সমান্তরাল – শম্পা সাহা

” হার জ্বালানি বজ্জাত ছেলে সারাদিন জ্বালিয়ে মারবে, না পড়াশুনো ,না কোনো ভালো কাজ? আবার হাত ঝাড়ছিস! স্থির হ! একদম নড়বি না! ” দ্বিজেনের ছোট ছেলে মানিক ,পাঁজির পা ঝাড়া !এরকম বজ্জাত ছেলে তল্লাটে নেই !সেই ছোট্টবেলা থেকেই  খুব দুরন্ত। ঠাকুমা বেঁচে থাকতে বলতো, “পিছনে হনুমানের হাড় লাগানো আছে !” সে আজকে রানুর মায়ের মাটির উনুন  লাথি মেরে ভেঙে দিয়েছে ,রানুর মায়ের কথা অনুযায়ী । তাই  দ্বিজেন হাতের কাছে একটা কঞ্চি পেয়ে ওটা দিয়েই সপাং সপাং বসিয়েছে মানিকের পিঠে।মালতি ,মানিকের মা উঠোনে দাঁড়িয়ে দড়িতে জামাকাপড় মেলে ঐ কঞ্চি দিয়েই। মানিক উরি বাবা !উরি মা !করে তিড়িংবিড়িং করে লাফাচ্ছে।মারা বন্ধ করার পরও এত জ্বলছে যে কিছুতেই স্থির থাকতে পারছে না । প্রতিটা কঞ্চির বাড়ি দাগরা হয়ে ফুলে চিড়বিড় করছে, কিন্তু হাত ঘষতে গেলে নড়তে হচ্ছে আর সেই নড়াচড়া দেখে দ্বিজেনের মাথা গরম হয়ে যাচ্ছে । এত অভদ্র ছেলে ,একটুও ভয় নেই ,না চোখের এক ফোঁটা জল বেরিয়েছে, না স্থির হয়েছে! শুধু লাফিয়ে গেছে! দ্বিজেন সহ্য করতে পারে না এই বেয়াদপি! মানিকের কিছু করার নেই ,বারির জায়গা গুলো এত জ্বলছে যে বেচারা কিছুতেই স্থির থাকতে পারছে না। মালতি বাঁচাতে আসতে চেয়েছিল ,তাই  দ্বিজেনের একটা বারি মালতির হাতেও পড়েছে, ফুলে লাল হয়ে আছে। 

    মালতী শুধু কেঁদেই চলেছে আর ভাবছে ওর একটা বারিতে যদি এত জ্বলে তাহলে মানিকের খোলা পিঠে এতগুলো মার ,না জানি কত কষ্ট হচ্ছে ! মানিক সবে পুকুর থেকে স্নান সেরে একটা হাফ প্যান্ট পরে খালি গায়ে , পিঁড়ে পেতে খেতে বসে ছিল। এই সময় দ্বিজেন মাঠ থেকে ফেরে। সেই কোন সকালে দুটো পান্তা খেয়ে বেরিয়েছে, পেটের মধ্যে আগুন জ্বলছে । এই জ্যৈষ্ঠের গরমে সব খাঁ খাঁ করছে আর ফাঁকা মাঠে একটুও ছায়া নেই ,তার মধ্যে মাঠে খেটে ঘেমে নেয়ে বাড়ি ফেরার পথে, পেটে যেন আগুন জ্বলে ।তার ওপর যদি এসব কথা শোনে তাহলে কার মাথা ঠান্ডা থাকে? তাছাড়া ছেলেপেলে লাঠির ডগায় রাখতে হয়, না হলে মাথায় উঠে বসে। 

   ছোট থেকেই মানিক এই রকম যাকে বলে অতিরিক্ত দস্যি !ওকে এক জায়গায় বেঁধে রাখলে চিল চিৎকার, খুলে দিলে হামা দিয়ে সারা বাড়ি চড়ে বেড়াবে । একবার তো গরম তাওয়ায় হাত দিয়ে দিয়েছিল।সেবার সারা হাত জুড়ে ফোসকা ! কতো মার, কত বকা খেয়েছে ওর দুষ্টুমি আর চঞ্চলতার জন্য । প্রায় রোজই দাঁড়িয়ে থাকে কান ধরে, ক্লাসে স্থির হয়ে না বসার জন্য। কখনো কখনো বা বাইরে বার করে দেয় মাস্টার মশাই ক্লাসে কথা বলার জন্য। সবার কাছে মানিক ভীষণ ভীষণ দুষ্টু যাকে বলে একেবারে বদ । পড়াশোনায় তো বিন্দুমাত্র মন নেই, পড়া তো শোনেই না ,গল্প করে পাশের ছেলেদের সঙ্গে। আগে যখন প্রাইমারিতে পড়তো তখন ও ক্লাস থেকে বেরিয়ে আদারে বাদারে ঘুরে বেড়াতো রোজই, প্রায়ই বই-খাতা হারিয়ে আসত । তখনই দ্বিজেন ওর পড়াশোনা বন্ধ করে দিতে চেয়েছিল কিন্তু মালতি বাধা দেয় ,”ছোট ছেলে দাদারা দিদিরা পড়াশোনা করছে আর ও ছেড়ে দেবে? ” সরকারি খরচে পড়াশোনা তাই সেবার বাঁচোয়া।

   ওর বাকি ভাই বোনেরা কিন্তু এমন নয় , ওর ওপরে আরো দুই দাদা আছে তারা পড়াশোনাতে ভালো নয় তবে এমন দুষ্টু নয় ,আর পাঁচজনের মতো ,আর দুই দিদি। তারা অবশ্য বেশ শান্ত শিষ্ট, কিন্তু মাথা ওদের মধ্যে মানিকের ই সবথেকে পরিষ্কার । যা শোনে একেবারে মনে রাখে, যা দেখে হুবহু করে দিতে পারে, কিন্তু মনোযোগ দিতে পারে না একেবারেই । মার খেয়ে খেয়ে  একেবারে থ্যাঁতলা, ওর কপালে শুধু জোটে লাথি-ঝাঁটা আর দুষ্টু ছেলের তকমা । আজকাল মানিক আর কাউকে  বলে না সত্যিটা যে, ও যা করে তা ও করতে চায়না,  অভ্যাসের বশে করে ফেলে। আসলে কেন যে ও সবার মতো শান্ত মনোযোগী হতে পারে না কে জানে? মাঝে মাঝে মানিকের নিজের উপর ভীষণ ভীষণ রাগ হয়। 

   রাতে মালতি ছেলের পাশে শুয়ে ওর খোলা পিঠে হাত বুলিয়ে দেয়, ছেলেটা ঘুমের ঘোরে কঁকিয়ে ওঠে ব্যথায়। মালতি ফুঁপিয়ে কাঁদে, “ভগবান কেন যে ছেলেটা এত দুষ্টু ,একটা কথা শোনে না! ওকে তুমি আর সবার মত করে দাও ,একটু সুবুদ্ধি দাও তোমার দুটি পায়ে পড়ি”,ঈশ্বরের উদ্দেশ্যে কপালে হাত ছোঁয়ায় মালতি।    

    রোহন চ্যাটার্জী বিখ্যাত ইঞ্জিনিয়ার রনজিৎ চ্যাটার্জির একমাত্র ছেলে, স্ত্রী ঐন্দ্রিলা হাইস্কুলের ইংরেজি শিক্ষিকা। রোহন খুব ছোট থেকেই ভয়ঙ্কর দুষ্টু ,কারো কথা শোনেনা ,চোখ বড় বড় করে ভয় দেখালে খিলখিল করে হাসে, কোলে তুললে  চুল টেনে ,কান কামড়ে, মুখে খিঁমচে একসা করে তুলতো । যত বড় হতে লাগল তত বাড়তে লাগল দুষ্টুমি । জিনিসপত্র ভাঙচুর, কক্ষনো এক জায়গায় থাকে না, বেবি কটে বসিয়ে দিলেই বিছানা-বালিশ সব ওখান থেকে ছুঁড়ে ছুঁড়ে মাটিতে ফেলতো, রাগে টয়লেট করে দিত ।একটু বড় হলে স্কুলে দেওয়া হলো, সেখানে একই গল্প ! না ক্লাসে বসে, না কোন কথা শোনে! এটা ফেলে দেয় ওটা ভেঙে দেয়,কারো পেন্সিল ভাঙে , কারো চুল ধরে টানে। এক দিন তো ক্লাসটিচার মিসেস আগরওয়ালার গায়ে দোতলা থেকে জল ঢেলে দিয়েছিল । বইখাতা প্রায় দিনই হারিয়ে আসে,  কোন কাজই ঠিকঠাক করতে পারে না, সবটাতেই তাড়াহুড়ো, সবেতেই দুষ্টুমি !

   বাড়িতে ঐন্দ্রিলাই ওকে পড়ায়, সে এক তপস্যা।গল্প বলে, ছবি এঁকে ,যতই চেষ্টা করা হোক মিনিট  পাঁচ খুব বেশি হলে মিনিট দশ, তারপরেই হয় খেলা, নয় হাত পা নাড়ছে, বা পেন্সিল  চিবোচ্ছে বা অন্যকিছু । শুধু যখন টিভিতে কার্টুন দেখে বা মোবাইলে গেম খেলে তখনই রোহন এক জায়গায়, বাকি সময় চর্কি পাক দিয়েই চলেছে । কারো বাড়িতে ওকে নিয়ে যাওয়ার ও উপায় নেই! কারো বাড়ি গেলে সাধারণত ড্রইং রুমে বসতে দেয় আর সেখানে সোকেশে রাখা যাবতীয় জিনিসপত্র মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই ও নামিয়ে আনে মাটিতে । মুখে কিছু না বললেও বেশ বোঝা যায় যাদের বাড়ি বেড়াতে গেছেন তারা বিরক্ত হচ্ছে। 

    একদিন স্কুলে গার্জিয়ান কল, বাবা-মা দু’জনকেই ডেকেছে । সেদিন রনজিৎ চাটার্জী অফিস গেলেন না, ঐন্দ্রিলা কেও ছুটি নিতে হলো, কি আর করা ?প্রিন্সিপাল মিসেস শর্মা বললেন ,”ম্যাডাম রোহনকে আপনারা একজন চাইল্ড সাইক্রিয়াটিস্ট দেখান। ওর মনে হয় কোন সমস্যা আছে !ও বোধহয় চোখে ভালো  দেখতেও পায় না, বোর্ডের দিকে তাকাতে বললে  চোখ কুঁচকে তাকায় ,তাই একজন আই স্পেশালিস্ট ও দেখিয়ে নেবেন । ” কথা শুনে দুজনেই ভীষণ চিন্তিত ,সেদিনই খোঁজ খবর নিয়ে যোগাযোগ করলেন কলকাতার নামকরা চাইল্ড স্পেশালিস্ট ডক্টর গার্গী স্যানালের সঙ্গে । অ্যাপয়েন্টমেন্ট পাওয়া গেলে দিন তিনেক পরের।

    নির্দিষ্ট দিনে দুজন রোহনকে দিয়ে যথাসময়ে হাজির ডক্টরস চেম্বার এ। ডাক্তারবাবু সবকিছু শুনে কয়েকটা টেস্ট করাতে বলেন এবং কিছু ওষুধ দিলেন টেস্টের রিপোর্ট আসার সাতদিন পর্যন্ত।  সব দেখে ডঃ সান্যাল কনফার্ম করলেন , ” রোহন এ ডি এইচ ডির শিকার ,অ্যাটেনশন ডেফিসিট হাইপার অ্যাক্টিভিটি ডিস অর্ডার।একটা হরমোন  ঠিকঠাক তৈরি হয় না তাছাড়া আরো অনেক জটিল কারণ থাকে তাই ,ও পরিবেশ অনুযায়ী কাজ করতে পারে না , এটা কিছুটা বংশগত। ইতিমধ্যে ওনারা রোহনের চোখ ও দেখিয়েছেন শহরের নামকরা আই স্পেশালিস্টের কাছে। স্কুলের প্রিন্সিপাল যা সন্দেহ করেছেন, তাই। চোখের সমস্যাও ধরা পড়েছে। হাই পাওয়ারের চশমা দিয়েছেন, দু চার দিনের মধ্যেই পাওয়া যাবে। ডাক্তার বাবু এও বলেন যারা এই সমস্যায় ভোগেন তাদের চোখের ও সমস্যা থাকে । এই সমস্যাগুলি মোটামুটি এক সাথেই হয়। বাবা-মা সাধারনতঃ ভাবেন ছেলেমেয়েরা দুষ্টুমি করছে, আসলে ওরা সমস্যায় ভুগছে ,ওরা জটিলতার শিকার । ওরা দুষ্টু বা বদমাইশ নয়, ওরা অসুস্থ । 

    চ্যাটার্জী দম্পতি রোহনের নিয়মিত চিকিৎসা শুরু করালেন এবং তার সঙ্গে সঙ্গে কাউন্সেলিং । ডাক্তার সান্যাল বলেছেন টানা ওষুধ খাওয়াতে হবে তার সঙ্গে কাউন্সেলিং । একদিন রোহন ও সবার মতোই স্বাভাবিক, শান্ত, মনোযোগী হয়ে উঠবে। ধীরে ধীরে যত দিন যেতে লাগল রোহনের দুষ্টুমি কমতে লাগল ,পড়াশোনায় মনযোগী হয়ে উঠল। আগে রাতে ঘুমোতেই চাইতো না কিছুতে, তার জন্য চ্যাটার্জী দম্পতিকে কম কষ্ট সহ্য করতে হয়নি ,ও এখনো রাতে ঘুমায় না কিন্তু সারারাত, যতক্ষণ না ঘুম আসে পড়াশোনা করে ।  ধীরে ধীরে রেজাল্টও ভাল হতে থাকে । এখন রোহন ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজে ডাক্তারি পড়ে। চ্যাটার্জী দম্পতি চির কৃতজ্ঞ স্কুলের প্রিন্সিপাল মিসেস শর্মার কাছে। উনি না  বললে হয়তো রোহনও হারিয়ে যেত অন্যসব  সাধারন বাচ্চাদের ভিড়ে,চ্যাটার্জি দম্পতি তো এসব বুঝতেই পারেননি। 

    মানিক কবেই পড়াশোনা  ছেড়ে দিয়েছে ,ছেড়ে দিয়েছে বলার চেয়ে বলা ভালো ওকে স্কুল থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে ।  খেলা করতে করতে এক সহপাঠীকে  মেরে মাথা ফাটিয়ে দেওয়ার জন্য ওকে স্কুল থেকে টি সি দেওয়া হয়। যদিও মালতি বারবার হেড স্যার কে অনুরোধ করেছিল কিন্তু মানিকের বিরুদ্ধে অভিযোগের লিস্ট এত লম্বা যে হেডমাস্টার মশাই আর সহানুভূতি দেখাননি। মানিক এখন ওর বাবার সঙ্গে মাঠে মুনিশ খাটে, বিড়ি খায় ,মাঝে মাঝে নেশাও করে। ও কিংবা ওর বাড়ির লোক কেউ জানেনা যে মানিক আসলে বদমাইশ নয় ও আসলে এক হরমোন ঘটিত রোগের শিকার যার নাম এ ডি এইচ ডি। এখন ও পাড়ার সবচেয়ে  বখাটে ছেলে ,বাজে ,বদমাইশ! 

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top