শয়তানের থাবা – ৪ // সুব্রত মজুমদার

.

.

www.sahityautsab.com

.

.

মরক্কোর তৈরি আসল ছাগল বা বাছুরের চামড়া দিয়ে বাঁধানো ডায়েরিটা উজ্জ্বল লাল রঙের। এতদিনের পুরানো হওয়া সত্ত্বেও এতটুকুও ঔজ্জ্বল্যে ঘাটতি পড়েনি। মরক্কো চামড়ার এটাই বিশেষত্ব।

.

.

   আমি ডাইরিটা নিয়ে নিজের কাছে রেখে দিলাম। নমস্কার জানিয়ে বুড়োকে বললাম, “আজ রাত অনেক হয়েছে। কাল আবার  সাইটসিইংয়ে  যাব। একটু ঘুমিয়ে নিই।”

বুড়ো আর কথা বাড়াল না। প্রতিনমস্কার জানিয়ে   বিদায় নিল।

.

.

                                                  – – তিন – – 

.

.

রাত্রে কেমন ঘুম হয়েছিল সেটা আর বলবার অবকাশ থাকে না। সারাদিনের জার্ণি আর আবহাওয়ার শীতলতা ঘুমের উত্তম অনুঘটক হয়ে দাঁড়াল। বিছানায় শোয়ার মাত্রই গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে পড়লাম। ঘুম ভাঙল অ্যালার্মের আওয়াজে। ভোর চারটেয় অ্যালার্ম দেওয়া ছিল। উঠেই ব্রেকফাস্ট করে নিলাম। আজ ‘নাথুলা পাস’ আর ‘ছেঙ্গু’ লেক যাওয়ার কথা।

.

.

গাড়ি আসবে সকাল ছয়টা নাগাদ।

কপালে সুখ লেখা না থাকলে যা হয়, তিন বুড়োতে আমার ভ্রমণের আনন্দের বারোটা বাজিয়ে ছাড়ল। এদের মধ্যে একজন হলেন শশাঙ্কশেখর মৈত্রের পক্ককেশ আঁতেল পুত্র যিনি আমার পেছনে পৃষ্ঠব্রণের মতো আটকে আছেন। অপর দু’জন আমার ট্রাভেলেরই যাত্রি শ্রীমান অঘোরনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় ও শ্রীমান মৃগাঙ্ক সেন।

.

.

ঠাণ্ডায় আমেজ করে বসে বসে ডিম টোস্ট সহযোগে কফি খাচ্ছি। আরো দু’একজন রয়েছেন। সবাই নিজেরমতো খোশগল্পে ব্যস্ত। এমন সময় হন হন করে এগিয়ে এলেন অঘোরবাবু। এসেই আমার সামনের চেয়ারটা টেনে নিয়ে জুত করে বসে কটমট চোখে আমার দিকে চেয়ে বললেন, “আপনাদের কি ব্যাপার বলুন তো মশাই, লোক ঠকানোর ব্যবসা ফেঁদেছেন ?”

.

.

ডিমটোস্টের টুকরোটা আর আমার গলা দিয়ে নামল না। আমি বিস্ময়ে জিজ্ঞাসা করলাম, “কেন, কি হল হঠাৎ ?”

“হবার কিছু বাকি আছে কি ? কি লোককে সঙ্গে দিয়েছেন মশাই ! একটু ঘুম আসে আর ঠেলা দিয়ে জাগিয়ে দেয়। বলে কিনা কেমন নৈসর্গিক শোভা দেখুন ! আরে মশাই, এতগুলো টাকা খরচ করে কি আমি রাত জেগে নৈসর্গিক শোভা দেখতে এসেছি ! আমার টাকা ফেরত দেন মশাই। অনেক হয়েছে আপনাদের কেরামতি, রাত জেগে জেগে মানসিক রোগী হয়ে যাব এবার। “

.

.

অনেক কষ্টে অঘোরবাবুকে বোঝালাম। অঘোরবাবু আমাকে দিয়ে একরকম প্রতিজ্ঞাই করিয়ে নিলেন যে নাথুলাপাসে পৌঁছে আমি মৃগাঙ্কবাবুকে চিন বর্ডার পার করে দেব। ভাগ্য ভালো পরিহাস ছলে মিথ্যা বলায় কোন পাপ হয় না।

.

.

ওয়েটার অঘোরবাবুর জন্যে ওমলেট আর কফি এনে টেবিলে রাখল। অঘোরবাবু কফির কাপে সুরুৎ করে একটা চুমুক দিলেন, তারপর আমার দিকে এবার প্রেমেপড়া দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন,” একমাত্র আপনার উপরেই বিশ্বাস করতে পারি মশাই। সেই যৌবনকাল যদি থাকত তবে ওরকম মৃগাঙ্ক সেনকে আমি এমন যুযুৎসুর প্যাঁচ কষতাম না একদম ভবলীলা সাঙ্গ হয়ে যেত। বিক্রম মুখোপাধ্যায়কে চেনেন ? “

.

.

বিক্রম মুখোপাধ্যায়কে আমি স্বচক্ষে দেখিনি, কিন্তু রেডিও, টিভি আর খবরের কাগজের দৌলতে ওই নামটি আমার চেনা। পুরীর হোটেলে বন্ধ রুমের রহস্য সমাধান থেকে হুয়াকোপার মমির রহস্যভেদের সব কাহিনীই আমার জানা। তাই বললাম,” চিনি। “

.

.

” আমার প্রতিবেশী মশাই। ওই যে পুরীর হোটেলে শিশুপাচারকারীদের ধরা হয়েছিল, তখন বিক্রমের সহকারী কে ছিল ?” অঘোরবাবু ভ্রু-নাচাতে নাচাতে জিজ্ঞাসা করলেন।

“কে ?”

“বলুন দেখি ! গেস করুন।”

.

.

আমি বললাম, “খবরের কাগজে যা পড়েছি  তাতে সেসময় তার সঙ্গে একটা সাইকিক বুড়ো ছিল। খুব জ্বালিয়েছিল বিক্রমবাবুকে। “

অঘোরবাবু একটা ওমলেট এর টুকরো মুখে নিয়ে চিবোচ্ছিলেন, আমার উত্তরটা কেন জানি নিতে পারলেন না বিষম খেয়ে প্রায় চেয়ার থেকে পড়ে যাচ্ছিলেন। আমি বাঁহাত দিয়ে  অঘোরবাবুকে ধরলাম। উল্টেযাওয়ার হাত রক্ষাপেয়েই তিনি আবার খাওয়ার দিকে মন দিলেন। আর গোয়েন্দা বিক্রমের প্রসঙ্গ আনলেন না।

.

.

  কার মুখ দেখে উঠেছি জানি না দুই বুড়োই আমার গাড়িতে। মাঝের সিটে পাশাপাশি দুই বুড়ো অঘোরবাবু আর মৃগাঙ্কবাবু। দুজনেই দুজনের বিপরীত দিকে মুখ ঘুরিয়ে গোমরামুখে বসে আছেন। মনে আনন্দ নেই। আমাকে দেখেই অঘোরবাবু একটা ইঙ্গিত করে মৃগাঙ্কবাবুকে দেখালেন। এর অর্থ এই যে আসামী হাজির, এইবার বেঁধেছেঁদে চায়নাতে পাঠাতে পারলেই হলো।

.

.

গাড়ি চলতে লাগল। চেকপোষ্টের কাছে গাড়ি দাঁড়াল। চেকপোষ্টে সিকিম পুলিশের হাতে ছবিসাঁটা অনুমতিপত্র জমা দিতেই গাড়ি ছেড়ে দিল। এরপর গন্তব্যস্থল নাথুলা পাশ। সেখানে বাবা মন্দিরে বাবা হরভজন সিংয়ের মন্দির দেখে ফেরার সময় ছাঙ্গু লেকে থামব।

.

.

রাস্তা পাকা হলেও  কিছু কিছু জায়গায় ধ্বস নেমেছে। তবে সেখানেও যুদ্ধকালীন তৎপরতায় চলছে রাস্তা মেরামতির কাজ। দুটো গাড়ি একে অপরকে ক্রস করে যেতে পারে সহজেই। তবে তার অতিরিক্ত রাস্তা নেই। কিছু কিছু জায়গায় রাস্তা সামান্য বেশি চওড়া, সেখানে গাড়িগুলো প্রয়োজন মতো পার্ক করে। গাড়ির দু’এক জনের হাইঅল্টিটিউডের সমস্যা আছে। আঁকাবাঁকা পাহাড়ী রাস্তায় তাদের মূহুর্মূহু বমি হচ্ছে। ওন্ডেম জাতীয় ওষুধেও কাজ হচ্ছে না।

.

.

ছাঙ্গু লেকের কিছুটা আগে একটা মাঝারি মাপের ঝর্ণা আছে। গাড়ি সেখানে থামল। গাড়ি থামতেই পেছনের সিট হতে মৈত্রবুড়ো নেমে এগিয়ে এলেন। তার হাতে সেই কাগজের টুকরোটা। আমার কানের কাছে মুখ এনে বললেন, “এই সেই জায়গা। এখানেই ম্যাপে চক্র আছে।”

.

.

… চলবে

.

.

ফেসবুক মন্তব্য

Published by Story And Article

Word Finder

Leave a Reply

%d bloggers like this: