সঙ্গীনি – বন্য মাধব

সঙ্গীনি  -  বন্য মাধব

অফ ডেথাকলেই বিকালের পরথেকে কেমন যেনলাগতে শুরু করে, একটা অদ্ভূত অদ্ভূতভাব, মনের মধ্যে একটাছটফটেভাব, তখনকোনো কিছুতেই মনবসাতে পারি না, একটু আলো কমেআসলেই আর ঘরেথাকতে পারি না, আগে কাগজের কাজটায়যখন ঢুকি নি, তখন দুবেলাপড়াতে যেতাম, ফলেঅবসরটা কম মিলতো, এখন তো পড়াইএকবেলা, বিকালে অফিস, সময় কাটে তরতর করে, ছুটিছাটায়মুশকিল, এত নিঃসঙ্গলাগে! চেনাজানা কারওকাছে যেতেও ইচ্ছেকরে না, এইসময়কারও সঙ্গে দেখাহলে সটকে পড়ারতালে থাকি।
বেরিয়ে পড়িমেস ছেড়ে, হাঁটতেথাকি, হাঁটতেই থাকি, যতক্ষণ পা দুটোতে ব্যথা টনটনিয়েওঠে, মাথার মধ্যেপোকা কিলবিল করছে, পোকাই বলতে হবে, কুরকুর করে কামড়াতেথাকে, সবচেয়ে বেশিকামড়ায় যখন দেখিচোখের সামনে দিয়েপ্রেম করতে করতেড্যাংডেঙিয়ে কেউচলে যায়, মনেহয় যেন আমাকেপ্যাঁক মারতে মারতেওরা যাচ্ছে, পোকাগুলোরতখন কী লাফানি! আর একা মেয়েগেলে একটু দূরত্বরেখে তার পেছনপেছন যতক্ষণ যাওয়াযায়, যাই, তবেভাবখানা এমনথাকেকিছু দেখছিনা, কিছু জানিনা, আমার কাজেআমি যাচ্ছি….
এটাও কাজ, আমার ভেতরের পোকামারার কাজ, পেছনথেকে দেখি, পাশথেকে দেখি, সামনেথেকে দেখি, দুএকবার সামনে থেকেদেখতে গিয়ে গালওযে জোটে নিতানয়, অভিজ্ঞরাহাবভাব দেখলে ঠিকবুঝে ফ্যালে, তখনআর কি? কিছু শুনি নিভাব দেখিয়ে কেটেপড়ি, আর একটুসাবধান হয়ে আবারনিজের পোকা মারারচেষ্টায় থাকি।
আমার এসবঅভিযানের পছন্দেরএকটা জায়গা আছে, এও হাঁটতে হাঁটতেইখুঁজে বার করা, রাস্তাটা ইঁটের, বেশি চওড়াও নয়, ফুট তিনেকের, এটাআসলে একটা বড়পুকুরের পাড়, বাঁশবাগানও আছে, মাথা থেকে মাথা যেতেমিনিট চারেক লাগে, বিকেল থেকে জায়গাটাছায়া ছায়া হয়েযায়, সন্ধ্যের পরআলোহীন জায়গাটা গায়েকাঁটা তোলার পক্ষেযথেষ্ট, আর হঠাৎকরে পেঁচা ডেকেউঠলে বা দুড়দাড়করে খটাস গেলেতো ভয় লাগবেই, তবে এটা একটাকাজের রাস্তা, যাকেবলে বাইপাশ, এটাতাই, চেনা পরিচিতরাইএই পথটা ব্যবহারকরে, এই রাস্তাটায়আমি যখন ঢুকি, তখন একঘন্টা তোপাক মারবোএই, অবশ্যইচ্ছে হলে কারোপেছন পেছন চলেওযাই, আবার ফিরি, একটা জিনিস লক্ষ্যকরেছি, মেয়েরা যেচেকাউকে ধাক্কা মারেনা, তবে কেউকেউ ধাক্কা মারারসুযোগ দেয়, কিন্তু একবারই, যেনখেয়াল করে নিব্যাপারটা এমনভাব, মাত্র একবারইএকজনকে পথ আটকাতেদেখেছি, টাকা দিতেরাজি না শুনেদুয়ো মেরে সেচলে গেছে।
আজকেও বারবারএর ওর পিছুনিয়েছি, ফিসফিসিয়ে যাবলার বলেছি, গল্পকরার একটাও কেউজোটে নি, শুধুক্লান্ত হয়েছি, এবার ফিরবো বলেবড় রাস্তায় উঠেছি, হঠাৎ দেখি রিক্সাথেকে একটা মেয়েআমাকে দেখে টাটাদিচ্ছে, আমাকে তো? এদিক ওদিক তাকালাম, কেউ তো নেই, রিক্সা ততক্ষণে পগারপার, কে হতেপারে? মনে পড়লোনা কাউকে, ভাবতেভাবতে ফিরছি, হঠাৎবর্ণার কথা মনেএলো, বর্ণা নয়তো? ধ্যুস তাকেন হবে? মেসেঢোকার আগে একবারওদের বাড়ি ঘুরেযাই বরঞ্চ, কিবলবো? হুম, কিছুতো বলা যাবেনা, এমনিই যাই, নিশ্চয়ই খুশিহবে, আগে তোওকে সন্ধ্যেয় পড়াতাম।
নিজেকে দ্রুতবদলে নিতে লাগলাম, নিজের কালো মনকেনিজের মধ্যে ঠেসেঢুকিয়ে দিতে লাগলাম, বর্ণা, সেই বর্ণা, যে পেনসিলে লিখেলিখে আমাকে বহুবারভালোবাসা জানিয়েছে, আমার লোভ হতো, এখনও হয়, কিন্তুনিজেকে লাথি মেরেমেরে আটকে রাখি, আমাকে কেন ওরামেয়ে দেবে? ভালোবাসাআমাকে মানায়? এসবকরলে বরং বদনামহবে, আর টিউশনওজুটবে না, শেষকালেক্ষীরোর মতোকেস হবে, মেসছেড়ে পালাতে হবে।
বর্ণাদের বাড়িএসে গেছি, বেলদিলাম, কে? না, আমি, দাঁড়ানআসছি, খলখল করতেকরতে বর্ণা দরজাখুললো, মুখ ভর্তিহাসি, কি খুশিকি খুশি, আসুনআসুন, দরজা লাগিয়েবর্ণাও লাফাতে লাফাতেএলো, বাইরে কীর্তনেরসুর ভেসে আসছে, সোনার গৌরাঙ্গকে পেয়েতিনি আর ছাড়তেচাইছেন না, বললাম, বর্ণা, বসো, আমিএকটু হাতে মুখেজল দিয়ে আসি, শান্ত হয়ে ফিরেএলাম, দুঢোকজল মুখে দিলাম, চা করবো? ওদেরবাড়ি বরাবর এটাওটা টিফিন বাঁধাথাকে, বললাম, কিন্তুতুমি কেন? তারপরবুঝলাম, মায়েরা কীর্তনশুনতে গিয়েছে, , না, না, থাক, তাহলে অন্য কিছুখান, নাহলে মাতো বকবে আমাকে, , তাহলে দাও, ঝপাঝপ ফল, বিস্কুট, মিষ্টি হাজির, বললাম, বর্ণা, তুমি আমাকেখুব ভালোবাসো না?
বর্ণা অনেকদিনপর এমন করেহাসলো, প্রথম যেদিনখাতায় চিরকুট লিখেছিলো, সেদিনও এমন করেহেসেছিল, সেদিনশুধু চমকে গেছিলাম, তালে আমাকেওকেউ ভালোবাসতে পারে! আর আজ ওকেখুব মন দিয়েদেখছি তো দেখছি, রক্তে আলোড়ন উঠছে, বাসি তো, খুবভালোবাসি, কতবছরধরে বাসি, ভালোবাসিবলেই তো নিজেকেতৈরি করছি, যেমনবলছেন তেমনটা করেইতো, সবাই কীখুশি, বাবা, মা, আপনি, পাড়া প্রতিবেশী, আত্মীয়রাও, শুধুআমি….. কী? বলোবর্ণা, আমি জানি, আমি তোমার যোগ্যনই, তাই কিছুবলতে পারি না, আসলে আমিও…… 
তাকিয়ে দেখিবর্ণার চোখ ছলছলিয়েউঠেছে, বাঁধ ভাঙলোবলে, বললাম, শোন, আমি আজ থেকেতোমার হয়ে ওঠারচেষ্টা করবো, একেবারেতোমার, আমার মধ্যেথাকা যা কিছুখারাপ সবগুলোকে শেষকরে ফেলবো, এক্কেবারেনতুন মানুষ, এবারনিশ্চয়ই তুমিখুশি? বাইরে কীর্তনেরপ্রেম অঙ্গের গানভেসে চলেছে, এইপ্রথম আমি ভালোবাসায়ভাসছি, বর্ণাকে নিজেরহাতে খাইয়ে দিচ্ছি, আমার মুক্তি ঘটতেলাগলো, আমি ধীরেধীরে সাদা মনটাকেফিরে পেতে লাগলাম, ঝরঝরিয়ে কেঁদেফেললাম, বর্ণা আমাকেআকন্ঠ প্রেম নিয়েজড়িয়ে থাকলো…….তার কাঁপা কাঁপাশরীর মোমের মতআমার শরীরে গলেগলে পড়তে লাগলো…….

ফেসবুক মন্তব্য

Published by Story And Article

Word Finder

Leave a Reply

%d bloggers like this: