শয়তানের থাবা – ৮ — সুব্রত মজুমদার

শয়তানের থাবা - ৮      --    সুব্রত মজুমদার

কোথায় ?” আমি জিজ্ঞাসা করলাম। ছেলেটি আমার কথার কোন উত্তর না দিয়েই নিজের মনে বিড়বিড় করতে লাগল। আমি সুন্দররামাইয়াকে দিয়ে একটা ডাক্তার ডাকিয়ে আনলাম। ডাক্তারবাবু পরীক্ষানিরীক্ষা করে বললেন,” ভয়ের কিছু নেই। তবে নার্ভ যথেষ্টই উইক। প্রেসারটাও বেড়েছে। ওষুধ লিখে দিলাম, জ্বরটা কমে যাবে। তবে চাঙ্গা হতে সময় লাগবে।
.
ডাক্তারবাবু চলে গেলেন। ছেলেটার সুস্থ্য হয়ে উঠতে কয়েকদিন লাগল। ততদিনে আমি নিশ্চিত হয়ে গিয়েছি যে ওর কোনো মানসিক সমস্যা আছে।
একদিন রাতে একটা চিৎকার চেঁচামেচির শব্দে আমার ঘুম ভেঙ্গে গেল। মাঝরাতে হঠাৎ ঘুম ভেঙ্গে যাওয়ায় অত্যন্ত বিরক্ত হয়ে বিছানা হতে উঠে বসলাম। ঘরের আলো জ্বেলে বালিশের তলা থেকে পিস্তলটা বের করে  নিলাম। রাতে বিরেতে সঙ্গে অস্ত্র থাকাটা ভালো। ঘরের বাইরে বেরোতে বোঝা গেল চিৎকার চেঁচামেচির আওয়াজটা সার্ভেন্টস কোয়ার্টার্স হতেই আসছে। সার্ভেন্টস কোয়ার্টার্সের দিকে এগিয়ে গেলাম।
.
ততক্ষণে গোলযোগ থেমে গেছে। কিছুটা এগোতেই দেখলাম সুন্দররামাইয়ার ঘরের দরজা খোলা।  ঘরের ভেতরে দেওয়ালের দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে আছে সুন্দররামাইয়া। আর বিছানায় অর্ধমৃতের মতো পড়ে আছে তার বন্ধু। গোটা ঘর লণ্ডভণ্ড হয়ে আছে।.
সেই রাত্রে কি হয়েছিল তা সুন্দররামাইয়া আমাকে বলেছিল, তবে পরের দিন সকালে। রাত্রে কথাবলার মতো মানসিক অবস্থা সুন্দররামাইয়ার ছিল না। সে আমাকে যা বলেছিল তা মোটামুটি এইরকম.
সুন্দররামাইয়া আর তার বন্ধু একটা ঘরেই থাকে। সারাদিন খাটাখাটনির পর বিছানায় শোয়ামাত্রই সুন্দরের আর কোনো জ্ঞান থাকে না। ঘুমিয়ে কাদা হয়ে যায় একেবারে। অন্যদিকে সুন্দরের বন্ধু ছেলেটির বায়ুচড়া ধাত আছে। চট করে ঘুম আসে না। সেদিন মাঝরাতে দুপদাপ আওয়াজে  ঘুম ভেঙ্গে যায় সুন্দরের। বিছানার উপরে উঠে বসে চোখ কচলাতে থাকে সে। আধো আলোয় তার নজরে পড়ে কয়েকটা ছায়ামূর্তি সারাঘরময় কি যেন খুঁজে বেড়াচ্ছে। আর একটা ছায়ামূর্তি সুন্দরের বন্ধুর গলাটা টিপে ধরে চাপা গলায় তর্জনগর্জন করছে।.
মানচিত্রটা কোথায় বল ? কোথায় লুকিয়ে রেখেছিস ?”
ছেলেটির উত্তর একটাই, “আমি মরে গেলেও বলব না।”  এইরকম তাণ্ডব কতক্ষণ চলেছিল তা সুন্দরের মনে নেই। আমার ডাকেই তার সম্বিত ফেরে।
এরপর আর ঝুঁকি নিইনি। ছেলেটিকে তার দেশের বাড়িতে পাঠিয়ে দিই। যাবার সময় একটা পুরোনো ভূর্জপত্রের পুঁথি আমাকে দিয়ে গিয়েছিল সে। না, পুঁথির ব্যাপারে কিছুই বলেনি। হয়তো সে নিজেও কিছু জানে না।
.
.
                                                                        – – চার
.
.
পুঁথিটা পালি ভাষায় লেখা। কোনো এক বৌদ্ধ সন্নাসী মহা গুপ্তের রচনা। গোটা পুঁথিজুড়েই আছে মারের বৃত্তান্ত, আর মারকে পরাজিত করার জন্য সম্রাট প্রিয়দর্শী অশোকের নয়জন জ্ঞানীর কথা।
মার হলো বুদ্ধের সাধনার পথে বিঘ্নসৃষ্টিকারি অশুভ শক্তি। চিনা ভাষায় 天魔/魔羅 মার কথার অর্থ হলো হত্যা  বা ধ্বংস করা এর তিন কন্যা, – তৃষ্ণা, অরাতি এবং রাগ। অন্যত্র এই মারকে অসৎ দেবপুত্র হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। যারা সংখ্যায় একাধিক। এরা মানুষের মুক্তির পথে বাধাদান করে। কখনো পশুপাখি, কখনো ভয়াবহ মূর্তি, কখনো বুদ্ধমূর্তি, রমনীয়া কন্যা বা দুঃস্বপ্ন রুপে সাধকের সাধনাভঙ্গ করে। বুদ্ধঘোষের মতে মার হল অকুশল মনোবৃত্তি বা মনের রিপুসকল।
সিদ্ধার্থ যখন বোধি লাভের আশায় বটবৃক্ষের তলায় সাধনায় বসেন তখন মারের মনে ক্রোধ জন্মায়। মার তার সুন্দরী মনমোহনকারিনী কন্যাদের পাঠান সিদ্ধার্থের তপোভঙ্গের উদ্দেশ্যে। মারের কন্যাদের দিকে তাকিয়েও দেখলেন না গৌতম।
মার আরো ক্রুদ্ধ হয়ে তার সৈন্যদের নিয়ে আক্রমণ করেন সিদ্ধার্থকে। ব্যর্থ হন এবারও। তখন তিনি সিদ্ধার্থকে  বলেন, “হে শাক্য ! কে তোমার হয়ে সাক্ষ্য প্রদান করবে ?”
সিদ্ধার্থ মৃদু হাসলেন। তারপর তার হাত দিয়ে ভূমিস্পর্শ করলেন। সঙ্গে সঙ্গে পৃথিবী বলে উঠল, “আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি। সিদ্ধার্থই বোধিলাভের উপযুক্ত।
মার অদৃশ্য হয়ে গেল। ইন্দ্রাদি দেবতারা আকাশ হতে পুষ্পবৃষ্টি করতে লাগলেন।
এতো গেল মারের কথা। পুঁথির পরের অংশেই আছে নয়জন জ্ঞানী ব্যক্তির কথা, যারা মারের হাত হতে বৈদিক জ্ঞানের সংরক্ষণ করেছিলেন। এরা প্রত্যেকেই ছিলেন সম্রাট অশোকের ব্রাহ্মণ মন্ত্রী।
এই জ্ঞান যাতে কোনো দুষ্ট ব্যক্তি তথা মারের হস্তগত না হয় তার জন্য তিনি সমস্ত জ্ঞানে নয়ভাগে ভাগ করে মন্ত্রীদের মধ্যে বন্টন করেন। এই জ্ঞানী ব্যক্তিগন সম্রাটের কাছে শপথ করেন যে উত্তরাধিকার পরম্পরায় এই জ্ঞানে তারা সংরক্ষণ করবেন। এই জ্ঞানের সংরক্ষণের জন্য নিজের জীবনকে বিপন্ন করতেও কুণ্ঠাবোধ করবেন না। এর পরেই পুঁথিটি খণ্ডিত। সম্ভবত কালের হস্তক্ষেপে জীর্ণ দীর্ণ হয়েছে পুঁথিটি।
এরপরে অনেক বছর পার হয়ে গেছে। সময়ের সাথে সাথে পুঁথির কথাও আমার মন হতে অপসৃত হয়ে গেছে। চাণ্ডেলের রাজার কাজ হতে অব্যাহতি নিয়ে কিছুদিন বাড়িতে ছিলাম।  বাড়িতে আমার মন বসে না। সারাদিন পড়াশোনা করি আর ছেলে বৌয়ের সাথে ঝগড়া, – বাস, এই নিয়েই দিন কাটছিল।
একদিন দুপুরবেলা, সবাই খেয়েদেয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে। আমি  সমরাঙ্গ সূত্রের একটা পুঁথি নিয়ে কপি করছি। একটু ঢুলুনিও এসেছিল। হঠাৎ একটা বাজখাই কন্ঠে ঘুমের রেশটা কেটে গেল।
অলখ্ নিরঞ্জন ! অলখ্ নিরঞ্জন ! অলখ্ নিরঞ্জন !”
.
  
চলবে

Facebook Comments

Published by Story And Article

Word Finder

0 0 vote
Article Rating

Leave a Reply

0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x
%d bloggers like this: