শ্রাবণের ধারার মতো পড়ুক ঝরে // পর্ব-১ // অভ্র ঘোষাল

.

www.sahityautsab.com.

.

.

ধৃতি কাছে থাকলে কলকাতাকে অন‌্যরকম লাগতো । University থেকে বেরিয়ে পুরনো বই-এর সার সার দোকানের সামনে দিয়ে ধৃতির সঙ্গে হাঁটতে হাঁটতে চলে যাওয়া মানুষগুলোকে যিশু খ্রিস্টের মতো মহৎ মনে হতো। Coffee House-এর table-এ পাশাপাশি বসে চারপাশের একটানা চেঁচামিচিকে সমুদ্র গর্জনের মতো নির্জন মনে হতো।

.

.

প্রথম বার ধৃতি যখন নিজেই যেচে আলাপ করতে এগিয়ে এসেছিলো, আমি একটু অবাকই হয়েছিলাম। মাথার দুপাশে খোলা চুলের কালোয় ফরসা মুখখানায় দুটো বড় বড় চোখে খুশির সুন্দর কারুকাজ, কপালটা একটু চওড়া তাই খুব বড় করে টিপ পরার ফলে চোখে আরাম লাগে। হাসলে অল্প গজদাঁত দেখা যায়। বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকলে বুকের ভিতর পাক খেয়ে যাওয়া বাতাস কেঁপে কেঁপে নি:শ্বাস হয়ে বেরিয়ে যায়। সেই চৈত্র দিনের দুপুরের হাওয়ার মতো তাপ ছড়িয়ে দিয়ে যায় আমার phone-এ থাকা ধৃতির একটা photograph। ওর facebook-এর এককালীন display picture ছিলো এইটিই। ছবিটায় ধৃতি ঘাড় কাত করে হাসছে এবং যথারীতি উঁকি দিচ্ছে তার গজদাঁতটি।

.

.

সেই বিকেলটা এখনও আমার কাছে ভীষণ পরিষ্কার। সবে মাত্র কৌশিকবাবুর class শেষ হয়েছে। এই একটা class করার জন‌্য আমরা ফিরে যেতাম Coffee House থেকে । শেষ হতে না হতেই আমি বেরিয়েছি, এমন সময় ধৃতি আমার সামনে দাঁড়ালো। বাঁ হাতে কপালের চুল সরিয়ে ওর চোখে চোখ রেখে বললো, “আচ্ছা, আপনি এতো কী দেখেন বলুন তো ! “

.

.

কথাখানা শুনে একটু ঘাবড়েই গিয়েছিলাম। এভাবে যে ও এসে কথা বলবে — এতোটা ভাবিনি কোনও দিন। যখনই class-এ এসেছে, আমি পিছনের সারিতে ব​সেছি। আর সেইখান থেকে সামনে বসা ছেলেমেয়ের মাথার পাশ দিয়ে একটা সরল রেখা হয়ে যেতো একসময়, যার অন‌্য প্রান্তে থাকতো ধৃতির মুখ। অনেকদিন ওর নাম জানিনি আমি। যতোই হোক, মফস্বলের ছেলে আমি, নিজে এগিয়ে গিয়ে কলকাতার মেয়েদের সঙ্গে আলাপ করার মতো মানসিক গঠন হয়নি তখনও।

তবে, এটা বেশ বুঝতে পেরেছিলাম যে, প্রতিটি মেয়েরই একটি নিজস্ব ইন্দ্রিয় আছে যাতে তারা বুঝতে পারে কেউ তাকে লক্ষ করছে কি না, ধৃতি বুঝে নিয়েছিলো প্রথম দিনই। তা না হলে দু বার তাকিয়ে মাথা ঘুরিয়ে নিলো কেন ?

.

.

ধৃতি সাধারণত backless salwar পড়তে পছন্দ করে । হলুদ রঙ ওর ভীষণ প্রিয়।  মাথার চুলের প্রান্তে একটা বাঁধুনি, চুলগুলো ফুলে ফেঁপে ছড়িয়ে থাকে চওড়া পিঠে। মেয়েদের পিঠ ভরাট হলে এতো সুন্দর দেখায়, ধৃতিকে না দেখলে বোঝা দায়। ধৃতি কিন্তু দৈর্ঘ‌্যে সুবিশেষ লম্বা নয়, কিন্তু গলার গড়নে ওকে লম্বা দেখায় বেশ। বছর আড়াই আগে আমরা তখন বিশ্ববিদ‌্যালয়ের শেষ ক্লাসের পড়ুয়া।

যা-ই হোক, এটা একটা মজার খেলা হয়ে গেলো আমার কাছে। আর এই চোখ ওঠানামা, মাথা ঘোরানোর খেলার এই নেশায় বুঁদ হয়ে ছিলাম এমনই যে পরপর কয়েকদিন ও না আসাতে মন মেজাজ বিশ্রী হয়ে গেলো আমার। ওর নাম জেনেছিলাম আমারই batchmate শিবুর  কাছ থেকে। বলেছিলো, “দারুণ intelligent আর ক্ষুরধার মেয়ে — যা না বাড়িতে গিয়ে খোঁজ নে। আসছে না কেন দেখ। “

.

.

“শালা তুইও এক একটা এমন কথা বলিস, মনে হয় গোবরের একটা আস্ত  পদক তোর মুখে ছুঁড়ে মারি । আমার সঙ্গে আলাপই নেই তার আবার….  হেসেছিলাম।

“আহাম্মক রে, তুই একটা good for nothing ! এক বছর যাবৎ একটা মেয়েকে কেবল দেখেই গেলি, গিয়ে আলাপ করতে পারলি না পর্যন্ত। “শিবু ঠাট্টা করেছিলো।

সেই মেয়েই দিন কতক বাদে ফিরে class শেষে ওর আমার সামনে এসে জিজ্ঞাসা করলো, “আচ্ছা, আপনি এতো কী দেখেন বলুন তো ? “

আমি এক লহমায় সহস্রবার মনে মনে বলে ফেললাম, তোমাকে। মুখে বললাম না কিছু, মাথঅ নীচু করে হাসলাম।

.

.

“What happened ? কিছু বলছেন না কেন ? ” ধৃতির গলা যেন আমাকে ছোটো ছোটো টোকা দিয়ে গেলো। ওর মুখের দিকে তাকালাম, “বলতে ঠিক সাহস হয় না। “

“কেন? ” ঘাড়ের পিছনে মৃদু ভাঁজ ফেলে চিবুক উঁচু করে তাকালো ধৃতি । চকিতে আমার মনে পড়ে গেলো নিজের মায়ের কথা। চৈত্রের সকালে মাটির এক ফুটোওয়ালা হাঁড়িতে জল ঢেলে মা এমন করেই তাকাতো। আর সেই ফুটো চুঁইয়ে একটা একটা করে জলের বিন্দু পড়তো নীচের পাতা শুকিয়ে আসা তুলসী গাছে। বুকটা একটু ভরে এলো আচমকাই। মনে হলো, আচ্ছা, এই প্রতিচ্ছবি কি একান্তই আমার অবচেতন মনের কল্পনা,  নাকি নেহাৎ কোনও মোহ ?

.

.

ধৃতি তো আমার সন্নিকটের কেউ নয়, তবুও কেন ওর মধ‌্যে মায়ের এই প্রকট প্রতিবিম্বটা দেখলাম ? হয় তো ও মায়ের মতোই ভালো । আর ওকে রোজ দেখতে গিয়ে তো আমি ওর বহু ছোটোখাটো আচরণও খেয়াল করেছি, যেগুলো এই যান্ত্রিক যুগে মানুষের মধ‌্য থেকে বিলুপ্তপ্রায়। থাক, ওগুলো না হয় পরেই বললাম। আমি এই সব ভাবছি আর ইতি মধ‌্যে অন্ততপক্ষে দশ বার ধৃতি “বলুন” শব্দটা বলে ফেলেছে।

আমি ঘোর কাটিয়ে বললাম, “কী জানি, হয়তো আপনি খুব সুন্দর বলে, সুন্দর এবং গম্ভীর। ” বহুক্ষণ নিমজ্জিত থেকে আচমকা এক লহমায় মাথা উত্থিত করে শ্বাসকার্য চালালে যেমন বোধ হয়, তেমনই একটা তৃপ্তি বোধ করলাম কথাটা বলতে পেরে।

.

.

“ধূর, আপনারা এমন বাজে কথা বলেন ! আসলে কী জানেন? আপনি প্রবল ভীরু, সাহস-টাহস নেই । তাই না ? ” ধৃতি হাসলো।

“হতেই পারে। ছেলেবেলা মফস্বলে কেটেছে তো, ঠিক বুঝতে পারি না সাহসের এই সকল ব‌্যাপার। “

“আমার নাম ধৃতি, ধৃতি সোম। আপনার নাম কিন্তু আমি জানি। “হাসলো ধৃতি।

“আপনার নামও আমি জানতাম। “

“আচ্ছা, একখানা কথা clearly বলুন তো । আপনি কিছু mind করছেন না তো ? “

” এমন কেন মনে হচ্ছে বলুন তো ? “

“না, মানে যেচে এসে কথা বলতে শুরু করলাম তো, তাই ! তবে, আমি কিন্তু খুব খারাপ মেয়ে, খু-উ-ব । “

.

.

“যা:, তা আবার হয় নাকি ? এমন সুন্দর মুখশ্রী যার, সেই মেয়ে খারাপ হয় কখনও ? “

একদিন lake-এর ধারে বসে আছি দুজনে পাশাপাশি, এমন সময় ধৃতি আমার কাঁধে মুখ রেখে বললো, “তুমি খুব ভালো, জানো, খুব ভালো । “

সহস্র শালুকফোটা সরোবরের মতো অন্তর টলটল করে উঠলো আমার। আমাকে তো কোনও দিন কোনও মেয়ে এভাবে বলেনি।

“হুঁ”। ধৃতির শরীরের গন্ধটা চোরের মতো বুকে ভরে  নিতে নিতে আমি বললাম।

আমি এবার হঠাৎ বলে ফেললাম, “ধৃতি, তোমাকে না আমার নিজের মায়ের মতো মনে হয় । মানে, ঠিক যেন মাতৃরূপা, পেলব একজন নারী ! তুমি যখন হাসো তখন গালের দুটো পাশ লাল হয়ে যায় তোমার। যখন…. “

“কী হলো, থামলে কেন ? ” ধৃতি প্রশ্ন করলো।

“সামনে তাকাও একবার । ” আমি বললাম।

.

.

ধৃতি আমার দিক থেকে সামনের দিকে তাকালো । তারপর হঠাৎ গেয়ে উঠলো,

“শাঙন গগনে ঘোর ঘনঘটা

 অঁধার যামিনীরে।

কুঞ্জপথে সখি, কৈসে যাওব

 অবলা কামিনীরে।

উন্মদ পবনে যমুনা উথলত

 ঘন ঘন গরজত মেহ।

দমকত বিদ্যুত বজ্র নিনাদত,

 থরহর কম্পত দেহ।

ঘন ঘন রিম্‌ ঝিম্‌ রিম্‌ ঝিম্‌ রিম্‌ ঝিম্‌,

 বরখত নীরদ পুঞ্জ।”

.

.

ধৃতির গলাটা হঠাৎ করেই আমার কাছে কতকটা রেজওয়ানা চৌধুরী বন‌্যার মতো ঠেকলো সেই রহস‌্যময় মেঘলা পরিবেশে । মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইলাম ধৃতির মুখের দিকে। চুলগুলো হাওয়ায় উড়ে উড়ে কেবলই ওর মুখের ওপরে আসছে, আর ও বিভোর হয়ে গেয়ে চলেছে। আমি জানি, ধৃতির কাছে রবীন্দ্র-সঙ্গীতই সব কিছু, ওর প্রাণ-ভ্রমর ।

.

.

“ছোটোবেলায় দেখতাম, বাবা রবীন্দ্রনাথের বই অনেক পড়তেন। তখনই রবি ঠাকুরের সঙ্গে প্রথম পরিচয় হয়। তৈরি হয় গভীর অনুরাগ।”গান শেষ করে ধৃতি আমার দিকে তাকায়।

“আচ্ছা ধৃতি, রবীন্দ্র-সঙ্গীত বলতে কী বোঝা উচিৎ বলে মনে হয় তোমার ? ” আমি প্রশ্ন করলাম।

আমার দিকে তাকিয়ে একটা দুষ্টু হাসি হাসলো ধৃতি। তারপর বললো, “বাবা, কে এই প্রশ্ন করছে দেখো ! রবীন্দ্রনাথের অশেষ সৌভাগ‌্য দেখছি ! “

.

.

আমি একটু লজ্জা লজ্জা ভাব করে বললাম, “এই, এরকম বলো না। আমিও রবীন্দ্রসঙ্গীত শুনি, তবে তোমার মতো ওতোটা মনোনিবেশ করতে পারি না। আমার বাবা ছিলেন শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের লোক। “

“সত‌্যিই ? তাহলে সেই তুমি এমন সব উগ্র গান-বাজনা শোনো ? English-এ কী সব লোহা-লক্কর Rock ‘n’ Roll, Metal-ফেটাল কী সব ! ম‌্যা গো ! কী পাও ওই সব ছাইপাশ শুনে?   ” ধৃতির নাকের কাছটা একটু কুঁচকোলো।

.

.

আমি বেশ আমোদ পেয়ে বললাম, “আগে আমার প্রশ্নের উত্তরটা দাও, তারপর না হয় আমি বলি । “

“দেখো, ঘরের মানুষকে ঘরের রূপেই দেখতে ভালো লাগে। ঘরের সাজে সাজলেই যেন অনেক বেশি আপন মনে হয়। তবু তাকেই যখন বাইরে দেখি বাইরের রূপে অন্য সাজে তখন সেই চেনাকেই যেন অচেনা কায়ায় নতুন করে পাওয়ার ইচ্ছা জাগে। ‘তোমায় নতুন করে পাব বলে হারাই বারে বার।’ ঠিক তেমনই হলো রবীন্দ্র-সঙ্গীত । শত শত রূপে ফিরে আসে এই গান , যা কালোত্তীর্ণ । “

.

.

আমি মুগ্ধ হয়ে শুনছিলাম ওর মুখ-নি:সৃত প্রতিটা শব্দ। ঠান্ডা হাওয়া প্রাণের মাঝে হিমের পরশ দিয়ে যাচ্ছিলো বারংবার। শ্রাবণের এই আধ-ভেজা, শীতল বিকেলে ধৃতি যেন এক মন-গলানো উষ্ণতা। সত‌্যিই হয়তো এই কারণেই হুমায়ূন আজাদ বলেছেন, “একটি স্থাপত‌্যকর্ম সম্পর্কে আমার কোনও আপত্তি নেই, আর কোনো সংস্কারও আমি অনুমোদন করি না। স্থাপত‌্যকর্মটি হচ্ছে নারীদেহ । “

ধৃতির শরীরের প্রতিটা স্পন্দন যেন আমি শুনতে পাচ্ছিলাম । প্রত‌্যেক মিনিটে, প্রত‌্যেক সেকেন্ডে ।

কথা থামিয়ে ধৃতি আমার মুখের সামনে হাত নাড়ালো, “Hello sir, কী হলো ? কোথায় হারিয়ে গেলেন ? “

.

.

আমি চমকে উঠলাম অল্প, তারপর বললাম, “তোমার ঠোঁটে, চোখে, গালে, সর্বাঙ্গে । “

লজ্জায় আবারও গাল দুটো লাল হয়ে গেলো ধৃতির । একটু ধাতস্থ হয়ে বললো, “এই দেখো, গুঁড়ি গুঁড়ি পড়তে আরম্ভ করেছে । একটা ছায়াঘেরা জায়গায় গিয়ে বসি চলো । ” এই বলে ধৃতি উঠে দাঁড়ালো।

.

.

 ক্রমশ
Facebook Comments

Published by Story And Article

Word Finder

Leave a Reply

%d bloggers like this: