শয়তানের থাবা – ৫ // সুব্রত মজুমদার

/www.sahityautsab.com

“বলেন কি !”   আমি কাগজটা বুড়োর হাত হতে নিয়ে খুলে দেখলাম। হ্যাঁ, তাইতো। ম্যাপ অনুযায়ী এই ঝর্ণাটাকে চক্র চিহ্ন দিয়ে চিহ্নিত করা হয়েছে। আমি বললাম,”তাইতো দেখছি। কিন্তু কি করা যায় বলুন তো !”

 মৈত্রবুড়ো বলল,” এখানে নির্ঘাত কিছু আছে। চলুন। একটু গোয়েন্দাগিরি করা যাক।”

আমি বুড়োর পেছন ধরলাম। বুড়োর শরীরে শক্তি আছে, যে চড়াই উঠতে আমার মতো যুবকেরও হাঁসফাঁস অবস্থা সেই চড়াই অবহেলে উঠে যাচ্ছে বুড়ো।

.

.

আমরা ঝর্ণার পাশের ঝোপ বরাবর উঠছি। ভেজা নরম পাথর খসে পড়ছে অবিরত। পাথরের খাঁজে ঠিকমতো হাত জমাতে পারছি না। বুড়ো তড়তড়িয়ে উঠে যাচ্ছে। আমিও বুড়োর পদাঙ্ক অনুসরণ করে উঠছি। কতক্ষণ লাগলো জানি না একটা সমতল মতো জায়গায় এসে পৌঁছলাম। আমি সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলাম কিন্তু বুড়ো আমার জামার পেছনে ধরে এক হ্যাঁচকায় আমাকে টেনে নিলো । বাপরে বুড়ো হাড়ের জোর ! একটা ঝোপের ভেতরে টেনে ঢুকিয়ে নিল। তারপর চাপা গলায় বলল, “চুপ ! সামনে দেখুন।”

.

.

সামনের দিকে চোখ যেতেই দেখলাম একটা বৌদ্ধস্তুপ। বৌদ্ধস্তুপটির মাথায় একটা চক্র। আমি কিছু বলতেই যাচ্ছিলাম, কিন্তু হঠাৎ একটা দৃশ্য দেখে আমার গলা শুকিয়ে গেল। আরে ওটা কে ! মৃগাঙ্কবাবু না ! হ্যাঁ তাই তো। দেখলাম মৃগাঙ্কবাবু এগিয়ে যাচ্ছেন স্তুপটার দিকে। সাথে একজন গোর্খা যুবক। দুজনে মিলে স্তুপটাকে শাবল আর গাঁইতি দিয়ে উপড়ে ফেলল। তারপর তন্ন তন্ন করে কি যেন খুঁজতে লাগল । খোঁজা শেষ হতেই উৎড়াই বেয়ে নেমে গেল দু’জনে।

.

.

ওরা অদৃশ্য হয়ে যেতেই বুড়ো মাটিতে শোয়ানো স্তুপটার দিকে এগিয়ে গেল। আমিও পিছু নিলাম।  শাবল গাঁইতির আঘাতে বিধ্বস্ত স্তুপটা মাটিতে পড়ে আছে। বুড়ো একটা খুরপির মতো জিনিস নিয়ে স্তুপটার মাথার একটা বিশেষ অংশে আঘাত করতেই একটা ধাতব টুকরো বেরিয়ে এল। বুড়ো সেই টুকরোটা পকেটে ভরে নিয়ে বলল, “এবার চলুন। আমাদের এখানকার কাজ শেষ।”

আমি কিছু বলার আগেই বুড়ো বলল, “হোটেলে গিয়ে সব বলব। এখন ভ্রমণের আনন্দটা মাটি করা উচিত হবে না।”   আমিও আর কথা না বাড়িয়ে নিচে নেমে আসার জন্য পা বাড়ালাম।

.

.

নিচে এসে দেখি সবাই সেলফি তলায় ব্যস্ত। এদিকে বুড়োও কখন কেটে পড়েছে। আমাকে দেখতে পেয়েই অঘোরবাবু দৌড়ে এলেন। তার হাতে অ্যান্ড্রয়েড মোবাইল। আমার হাতে মোবাইলটা জোর করে ধরিয়ে দিয়ে বললেন ,” কয়েকটা ছবি তুলে দেন তো মশাই । এই সুন্দর কলোকল্লোলিনী ঝর্ণা, এর সামনে দাঁড়িয়ে ছবি না তুললে জীবনটাই বৃথা মশাই।”

.

.

আমি সংশোধন করে দিয়ে বললাম, “ঝর্ণা কখনো কলোকল্লোলিনী হয় না। নদী হলে হতে পারে।”  অঘোরবাবু কোনো প্রতিবাদ করলেন না। ঝর্ণাটাকে ব্যাকগ্রাউন্ডে রেখে অনেকগুলো ছবি তুলে দিলাম ভদ্রলোকের। সত্যি বলতে কি পরিবেশটি খুবই মনোমুগ্ধকর। ঝর্ণার আওয়াজ এই সৌন্দর্য্যকে একটা বিশেষ মাত্রা দিয়েছে। আরেকটা জিনিস আমার নজরে এল, সেটা হল স্ট্রবেরীর ঝোপ। ঝর্ণার আশেপাশে অজস্র স্ট্রবেরীর ঝোপে  প্রচুর ফুল ফুটে রয়েছে। নার্সারি হতে স্ট্রবেরীর কাটিং এনে বাড়িতে টবে লাগিয়েছিলাম। ফুল ধরার পর গাছটা গরমে শুকিয়ে যেতে লাগল। বাঁচাতে পারিনি। অথচ এখানে প্রকৃতির কোলে বিনা কোন পরিচর্যায় কতশত স্ট্রবেরী গাছ তাদের একাধিপত্য জাহির করছে। এই হল প্রকৃতি। তার করুণা যার উপর বর্ষিত হয় সে পত্রেপুস্পে বিকশিত হয়ে ওঠে আর প্রকৃতির রোষ…!

.

.

সে তো আমরা নিত্য উপলব্ধি করতে পারছি। বিশ্বউষ্ণায়ন তিলে তিলে গ্রাস করছে সভ্যতাকে, দিন দিন পৃথিবী হয়ে উঠছে ধ্বংস যজ্ঞের হোমকুণ্ড। সে অবশ্য আমাদের দোষেই।

এবার দেখতে পেলাম মৃগাঙ্ক সেনকে। তিনি ঝর্ণার পাশে একটা পাথরে চুপচাপ বসে আছেন। তাকে দেখলে বোঝাই যাবে না যে একটু আগেই তিনি মিটার দশেক চড়াই পেরিয়ে প্রাচীন বৌদ্ধস্তুপের দফারফা করে এসেছেন। আমার মতোই অঘোরবাবুর দৃষ্টিও মৃগাঙ্ক সেনের উপর পড়ল। অঘোরবাবু আমার পাশটাতে দাঁড়িয়ে বললেন, “দেখলেন তো মশাই, কেমন ভিজে বেড়াল হয়ে বসে আছে। গাড়ি থামার আগেই আমাকে চিমটি কাটছিল। আমিও দিয়েছি। আমি কারোর খেয়ে থাকি না মশাই।” অঘোরবাবু একটা বিজয়ীর হাসি হাসলেন।

.

.

                                              অন্যসময় হলে অঘোরবাবুর কথায় বিরক্তি প্রকাশ করতাম, কিন্তু এখন কেন জানি না অঘোরবাবুর মতোই আমারও ইচ্ছা করছে মৃগাঙ্ক সেনের পেটে একটা রামচিমটি লাগাই। ইতিমধ্যে ড্রাইভার তাড়া দিতে শুরু করেছে। তাই সবাইকে গুটিয়ে নিয়ে নিজের নিজের গাড়িতে তুলে দিলাম। গাড়ি চলতে শুরু করল।

.

.

আস্তে আস্তে দৃশ্যপট বদলাচ্ছে। গাড়ি পাকদণ্ডী বেয়ে ক্রমাগত উঠে চলেছে। ঘন কুয়াশার মতো মেঘ হাতের নাগালে ঘোরাফেরা করছে। কখনো কখনো গাড়ির জানালা দিয়ে ঢুকে আরোহীর সঙ্গে সুখালাপের চেষ্টা করছে । কিন্তু এই প্রচেষ্টা ড্রাইভারের পাশে বসে থাকা আরোহীর মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে । সে তখন ড্রাইভারকে ধীরে সুস্থ্যে গাড়ি চালাবার জন্যে অনুনয় করতে থাকে। ড্রাইভার খুব শান্ত ছেলে। সে মোটেও বিরক্ত হয় না।

.

.

গাড়ি ছাঙ্গু পেরিয়ে গেল। জানালা হতে হ্রদটাকে দেখলাম। কি অপূর্ব সুন্দর !  যেন কোন পাহাড়ী মেয়ে তার উদ্ধত বুকের উপর কালচে সবুজ পনচো জড়িয়ে বসে আছে। ফিকে নীল রঙের রেশমি দোপাট্টা তার গভীর নাভিদেশের উপর পড়ে রয়েছে অবহেলে। কখনো কখনো হাল্কা হাওয়ায় তিরতির করে কাঁপছে ওড়নাখানা। আমার মতো যারা আনকোরা, যারা এখনও প্রেমে পড়েনি তাদের মনকেও বিচলিত করতে পারে এই দৃশ্য। মনে পড়ে গেল মহাকবি কালিদাসের মেঘদূত কাব্যের সেই অমোঘ উক্তি।

‘… কামার্তা হি প্রকৃতিকৃপণাশ্চেতনাচেতনেষু।’

.

.

অর্থাৎ কামনাগ্রস্থ ব্যক্তির কাছে চেতন আর অচেতনের কোন পার্থক্য নেই। তাই কখনো মেঘ হয় দূত তো কখনো সুউচ্চ পাহাড়কে দেখে মনে হয় কোন চপলমতি কিশোরীর উদ্ধত বক্ষদেশ।

.

.

… চলবে

.

.

Published by Story And Article

Word Finder

Leave a Reply

%d bloggers like this: