সত্যিই অসতী ? // শ্যামল কুমার রায়

সত্যিই অসতী ? // শ্যামল কুমার রায়

                ডায়মন্ডহারবার রোড স্টেশন থেকে রায়চক যাবার পথে চৌমাথায় চোখ ধাঁধানো মুখার্জি ম্যানসন্ দেখে অনেকেরই চোখ ছানাবড়া হয়ে যায়। কিন্তু, এই চোখ ধাঁধানো প্রাসাদের অন্তরালে যে কান্না লুকিয়ে আছে, তা জানতে হলে,ও বাড়ির বর্তমান শাশুড়ি কাবেরী মুখার্জির কথা না বললেই নয়।
.

হাওড়া আমতলার বাসিন্দা কাবেরী আজ থেকে প্রায় বছর ত্রিশ আগে মন দিয়েছিল, সুদর্শনকে। কাবেরী তখন একাদশ শ্রেণির ছাত্রী; আর সুদর্শন তখন বছর চব্বিশের সৌমদর্শন যুবক, ডাকসাইটে অভিজাত ঘোষ মিষ্টান্ন ভাণ্ডার এর মালিক তারাপদ ঘোষের একমাত্র ছেলে।

যাওয়া আসার পথেই চোখাচোখি ও মন দেওয়া নেওয়া হয়েছিল। বাছুরে প্রেমের উন্মাদনা যেমন ছিল, ঠিক তেমনই ছিল প্রথম প্রেমের উষ্ণতা, ভালোলাগা আর ভালোবাসা; সঙ্গে ছিল প্রতিশ্রুতি দেওয়া ও প্রতিশ্রুতি রাখার তাগিদ। আর কাবেরী? এক কথায় ডানাকাটা পরী। গায়ের রঙ ছিল দুধে আলতা। আর ঠোঁট? পাকা টমেটোও লজ্জা পেত ওর রঙ ঠোঁটের রঙ দেখে।

                 স্কুল ফেরত কাবেরীকে একবার দেখবার আর কাবেরীর সঙ্গে কথা বলার জন্য সুদর্শন ইস্কুল পাড়া মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকত বাইক নিয়ে। আর কাবেরী শাড়িতে জাস্ট ফাটাফাটি। ওর সঙ্গে অবশ্যই ওর বেস্ট ফ্রেন্ড তৃণা থাকতই।

বিকেলে টিউশন পড়তে যাওয়ার সময় এবং তিন সন্ধ্যে বেলায় ফেরার সময়ে সুদর্শন সঙ্গে থাকতই। একটা সময় প্রেমে হাবুডুবু খাওয়া কাবেরীকে দেখে বন্ধুরা বলত, সুদর্শনা আসছে। এটাকে বেশ এনজয় করত ও। দেখতে দেখতে কাবেরী উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করে কলেজে ভর্তি হল। আর সুদর্শন এর সঙ্গে সম্পর্কটা গাঢ়তর হল।

কিন্তু, সব অঙ্ক তো আর মেলে না, সুদর্শন একদিন কাবেরীদের বাড়িতে এল;কাবেরীর মা সাধ্যমত যত্নআত্তি করল। কথায় কথায় চারহাত এক করার কথা উঠলে কাবেরী রাঙা মুখে পাশের ঘরে চলে গেল। নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের কাবেরীদের পরিবারের কোনো ওজর আপত্তি ছিল না। সেদিন সারা রাত শুধু জেগে জেগে কাবেরী স্বপ্ন দেখেছে , ওই বাড়িতে বৌ হয়ে যাওয়ার।

             চরম মোহভঙ্গ হল , যখন কাবেরীর বাবা, পেশায় ফুল ব্যবসায়ী নন্দলাল চাটুজ্জ্যেকে অন্ধকার রাস্তায় মুখে কাপড় ঢাকা কয়েকজন তাজা যুবক ফ্যালায় ফ্যালায়ে মার দিল; যাবার সময়ে বলে গেল, বামন হয়ে চাঁদে হাত দেবার শখ; ভালো চাস তো কেটে পর; নইলে তোর ঐ ডাগর মেয়েটার গায়ে একটা সুতোও থাকবে না।

রক্তাত নন্দলাল চাটুজ্জ্যে সেই রাতেই বৌ , মেয়ে নিয়ে ছিটেবেড়ার ঘর ছেড়ে সোজা তিন ভুবনের পাড়- রায়চক এ হাজির হল। স্বল্প পরিচিত এই জায়গাটা যেন মায়াবী। এই মায়াবী রায়চকে যাইহোক করে অনিশ্চিত জীবনে অন্ন জুটে যায়। কাবেরী আর পড়ার কথা ভাবল না। অমন রূপ আর মধুমাখা ব্যবহার এর জোরে রায়চকে এক রিসেপসনিস্ট এর কাজ জুটিয়ে নিল।

                      হতাশার মাঝে ঐটুকুই যা আশার আলো। দেখতে দেখতে বছর দুই কেটে গেল। সুদর্শন কোথায় যেন কাবেরীর বুকের ভেতর লুকিয়ে রইল। কিন্তু, স্মৃতিকে আঁকড়ে ধরে কি সব সময় বাঁচা যায়? সদ্য যৌবনে পা দেওয়া কাবেরী চাটুজ্জ্যেকে চোখে লেগে গেল অর্পণ মুখার্জির বাবার। অর্পন রায়চকে হোটেলে আনাজ সাপ্লাই করে; বয়েসে কাবেরীর চেয়ে আট বছরের বড়ো। অর্পন দেখতেও মন্দ না।

দুই বাড়ির লোকে মিলে চার হাত এক করে দিল। বিয়ের আগে রায়চকের হোটেল থেকে বাড়ি ফেরার পথে অর্পনের সাথে কাবেরীর দৈবাৎ দেখা হয়ে গেল। গঙ্গা পাড়ে দাঁড়িয়ে গল্প করতে করতে কাবেরী নিজের জীবনের প্রতিটা পাতা অর্পনের সামনে মেলে ধরল। বাদ গেল না সুদর্শন পর্বও। সব জেনেশুনে অর্পন কাবেরীকে সিঁদুর দিল। লো প্রোফাইল মুখার্জি বাড়িতে সেরকম কোন অসুবিধা ছিল না।

                         কিন্তু, ওদিকে? সমস্ত পারিবারিক চাপ উপেক্ষা করে বিয়ে না করে রয়ে গেল সুদর্শন। বাবার ব্যবসায় না বসে স্বাধীন ভাবে মদের ব্যবসা শুরু করল। রক্তে ব্যবসা। ঐ মদেরই ফরেন লিকার অন শপ্ থেকে মদের সাপ্লাই শুরু করতেই ফুলে ফেঁপে ঢোল হয়ে গেল। পায়ে চাকা লাগিয়ে ব্যবসার কাজে ঘুরে বেড়াতে লাগল। আসলে সুদর্শন ব্যবসার কাজে সব কিছু ভুলে থাকতে চায়। আজ ওর ব্যবসার নাম ‘কারনসুধা এন্টারপ্রাইজ’ ।.

এক কালী পুজোতে সুদর্শন আকন্ঠ পান করেছিল। পরের দিন বড়াই করে কাবেরীকে গঙ্গার পাড়ে বসে তা বলতে, কাবেরী গুনগুন করে গান গাইতে শুরু করেছিল, ‘বিপিনবাবুর কারনসুধা, মেটায় জ্বালা, মেটায় ক্ষুধা’। সারাদিন গতর খাটিয়ে পেটের ভাত জোগাতে হয় ওদের। তার জন্য কোনো আক্ষেপ ছিল না ওদের। দু’বছর যেতে  না যেতেই কাবেরীর খাবারে অরুচি বাড়িতে খুশির জোয়ার নিয়ে এল। সেই সময়ে কাবেরী কোনো মাইনে পেত না। ঐ একার রোজগারে অর্পন সব সামলে নিয়েছিল।

            শুধু তাই নয়, পাছে কাজ নিয়ে বাড়িতে অশান্তি হয়, অর্পন কাজে যাবার আগে সংসারের অনেক কাজ গুছিয়ে দিয়ে যেত। লোকে অবশ্য টিপ্পনী কাটত বৌয়ের গোলাম বলে। তাতে অবশ্য সাদামাটা অর্পনের কোনো হেলদোল ছিল না।

ঠিক দুশো আশি দিনের কাছাকাছি নিকটবর্তী ফলতা ঈ.এস.আই. হসপিটালে ডা. অমিয়বালা নস্করের তত্বাবধানে পৃথিবীর আলো দেখল সৌম্য। নামে কোথাও যেন একটা অবচেতন ভাবেও সুদর্শনের ছোঁয়া।সব কিছু ধাতস্থ হলে কাবেরী আবার পুরনো কাজে যোগ দিল। একদিন হন্তদন্ত হয়ে কাবেরী কাজে যাবে বলে জোরে হাঁটা দিল, এমন সময়ে একটা ফরটুনার্ গাড়ি কাবেরীর পাশে এসে দাঁড়াল।

ঘটনার আকস্মিকতায় কাবেরী থমকে গেল। কালো কাঁচ নামতেই কাবেরী কাকে দেখল? সময় যেন থমকে দাঁড়ালো। উঠে এস। ভেতর থেকে শুধু এটুকু শব্দই এল। কেমন মোহাবিষ্ট হয়ে কাবেরী গাড়িতে চড়ে বসল। ইব্রাহিম জিজ্ঞেস করল,”দাদা কোন দিকে যাব?” সোজা নন্দকুমার, মাঝের সিটে বসে সুদর্শন বলল।
.

কাবেরী পাশে বসতেই , ইব্রাহিমকে এসি টা চারে দিতে বলল; আর কার ফ্রেশনার আর একবার দিতে বলল। কাবেরী আর সুদর্শন আকস্মিকতা কাটিয়ে কথা বলতে শুরু করল। আস্তে আস্তে উঠে এল, কেন, কিভাবে, কাবেরীরা চলে এল।

কিন্তু, তুমি কেন আমার জন্য অপেক্ষা করলে না? আমি তো আজও শুধু তোমাকেই চাই। এ কথায় যেমন কাবেরীর চোখে জল বাঁধ মানল না, তেমনি নিজের বাড়ির লোকের উপর চরম ঘেন্না লাগল সুদর্শনের। মুখ দিয়ে বেরিয়ে এল কত না অশ্রাব্য গালিগালাজ।.

রাগে গুলি করে মারতে চেয়েছিল নিজের বাড়ির  লোকেদের। ইব্রাহিম ও কাবেরী কোনোমতে শান্ত করল সুদর্শনকে। সব দেখেশুনে কাবেরী সুদর্শনকে ওর বর্তমান ঠিকানায় আসতে বলল।

                       সুদর্শন সৌম্য, অর্পন আর কাবেরীর শয্যাশায়ী শাশুড়ির জন্যে প্রচুর জিনিস নিয়ে এল। অর্পন ভেতরে অস্বস্তি হলেও মুখে কিছু বলল না। বড় টানাপোড়েন এ পড়ে গেল কাবেরী। একদিকে স্বামী সংসার, অন্যদিকে যা চেয়েছিল, তা না পাওয়ার তীব্র যন্ত্রণা। শুধু কাবেরীকে দেখার, কথা বলার জন্য,  যে হোটেলে কাবেরী কাজ করত , সেখানে এসে থাকতে লাগল টাকার কুমীর, সুদর্শন। শুরু হল জীবনের দ্বিতীয় অধ্যায়।

            স্ত্রীর চালচলন ঠিক মেনে নিতে পারছিল না অর্পন কিন্তু সৌম্যর মুখ চেয়ে কিছু বলতেও পারছিল না। মানসিক চাপ ডেকে আনল রোগ। একদিন সকাল দশটা নাগাদ হোটেলে সবজি পৌঁছে দেওয়ার সময়ে রাস্তায় স্ট্রোক হয়ে গেল অর্পনের। স্থানীয় ডাক্তার অর্পনকে কোলকাতার কোনো হাসপাতালে ভর্তি করাতে পরামর্শ দিল। স্বেচ্ছায় সব দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিল সুদর্শন।

ই.এম.বাইপাসে ‘আরোগ্য’ এর মতো সুপার স্পেশিয়্যালিটি প্রাইভেট হসপিটালে চিকিৎসা করাল সুদর্শন। কিন্তু, দুর্ভাগ্য, পক্ষাঘাত গ্রস্ত হয়ে শয্যাশায়ী হয়ে গেল অর্পন। সব দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিল সুদর্শন। সৌম্যকে ভর্তি করালো নামী বেসরকারি ইস্কুলে।

স্কুলের বাসে যাওয়া আসা করত সৌম্য। আঙ্কেল খুব প্রিয় হয়ে উঠল সৌম্যরও। বাস্তব বুদ্ধি সম্পন্ন সুদর্শন ওখানকার ক্লাবের পুজোয়, টুর্নামেন্টে মোটা টাকা স্পনসর করল; সঙ্গে কেষ্টবিষ্টুদের তুষ্ট করল; বিসর্জনের দিন বিনিপয়সায় দেদার ‘কালো কুত্তা’ পান করালো। সুদর্শন ঐ এলাকায় প্রভাব বিস্তার করে ফেলল। আড়ালে যাই বলুক, সামনে সুদর্শনকে, কাবেরী বা তার পরিবারের সদস্যদের প্রতি উষ্মা প্রকাশ করতে সাহস হারাল।

                           ধীরে ধীরে ভোল বদলাতে লাগলো মুখুজ্জে বাড়ির। পক্ষাঘাত গ্রস্ত অর্পন শেষ নিঃশ্বাস না পরা পর্যন্ত অসহায়ভাবে মৃত্যুর অপেক্ষা করতে লাগল। আর কাবেরী? কোনো কারণ না থাকা সত্ত্বেও, শুধুমাত্র হা ঘরের মেয়ে  হওয়ার জন্য,ভিটেমাটি ছাড়তে হল, ভালোলাগার,

ভালোবাসার মানুষকে ছেড়ে, শুধু মেয়ে বলে অবলম্বন হিসেবে অর্পনকে স্বামী হিসেবে গ্রহণ করতে হল, মন না দিয়েও শরীর দিতে হল, মেনে নিতে হল বৈবাহিক ধর্ষণ, সেই কাবেরী আর নিজেকে আটকে রাখতে পারল না, সমর্পণ করল সুদর্শন এর ভালোবাসার কাছে। যে চাইলেই শরীর ভোগ করে ক্লান্ত হতে পারত, সংসার সাজাতে পারত, হতে পারত বাড়ির বাধ্যের ছেলে। তা না করে শুধু কাবেরীর স্মৃতিকে আঁকড়ে ধরে আইবুড়ো থেকে গেল।

                        পরকীয়া কি না? কাবেরী সুদর্শনের কেপ্ট কি না , তার উত্তর নীতিবাগীশরা   দিতে পারবেন। কিন্তু, ভালোবাসা হার মানল ন্যায়নীতির কাছে। সুদর্শন এর হাত ধরে তৈরি হল মুখার্জি ম্যানসন্ – কাবেরীর নিজের বাড়ি।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *