শৈশব-২ (স্মৃতির পাতা থেকে) // সুবীর কুমার রায়

32

আমার অবসর সময়ের সব থেকে বেশি সময় ব্যয় হতো, মাঠেঘাটে ঘুরে ঘুরে গঙ্গাফড়িং সংগ্রহে। জুতোর বাক্সে ঘাস রেখে, মাঠঘাট জলাজঙ্গল থেকে গঙ্গাফড়িং ধরে এনে, ওই বাক্সে রেখে পুষতাম। যদিও এটা বেশ ভালোই বুঝতাম যে, গঙ্গাফড়িং পোষ মানার পাত্র নয়। কিন্তু সবুজ রঙ যে কত রকমের হতে পারে, বিভিন্ন গঙ্গাফড়িং-এর রঙ দেখে শিখতে হয়।

এছাড়া সরু একরকম ফড়িং আছে, অনেকটা হেলিকপ্টারের মতো দেখতে। নানা রঙের এই ফড়িংও ধরে বেড়াতাম। একদিন সন্ধ্যার মুখে, হাতে একটা পাকা আম নিয়ে,বাড়ির সামনের ঝিলের ধারে আগাছার জঙ্গলে, গঙ্গাফড়িং-এর সন্ধানে ঘুরে বেড়াচ্ছি। আমটা খেয়ে আঁটিটা ছুড়ে গোয়াল ঘরের টিনের দেওয়ালে মারতেই, গোয়াল ঘরের অপর দিকের রাস্তা থেকে একটা মুরগি আওয়াজ শুনে ভয় পেয়ে, উড়তে উড়তে গিয়ে, পানাভরা রেলের ঝিলের মাঝখানে গিয়ে ল্যান্ড করলো।

কাদের মুরগি জানি না, সে যে গোয়াল ঘরের অপর প্রান্তে ছিল, তাও জানতাম না। কিন্তু মুরগিটা বড় বড় পানার মধ্যে থেকে আর উঠলো না। খানিক পরেই মুরগির মালিক কোথা থেকে খবর পেয়ে এসে, খুব চেঁচামেচি শুরু করে দিল। যারা ঘটনাটা দেখেছিল, তারা সবাই এক বাক্যে স্বীকার করলো, যে  আমার আমের আঁটি ছোড়ার কারণেই, মুরগির এই আত্মহত্যা।

অকুস্থলে আমি একা, কাজেই টি.আই. প্যারেডেরও কোন সুযোগ নেই, প্রয়োজনও হলো না। আত্মহত্যায় প্ররোচনা দেওয়ার অপরাধে, আমি দোষী সাব্যস্ত হলাম,এবং বিনা দোষে, বিনা কারণে, সেই সন্ধ্যায় বাবার হাতে সান্ধ্যভোজের ব্যবস্থা হলো। রাতে পড়া না পারার জন্য, নৈশভোজের ব্যবস্থাও বেশ ভালোই হলো। জানি না এটা মৃত মুরগির আত্মার অভিশাপে কী না, তবে এই মুরগির কারণে বারবার আমাকে বিপদে পড়তে হয়েছে।

আমাদের নিজেদেরও বেশ কয়েকটা মুরগি ছিল। একদিন এক তীরধনুক তৈরি করে, তীরের মুখে একটা ছোট পেরেক বেঁধে, আমাদের একটা মুরগিকে টিপ করে, তীর ছুড়লাম। সেদিন আমার মধ্যে, মধ্যম পান্ডব অর্জুনের আত্মা বোধহয় ভড় করেছিল। পাটকাঠির তীর গিয়ে মুরগির গায়ে বিঁধে, ঝুলতে শুরু করলো। মুরগিটা ভয়ে, না যন্ত্রণায় জানি না, সারা পাড়া তীর নিয়ে ছুটে বেড়াতে লাগলো। মুরগির পিছন পিছন আমিও, সব কাজ ফেলে ছুটে মরছি।

উদ্দেশ্য একটাই, মুরগি মরে মরুক, তীরটা কোনমতে খুলে নিয়ে প্রমাণ লোপ করা। তা নাহলে আমার হাতে মুরগির মৃত্যু না হলেও, বাবার হাতে আমার মৃত্যু অনিবার্য। শেষ পর্যন্ত মুরগিটার লাফঝাঁপে, তীর আপনা আপনি খুলে পড়ে গেল, এবং সে যাত্রায় মুরগি বা আমার, কারোরি মৃত্যু হলো না।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *