সাঁইথিয়া বন্যায় : সুদীপ ঘোষাল

দিদির জন্ম ও বেড়ে ওঠা গ্রামের এক কৃষিজীবী পরিবারে। ওনারা তিন বোন। উনি মেজ। কোনও ভাই নেই। ওনার জ্ঞান হবার আগেই উনি পিতৃহারা হন। সে সময়ে সেখানে ছবি তোলার কোনও ব‍্যবস্থা না থাকায় উনি নিজের পিতাকে ছবিতেও দেখেননি।

উনি মূলত বড় হয়ে উঠেছেন জ‍্যাঠার কাছে। জীবনে কষ্টের কাছে নতিস্বীকার করেন নি দিদি। পড়াশুনো করেছেন আপন চেষ্টায়। উইল ফোর্স একটা মানুষকে কত উঁচুতে ওঠাতে পারে তার প্রকৃষ্ট প্রমাণ দিদি নিজেই। 

হৈমন্তী দি শ্রাবণ মাসে গিয়েছিলেন সাঁইথিয়া। বীরভূম জেলায় অবস্থিত এই শহরে একান্ন সতীপীঠের এক পীঠ কেশেশ্বরি মহাপীঠ অবস্থিত। এখানে মায়ের কেশ পতিত হয়েছিল বলে এই নাম।

এমনিতেই হৈমন্তিদিদির ছোটবেলা কেটেছিল পাহাড়ি উপত‍্যকার এক গ্রামে। ঐ গ্রামের নাম – ‘খোয়ারডাঙ্গা’। জায়গাটির অবস্থান অদ্ভুত। একেবারে ভারত ও ভূটানের সীমান্তে দুটি দেশেই অবস্থিত। আবার ভারতীয় অংশটিও দুটি রাজ‍্যের সীমান্তে অবস্থিত। অসম ও পশ্চিমবঙ্গ। ওখানে আজও দিদির পারিবারিক একটি খামারবাড়ি রয়েছে। সেখানকার পশ্চিমবঙ্গের অংশটি বর্তমান আলিপুরদুয়ার জেলায় অবস্থিত। আগে তা অবিভক্ত জলপাইগুড়ি জেলায় ছিল। তাই তিনি সুযোগ পেলেই বেড়িয়ে আসেন গ্রাম গ্রামান্তরে।

দিদি এই সতীপীঠের পাশেই একটা লজে ঘর ভাড়া নিয়ে থাকলেন তোতনকে নিয়ে। তোতন হোটেল থেকে খাবার দাবার নিয়ে আসতো আর দুজনে খেত। হৈমন্তী দিয়ে এখানে এসেছেন তার উদ্দেশ্য একটাই বিজ্ঞানের প্রসার ঘটানো। তিনি এখানে একটা ক্লাস করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

তিনি ফাঁকা জায়গাতে ক্লাস নিতে পছন্দ করেন। সাধারণ লোকেদের মধ্যে বিজ্ঞান বিষয়ক জ্ঞান বিতরণ করার চেষ্টা করেন। সতীপীঠের এক বটগাছ আছে। সেই পুরনো বট গাছের নিচে অনেকটা জায়গা সেই জায়গা জুড়ে অনেক লোকে বসে আছে।তারা খাওয়া-দাওয়া করছে তারা বিশ্রামও নিচ্ছে।

সেখানে গিয়ে বসে তাদের উদ্দেশ্যে একটা কথা দিদি বললেন, যে আমি এখানে বিজ্ঞান সম্বন্ধে কিছু কথা বলতে চাই। আপনারা কি শুনতে রাজি আছেন?
সকলেই হাত তুলে বলল, রাজি আছি। 

এবার তাহলে ক্লাস শুরু করি।হৈমন্তী বললেন, ঈশ্বরে বিশ্বাস ভালো। কিন্তু সবকিছু বিজ্ঞানের যুক্তিতে মেনে নিতে হয় আর কারোর ভক্তি-শ্রদ্ধায় আমি আঘাত দিতে পারি না এটা আমার অন্তরে ও আছে। কিন্তু বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে সব কিছু যুক্তি দিয়ে মেনে নিলে আমাদের কিন্তু বুঝতে সুবিধা হয় বেশি।

হৈমন্তী দিয়ে বললেন,  আমি দেখছিলাম আপনারা খাচ্ছিলেন কেউ চানাচুর কেউ বা  মোমো। কিন্তু আপনারা স্বল্পমূল্যে ফল খেতে পারেন। যেমন কলা খেতে পারেন।কলা আমাদের একদম দেশের ফল।আমাদের বেদ-পুরাণে এই ফলের উল্লেখ আছে। কলা শিশুদের পক্ষে খুব ভালো। ভাল করেই জানে আমাদের দেশে অনেকেই।

পুষ্টিবিজ্ঞানী ডাক্তার খাদ্যবিজ্ঞান বিজ্ঞানী সবাই এক বাক্যে বলেন একটি অত্যন্ত পুষ্টিকর স্বাস্থ্যকর ফল কলা। কেননা এতে ভিটামিন শর্করার পরিমাণ আছে তাহলে আপনারা কলাটা স্বল্প মূল্যে কিনে খেতে পারেন।।কিন্তু চানাচুর খেলে গ্যাস হবে।রোগ এসে গেছে অজানা অনেক। আপনাদের অসুবিধা হবে। এমনকি বুক ব্যথা হতে পারে হার্ট এটাক পর্যন্ত হতে পারে।
একজন লোক বলল আপনি বলুন না কলায় কি কি গুন আছে? আমরা জানতে চাই জানলে আমাদের উপকার হয়।

হৈমন্তী দিয়ে বললেন 100 গ্রাম কলা থেকে 400 কিলো শক্তি পাওয়া যায় যা প্রায় অন্যান্য ফলের থেকে বেশি দু’গ্রাম ডায়েটারি ফাইবার পাওয়া যায়। যা প্রতি 100 গ্রাম কলায় থাকে আর এই ফাইবার ধমনীতে কোলস্টেরল কমায় ও মানসিক দারিদ্র কমাতে সাহায্য করে।

একটি কলা দশ গ্রাম থেকে প্রায় 250 গ্রাম পর্যন্ত হতে পারে এবং সারা বছর আমাদের দেশে বিভিন্ন প্রান্তে পাওয়া যায়। বিভিন্ন রঙের বিভিন্ন ধরনের প্রজাতি করার ফলে মানুষ তার পছন্দমতো কলা নিতে পারে। সবচেয়ে বেশি প্রোটিন আছে অন্যান্য সমস্ত ফলের চেয়ে এবং প্রোটিনের পরিমাণ 350 থেকে 500 মিলিগ্রামের মতো।  ভিটামিন সবচেয়ে বেশি এই ফলে। সবচেয়ে বেশি ফসল ফলায় অনেক গুণ।

আর একজন মহিলা উঠে বললেন কি কি রোগ ভাল হয় কলা খেলে।
হৈমন্তী দি আবার বলতে  শুরু করলেন পেটের ভিতরে উপকারী জীবাণু পরিমাণ বাড়ায়। সেইসঙ্গে অপকারী জীবাণু জীবনে কমিয়ে দেয় ওই জন্য পেটের গন্ডগোল কমে যায়।উচ্চ জাতীয়  রক্তচাপ ডায়াবেটিস কমায়। সর্দি কাশি কোষ্ঠকাঠিন্য এবং তার ফলে শরীরের চাহিদা গুলো মিটবে। তাই আপনারা থেকে কল অবশ্যই খাবেন।

তোতোন আজ খুব খুশি দিদি কথাগুলো শুনে এসে অনেক কিছু শিখতে পেরেছে। আজকের লজে খেতে খেতে সে দিদি কে বলল দিদি আপনি এত কিছু কি করে জানেন। হৈমন্তী দি বললেন এর জন্য পড়াশোনা করতে হয় সব সময় বই পড়তে হয়। তুমিও জেনে যাবে তুমিও শেখো তুমিও আস্তে আস্তে অনেক কিছুই জেনে গেছ।

কিছুদিন থাকার পর শ্রাবণ মাসে বৃষ্টি প্রচন্ড বৃষ্টির ফলে ময়ূরাক্ষী নদীর জল বেড়ে গেল এবং বন্যা দেখা দিল বিশাল বন্যা। হৈমন্তীরা উঠে গেছেন সেখানে দোতলার ঘরে।সেখান থেকে দেখছেন জল থৈ থৈ চারিদিকে কোন খাবার নেই দোকান নেই যাদের সঞ্চিত খাবার আছে। সেই খাবার খেয়ে কোন রকমে বেঁচে আছে।

কিছুদিন পর বন্যা কমে গেল। বন্যা কমে গেলে ভয়াবহ হয়ে যায় পরিস্থিতি। আমার সাথে কে যাবে কলেরা নানান রকম জ্বরে সাহায্য করতে।
তোতন বলল, আমি যাব। আরও দুজন আছে।
 হৈমন্তীর নিজের সঞ্চিত অর্থ দিয়ে ওষুধ কিনে সেগুলো বিলি করলেন বন্যার্তদের মধ্যে।
 তাদের খাবার খাবার হাহাকার পড়ে গেছে।


তিনি দেখলেন অনেক পেঁপে গাছ পড়ে আছে ঝড়ের দাপটে।সেই পেঁপে গাছের পেঁপে গুলো নিয়ে বললেন তোতনকে, সব নিয়ে বস্তা মধ্যে ভরে রাখতে এবং সেগুলো বিতরণ করার জন্য পেঁপের অনেক গুণ।তোতন বলল,ছোট বড় দেখে কি হবে? পেঁপে খেলে কি শরীরের চাহিদা মিটবে?
 হৈমন্তী বললেন তোকে আমি পেঁপের গুনাগুন সম্বন্ধে পরে বুঝিয়ে বলব।


একটা গ্রামে গিয়ে পেঁপে বিতরণ করতে গিয়ে তিনি অনেকের কাছে শুনলেন পেঁপে খেয়ে কি হবে? তিনি বলেন ভাতের সঙ্গে পেঁপের তরকারি  খাবেন তা আপনাদের পেটও ভোরবে উপকার হবে।অনেকে সবাই জানতে চাইল, বলুন আমরা এখানে আপনার সামনে বসছি। পেপের উপকার সম্বন্ধে কিছু বলুন। আমরা জানতে চাই। জানতে আমাদের ভালো লাগে।


 শুরু করলেন দিদি তাঁর ক্লাস,  পেঁপের বৈজ্ঞানিক নাম ক্যারিকা পেপেয়া লিনকের। খাদ্যমূল্য মূল্যায়নে দেখা যায় একটি পুষ্টিকর ফল আমাদের প্রতিদিনের প্রয়োজনীয় প্রোটিন কার্বোহাইড্রেট খাদ্যপ্রাণ বা ভিটামিন এ পাওয়া যায়। ভিটামিন সি পাকা পেঁপেতে বেশি থাকে। কাঁচা পেঁপেতে প্রচুর পরিমাণে পেক্টিন থাকে। ফলে বিশ্লেষণে দেখা যায় শরীরের প্রয়োজনীয় সবই আছে পেঁপের মধ্যে। 


হৈমন্তী দি আর তোতন চলে এলো লজে। লজে তারা খাওয়া-দাওয়া করলো।খাওয়া-দাওয়ার পরে দিদি বলেন, বহু শতাব্দী ধরে পেঁপে ভেষজ গুণসমৃদ্ধ পেঁপে কেবল সহজপাঠ জন্য অন্যান্য খাদ্য হজমে সাহায্য করে পাকা পেঁপে। সকলের জন্য খুবই ছোট বাচ্চা গর্ভবতী মহিলা স্তন্যদানকারী মায়েদের এবং রোগীদের পক্ষে কাজ করে সাহায্য করে। তখন আমরা খেতে চাই না। অথচ পেঁপে  সহজলভ্য। পেঁপে সকলের খাওয়া উচিত। তোতন বললেনদিদিকে,  দেখবেন এবার থেকে ওরা হয়তো কলা পেঁপে খাবে।
 এই ভাবে বুঝিয়ে থাকেন এটাই দিদির  ক্লাস… 


সুদীপ ঘোষাল নন্দন পাড়া খাজুরদিহি কাটোয়া কুড়ি নম্বর ওয়ার্ড পূর্ব বর্ধমান 713150 

Published by Story And Article

Word Finder

Leave a Reply

%d bloggers like this: