লাল টিপ // সঞ্চিতা রায়(ঝুমা) কল্যাণী নদীয়া 

লাল টিপ  //  সঞ্চিতা রায়(ঝুমা) কল্যাণী নদীয়া 
 

ড্রেসিং টেবলের আয়নায় এখনও অনেকগুলো লাল টিপ লাগানো। লাল টিপ পড়তে ভীষণ ভালবাসে সুচিস্মিতা। কিন্তু সমাজের বিধানে রিন্টু চলে যাওয়ার পর থেকে নাকি তার লাল টিপ পড়া বারণ। “আর সব রঙ পড়লেও লালটা পড়ো না,একজন বিধবা মানুষকে লাল পড়লে ভাল দেখায় না”। পাশের বাড়ির মাসিমা সহ অনেকেই বললেন একথা।        লাল রঙটা সুচিস্মিতার খুব প্রিয়। তার চুড়িদার,শাড়ী বেশীরভাগ ই লাল রঙের,অথবা অন্য কোনো রঙের সাথে লাল রঙ আছে অনেকটা জুড়ে।     

  
     
    সুচিস্মিতার মেয়ে শুচিতা  লাল রঙ নিয়ে মাকে বলা নানা রকম কথা প্রায় রোজ ই শোনে। সে এখন নবম শ্রেণীতে। লাল রঙটা যে তার বাবার ও খুব প্রিয় ছিল সে জানে। আর তার মা যখন লাল টিপ পড়ে বাবার সামনে যেতেন,বাবা কাব্য করতেন মা কে নিয়ে আর বলতেন “বয়স হলেও কিন্তু তুমি লাল টিপ লাল শাড়ী ছেড়ো না জেনো বয়স একটা সংখ্যা মাত্র,মনের বয়স বাড়তে দিও না। ”বাবার সপ্রশংস দৃষ্টি  বেশ লাগতো শুচিতার।

বাবা কে একদিন বলতে শুনেছিল, ’জানো আমার মা সবসময় সিঁদুর শাখা পলায় নিজেকে সাজিয়ে রাখতেন,সুন্দর শাড়ী পড়তেন,বাবা চলে যাওয়ার পরে মায়ের ওই শাখা সিঁদুর বিহীন রূপ আমি সহ্য করতে পারতাম না। তাই তোমাকে আমি বলেছি আমার জন্য শাখা সিঁদুর পড়ার কোনো দরকার নেই। তুমি মেয়েবেলা যেমন সাজে কাটিয়েছ,সেই সাজেই কাটাও। যখন যে রঙ,যে সাজ তোমার ভাল লাগবে তাই করো। হ্যাঁ আমি যদি তোমার আগে যাই তাও নিজেকে বদলিও না।
”                                                একজন বয়স্ক মানুষ এসে কালচে টাইপের একটা টিপের পাতা মায়ের হাতে ধরিয়ে বললো “এই ধরণের টিপ ই এখন থেকে পড়বে বুঝলে। ”কারোর কারোর মতে আবার এখন থেকে হালকা রঙের শাড়ী পড়াই ভালো।    
                                                    কোনোদিন ই খুব সাজগোজ করতো না সুচিস্মিতা। কিন্তু রিন্টুর আব্দার ছিল,লাল টিপ পড়া অবস্থাতেই যেন সে অফিস থেকে ফিরে সুচিস্মিতা কে যেন দেখে।     রিন্টুর ছবির দিকে অপলকে তাকিয়ে আছে সুচিস্মিতা। কপালে তার ছোট্ট একটা কাল টিপ,আর পড়নে হালকা রঙের নাইটি। তার বারবার মনে হতে লাগলো, ছবি থেকে বেরিয়ে এসে রিন্টু যেন বলছে, “তোমার কপালে জ্বলজ্বলে   লাল টিপটা কই” টপটপ করে জল গড়িয়ে পড়ছে সুচিস্মিতার গাল বেয়ে।
       ছোট বেলায় বাবা লাল জামা কিনে আনলে আনন্দে লাফিয়ে উঠতো সুচি। তার বাবা মা তাকে সুচি বলে ডাকতেন। সুচির নির্মল আনন্দ দেখে বাবা মা খুব মজা পেতেন। সুচিস্মিতা ভাবে লাল রঙটা  তো ও বিয়ে করার পর থেকে ব্যবহার করা শুরু করেনি,তবে কেন এই অদ্ভূত নিয়ম । সমাজ এতটা বদলে গেছে,তবুও অদ্ভূত অদ্ভূত নিয়ম জোড় করে চাপানো। সামনের দেওয়ালে টাঙানো তার ভীষণ প্রিয় রবিঠাকুরের দিকে চেয়ে থাকে সে।
রবিঠাকুর   লিখেছিলেন, ‘বিপুল তরঙ্গ রে’। কেউ চলে গেলে শোক তো থাকবেই,কিন্তু এটাও ঠিক পৃথিবী র কোনো কিছুই থেমে থাকে না। কে কিভাবে তার ব্যক্তিগত জীবন কাটাবে,কি খাবে কি পড়বে সেটা তা  নিজের উপর  ছেড়ে দেওয়া যায় না? যদিও রিন্টু তার জীবনে নেই ভাবলেই তার বুকের মধ্যে এক অসহ্য কষ্ট হয়। কিন্তু তবু সে বিশ্বাস করে জীবন থেমে থাকে না। তাকে তার মেয়ের জন্য এরপরেও হাসিমুখে জীবনকে এগিয়ে নিয়ে  যেতে   হবে।    
   
    রিন্টুর অফিসে যোগদান করেছে সে। বেরাবার জন্য তৈরী হচ্ছে। ছোট কাল টিপটা যেই কপালে লাগাতে যাবে,মেয়ে তার হাত থেকে টিপটা ফেলে দিল। বাবার কিনে দেওয়া লাল টিপের পাতা থেকে টিপ নিয়ে মায়ের কপালে পড়িয়ে দিল।  “এ কি করছিস,লোকে কি বলবে”। “মা লোকে এসে কি বাবার শূণ্যতাকে পূরণ করে দিতে পারবে? না কি নিজেদের কাজ ছেড়ে আমাদের সব সমস্যার সমাধান করবে?মাগো তোমায় ছোটো বেলা থেকে লাল টিপ পড়তে দেখেছি,লাল টিপ ছাড়া তোমায় দেখলে আমার ভীষণ কষ্ট হচ্ছে। মানুষ যদি প্রতিবাদ না করতো,তবে আজ সতীদাহ প্রথা থেকে যেত,বিধবা বিবাহ দেওয়া যেত না,বাল্যবিবাহ রদ হ’ত না।
এমনকি মেয়েরা হয়তো পড়াশোনাও করতে পারতো না। তারপরের ধাপ জোড় করে সাদা শাড়ী পড়িয়ে নিরামিষ খাওয়ানো থেকে বেড়িয়ে আসতে পারতো না। হ্যাঁ নিজের মত বাঁচো, সমাজের কথাকে নয়,নিজের মনের ,নিজের যুক্তির কথা শোনো। আজ তোমার আগে কিছু হলে বাবাকে কি কোনো রঙ বা কোনো কিছু ছাড়তে হ‘ত?তবে কেন মেয়েরা ?
”      সুচিস্মিতা তাকিয়ে দেখলো চিরদিন পড়ে আসা লাল টিপটা পড়ে তাকে সত্যিই অনেক প্রাণবন্ত লাগছে। আর বেঁচে থাকতে গেলে প্রান্তবন্ত ভাবেই বেঁচে থেকে জীবনে এগিয়ে যেতে হবে।                            মেয়েকে জড়িয়ে ধরে বললো,“সোনা আমার সত্যিই  তুই বড় হয়ে গেছিস মনের দিক থেকে”। “হ্যাঁ মা আমি শুধু নই আমাদের প্রজন্মের অনেক অনেক মানুষ এই নিয়ম,ভুলভাল নিয়মের বিপক্ষে আছি এবং থাকবো জেনো। তুমি শুধু তোমার মত থাকো মাগো। মা মেয়ে দুজনে দুজনকে ভালোবাসার আলিঙ্গনাবদ্ধ  করলো।     

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *