শূন্য শুধু শূন্য নয় — ফজলুল হক

শূন্য শুধু শূন্য  নয়    --   ফজলুল হক
রাত আকাশের প্রথম তারার আলোগুলি ম্লান করে দিয়ে নগরের রাস্তার বাতিগুলো এক সাথে জ্বলে উঠল । জনসমুদ্রের গণকোলাহল ঠিক এই সময়ে কর্মস্থল থেকে ঘরে ফেরার মহা যুদ্ধ শুরু হয়ে যায় । ট্রামের শব্দ শুনে পেছন ফিরে তাকাতেই  ওর হাত ধরে টেনে ফুটপাথে সরে আসি । যাত্রি বোঝাই ট্রামের গর্জণ শহরতলির এই জায়গাটা আমাদের চেনা । মানুষগুলো যেন জালে পড়া মাছ । বেরবার ও ঢুকবার প্রতিযোগিতায় নেমেছে ।
একটু ডানদিকে ঘুরে কলেজ স্কয়্যারের অহংকারী লেকটি সুন্দরী কিশোরী থেকে ড্যাবকা রমনীদের বুকে জড়িয়ে অট্টহাসির ফোয়ারা তুলেছে । বিভূ উৎফুল্ল । বসে পড়ে বহু ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী , বিরহ মিলনের শাক্ষী আধভাঙা বোঞ্চির উপর । যৌনতা উপভোগ করার এমন আদর্শ ও পবিত্র স্থলভূমি আর কোথায় পাবে ! আর তার পুরানো “কলিকাতার যৌনচার’’ বিষয়ে গবেষণা পরিপুষ্ট হবে । জলের উপর বৃষ্টি পড়ছে জোরে , হালকা , অথবা মাঝারি ।
ওর চোখে অশ্রু । আশ্চর্য ! যে কাহিনী শুরু হয়েছিল আমাদের দেখা হওয়ার সাথে সাথে, তার  দংশনের উপস্থিতি এখনও টের পাওযা যায় ।  ওর পিঠের ওপর হাত রাখি , সব ঠিক হয়ে যাবে । এই প্রচলিত কথা ছাড়া আর কিছু বলার ছিল না ।
ও মাথা তুলল । ভাবনায় নিমগ্ন বিভূর কাঁপা কন্ঠস্বর ধ্বনিত হল , অনেক অনেক বছর লেগে যাবে , তাও বিশ্বাস নিয়ে বলতে পারব না সফল হবই । এই দুটো দিন এমন দীর্ঘ , ক্লান্তিকর ,আগামীতে এমন দিন আর কোনোদিন আসবে না । এর থেকে খারাপ আর কিছু হতে পারে না ।
ওর অনুশোচনার মধ্যে ওকে ছেড়ে দিলাম । খেপে খেপে বৃষ্টি ঝরে পড়লেও দর্পিত গরমকে শীতল করা যাবে না । যৌনতা উপভোগকারী বিভূ মেয়েগুলো উঠে যেতেই হতাস হয়ে আমার দিকে বিষাদ দৃষ্টি ফেলল । অস্থিরতা টের পাই । তার চোখের জল শুকিয়ে এসেছে এই সময়টুকুতে । উভয়েই হয়তো ভাবছি উঠতে হবে । এই সময়টাকে ভগবানের ওপর ছেড়ে দিই । যদি ভগবান বলে কেউ থেকে থাকে । ওর হাতে হাত রাখি । ও আমাকে জড়িয়ে ধরে ।
ভয় পাচ্ছ কেন ? বুকে শক্ত করে চেপে রাখি তাকে ।
যদি এখান থেকে না উঠি , সময়ের এই আবর্ত আমাদের ছাড়বে না । পাগলামীর কোনও প্রজ্ঞা থাকতে পারে কি না জানা নেই । তখনকার মতো আমরা নিজেদের পাগল বলে মেনে নিই । ওখান থেকে উঠে আসা ,জোরে হাঁটতে থাকা দুটি মানুষ একটি সস্তা বারের সন্ধানে  রাস্তায় নামি । আর পান করার খুশিতে কিঞ্চিত পাগল হয়ে ওঠার বাতিক চেপে যায় বিভূর মস্তিষ্কে । দখিনা হাওয়া বইছে । ও বলল, দেখ ভগবান হাওয়া দিয়ে আমাদের অভিনন্দন জানাচ্ছে ।
এই রকম ভগবানে কখনও আমাদের বিশ্বাস নেই । তবুও মজা করতে তাকে লাগে বলেই তার প্রতি কৃতজ্ঞ । হতাশার ভার কাটিয়ে ওঠে বিভূ । রাস্তায় আলো-ছায়ায় যন্ত্রযানের তান্ডব , কোনও কারণ ছাড়াই থেমে যাওয়া ক্লান্তিকর এই সময়টাকে এখন উপভোগ করছি । হাঁটার গতি কমেনি । অসামান্য সুন্দরীরা যারা বাস, ট্রামের ধকল এড়াতে হাঁটা শুরু করেছে তাদের পোশাকের ভেতর থেকে যৌন বাতাস টেনে নিচ্ছে বিভূ । স্বল্পবাস যুবতীর অদৃশ্য  কাল্পনিক প্রেম-হাতছানি তাকে কাতর করে তুলল । সে মদ্য পানের জন্য আর সময় নষ্ট করতে চায় না । আর মনে মনে মুক্তির শ্বাস নিল ।
একটা দায়িত্ব অনুভব করলাম । ওর কথা মতো তার বউ বিতান তারই প্রতীক্ষায় আছে । বিতানের বিষাদগুলো ঘরের চারপাশের দেয়ালে শয়তানের মতো দাঁড়িয়ে আছে । আর সে ধন দৌলতের দেবতাকে বিশ্বাস করতে পারছে না । অসম্ভব ক্লান্ত শরীরের শেষ জলবিন্দু শুকিয়ে গেছে । সে কাঁদতে পারছে না । এই মুহূর্তে স্বয়ং গনেশ রূপে কেউ এলেও তাকে সে ঘৃণা করবে ।
এখন কোনও সিদ্ধান্তে আসা না আসা  সমান । বসে আছে তার প্রিয় বাদ্য যন্ত্র সেতারটি বুকে জড়িয়ে । নড়াচড়াহীন । বুকের ভেতর দাবানলের দহন । কব্জির শিরাগুলো ফুলে নীল দেখাচ্ছে । যা অবশ্যম্ভাবী তা যখনই ঘটুক, নিজেক ভর্ৎসনা করা, বোকা ভাবা কিংবা ভাগ্যহীন ভাবা , এর মধ্যে -ভাল কিছু নেই । বিভূর এই কথাগুলো তার কানের পর্দায় টোকা মারবে । আর যদি বিতান ভেবে নেয় , বিভূর স্বরক্ষেপণের পবিত্র উচ্চারণগুলি তার শরীরের প্রতিটি অণুতে অণুতে প্রাণ স্পন্দিত করতে সক্ষম,তাহলে উৎসমুখ আনন্দের ধনরাশি হয়ে উচ্ছ্বল হয়ে উঠবে ।
আপনমনে কথা বলছিল বিভূ । আকাশে মেঘবেশ্যারা পার্থিব যৌনঘ্রাণ নিয়ে আর একবার  খিলখিল করে হেসে উঠল । এইভাবে বার বার মেঘ-বৃষ্টির ছেনালীপণায় বিভূ যৌন কাতর হয়ে পড়ল । বলল, মনে কর আমার ছাতার তলায় ওই রাস্তায় দ্রুত হেঁটে যাওয়া রূপবিলাসীদের  কেউ একজন আশ্রয় চাইল , একেবারে পবিত্র ঘনিষ্ঠ হতে চাইল , আর আমি ওর হাত টেনে দ্রুত দূরে ওই গাছের ভিজে ছায়ায় বসলাম ! এমনটা হতে পারে না ? ধর , আমার কোলের উপর চিৎ হয়ে শুয়ে থাকা কাম-কৌশলী যুবতী’র মাথার উপর আকাশে ভেসে যাওয়া বৃষ্টি কণারা বন্দি হয়ে থাকা মেঘেদের পতিতালয় ভেঙে অছড়ে পড়ল আমার বুকের উপর ! হতে পারে না ?
বারের দরজা খুলে সেলাম ঠুকল এক পোশাকধারী । সাধুসুলভ বিনয়,স্বর্গীয় নজির অনুসরণ করে তার ডান হাতটি প্রসারিত করল রাজকীয় ভঙ্গীমায় । বিভূ খুশি হল । তারপর থেকে টেবিলে বসা পর্যন্ত যে সব কাণ্ডগুলো সে ইচ্ছা বা অনিচ্ছাতে করে গেল , মনে হতেই পারে যেন পূর্বজন্ম থেকে ও অভিজ্ঞতা যোগার করে এসেছে । বসার পর তাকে বলি , তুমি নিশ্চিত এই বারটি সস্তা ?
একশ ভাগ দায়িত্ব নিয়ে বলতে পারি শহরতলিতে এর চেয়ে আর সস্তা বার নেই ।
ওর এই নিশ্চয়তা নিয়ে কোনও মাথা ব্যথা নেই । কেবল অদৃশ্য অস্থিরতায় বিতানের মুখ ভেসে উঠছে ,যাকে আমি কোনও দিন দেখিনি । ছাদের ফাটল দিয়ে নৈঃশব্দের গভীরে তার সেতারের ঝঙ্কার শুনি । আবেগকাতর আমার হৃদয় সৌজন্য প্রদর্শণ অথবা বিভূর বন্ধুত্বের সম্মান জানানোর কারণে সাহায্যের ক্ষীণতম হাত বাড়িয়ে দেয়া, সঙ্গীত অনুরাগিনী বিতানের ভাল লাগা অথবা না লাগা , কিংবা আত্মসম্মানে আঘাত কোনটাই ঝঙ্কারের শিল্পীত অহংকারকে খর্ব করতে পারে না ।  এই ভাবনাকে সদর্পে অবহেলা করে বিভূকে  সাহায্যের কথাগুলো শুনতে বাধ্য করেছিলাম, সন্দেহ নেই বিভূর মনে বেদনার ভার বেড়ে যায় ।
তারপর সে সঙ্গীত সম্পর্কে ,বাদ্যযন্ত্র সম্পর্কে, বিতানকে এক অসাধারণ শিল্পী হিসাবে যা সত্যি তা চিহ্নিত করতে যে সব ভাষা ব্যবহার করেছিল ,আমি মুগ্ধ হয়ে শুনেছিলাম মাত্র । তার ব্যবহৃত শব্দের আবেদন আত্মাকে পুষ্টি যোগাতে সম্পূর্ণ সফল । সে জানে  ঘটন,অঘটনের  শোকের আত্মদহনত্রাস  থেকে মুক্তি পেতে হলে সরল রসিকতার মধ্যে নিজেকে ছেড়ে দেয়া শ্রেয় । বিশ্বাসটিকে সম্মান জানানোর জন্যে অথবা স্বভাব কিংবা অন্য কিছু, সে নিজেকে যৌনকাতর করে তোলাএ চেষ্টা করে যায় সময় বিরতি না দিয়ে ।  তবুও শোক নিজে থেকে তাদের চারপাশে ঘোরাফেরা করে । বিতান জানে না ,কীভাবে তার সমাধান হবে । এমন কি বিভূও না ।
এখন বিভূ প্রেমের মধ্যে থাকতে চা । সে ধরেই নিয়েছে সেই মেয়েটি তাকে ভালবেসে ফেলেছে । কেনকি মেয়েটি একটি কবিতায় লিখেছিল, মুখে খোঁচা খোঁচা দাড়ি , মাথায় বাউল চুলের ভেতর ফুরফুরে বাতাস,শুকতলাহীন জুতো , চোখে গভীর তৃষ্ণা !
হ্যঁ সে প্রেমে পড়েছে । এবং আমার ই প্রেমে পড়েছে । বিভূ অভিজ্ঞ চোখে আমার দিকে তাকায়, গরমে বিয়ার ভাল লাগবে । আমার ইচ্ছা অনিচ্ছায় গুরুত্ব না দিয়ে সে বিয়ারের ওর্ডার দেয় ।
কখনও দেখা যায় না সে সময়ের দাসত্ব করেছে । তারও একটি স্বপ্ন আছে । তবে সে সময়ের কাছে হাত পাতে না । সে প্রতিটি মুহূর্ত নিজেকে আবিষ্কার করে । সর্বনাশটি ঘটে যাবার পর সে দেখেছিল ,বিতানের পৃথিবী অবিশ্বাস্য ক্ষিপ্রতায় কুঁকড়ে যাচ্ছে : তখন সে ধীর ,স্থির পূর্বের মতোই  । গল্প করে সময়কে তরল করার চেষ্টায় ছিল । আর বলেছিল , কারও কাছে হাত পাতবো না । শান্ত হও । সর্বনাশের পরও তার মাথা সুস্থতার দাবি করে । 
রাত গভীর হয়ে আসে । আবছা প্রায় দেখা যায় না এমনি ক্ষীণতম আলো আকাশে । প্যালেস স্কয়্যারের একেবারে উল্টোদিকে গলির মোড়ে নিম্ন মধ্যবিত্ত ভাঙাচোরা ফ্ল্যাটগুলির একটিতে তারা থাকে । বহুদিন আগে একজন বিধবা মহিলা জলের দামে বিক্রী করে ওদের মঙ্গল করেছে । পরে মেরামত করতে বিভূ ও বিতানের জমানো অর্থ প্রায় তলানিতে ঠেকে ।
সারাদিন ওরা ঘরের মধ্যে বন্দি ছিল । সর্বনাশটা কী মনে করতে না চাইলেও তাদের দীর্ঘশ্বাসের সতর্ক বার্তা ছিল । এটা অনুভব করার সাথে সাথে  বিভূ বিতানকে কোলে তোলার চেষ্টা করে । ওর মাথাটা তুলে বোজা চোখের দিকে তাকিয়ে সে বোবা হয়ে যায় । বিতানের পোশাক খসে পড়েছিল দেহ থেকে । যখন সে নিজের পোশাক নিয়ে সচেতন হল ,তখন বিভূর হাসি পেল । অতীতের একটা মুহূর্তের কথা তার মনেও পড়ল । পোশাক সংক্রান্ত বিষয়ে একদিন তারা দীর্ঘ সময় ধরে পক্ষে বিপক্ষে যুক্তি সাজিয়েও কোনও সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেনি ।
তখন বিতান বলেছিল, আশ্চর্য ! ভগবানের কী রহস্যময় সিদ্ধান্ত যা আমাদের ওপর চাপিয়ে দিয়েছন । তিনি যখন আমাদের সৃষ্টি করলেন ,মানে আমরা যখন জন্ম গ্রহন করলাম ,তখন তিনি আমাদের নগ্ন করে পাঠালেন , আর তার সামনে প্রর্থনা করার সময় পোশাক পরে আসার নির্দেশ দিলেন ।  ব্যাপারটা মজার , তাই না ? ভগবান বা ঈশ্বর একজনই । দ্বিতীয় জন থাকলে মানুষ বোধ হয় বিকল্প ভাবার সময় পেত ।
তখন গভীরতম রাত । নিদ্রায় মগ্ন গোটা নগরী । ওরা নিদ্রাহীন নৈঃশব্দের মধ্যে । তখনও পর্যন্ত অতিরিক্ত সান্ত্বনা বাক্য প্রয়োগ করেনি বিভূ । কারণ সে জানে , সান্ত্বনা বাক্যগুলি একেবারে মামুলী , পচা , যা ব্যবহার করা বা না করা  কী আসে যায় তাতে : কেবল নীরবতাই সত্যিকারের অস্তিত্ববান ।
বিয়ারের বোতল তুলে গ্লাস ভর্তি করে এগিয়ে দেয় বিভূ । পর পর দু গ্লাস পান করার পর বিভূ চোখ মেলে ,  এই সময়টুকু , সম্পর্কের বন্ধনটুকু গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহন করলাম । এটা প্রকৃতই আন্তরিক ।
আমার পিঠে হাত রাখল সে ।
বহু কষ্টের পর, বহু সাধনার পর  বিদেশ থেকে একটা প্রোগ্রাম করার ডাক পায় বিতান । এই শহর , শহরের বাইরে বহু হাততালি ,বহু সম্মান সে কুড়িয়ে নিয়েছে । কিন্তু বিদেশ থেকে ডাক পাওয়া সেই তুলনায় আসে না । আন্তর্জাতিক স্থরে পরিচিত হওয়ার এই একটা সুযোগ । এত আনন্দের মধ্যেও বিতানের মনে একটা ভয় কাজ করছিল , তার সেতারটি পুরানো , বয়েসের ভারে সুরগুলি ম্রিয়মান । উদ্বিগ্ন এই মুখটি চিনে ফেলেছিল বিভূ । 
থামল বিভূ । এসব বলার মধ্যে সহানুভূতি আদায় করার ফন্দি মিশে থাকে । তাকে সে জায়গায় রাখতে পারি না । সে পর পর পান করে গেল । আর চারপাশ মনোযোগ সহকারে দেখে নিল ।  কোণের দিকে সুন্দরী একটি মেয়েকে পাশে বসিয়ে দুজন মিলে আদর করছিল , তাদের উদ্দেশ্যে বলল, যৌনতাই পৃথিবীর শ্রেষ্ট এবং  পবিত্র ।
অক্ষম আলোয় মেয়েটির মুখ স্বর্গীয় হয়ে উঠেছে । যেন মৃদু কোলাহলের ভেতর আধিপত্য বিস্তারকারী মহান নৈঃশব্দের মধ্যে ওরা নিজেদের খুঁজে পেয়েছে  । ছেলেটি ওকে চুমু খেল ঠিক গালের যে জায়গাটায় টোল পড়েছিল । আমরা ক্রমশ ওদের প্রতি দয়ালু হয়ে পড়ছিলাম । আর বিয়ারের আদিখ্যাতাকে সৌজন্য দেখাতে পোশাকধারীকে ডেকে নিলাম ।
ওর জড়ানো কন্ঠস্বরে মুখ ফেরালাম ।
বিশ্বাস কর, ওই সেতারটি বাজানো কষ্টকরই নয় ,অনেক ভুল ভ্রান্তির মধ্যে ডুবিয়ে দেয়া । আন্তর্জাতিক অনুষ্ঠানে নিজেকে উপহাসের পাত্রী করে তোলা ছাড়া আর কিছু আশা করতে পারি না । হাতে সময় আছে । বাতাস ভারী ,অস্পষ্ট কুয়াশা আকাশে আলো ছড়াচ্ছিল । সকালে দোকানে একটা ফোন করি । সত্যি তখন কী আনন্দ ! একটা নতুন সেতার হবে । সৎ ভাবে অর্থ সংগ্রহ করার ইতিহাসটা ভয়ংকর করুণ , এবং তা করতেই হবে । বিতানের স্বপ্ন পুরণ হবে । এক কোটি ইচ্ছা পুরণের মর্যদা পাবে ।
কথগুলি বলার সময় তার বিশ্বাসের প্রত্যয় চুইয়ে পড়ছিল । গ্লাস এগিয়ে দিই । কিছু খাবার তার মুখে তুলে দিই । সেও দেয় । তখন সময় আমাদেরকে পানশালার আবহবিকারে টেনে নেয় । সেই মেয়েটির কথা ওঠে । যে কিনা আঠারোয় পা রেখেছে ।  নিজেকে সে আধুনিকা ভাবে । যৌনতা নিয়ে তার কোনও শূচিতা নেই । ফলে যৌন বিষয়ক আলোচনাগুলি জমে উঠেছিল  এক অবসর বিকেলে । বিভূ এ বিষয়ে একটা বই লিখছে , যা খ্যাতিমান লেখকদের বিষয় হয়ে ওঠেনি কোনোদিন । প্রথমে সে ভেবছিল বইটির নাম দেবে “সেক্স ইন মিনি বাস” । পরে  সে তার সিদ্ধান্ত বদল করে । নাম দেবে পুরানো কলিকাতার যৌনচার ।
এ কথা সুবিদিত যে, বিভূ পান করতে পছন্দ করে  মাতাল না হয়ে । এখন সে আমাকে সম্মান জানাতে সঙ্গ উপভোগ করছে ।  আজ বাদে অন্যদিন হলে সে এখান থেকে বেরিয়ে  একটা ভোদকা  ঢক ঢক করে গিলে  খোলা আকাশের নীচে শুয়ে পড়তো অল্প সময় বিশ্রাম নিয়ে পকেট থেকে গাঁজা বের আরে সিগারেটের মধ্যে  পুরে  , ধ্রুম্র পানের গভীরতায় রাত ডেকে আনতো । তারপর এক সময় বাড়ি ফিরে, ক্লান্ত বিতানের মুখের দিকে অপরাধীর মতো কর জোরে বলতো , একটু রাত হয়ে গেল , ক্ষমা করে দাও ।  বিতান নিয়মিত এই কন্ঠস্বর শোনে , জানে , বোঝে , আচরণে স্বাভাবিকতা বজায় রাখে । সে একজন শিল্পী ।
তার সেতারে মুগ্ধ নগরের রসিক বোদ্ধাগণ । অকেজো উপদ্রব সব সময় এড়িয়ে যায় । শান্তি বজায় থাকে । শান্তি না থাকলে সেতারের ঝঙ্কার তোলা যাবে না ।  সে একজন শিল্পীকে ভালবেসে এসেছে অর্থের বৈভব ছেড়ে । হাত ধরেছে । অনেক অনেক দিন একবেলা খেয়ে দিন কাটায় । দিনের শেষে নিজের হাতে রান্না করা শাক ভাত পরিতৃপ্তির শান্তভাব তাকে সুখের আবর্তে বেঁধে রাখে । আর বিশ্বাস করে বিভূ মহৎ কিছু লেখার ক্ষমতা রাখে । একদিন বিশ্বসাহিত্যে তার লেখাগুলি নিজ মহিমায় উজ্জ্বল হয়ে উঠবে । বিভূ জীবনকে ভেঙেছে, ভাঙে, ভাঙবে । বাঁধা ধরা ছকের বাইরে যে কোনও বিপদের ঝুঁকি সে নিতে পারে , এই বিশ্বাসে বিতান পরিপূর্ণ ।
তুমি আর একবার শোনাবে শুরু থেকে শেষ অবধি  ? বিভূ হাত বাড়িয়ে আমার মুখ তার দিকে ঘুরালো , শোনাও না ,যদিও আমার মনে আছে । তুমি বলেছিলে , মেয়েটির নাম বলনি ।  বলেছিলে ‘ঙ’ । তার ব্যতিক্রমী উদার যৌনঙ্খলন দিয়ে সে গুরুত্ব প্রতিষ্ঠিত করেছিল , আর তুমি সেটা স্বীকার করেও সংক্ষিপ্ত মুহূর্তের বিচ্যুতি বলে নারীর স্বাধীনতাকে মেনে নিতে পারছো না আজ অবধি । আহা ! আর ওই মুহূর্তগুলির বিবরণ যে কোনও ঐতিহাসিক দলিলকে ভর্ৎসনা করার উপযুক্ত । 
পরের ব্যাপারটা আমার কিছুটা মনে আছে মিলিয়ে নাও। তোমরা কয়েক মিনিটের মধ্যেই  নিজ নিজ চরিত্র ফিরে পেয়েছিলে । প্রেমবিলাসী , হাসি মুখে তোমার কাছে এসেছিল , ঘাড়ের ওপর ঠাণ্ডা ঠোঁট চেপে ধরেছিল । তখন তুমি রসিকতা করে  বলেছিলে , এটা কী করে হল ! সে উত্তর দিয়েছিল, আমিও এর উত্তর খুঁজে পাচ্ছি না । এটা একটা নিছক পাগলামীও বলতে পারছি না । মনে আছে তোমার ? পিলিজ , আর একবার তোমার মুখে শুনতে চাই ।
ধীরে ধীরে পানশালা পাতলা হচ্ছে । ওর কথা থামেনি । উক্তি পুণারাবৃত্তি করতে কার না ভাল লাগে । ও বলে, নারীর মৌলিক স্বাধীনতায় আমি বিশ্বাসী । বিতান যখন হৃদয়ের যন্ত্রণায় অথবা ভেতরের প্রলম্বিত এক সীমাহীন মরুর দিকে তাকিয়েছিল , মনে হচ্ছিল, সর্বনাশের সব চালাকির অবসান ঘটিয়ে বস্তুটি অলৌকিকভাবে পূর্ণনির্মিত হচ্ছে । তার শিল্পকলাগুলি একটার পর একটা মৌলিক সুরে বাঁধা । আমি তখন মানসিক ভাবে , শারীরীক ভাবে অবসাদগ্রস্ত থেকে জেগে উঠছিলাম ।  এটাও সম্ভব হতে পারে । কী সম্ভব হতে পরে আর কী হতে পারে না কেউ বলে দিতে পারে না । আমি জানি মানুষের হাত দিয়ে ,আঙুল দিয়ে নির্মিত শব্দে পৃথিবীর অনেক কিছু বদলানো যায় ।
অনেকে এটা শব্দ আর তার বুদ্ধির খেলা বলেও ভাবতে পারে । অর্থের দিকে খুব একটা গুরুত্ব না দিয়ে যারা সুরটা শুনতে পায় ; তারা যদি ফাঁসির দড়ি গলায় পড়ে থাকে, তবুও তারা মৃত্যুর কথা ভুলে যায় । বিতান যখন বাজাতো আমি ফেলে আসা চল্লিশ বছরের যন্ত্রণা ভুলে যেতাম । বিশ্বাস কর লম্বা লম্বা একটা ক্ষীণ আলো এগিয়ে আসছিল আমার দিকে । আমাকে আকর্ষণ করছে । আর যখন ইটালীয় সঙ্গীতজ্ঞ খবরটা জানালেন , পবিত্র আত্মার ভেতর বিশ্বাস শব্দটা গেঁথে গেল । তুমি জানো কি না জানি না , সত্যির নিজস্বটি আমি বেছে নি ।
যে হাতে শব্দের খেলা বলে মনে হয় , সেই হাতে শূন্য থেকে জমিনে ,অথবা জমিন থেকে শূন্যে যন্ত্রটির সঙ্গে সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল । মাত্র একদিন আগে ঘটনাটি ঘটেছিল । সেই থেকে সত্যি কথাটা উল্লেখযোগ্য রকম বদলে যায় । ব্যাপারটা গোপনীয় । ভেবছিলাম সঙ্গীত ই হাওয়ায় উড়তে পারে । বেশ তবে চল  নিজের চোখে দেখে আসবে ।
যেন বিশাল ঠোঁট ওলা একটা শিকারী পাখির মুখোমুখি হলাম । একটি নতুন সেতারের ওর্ডার দেয়ার পর অর্থ সংগ্রহ করা , তার পরের দিনগুলোর রক্ত ক্ষরণ , যাই হোক না কেন ,তাদের ইচ্ছার অসম্মান করতে পারবে না ওরা । ক্লাব স্তরের অনুষ্ঠানের ধকল , সঙ্গীতের স্কুল ,বাড়ির কাজকর্ম  এসবের মধ্যে অর্থ সংগ্রহ করার ব্যাপারটা সহজ মনে হতে পারে না । বিভূর লাঞ্ছ খরচের টাকা  বাঁচিয়ে , হাউসের নির্মম ব্যবহার সহ্য করা সহজ ভাবে মেনে নেয়াটাও সহজ নয় । বিভূর  এসব বলার মধ্যে সহানুভূতি আদায় করার কোনও মতলব ছিল না । সে এসবের বাইরে ।
ভগবানের গাঢ় কালো মেঘ সরে গিয়ে নতুন চাঁদের দেখা পেল ওরা বিদেশে অনুষ্ঠানটিতে যাবার আগেই সেতারটি তাদের বেমানান ছোট্ট ফ্ল্যাটে বাক্স বন্দি করে দিয়ে যায় দোকানের লোকেরা । তারও ঘন্টা খানেক পর , বাক্সটি ভাঙতে যতটা সময় তারও কম সময়ে আকাশ – চাঁদ, সূ্র্য , তারাদের নিয়ে ওদের ঘরে ঢুকে পড়ল । সেতারটির ওপর আলোর বিচ্ছুরণ  যন্ত্রটিকে আলোকিত করে তুলল । আর ওদের চোখ আনন্দ অণ্ধকারে  ডুবে গেল । বিভূ চোখ মেলল , স্পর্শ করল না । বিতান উলটোদিকে ঘুরে বলল, না থাক , স্নান করে আসি আগে < তারপর ছোঁব । আমি সন্তুষ্ট । আমি বিশ্বাসের রাজত্বে বাস করছি ।
তবে যাও । আমি আজ আর কোথাও বের হব না । তোমার আঙুলের কেরামতিতে বুঁদ হয়ে থাকব । তোমার হুকুম তামিল করব । ইচ্ছেরা তাড়াতাড়ি বদলে যায় । কিংবা বদলে দেয় । অথবা এটা কোনও দর্শন নয়  মামুলী অনুভূতি ।  এই বিতানকে  বিভূর খুব ভাল লাগল । নিজেকে আদম আর তাকে ইভ ভাবার চেষ্টায় ছিল সে । দিনটা একটা উৎসবে পরিণত হতে পারে । তার চোখ খোলা অথচ সে কিছু দেখতে পাচ্ছে না । স্বপ্নের জাদুবাস্তবতায় যৌনতার সামাজিক রীতিনীতি তোয়াক্কা না করে  কোনও উদার গভীর রহস্যের মধ্যে সে হারিয়ে যাচ্ছে ক্রমশ । তারপর তার মনে হল সবটাই সত্যি । আজকের বিতান যৌনতায় আগের বিতানকে হারিয়ে দিয়েছে ।
তারপর যা ঘটল , কী ঘটল  কেন ঘটল বিভূর জানতে সময় লেগেছিল । সে কেবল একটা শব্দ  শুনল । জোরালো শব্দ । বিয়ারের গ্লাস নামিয়ে আমার দিকে অসহায় চোখ মেলল । সে বলল , শব্দটা জোরালো  , একেবারে অন্য রকম । আগে কখনও শুনিছি বলে মনে পড়ে না ।  বিশ্বাস কর বলা যাবে না । কোনও ভাষা নেই । শুধু নির্বাক চেয় থাকি । দেখি বিতান সরু বারান্দায় চিৎপাট দিয়ে পড়ে আছে ! আর তার সেতারটিকে আঁকড়ে ধরার চেষ্টা করছে ! ততক্ষণে সেটি ভেঙে টুকরো     টুকরো      টুকরো      টুকরো  টু    ক   রো . . . 
আকাশ বন্ধুরা যারা অতিথির ভূমিকা পালন করছিল তাদের আর দেখা গেল না । অন্ধকারের আত্মা যেন আমার চোখে চাদর বিছিয়ে দিল ।  চারিদিক নিঃস্তব্ধ । অদৃশ্য শব্দহীন বেসুরো গুঞ্জন আমাকে নিশ্চল করে দিচ্ছে । এ যেন ওপারের ঢেউ খেলানো আকাশ থেকে নেমে আশা সুরহীন যন্ত্র সঙ্গীত নক্ষত্রের ভ/র্সনা চাঁদের বিদ্রুপ , আর সূর্যের অট্টহাসি  আমার মাথাটা গোলমাল করে দিল । আমাদের ইচ্ছাগুলো ভেঙে চুরমার করা বিষাদে শরীরের ট্যিসুগুলি দু টুকরো হয়ে যাচ্ছে । মাথার মধ্যে শেষ ঝাঁকুনিটা এল যখন দেখলাম , বিতান নিশ্চুপ , ধীরে ধীরে নিস্তেজ হয়ে পড়ছে । মারাত্মক রকম শীর্ণ মনে হল তাকে । তার চোখ জোরা বন্ধ । তার চামড়ায় গাঢ় ফ্যাকাশে ভাব ।। ছুটে গেলাম তার বাহুর সাথে বাহু ছোঁয়ালাম , কব্জির সাথে কব্জি । তাকে বললাম , কিছু হয়নি < কিছু হারায়নি ।  এই সব কথা বড় প্রাচীন আর সেকেলে মনে হল, এমন কি তাকে জড়িয়ে ধরাটাও ।
একটা ঘুসি মারল সে । টেবিল থেকে বিয়ারের বোতল পড়ে ভেঙে গেল । পোশাকধারী চোখ বড় বড় করে তাকাল একবার । বিভুর চোখে অশ্রুধারা । আমি চেয়ে দেখি সেই অশ্রুর ভেতর ভেঙে যাওয়া সেতারের  টুকরো । নীরব বিস্ফোরণের ধাক্কা সামলাতে পারছি না । সেই  অবস্থায় তাকে টেনে তুললাম । বিতান দুদিন মুখে কিছু দেয়নি চোখের জল আর পানশালার পোশাকধারীর অপমানের ভেতর আমরা রাস্তায় নামলাম ।
ভালবাসার পূর্ণ আকাশে বিভূ তাকিয় থাকে । মেঘেদের বেহেল্লাপনায় ক্লান্তি এসেছে । এখন খাবারের দোকানগুলি বন্ধ । পাওয়া যেতে পারে সমাজ নির্দেশিত নিষিদ্ধ পল্লীর দোকানগুলিতে । তার মুখে খুশির ঝলক , বিশ্বাস কর  নারী প্রেম , যৌনতা এসব দুঃখ ভোলানোর ওষুধ । আকাশে দেখ কেমন তারাদের হাসি উচ্ছ্বলতা । দেখ চাঁদ কত সুন্দর ।
পল্লীর দোকানের সামনে দাঁড়াতেই মেয়েগুলো ঘিরে ধরে । বিভূ উল্লেখযোগ্যভাবে নিজেকে মানিয়ে নেয় ।  রসিকতার মাত্রা জ্ঞান আছে ওর । বলে , সব টাকা তো মদেই শেষ করে দিলাম ।  কী দেব তোমায় । আজ থাক অন্য একদিন ।
বিদায়ী চাঁদ ঢুলু ঢুলু । আমরা ততক্ষণে গলির মোড়ে দাঁড়িয়েছি । যেখান থেকে বিতানের ফ্ল্যাটটি দেখা যায় ।

Published by Story And Article

Word Finder

Leave a Reply

%d bloggers like this: