শেষ বেলা – অনন্যা মিত্র

সাঁঝ বেলায় তোমার মতই সবাই থাকে মা। কি যে করো বুঝতেও চাওনা এটাই তোমার দোষ । দেখো সারাদিন থাকিনা আমরা তোমার তো একা লাগে ,আর ছেলেটাও বড়ো হচ্ছে বাড়িটা তো আর বড়ো হচ্ছেনা।

                   দ্যাখ বাবু এই শেষ বেলায় আর কোথাও পাঠাস না। নাহয় দুদিন ই তো আর আছি । কাঁপা হাতটা বাড়িয়ে দিতেই সৌম্য রেগে ঠেলে দাড়ালো মা আর বোঝাতে পারলামনা । 

                   সেই ছোটবেলা থেকেই সৌম্য খুব জেদী যেটা চায় সেটাই করে । অগত্যা রীনা দেবী চুপ করে গেলেন। সারারাত তিনি চোখের জল ফেলেন আর নাতিকে আদর করে বুকে জড়িয়ে ধরেন। একমাত্র আদরের নাতিকে সম্বল করে তিনি করবেন ভেবেছিলেন। কোথায় কি?

                   রোজ ভয়ে ভয়ে থাকেন রীনা দেবী হয়ত আজই সৌম্য আসবে বলবে মা চল… তবে ১সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও আর কিছু বলেনি হাঁপ ছেড়ে বাঁচবে ভাবতেই সৌম্য এসে বলে মা বলছি কাল তাহলে…..আর কিছু বলতে হবেনা বাবু বুঝলাম । কেমন শুকনো গলা এবং নিজের অজান্তেই কঠিন হয়ে উত্তর দিলেন রীনা দেবী।

                  বাইরে গাড়ি দাড়িয়ে সব জিনিসপত্র এধার ওধার গোটানো , একটা ব্যাগ ভর্তি ছবি রীনা দেবী বললেন ওটা আমার সাথেই থাকবে। তোদের একটু জায়গা আরো বাড়বে সৌম্য বললো বাবার ছবিটা …কথাটা শেষ হতেই রীনা দেবী এগিয়ে গেলেন নতির দিকে । শোনো দাদু একটা কথা….

              সাঁঝ বেলায় সৌম্যের পথ চেয়ে দিন কাটে রীনা দেবী র প্রথমে ৭দিনে একবার পরে মাসে একবার আজ আর অপেক্ষা করেননা। ছেলে এলেও সেভাবে কথা বলেননা। একদিন সকালে ওই ভোর ৬ টার একটু আগে ফোন বাজে সৌম্যের বিরক্তির স্বরে সৌম্যের স্ত্রী বলে ফোনটা ধরো। হতবাক সৌম্য সাঁঝ বেলা থেকে ফোন আপনার মা আজ ভোরে heartattack এ চলে গেছেন । আমাদের ডাক্তার দেখেছেন ।।চোখ ফেটে জল এলো সৌম্যের মুখে অস্ফুটে বলল মা..

                    আজ সৌম্য পারকিনসন এর রোগী । ডাক্তার বলেছেন নিয়মিত বেয়াম,করতে ওষুধ খেতে আর সবচেয়ে দরকার পরিবারের ভালোবাসা । সৌম্যের স্ত্রী নিজেও প্রেসারের রোগী । তবে আকাশ মা,বাবা দুজনকে যত্ন করে কাছে রাখে।   একদিন সৌম্য অন্ধকারে বসে আছে ছেলে আসতেই চোখ মুছে নিলেন। অস্থির হোয়ে আকাশ বললো কি হলো বাবা?শরীর খারাপ লাগছে?সৌম্য বললো কতদিন হয়ে গেলো মা বাবা চলে গেছে। বাবা,মা বড়ো সম্পদ ।। 

                   আকাশ বললো তাই বাবা?মুচকি হেসে বললো আজ একটা কথা বলি বাবা? সাঁঝ বেলায় যাবার সময় ঠাম্মী আমায় বুকে জড়িয়ে বলেছিলেন তোমার এই কথাটাই আর বলেছিলেন কোনদিন বাবার মত হয়ও না।

          ছলছল চোখে সৌম্য ওর কাঁপা হাতটা ছেলের দিকে বাড়িয়ে দিতেই আকাশ শক্ত করে ধরলো।। দুহাতে চেপে।।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top