শেষ বিকেলের বৃষ্টি // অভ্র ঘোষাল

123

.

.

সকাল হতেই খুব তেজি রোদ উঠেছিলো আজ। আবহাওয়া দফতর যদিও বলেছে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা কোনোভাবেই ৩৬ ডিগ্রির আতঙ্কসীমা অতিক্রম করে যাবে না, কিন্তু অস্বস্তিসূচক বিশ্বাস করতে দিচ্ছে কই যে ৩৬ ডিগ্রিটা অগোচরে ৪৩ হয়ে যায়নি! দুপুরের দিকে বিপদ আরও বাড়ালো আবছা মেঘলা। 

.

.

দুধ কেটে গেলে যেমন ছানা-ছানা বস্তুদলা দেখা দেয়, আকাশে সেরকম কিছু গ‌্যাসীয়পুঞ্জের জমায়েত ঘটেছে। তফাতের মধ‌্যে রঙখানা তাদের সাদা নয়, বেশ কালোকুলো। সূর্যের জ্বালাপোড়া তাপেই যেন সব রূপ ঝলসে গিয়েছে। এ-মেঘে বৃষ্টি হবে?রান্না করতে করতে আড়চোখে মাপার চেষ্টা করলো পারমিতা। বাড়ির সামনের বড়ো রাস্তাটায় চলমান লোকগুলিরও প্রত‌্যেকে বোধ হয় আন্দাজ করার চেষ্টা করছে এই মেঘ থেকে ধারাপাতের সম্ভাবনা কতোখানি!  এ-মেঘে প্রচুর জলীয় বাষ্প ভরা আছে। আছে ধুলোরাশি। কিন্তু পারমিতার মনে হয়, এই সমস্ত কি জবরদস্ত এক পশলা বৃষ্টির পক্ষে আদৌ পর্যাপ্ত ?

.

.

Lunch করার পরে এক ঘন্টা যাবৎ বিছানায় গড়িয়ে সাড়ে তিনটে নাগাদ দোতলার বারান্দায় আসে পারমিতা। তারপর, এখন বাজে সাড়ে চারটে। দুপুরে রান্নাঘরের জানলা দিয়ে এই মেঘের খেলা দেখতে গিয়েই আনমনা হয়ে ডান হাতের বুড়ো আঙুলটায় একটু ছ‌্যাঁকাও খেয়েছিলো গরম কড়াইটায়। এখন একবার আবার চোখ বুলিয়ে নেয় ওই ছ‌্যাঁকা খাওয়া জায়গাটার ওপর। এরকম টুকটাক ছ‌্যাঁকা-ট‌্যাকা এখন ওর গা-সওয়া হয়ে গিয়েছে। আবির সেই সকাল সাড়ে আটটা নাগাদ বেরিয়ে গিয়েছে।

.

.

Office-এ একটা important meeting আছে ওর, বলে গিয়েছে আসতে একটু দেরী হবে। বেরোনোর সময়ে তেমন একটা কথাও হয়নি আবিরের সাথে ওর। আজকে অন‌্যান‌্য দিনের চেয়ে অনেক বেশি ভোরেই উঠতে হয়েছিলো পারমিতা-কে। আবিরকে কিছু না খাইয়ে বাড়ি থেকে বেরোতে দিতে ভীষণ খারাপ লাগে ওর। ওর জন‌্য দুটো ভাত আর একটা তরকারি কোনও মতে বানিয়ে নিয়েছিলো ও। সেই খেয়েই রওনা হয় আবির। রওনা হওয়ার সময়ে স্রেফ ওই দেরী হওয়ার ব‌্যাপারটুকু বলেই বেরিয়ে গিয়েছিলো ও। আবির মা-কে প্রণাম করতে গেলে ওর মা বলেছিলেন, “খোকা, একটু তাড়াতাড়ি ফিরিস। কালকে খবরে বলছিলো, বৃষ্টি হতে পারে।

.

.

“আবির মজার ছলে বলেছিলো, “উফ মা, তুমিও না অযথা চিন্তা করো। বৃষ্টি হবে তো আমার কী ? থাকবো তো office-এ। চললাম মা গো। “

পারমিতার শাশুড়ি ইন্দু দেবী দুপুর এবং রাত — দু-বেলাই তাড়াতাড়ি খেয়ে নেন। পারমিতার শশুরমশাই-এর মৃত‌্যুর পরই এই ব‌্যাপারটা শুরু হয়েছে। ওর যে বছরে বিয়ে হয়, তার তিন বছরের মাথায় ওর শাশুড়ি বিধবা হন। বিয়ের পর এই নিয়ে প্রায় পাঁচটা বছর পারমিতা এই বাড়িতে কাটিয়ে ফেলেছে। সব কাজই ও ধীরে ধীরে শিখেছে ইন্দু দেবীর কাছ থেকে।

.

.

বিয়ের আগে বলতে গেলে গৃহস্থালীর কাজ কিছুই জানা ছিলো না ওর। সেই বাইশ বছর বয়সে এই ভদ্রমহিলাই তাকে করে-পিঠে নেন। তখনই তাঁর বয়স বাহাত্তর ছুঁই ছুঁই। সারাটা দিনের এই দৌড়-ঝাঁপ, ঘর মোছা, বাসন মাজা, রান্না করা ইত‌্যাদি সব কিছুই ওর কাছে এখন নিত‌্য দিনের অভ‌্যাস। শাশুড়িকে এখন তেমন আর খাটতে দেয় না পারমিতা। আটাত্তর বছর বয়সী হাড়গুলোর  বিশ্রামের প্রয়োজনীয়তাটা খুব বুঝতে পেরেছিলো ও। আর ওর শশুরমশাই মারা যাওয়ার পরে অনেকটাই ভেঙে পড়েন ভদ্রমহিলা। সকাল সকাল স্নান সেড়ে নির্লিপ্ত দৃষ্টিতে চেয়ে বসে থাকেন ভগবানের সিংহাসনের দিকে; কৃষ্ণ-নাম জপেন আর চন্ডীর মন্ত্র পড়েন।

.

.

তারপর এক কাপ raw-চা খেয়ে কোনও না কোনও ধর্মের বই নিয়ে বসেন । বাড়ির একতলার বৈঠকখানায় বিশাল একখানা বইয়ের আলমারি আছে। ওর শশুরমশাই  ছিলেন Banaras Hindu University-র সংস্কৃত-এর অধ‌্যাপক। আর সেই সূত্রেই এতো রকমের বইয়ের সমাহার এই বাড়িতে। High-power-এর চশমা চোখে নিয়ে বেশ আগ্রহের সঙ্গে বইপত্র ঘাঁটেন ভদ্রমহিলা। তাঁর এই জীবনযাত্রা দেখে পারমিতার প্রায়ই মনে হয়, মানুষের জীবনযাত্রা যে কোন মুহূর্তে কীরকমের বেগ নিয়ে ছুটবে, তা কোনও মানুষের নিজেরও অজানা। 

.

.

এখন একতলার শোওয়ার ঘরে ঘুমোচ্ছেন ওর শাশুড়ি। পারমিতা বসে বসে রাস্তায় প্রবহমান জীবনস্রোত দেখছে, পাশের ছোট্ট park-টায় বাচ্চাদের ধুলো উড়িয়ে খেলা করা দেখছে।এবার বাতাস বইতে শুরু করেছে ঝিরিঝিরি। এই বুঝি বৃষ্টি নামলো। বেতের চেয়ারে গা এলিয়ে দিয়ে মেঘলা আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে হঠাৎ আপন খেয়ালেই গুনগুনিয়ে ওঠে পারমিতা, “আজি ঝরো ঝরো মুখর বাদল দিনে/জানি নে, জানি নে/কিছুতেই কেন যে মন লাগে না…. ।” গলাটা তো কোনও কালেই মন্দ ছিলো না পারমিতার। সেই college-life-এর স্মৃতিগুলো মনে পড়ে যায় ওর একে একে। সেই  class-room, সেই lectures, সেই canteen, সেই ভেলপুরী, পাপড়ি চাট, সেই প্রথম college-fest-এ গাওয়া গান আর আবিরের সাথে প্রেমের সূত্রপাত।

.

.

এবার শুরু হলো বৃষ্টি। প্রথমে হালকা, তারপর ধীরে ধীরে জলের ফোঁটাগুলো বড়ো হয়ে পড়তে শুরু করে। পারমিতার মনে পড়ে হুমায়ূন আহমেদ-এর একটা কথা: “মাঝে মাঝে বৃষ্টি নামে, একঘেঁয়ে কান্নার সুরের মতো সে-শব্দ। আমি কান পেতে শুনি। বাতাসে জামগাছের পাতায় সরসর শব্দ হয়। সব মিলিয়ে হৃদয় হা-হা করে ওঠে। আদিগন্ত বিস্তৃত শূন্যতায় কী বিপুল বিষণ্নতাই না অনুভব করি!  জানালার ওপাশের অন্ধকার থেকে আমার সঙ্গীরা আমায় ডাকে। একদিন যাদের সঙ্গ পেয়ে আজ নিঃসঙ্গতায় ডুবেছি।” Mobile-phone-টাকে ফেলে  রেখেছে বারান্দা-সংলগ্ন ওদের স্বামী-স্ত্রীর শোওয়ার ঘরটায়;ওই জিনিসটা মোটেই খাপ খায় না এই আবহাওয়ার সঙ্গে। 

.

.

দেখতে দেখতে পাঁচটা বাজলো আদ‌্যিকালের Grandfather clock-টায়। কালো হয়ে এসেছে সব দিক। রাস্তায় লোক চলাচল বন্ধ, park-এ থাকা বাচ্চাগুলোও উধাও। কুকুরগুলো আধভেজা হয়ে দৌড়োচ্ছে একটু ছাউনির আশায়। ঘরে-বাইরে অন্ধকারের এক মায়া ঘনীভূত হয়ে চলেছে ক্রমাগত। অপলক দৃষ্টিতে এই সব অনুভব করছিলো পারমিতা। আচমকা একটা দমকা হাওয়া এসে লাগলো ওর মুখে, আর ঠিক একই সময়ে একটা উষ্ণ বাতাস ধাক্কা খেলো ওর ঘাড়ে । শিহরিত হয়ে ওঠে পারমিতা, সর্বাঙ্গে বিদ‌্যুৎ খেলে যায় ওর। প্রথমবারের হাওয়াটা খুব সাধারণ হলেও পরেরটা খুব একটা সাধারণ নয়। কারণ, পারমিতা এতোক্ষণে বুঝতে পেরেছে ওটা কোনও মানুষের নি:শ্বাসের উষ্ণতা ছাড়া আর কিছু নয়। শরীর শীতল হয়ে আসে ওর।

.

.

প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই পিঠে একটা আলতো শীতল স্পর্শ অনুভব করে পারমিতা। স্পর্শটা ওর খুব চেনা মনে হয়। এক লহমায় এবার ঘুরে দাঁড়ায় ও। একরাশ অন্ধকার ছাড়া আর কিছুই চোখে পড়ে না ওর। এবার, কানের কাছে একটা ফিসফিস শব্দ ভেসে আসে ওর। কোনও এক অদৃশ‌্য উৎস থেকে ভেসে আসছে শব্দটা….. ” বিদায় মিতা, বিদায়। “তাহলে ভুল হয়নি পারমিতার। স্পর্শটাও ওর চেনা, কন্ঠস্বরের অনুরণনটাও ওর চেনা। কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমে আসে পারমিতার। হঠাৎ শোওয়ার ঘরে রাখা ওর phone-টা বেজে ওঠে। দৌড়ে শোওয়ার ঘরে ঢোকে পারমিতা। দরজার পেরেকের খোঁচায় আঁচলের অনেকটা ছিঁড়ে যায় ওর। 

.

.

Number-টা অচেনা ঠেকে ওর কাছে । Call recieve করার পরে অন‌্য প্রান্ত থেকে ভেসে আসে একটা চেনা পুরুষ-কন্ঠস্বর—“Hello, মিতা বৌদি ? “

পারমিতা কাঁপা গলায় উত্তর দেয়, “কে কথা বলছো ?  “

ওপার থেকে ভেসে আসে, “বৌদি, আমি সুজন, আবিরদা-র colleague। আজকে office-এর desk-এ বসে কাজ করতে করতে হঠাৎ দাদা ধপ করে মুখ থুবড়ে পড়ে যান desk-এর ওপরেই। Doctor বলেন massive heart-attack…. ” এবার গলা বুজে আসে সুজনের, “অনেক চেষ্টা করলাম বৌদি, কিন্তু আবিরদাকে আর….. “

.

.

পরের কথাগুলো আর শোনা হয় না পারমিতার। Mobile phone-টা হাত থেকে খসে পড়ে ওর। স্থবির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে পারমিতা। ভয় কেটে গেছে ওর। তার বদলে গলার কাছে দলা পাকিয়ে উঠেছে একটা হাহাকার।এতোক্ষণে বৃষ্টি থেমে এসেছে প্রায়। ওই গভীর আকাশের কালো মিশেছে ওর চোখের কাজলে। 

.

.

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *