখ্যাত meme পেলাম মহানায়িকা সুচিত্রা সেনকে নিয়ে। উনার সেই ভুবনভোলানো হাসিমুখের ছবি দিয়ে কেউ একজন লিখেছেন
ইনি ৩০ বছর বাড়ি থেকে বেরোননি, আমরা মাত্র ২১ দিন পারবো না ?”

এই সমস্ত দারুণ দারুণ meme এবং সতর্কতাবাণী দেখে পড়ে দারুণ কেটে চলেছে আমার Whats app-ঘন্টা Facebook-এর সময়। দিন দুই আগেই পেলাম আরো একটি  meme –
চা খাবো না ?

খাবো না চা ?”


কয়েকদিনে মানুষ কিন্তু Lock Down হতেকিন্তু কিন্তুবোধ করেও শেষমেশ Lock Down হয়েছে Reporter আর Police-দের ভয়ে ; যদিও স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে Lock Down হওয়ার সংখ্যাটা ছিলো খুবই কম। পেটের টানে দিনআনা দিনখাওয়া মানুষেরা বেরিয়ে পড়েছে মাঝেমধ্যেই। প্রশাসন থেকে তাদের সাহায্যও করা হচ্ছে চাল, ডাল, তেল, নুন, সব্জি দিয়ে। কেউ কেউ আবার ্যক্তিগত উদ্যোগেও সাধারণ মানুষকে সাহায্য করেছেন।

খুলে গিয়েছে সাধারণ মানুষের সাহায্যার্থে Relief Fund – কেন্দ্রে রাজ্যগুলোতে। পর্যন্ত খবর – 
মানুষ মানুষের জন্য
আমি তো সারাদিন বাড়িতে বসে একঘেঁয়েমিতে ভুগছি। তাই, মাঝেমধ্যে একঘেঁয়েমি কাটাতে গান গাইছি ; Chat করছি বন্ধুদের সঙ্গে ; জানাশোনা সকলকে “Stay Safe at Home” message পাঠাচ্ছি দিনরাত। আবার, খোঁজ নিচ্ছি পরিচিত মানুষগুলো সত্যি সত্যি বাড়িতেই আছে কিনা। কিছু দিন আগে YouTube- সস্তার কাগজের mask বানিয়ে দেখালাম কারোর কাজে লাগবে ভেবে। 

Corona Virus নিয়ে সতর্ক করেছি বার দুয়েক নিজের মতো করে। এভাবেই সময় কাটছিল। এর মধ্যে আবার দেখি বিভিন্ন ধরনের Challenge-এর ছড়াছড়ি Whatsapp Facebook-এ। কেউ একটা অনুচ্ছেদ লিখলো। তার থেকে ফলের নাম খুঁজে বের করতে হবে। কেউ বা উলটপালট করে কতকগুলো শব্দ লিখেছে। সেগুলো সাজিয়ে সিনেমার নাম লিখতে হবে। কেউ বা Whatsapp Status- পুরনো বা নতুন বন্ধুদের ছবি বর্ণনা দিচ্ছে নিজের মতোন করে। 

আমিও ওদের দেখাদেখি আমার কিছু পোষ্যের ছবি দিয়েছিলাম বর্ণনাসমেত। আপাততঃ এভাবেই কাটলো এই দিন। এখনো দিন বারো এভাবে কাটাতে হবে। লোকে এই দশাকেকোয়ারেন্টাইনবলছে। আমি বলবো এক নীরব বিপ্লব। অন্যদের বাঁচানোর জন্য নিজেকে গৃহবন্দী করার দশা।
একটি ধানের শিষের ওপর/একটি শিশির বিন্দুদেখতে বাড়ির বাইরে এখন আরদুই পাফেলা যাবে না। বলা যাবে না

ভেঙ্গে মোর ঘরের চাবি নিয়ে যাবি কে আমারে।

এখন সময় এসেছে বলার

আমাকে আমার মতো থাকতে দাও (তবে, একা)”

ফেসবুক মন্তব্য

Published by Story And Article

Word Finder

Leave a Reply

%d bloggers like this: