শোলে দেখার ইতিকথা // সুবীর কুমার রায়

 শোলে দেখার ইতিকথা  //  সুবীর কুমার রায়

ভারতীয় সিনেমা জগতে শোলের মতো দর্শক উন্মাদনার ইতিহাস তার আগে আর বোধহয় দেখা যায়নি, অন্তত আমার তো জানা নেই। রাস্তাঘাটে রক্ষাকালী, শীতলা, মনসা, ইত্যাদি পূজা, এমনকী স্বাধীনতা দিবস, প্রজাতন্ত্র দিবস, নেতাজী বা স্বামীজীর জন্ম দিবস, বা শিশু দিবস, ঘটা করে পালন করার অনুষ্ঠানে এখনকার মতো তারস্বরে শুধুমাত্র হনি সিং-এর গান বা লুঙ্গি ড্যান্স্ বাজিয়েই ভক্ত যুবকেরা ক্ষান্ত না হয়ে, শোলের ডায়লগের ক্যাসেট বা রেকর্ড বাজিয়ে অন্তরের ভক্তি নিবেদন করতো। টিভিতে প্রথম যেদিন শোলে দেখানো হয়, শুনেছিলাম সেই সুযোগটা হাতছাড়া না করে ছিঁচকে চোরেরা ভর দুপুরে অনেক বাড়ির ওপরই সুনজর দিয়ে লাভবান হয়।

হিন্দী ভাষায় কথাবার্তা একটু কম বোঝায়, আমি সাধারণত ডায়লগ ভিত্তিক সিনেমা দেখা থেকে নিজেকে দূরে রাখতাম। কেউ পাঁচবার, কেউ বা তার থেকে অনেক বেশিবার দেখে শোলের ডায়লগ যখন প্রায় সকলের মুখে মুখে ফিরতো, তখনও আমরা দুই ভাই রাষ্ট্রভাষার ভয়ে শোলে দেখায় আগ্রহ প্রকাশ করিনি।
এরকম একটা সময় আমাদের বাড়ির পাশে বিখ্যাত শ্যামলী হলে শোলে দেখানো শুরু হলো। আমার তাই নিয়ে সামান্যতম মাথাব্যথা না থাকলেও, আমার ভাই বেশ লজ্জিত হয়েই দুঃখ প্রকাশ করে বললো—“রাঙাদা, সবাই দশ-বিশবার করে শোলে দেখেছে, আমরা একবারও দেখিনি শুনলে লোকে কি বলবে, চল্ দুজনে গিয়ে রাতের শোতে দেখে আসি। আমি বললাম “হিন্দী ভাষায় কথা ভালো বুঝতে পারি না বলেই তো এতদিন দেখিনি”। সে জানালো, যে সমস্যার সমাধান সে বার করে ফেলেছে, তাই আগামীকাল নির্ঝঞ্ঝাটে সিনেমা দেখায় কোন সমস্যা হবে না।
ভাইয়ের প্রাণের বন্ধু গৌতম, যদিও সে আমারও বন্ধুর মতোই ছিল, আমাদের সাথে শোলে দেখতে যাবে। লম্বা চওড়া স্বাস্থ্যবান রসিক গৌতম আমাদের জন্য এতবড়ো পবিত্র দায়িত্ব পালন করছে, তাই তার জন্য টিকিট কাটা ছাড়া রাতের থাকা খাওয়ার সুব্যবস্থাও করা হলো। নির্দিষ্ট সময়ে দোভাষী গৌতম এসে হাজির হয়ে কথা দিল, যে সে সমস্ত সিনেমার ডায়লগ আমাদের বাংলায় বুঝিয়ে দেবে।
নির্দিষ্ট সময়ের কিছু আগেই আমরা সব থেকে ব্যয়বহুল আসনে নিজেদের আসন গ্রহণ করলাম। দুজনকেই একসাথে বোঝাবার সুবিধার্থে তাকে আমাদের দুজনের মাঝখানের আসনে খাতির করে বসানো হলো।  
এই হলটার একটু বিবরণ ও বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করা অত্যন্ত প্রয়োজন। প্রথমত, হলের দুপাশে লম্বা রো, মাঝখান দিয়ে হাঁটা চলার ব্যবস্থা। অবশ্য হলের দুপাশ দিয়েও হাঁটাচলার জায়গা রাখা আছে। দাঁতের পাটির মতো একটার সাথে অপরটা জোড়া আসনগুলোর একবারে দুই প্রান্তে নাটবল্টু দিয়ে মেঝের সাথে লাগানো। প্রতিটা রোয়ের নাটবল্টুই মোগল আমলের পরে সম্ভবত মেরামত বা পরিবর্তন করা হয়নি, তাই যেকোন আসনের একজনও যদি সামনে বা পিছনে কাত হয়ে বসে, তাহলে সেই রোয়ের সমস্ত আসনের দর্শককেই তার মর্জিমাফিক সামনে বা পিছনে কাত হয়ে বসতে হবে।
 দ্বিতীয়ত, মাঝেমাঝেই হলের আলো, বা সাউন্ড, বা উভয়ই কমতে শুরু করে, তখন হাজার চিৎকার চ্যাঁচামেচি করেও কিছু লাভ হতো না, কিন্তু কাঠের আসনের ওপর জোরে জোরে চড়চাপড় মারতে শুরু করলেই, কোন মন্ত্রবলে তৎক্ষণাৎ সমস্যার সমাধান হয়ে যেত। সমস্যা নিরময়ের এই প্রথা সম্বন্ধে প্রায় সকল দর্শকই অবগত ছিল, তাই অহেতুক চিৎকার করে সময় নষ্ট না করে, প্রথমেই চেয়ার চাপড়ানো শুরু করে দিত। 
সে যাহোক যে কথা হচ্ছিল, সিনেমা শুরু হলো। গৌতমকে দেখে মনে হচ্ছে যে সে এই প্রথম শোলে দেখছে। আমরাও মোটামুটি নিজেদের বুদ্ধিমতো কথা বুঝে সিনেমা দেখছি। হলের ওপর দিকে বিরাট একটা ঝুল না কি যেন, ছাদ থেকে অনেকটা নীচু পর্যন্ত ঝুলে হাওয়ায় দুলছে ও সমস্ত পর্দা জুড়ে তার বিশাল একটা কালো ছায়া দোল খাচ্ছে। একদম ওপরে ছাদের কাছে গোলা পায়রার বাসা। খানকতক গোলা পায়রা মনের আনন্দে মাঝেমাঝেই এদিক ওদিক উড়ে বেড়াচ্ছে। হঠাৎ একটা পায়রার পা বা ডানা লেগে ঝুলটা ছিঁড়ে গিয়ে, ওপর থেকে নীচে ধীরে ধীরে পড়তে শুরু করলো। পর্দায় সেই বিশাল ঝুলের নীচে পড়ার লাইভ টেলিকাস্ট্ আমরাও দেখলাম। পর্দায় আর ঝুলঝামেলা না থাকায়, সমস্ত দর্শক মুখের ভিতর দুটো আঙুল ঢুকিয়ে তীব্র শিস দিয়ে হলের মালিককে না পায়রাটাকে জানি না, কিছু সময় নিয়ে শুভেচ্ছা জানালো।
কথা ছিলো গৌতম মাঝে বসে হিন্দী কথা বাংলায় অনুবাদ করে আমাদের রিলে করে যাবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল সে সিনেমা দেখায় এতোটাই মগ্ন, যে একটা কথা জিজ্ঞাসা করতে গেলেই সে বিরক্ত হয়ে বলছে, “এখন কথা বলবেন নাতো, বাড়ি ফিরে রাতে বলে দেব। নিরুপায় হয়ে আমরা কখনও বুঝে, কখনও না বুঝে, কখনও বা অর্ধেক বুঝে শোলে দেখছি।
একসময় দেখলাম সেই দৃশ্য, শুনলাম সেই বিখ্যাত উক্তি, যা পূজা মন্ডপে যুবকদের মুখে অজস্রবার শুনেছি,  “কিৎনা আদমী থে, সরদার দো আদমী থে….” তারপরে রিভলবারের তিনটি কার্তুজ বার করে নিয়ে গুলি করা ও “যা তু ভী বাঁচ গ্যায়ে” ইত্যাদি ইত্যাদি। পরিস্কার দেখলাম একে একে তিনজনই বেঁচে গেল। ছবি চলছে, হলের ভিতর আলো ও সাউন্ডে কোন গোলমাল নেই, ফ্যানের ফুরফুরে হাওয়াতেও একটা বসন্তের আমেজ আছে, এমন সময় শুরু হলো প্রবল চেয়ার চাপড়ানো সঙ্গে হলের মালিকের চোদ্দো পুরুষের উদ্দেশ্যে চোখা চোখা বিশেষণ এমনকী মা মাসিকেও টেনে আনা হলো। গৌতমকেও দেখলাম প্রবল উত্তেজিত। একমাত্র আমরা দুই ভাই উত্তেজনার কারণ অনুধাবন করতে না পেরে, চুপ করে বিরোধী পক্ষের আসনে বসে।
হলের সমস্ত আলো জ্বেলে দেওয়া হলো। কিছুক্ষণ পর হল অন্ধকার করে, সেই দৃশ্য আবার দেখানো হলো। এবার দেখা গেল ওই দৃশ্যের শেষটায় ভিলেন গব্বর সিং হঠাৎ ওই তিনজনকেই গুলি করে মেরে দিল। আমরা না হয় আগে দেখিনি, ভালো হিন্দী বুঝি না তাই চুপ করে ছিলাম, কিন্ত আর সবাই তো দশ-বিশবার করে দেখা পাবলিক, মাতৃভাষার থেকেও ভালো হিন্দী বোঝে, তারা সহ্য করবে কেন? যাহোক বাকি অংশ বিনা গোলমালে সিনেমা দেখে তৃপ্ত হয়ে বাড়ি ফিরে, বিশিষ্ট অতিথি গৌতমের খাওয়া ও শোয়ার ব্যাপারে মন দিলাম।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *