লকডাউন : জান্নাতুল ফেরদৌস মিম

সকাল  থেকে কেমন যেন অস্থির লাগছে রাশেদার ।ঠিক ফজর এর নামাজ এর আগে উদ্ভট একটা স্বপ্ন দেখেছে । দুই পাওয়ালা ঘোড়ায় চড়ে বাড়ী আসছে রিয়াজ ।দুই পাওয়ালা ঘোড়া হয় না কি ? তখন থেকেই ভীষণ খারাপ লাগছে রিয়াজ এর জন্য ।রিয়াজ রাশেদা বেগম এর বড় ছেলে স্বস্ত্রীক ঢাকা থাকে ,গার্মেন্টস এ কাজ করে ।

প্রায় প্রতিদিন কথা হয় ফোনে ।ঢাকার অবস্থা নাকি খুব খারাপ ,প্রায় প্রতি গলিতেই নাকি রোগী।এদিকে বাড়ী আসাও সম্ভব নয়। কোন দিন গার্মেন্টস খোলে কোন দিন বন্ধ হয় তার কোন ঠিক নাই ।ফজর পড়েই ফোন দিয়েছিলো রাশেদা মেয়েলি মিষ্টি কন্ঠে আপনার একাউন্টে যথেষ্ট পরিমান টাকা নেই শুনে মন টা আরো খারাপ হয়েছে তার । 

সকালে খাওয়ার পর কাজে বেরিয়ে পরে সোনা মিয়া ।আজ আর বেরোনো হলো না। শাহিন এসে ডেকে নিয়ে গেল তাকে ।নিয়ে যেতেই পারে ভাই এর ছেলে চাচা কে তো ডাকতেই পারে ।তবু চাপা ভয়ে হৃদস্পন্দনটা বেড়ে গেল রাশেদার ।এই এক জ্বালা হয়েছে তার কিছু একটা হইলেই হার্টবিট বেড়ে যায়,বয়স হয়েছে কিনা ।কিছুক্ষন পর বাড়ী এসে গম্ভীর মুখে দাওয়ার উপর মাঠিতে বসে পরলো সোনা মিয়া ।সাহীন এর এক বিঘা জমি যদি বিক্রী করতেই হয় তাহলে তাদের কাছেই বিক্রি করা লাগবে।

আজকাল সৎ অসৎ উপায়ে ভালো টাকাই হয়েছে সাহিন এর। কিন্তু সোনা মিয়া দুই মাস আগেই ময়নার বিয়ের সময় সে জমি বিক্রি করে দিয়েছে আর এক জনের কাছে । শাহিন বলেছে চাচা কাজ টা ভালো করেন নাই, এর ফল ভোগ করতে হবে আপনাকে ।ফল ভোগ করার কি বাকি আছে তাই খুঁজে পাচ্ছে না সোনামিয়া ।কন্যা দ্বায় গ্রস্থ পিতা সকলের দ্বারে দ্বারে ঘুরেছে একটু সাহায্যের জন্য ।যা জমি ছিলো বিক্রি করে এই বয়স এ মানুষের বাড়ীতে কাজে লেগেছে। সারাদিন কাজ করার পর যা আয় হয় তা দিয়ে চলে দুজন এর সংসার ।একদিন কাজ বন্ধ তো মুখ ও বন্ধ ।

দুপুর এর দিকে ফোন করেছে রিয়াজ তারা বাড়ী ফিরছে । পাশের বাড়ীর সম্ভ্রান্ত 8পরিবারের মেয়ে আসছে ঢাকা থেকে এ্যাম্বুলেন্স ভাড়া করে ,তাদের এক কোণায় ঠাই মিলেছে তাদের। খবর টা শুনে মনটা ভালো হলো রাশেদার। এতো বড় বিপদ থেকে বেঁচে ফিরছে ছেলেটা ।

বিপদ একবার পিছু নিলে আর ছাড়তে চায় না । বাড়ীতে আসা মাত্র খবর টা রাষ্ট্র জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে – ঢাকা থেকে আসছে । ঐ দিকে ওই বাড়ীর মেয়েটা নিরদ্বিধায় গোটা গ্রাম ঘুরে বেড়াচ্ছে, কারো বলার সাহস তো নাই । 

রাশেদা বেগম রিয়াজ এর টুনি কে ঘর থেকে বেরুতে হইতে দেয় নাই। ঢাকা থেকে আসলে নাকি চৌদ্দ দিন  ঘরের ভিতর থাকতে হবে ।তবু নানা জন নানা কথা বলছে । এইতো বিকেল এ পাশের বাড়িতে তেল ধার করতে গেছিলো দেয় নাই, ফিরিয়ে দিয়েছে ,ঢাকা ফেরত ছেলের মা কি না ।। 

অপ্ল তেলেই বাড়ির মুরগী রেধে খেতে দিয়েছিলো ছেলে কে ।বাইরে সোরগোল শুনে বেরিয়ে এসে দেখে বাড়ির সামনে পুলিশ ।আবারও হার্ট বিট বেড়ে যায় রাশেদার। পুলিশ বলছে আপনার ছেলে বউ ঢাকা ফেরত এবং আপ্নারা তাদের সংস্পর্শে এসেছেন। তাই আপনাদের বাড়ী লকডাউন করা হল । আপ্নারা কারো বাড়ী যেতে পাবেন না আপনাদের বাড়ীও কেউ আসতে পারবে না।

সে না হয় বোঝা গেল কিন্তু আমাদের খাবার? খুব কষ্টে কথা টা বলেছিলো সোনা মিয়া । রক্তবর্ন চোখ করে পুলিশ কনস্টেবল উত্তর দিয়েছিলো, সে দায়িত্ব চেয়ারম্যান এর। ওদের বাড়িতে তো ঢাকা থেকে মেয়ে আসছে লকডাউন তো দিলেন না ।খুব আস্তে কথাটা বলেছিলো রাশেদা । রাঙ্গানিত স্বরে পুলিশ বলেছিল এই মহিলা বেশি কথা বলে । তাইতো আজ খাবার পেটে তাই মুখ দিয়ে কথা বেরোচ্ছে । বাড়ীর সাননে লাল পতাকা টাঙ্গিয়ে বিদায় নিল সবাই।

চৌদ্দ দিন তো মুখের কথা নয়। করোনায় নয় , না খেয়ে মরতে হবে হয়তো । আজ দুই দিনেও কেউ আসে নি সামান্য সাহায্য নিয়ে । দিবে হয়তো, দিন তো আর ফুরায় নাই।

রাতে ঘুম আসে না সোনা মিয়ার এই অজপাড়াগাও এ পুলিশ জীবনে খুব কমই দেখেছে সে ।পুলিশ জানার কথাও নয় কে কোথা থেকে আসলো। বারবার তার মনে পড়তে লাগল শাহীন এর কথাটা , এর ফল আপনাকে ভোগ করতে হবে …………। 

ফেসবুক মন্তব্য

Published by Story And Article

Word Finder

Leave a Reply

%d bloggers like this: