শয়তানের থাবা // 2 // সুব্রত মজুমদার

smritisahitya.com

“মশাই কি গ্যাংটক চললেন ?” একটা জড়ানো কণ্ঠস্বরে ঘুম ভেঙ্গে গেল।  দেখি পাশের আপার বার্থ হতে একজন বৃদ্ধ লোক আমার দিকে জুল জুল করে তাকিয়ে আছেন। আমি তার দিকে তাকাতেই তিনি একটুখানি কেশে গলাটা পরিস্কার করে নিলেন। যদিও গলাটা খুব একটা পরিস্কার হল বলে মনে হল না। সেই রকমই শ্লেষ্মাজড়ানো গলাতে বললেন, ” আমিও চল্লাম কিনা। আপনি তো আবার ট্রাভেলের লোক, আলাপ পরিচয় থাকলে সুবিধা হবে আরকি।”

                  আমি বললাম, “ট্রাভেলের লোক আমি ঠিকই কিন্তু কাউকে সুবিধা করে দেবার মতো আমার অভিজ্ঞতা নেই। নেহাত পেটের দায়ে এই কাজ করছি। তবে আপনাকে যতটা সম্ভব আমি সাহায্য করব ।”

লোকটির  কাছ থেকে আর কিছু উত্তর পেলাম না, পরিবর্তে নাক ডাকার আওয়াজ আসতে থাকল। আমিও ঘুমিয়ে পড়লাম।

গোলবাধল পরদিন সকালে। টিটি এসে টিকিট দেখতে চাইতেই বুড়ো তার নোকিয়া ষোলোশ’ মোবাইলটি টিটির হাতে দিয়ে বলল,” মেসেজ ঢুকছে, দেখে নেন। ”  টিটি ভদ্রলোক হাজার চেষ্টা করেও টিকিট কনফার্মের মেসেজটি পেলেন না। একসময় বিরক্ত হয়ে মোবাইলটি বুড়োর হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললেন, “আইকার্ড দেন।”

  বুড়ো ফ্যালফ্যাল করে কিছুক্ষণ টিটির দিকে তাকিয়ে থেকে একটা উত্তাপহীন গলায় বলল, “আইকার্ড তো নেই বাবা ! রেশনকার্ড আছে, বের করব ?”   টিটি আর দাঁড়াল না।

নিউজলপাইগুড়ি স্টেশন আসতেই দু’জন রেলপুলিশ এসে বুড়োকে টানতে টানতে নিয়ে গেল। আমার মুখোমুখি হতেই বুড়ো একটা শিশুসুলভ হেসে মুখটা ঘুরিয়ে নিল।

                   নিউজলপাইগুড়িতে  ব্রেকফাস্ট সেরে যাত্রিদের সাথে একটা গাড়িতে চড়ে বসলাম। দীর্ঘ যাত্রাপথ । আমাদের মোট পাঁচটা গাড়িতে চল্লিশজন যাত্রি। আমি একদম পেছনের গাড়িতে ড্রাইভারের পাশের সিটে বসে আছি। ড্রাইভার নেপালি হলেও বাংলা ভালোই জানে। নাম পওন প্রধান। সারা রাস্তা গল্প করতে করতে চললাম।

পওন জানাল যে গ্যাংটকে এখন  বর্ষার প্রাকমূহুর্ত। একমাত্র জিরোপয়েন্ট ছাড়া বরফ পাওয়া দুষ্কর। আমরা যেন সেখানে যাই। তবে গ্যাংটকে খুব সাবধান। আমি বিস্মিত হয়ে শুধালাম, “সাবধান কেন ?”

পওন বলল, “সাবজী, জিন্দেগি ভগবানের দেন আছে; – আপনি শুধু শুধু কেন তকলিফ উঠাবেন !”

আমি বললাম, “হেঁয়ালি বুঝি না, যা বলবে ঠিক করে বল।”

পওন ডানহাতটা দুটো কানে ঠিকিয়ে কিছু একটা বিড়বিড় করে জপ করে নিল, তারপর বলল, ” শয়তান আছে সাবজী ! একদম শয়তান ! আন্ধেরা হোয়ে গেলে ও আসে। তারপর আঁখ মু’ সিনা পাঞ্জা দিয়ে সিরে লেয়। রাম রাখে সাবজী !! “

আমার বুকটা কেমন আকুপাকু করতে লাগল। বলে কি পওন, চোখ মুখ বুক ছিঁড়ে নেয় ! পেটের দায়ে কি শেষে জানে মারা পড়ব !  ট্রেন থেকে নেমেই একটা ঠান্ডা জলের বোতল কিনেছিলাম, সেটা হতে কিছুটা জল গলায় ঢেলে নিলাম। ভয়ে শুকিয়ে যাওয়া গলাটতে একটু জোর এল। আমি সভয়ে বললাম,” পুলিশ কিছু করে না !”

পওন বলল, “ও দানো আসে সাবজী। দানোর সাথে কেউ ভি পারে না।”

আমি আর কথা বাড়ালাম না। গাড়ি ছুটে চলল।  প্রচণ্ড রোদে আমার অবস্থা খারাপ। মাথা ধরে গিয়েছে। পওন জানাল যে আর কিছুদূর গেলেই আবহাওয়ার পরিবর্তন হবে। হ্যাঁ, তাই হল। বেশ অনেকটা চলার পর পর জঙ্গলের গাছপালাগুলোর একটা পরিবর্তন এল। জঙ্গল ঘন হচ্ছে আর শালের জঙ্গলে অনুপ্রবেশ ঘটছে পাইন দেবদারুর। বাতাসটাও শীতল হয়ে আসছে।

দু’পাশের পটচিত্রে আমূল পরিবর্তন। একদিকে পাহাড়ের কোলে রাস্তা আর অন্যদিকে গভীর খাত। সেই গভীর খাতের পাশে আবার কালচে সবুজ রঙের সুউচ্চ পাহাড়ের সারি। রাস্তা সাপের মতো আঁকাবাঁকা।

রাস্তার পাশে একটা হোটেলে আমাদের গাড়িগুলো দাঁড়াল। দুপুরের খাওয়ার জন্য। আমি একপ্লেট ডিমভাত অর্ডার করলাম। ভাত এল। সরু চালের ভাত সাথে ডিমের কারি ডাল আর পাঁপড়। খেয়ে মন বা পেট কিছুই ভরল না। আমরা রাঢ়বঙ্গের মানুষ, পেট ভর্তি মোটা চালের ভাত খেয়ে অভ্যাস আমাদের কাছে এ খাবার নস্যি। কিন্তু উপাই কি ?

খেতে খেতেই শুনলাম দু’জন  ড্রাইভার নেপালি ভাষায় নিজেদের মধ্যে গ্যাংটকের দানবের ব্যাপারে আলোচনা হচ্ছে। নেপালি ভাষাটা হিন্দির কাছাকাছি হওয়ায় অনেকটাই বুঝতে পারছি । দুজনের আলোচনার সারমর্ম হল এই,

‘ একটা দানবের আবির্ভাব ঘটেছে গ্যাংটক শহরে। সে যেমন নির্মম তেমনি শক্তিশালী। পাহাড়ী রাস্তা হতে শুরু করে হোটেলের ঝুলবারান্দা, – সর্বত্রই তার আতঙ্ক বিদ্যমান। পশ্চিমবঙ্গ ও সিকিম পুলিশ যুদ্ধকালীন তৎপরতায় এই সমস্যা সমাধানে তৎপর হয়েছে।

দানবটিকে আজ পর্যন্ত কেউ দেখেনি। তবে এর কাহিনী ছড়িয়ে পড়েছে গোটা উপত্যকায়। নিঃশব্দে আসে আর আঘাত করে। এ পর্যন্ত সাত সাতজনের মৃত্যু হয়েছে। সবারই চোখ মুখ ক্ষতবিক্ষত আর বুক চিরে কলজেটা বের করে নেওয়া হয়েছে। আতঙ্কে  সন্ধ্যার পর মানুষ আর  ঘর হতে বের হয় না।

.

.

… চলবে

.

.

.

.

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *