শয়তানের থাবা – ৩ // সুব্রত মজুমদার

smritisahitya.com
ঠিক বিকেল চারটে নাগাদ গ্যাংটকে পৌঁছালাম। বোধিমার্গের কাছাকাছি একটা হোটেল আগেথেকেই ঠিক করা ছিল। পাঁচতলা হোটেলের ছাদের দিকের সিঁড়ি দিয়ে নামলাম।

সব যাত্রীর রুমের ব্যবস্থা করে দিয়ে আমি নিজের রুমে গিয়ে লেপের তলায় ঢুকলাম। আজ আর কিছুই ভালো লাগছে না। নেহাত ডাকাত না পড়লে রাতের খাবারে ডাক পড়ার আগে লেপ হতে বেরোবো না।

রাত্রের খাবারের আয়োজন হয়েছে। আলুপোস্ত, ডাল, ডিমকষা, ভাত আর পাঁপড় ভাজা। এখানে খাবার শেষে একটু করে জলপাইয়ের আচার দেওয়া হয়, অনেকটা আমাদের সমতলের শেষপাতে চাটনির মতো। খেতে খেতে পাশের টেবিলে চোখ যেতেই দেখলাম সেই বুড়ো। একমনে ডাল দিয়ে ভাত মাখাচ্ছে।

তবে রাতের তুলনায় বয়সটা একটু কম মনে হলো। আমার দিকে নজর যেতেই বুড়ো একগাল হেসে বলল, “কেমন আছেন স্যার ?”
আমি দায়সারা ভাবে জবাব দিলাম, “ভালো।” বুড়োটা তাতে একটুও বিরক্ত না হয়ে পরবর্তী প্রশ্ন ছুঁড়ে দিল। “খুব ব্যস্ত আছেন কি ? মানে একটু যদি সময় দেন খাওয়ার পরে। আমি বেশিক্ষণ জ্বালাবো না।”

বুড়োর ব্যাপারে আমিও খুব কৌতূহলী হয়ে উঠেছিলাম। কিছুক্ষণের পরিচয়েই লোকটার উপর একটা দূর্বলতা এসে গিয়েছিল তাই আর না করতে পারলাম না। আলুপোস্ত মাখানো ভাত মুখে তুলতে তুলতে বললাম,” আচ্ছা আসুন। “

ঘরে ঢুকেই বুড়ো আমার বিছানার উপর গুছিয়ে বসল। তারপর আমার দিকে তাকিয়ে বলল, ” আমি মশাই কোনো সাহায্য প্রার্থী বা উমেদার গোছের কিছু নই। আমি এখানে এসেছি নিতান্তই নিরুপায় হয়ে। নাহয় এ বয়সে এতটা উঁচুতে শুধু শুধু প্রেসার বাড়াতে আসবো কেন।”

এই বলে বুড়ো পকেট হতে একটা জীর্ণ কাগজের টুকরো বের করে বিছানার উপর রাখল । কাগজটা বয়সের ভারে লালচে হলুদ হয়ে গেছে। বহুবার ভাঁজ করার ফলে ভাঁজগুলো ছিঁড়ে যাবার মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। আমি কাগজটা হাতে নিয়ে অতি সাবধানে খুলে ফেললাম। কালচে লাল কালিতে আঁকা একটা ম্যাপ। ম্যাপের কিছু কিছু জায়গায় চক্রের মতো চিহ্ন দেওয়া আছে।

আমি বললাম, “এ তো মনে হচ্ছে সিকিমের ম্যাপ। কিন্তু এই ম্যাপের সাথে আপনার সিকিম আসার কি সম্পর্ক থাকতে পারে !”
বুড়ো মিটমিট করে হেসে বলল, “আপনার বুদ্ধি আছে। ম্যাপটা আমার বাবার সিন্দুক থেকে পেয়েছি। খুব ছোটবেলা থেকেই আমরা ভাইবোনেরা পিতৃস্নেহ হতে বঞ্চিত। আমার বাবা ভবঘুরে মানুষ ছিলেন। সংসারের কোনো খোঁজ তিনি রাখতেন না।

হঠাৎ হঠাৎ করে ঘর হতে নিরুদ্দেশ হয়ে যেতেন। ফিরে আসতেন দু’চার বছর পরে। শেষ যেবার গেলেন সেবারে এলেন পাক্কা সাত বছর পর। আমরা কেউই তার জন্যে ভাবতাম না। সামান্য কিছু জমিজমা ছিল, তার আয়েই মোটামুটি দিন গুজরান হয়ে যেত। তাছাড়া দাদা বড় হয়ে সংসারের হাল ধরলেন।

হ্যাঁ যেটা বলছিলাম, বাবা সেবার ফিরলেন সম্পূর্ণ অন্য মানুষ হয়ে। মুখে খোঁচা খোঁচা দাড়ি, মাথায় জটা, শরীরে রক্তশূন্যতার ছাপ স্পষ্ট। দরজার সামনে দাঁড়িয়েই তিনি ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইলেন আমাদের দিকে। যেন চিনতে পারছেন না আমাদের। আমরা ধরাধরি করে বাবাকে ঘরে নিয়ে গেলাম। বিছানায় শুইয়ে দিলাম। সেই যে তিনি বিছানাগত হলেন আর উঠলেন না।

বাবা বাকশক্তি হারিয়েছিলেন। স্মৃতিশক্তিও তলানিতে। ফলে আমরা জানতেই পারলাম না কিভাবে এসব হল। এরপর একবছর বেঁচেছিলেন বাবা। বাবার মৃত্যুর পর আমরা এবিষয়ে আর কোনো কৌতূহল দেখাইনি।

ঠিক মাসখানেক আগে আমার নাতির খেলনা গাড়িখানা ভেঙ্গে যায়। কি কান্না কি কান্না ! নাতি আমার খুব আদরের । ওর কোনও কষ্ট আমি দেখতে পারি না। এজন্য দিনে কতবার যে বৌমার সঙ্গে আমার ঝগড়া হয় তার অন্ত নেই। লোকে আড়ালে আবডালে আমার এই স্বভাব নিয়ে পাঁচকথা বলে বেড়ায়। আমি ওসবে পাত্তা দিই না।

নাতিকে কি করে চুপ করাব সে নিয়ে ভাবছি, এমন সময় হঠাৎ আমার ছেলেবেলার কাঠের গাড়িটার কথা মনে পড়ল। আউটহাউসে পুরানো জিনিসপত্রের সঙ্গে থাকার কথা সেটা। যেই মনে হওয়া ছুটলাম আউটহাউসে। পুরানো মরচে ধরা তালাটা খুলতেই অনেক সময় লেগে গেল।

ঘরের ভেতরে ঢুকতেই গোটাদুয়েক বাদুর তীব্র গতিতে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। একটা আবার আমার গালে রীতিমত লাথি মেরে জানান দিয়ে গেল যে ঘরটা তাদের। আমি নিতান্তই বহিরাগত মাত্র। ঘরের ভেতরের অবস্থাও খুব খারাপ। ধুলো আর ঝুলে সবজিনিস ঢেকে আছে। মেঝেতেও এক ইঞ্চি পুরু ধুলো। এদিক সেদিক খুঁজতে খুঁজতে হঠাৎ একটা কালো রঙের ট্রাঙ্কের দিকে নজর গেল। কাছে গিয়ে ট্রাঙ্কের গা’ হতে ধুলো ঝাড়তেই সাদা পেইন্টের লেখাটা স্পষ্ট হয়ে এল।

SHASHANKA SHEKHAR MOITRRA
MA, PHD,
DIPLOMA IN PARAPSYCHOLOGY

মরচে ধরা তালাটা টান মারতেই খুলে গেল। ভেতরে অজস্র কাগজপত্র আর নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের সম্ভার। কাঠের সুদৃশ্য ব্রাশ, মেড-ইন-ইংল্যাণ্ড রেজার, আরো কত কি ।

তবে এত সবকিছুর মধ্যেও যে জিনিসটা আমার নজর কাড়লো সেটা হল একটা মরক্কো চামড়ার বাঁধাই একটা সুদৃশ্য ডায়েরি। “

এতটা বলার পর বুড়ো সোয়েটারের ভিতর থেকে একটা মাঝারি সাইজের চামড়া বাঁধানো ডায়েরি বের করে আমার হাতে দিলেন।

.. চলবে

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *