সিঙ্গেল পেরেন্ট // শ্যামল কুমার রায়,

12312

.

.

প্রথম   অধ্যায়

      আজ বছর ছয়েক হল যশোর রোডের লাগোয়া ‘ চিন্তামণি ধাম ‘  অ্যাপার্টমেন্টে প্রদ্যুম্ন ও শাশ্বতী থাকে । প্রদ্যুম্ন পেশায় ঠিকাদার । গ্রামে যেমন সোনার ধান চাষ হয় , ঠিক তেমনই বৃহত্তর কোলকাতাতে ফ্ল্যাট এর চাষ হয়। পেশাগত কারণেই , প্রদ্যুম্ন কোলকাতার সব বড় সিন্ডিকেটের সঙ্গে ওতপ্রোত ভাবে জড়িয়ে ।

.

.

সরকারি দপ্তরের বিশেষ বিশেষ আধিকারিক তো প্রদ্যুম্ন যশ বলতে অজ্ঞান । আসলে প্রদ্যুম্ন যে কোনো আধিকারিক এর সঙ্গে সম্পর্কটা অফিসের গণ্ডি পেরিয়ে ব্যক্তিগত স্তরে নিয়ে যায়। তার অর্থ এই নয় যে প্রদ্যুম্ন স্ত্রী, শাশ্বতীকে ‘হানি ট্রাপ ‘ হিসেবে ব্যবহার করে টেন্ডার হস্তগত করে । প্রদ্যুম্ন আসলে মানুষ হিসেবে মানুষের পাশে দাঁড়ায় । আর কাটমানি? ওটা তো সিন্ডিকেটের বৈঠকে ঠিক হয়ে যায় । সিন্ডিকেটের গোলকধাঁধা বোঝা সাধারণের কম্ম নয়।

.

.

    শাশ্বতীর কিছু সমস্যা থাকায় , সন্তান ধারণে সমস্যা হচ্ছিল । কিন্তু, প্রদ্যুম্নর মায়ের আর তর সই ছিল না । বাঁজা মেয়েমানুষ! বংশ রক্ষা করতে পারবে না । প্রথম দিকে শাশ্বতী শাশুড়ির এই অযাচিত আক্রমণে খানিকটা গুটিয়ে থাকত ; আর মনে মনে নিজেকে খুব অপরাধী ভাবত। কিন্তু, প্রদ্যুম্ন তো কোনও কটু কথা বলেনি ।

.

.

             বরঞ্চ, পূর্ত দফতরের আধিকারিক মাননীয়া রাজন্যা রাজবংশী একদিন প্রদ্যুম্ন কে জিজ্ঞেস করলেন, ” ভাই , প্রদ্যুম্ন! আমার ভাইপো না ভাইঝি ? পাছে দিদি বাড়ি যায় , তাই একদিনও তো মুখ ফুটে বললেও না।” প্রদ্যুম্ন মুখ নীচু করে বলল – ” ইস্যু নেই , ম্যাডাম । ” হোয়াই ? অ্যাপ্রক্সিমেটলি , ইউ ম্যারেড ইন্ ১৯৯৮ । ইয়েস, ম্যাম । ইজ্ দিজ্ অ্যা পয়েন্ট অব্ ডিসপিউট্ বিটূইন ইউ এন্ড ইয়োর ওয়াইফ? আসলে, মা অধৈর্য হয়ে পড়েছে । ‘ জেনারেশন্  গ্যাপ, প্রদ্যুম্ন! জেনারেশন গ্যাপ! ‘ বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, ভাই । কলকাতার বাইপাসের যে কোনো সুপার স্পেশিয়্যালিটি হাসপাতালে ফার্টিলিটি সেন্টারে দেখাও ; ভালো কাজই হবে , আশা করি ।

.

.

                     রাজন্যা ম্যাডামের কথা মত এক সুপার স্পেশিয়্যালিটি হাসপাতালে সমস্ত রকম পরীক্ষা নিরীক্ষা করে জানা গেল যে শাশ্বতী বেবি ক্যারি করতে পারবে না । সি নিডস্ এ স্যারোগেট মাদার। এ যেন ধৃতরাষ্ট্র, গান্ধারীর শত পুত্রের জন্ম দেওয়ার মতো ব্যাপার হয়ে গেল। শুরু হয়ে গেল গরু খোঁজা করে খোঁজা । স্যারোগেট মাদার পাওয়া গেলেও কোনো না কোনো কারণে শেষমেশ বাতিল হয়ে যাচ্ছিল।

.

.

                রাতে ফ্ল্যাটের তারকাখচিত সিলিং এর দিকে চেয়ে চেয়ে আকাশ কুসুম ভাবতে লাগল প্রদ্যুম্ন । হঠাৎই কোথা থেকে রোহিণীর মুখ ভেসে উঠল। রোহিণী আচার্য । প্রদ্যুম্নর ফার্স্ট ফ্যান্টাসি । কিন্তু, প্রদ্যুম্ন প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আগেই রোহিণী পাত্রস্থ হয়েছিল । কিন্তু, ভাগ্যের কি নিষ্ঠুর পরিহাস! রোহিণীর স্বামী পেশায় মেডিক্যাল রিপ্রেজেন্টটেটিভ্ । সেদিন ছিল শনিবার । হিরণ্ মার্কেট এ বের হয়েছিল বাইকে চড়ে । কিন্তু, এক ভয়াবহ দুর্ঘটনা স্তব্ধ করে দিয়েছিল ওদের দাম্পত্যের সব সুখ । অপশন দুটো – হয় মৃত্যু অথবা স্থায়ী পঙ্গুত্ব । শুধু চোখের দেখা দেখতে পাবে – এটুকুই!

.

.

                        কিন্তু, নিয়তি? আগে থাকতেই সব গেম সেট করে রাখে । প্রাইভেট কোম্পানির জব। রোহিণী সে অর্থে সাহায্য পেল না কিছুই। তবে কোম্পানি থেকেই এক প্রাইভেট হসপিটালে স্বল্প বেতনের ট্রেনি হিসেবে একটা জব এর ব্যবস্থা করে দিয়েছিল। রোহিণী শুধুমাত্র ঔরসজাত সন্ততি, চিত্রাঙ্গদার মুখ চেয়ে জব্ অ্যাকসেপ্ট করল। কারণ , ও বাপের বাড়িতে ভাই ভাজের সংসারে বোঝা হতে চায়নি । মনের দুঃখ বুকের ভেতর চেপে রেখে হাড়ভাঙ্গা খাটনি হাসি মুখে মেনে নিয়েছিল রোহিণী। রোহিণী একা মহিলা; খুব সাবধানে থাকে। পাছে কেউ যদি কিছু বলে! সব সময়ই একটা চাপা আতঙ্ক কাজ করে । বেশ  অভ্যস্ত হয়ে গেছিল রোহিণী তার এই অকাল বৈধব্যের জীবনে।

.

.

                         কিন্তু, ডে কেয়ার ইউনিটের সামনে টয়োটা ফরটুনার্ গাড়ি থেকে সস্ত্রীক কে নামল ? কৈশোরের ফার্স্ট লাভ্, প্রদ্যুম্ন নয় তো?ঘোর কাটল, প্রদ্যুম্নর ডাকে। রোহিণী! এখানে? ‘কাজ করি’, গলা নামিয়ে বলল রোহিণী । মিট মাই ওয়াইফ, শাশ্বতী। শাশ্বতী! মাই ব্যাচমেট , রোহিণী। সৌজন্যের পর্ব উত্তরণ ঘটাল সখ্যতায় । গতিমান, জনবহুল শহরের গগনচুম্বী ফ্ল্যাটের বাসিন্দা নিঃসঙ্গ শাশ্বতী সমমনোভাবাপন্ন রোহিণীর খুব কাছের মানুষ হয়ে উঠল। চিত্রাঙ্গদা খুঁজে পেল এক সত্যিকারের মাসীকে। আর শশব্যস্ত ঠিকাদার প্রদ্যুম্নর মধ্যে ‘ কামরূপ দুর্বারিত অনল’ এর কারকতা ছিল না। শাশ্বতী কে নিয়ে দিব্যি খুশি ছিল।

.

.

                      চিত্রাঙ্গদার তিন বছরের জন্মদিন শাশ্বতীর ফ্ল্যাটে ঘরোয়া ভাবে পালন হল। মাসীমণিকে ছেড়ে অবুঝ চিত্রাঙ্গদা মায়ের সাথে বাড়ি ফিরে যাবে না । অথচ , জীবনে ঘা খাওয়া রোহিণী বোঝে সব।

.

.

      দ্বিতীয় অধ্যায় 

.

.

                  শেষমেশ, সন্তানহীনা শাশ্বতীর কাতর অনুরোধের কাছে হার মানতে বাধ্য হল রোহিণী। সেদিন, এক ঘরে চিত্রাঙ্গদাকে মাঝে রেখে শাশ্বতী আর রোহিণী শুলো। চিত্রাঙ্গদার কথা মাথায় রেখে খুব হালকা করে এসি চালিয়ে দিল শাশ্বতী।

.

.

          ধীরে ধীরে একে অপরের জীবন পাতার প্রতি পাতা উল্টালো। রোহিণীর হিরণহারা হওয়া ও বাপের বাড়ির কাছে সম্পূর্ণ অপাক্তেয় হওয়ার  কথা যেমন এল; গর্ভধারণের অক্ষমতা, শাশুড়ির বাক্যবাণ, আজ শাশ্বতীকে এই জনারণ্যে একলা করে দিয়েছে। খুব সরল, সাবলীলভাবে একে অপরের আন্তরিক সই হয়ে উঠল। এখানে প্রদ্যুম্নর মতামতের খুব প্রয়োজন অনুভূত হল না।

.

.

                     পরের বছর রাজারহাটে একটা টাউনশিপ  প্রকল্পে যুক্ত হল প্রদ্যুম্ন। ঐ পশ্ এলাকাতে প্রায় তিন কোটি টাকা দিয়ে নিজের জন্য একটা বিশাল বাংলো কিনল। যশোর রোডের ফ্ল্যাটে যদিও চেনাশোনা ছিল, এখানে তো লালবাতির দাপাদাপি, অডি, বি এম ডব্লিউ র যাওয়া আসা। তবে রোহিণীর খুব কাছে হয়ে গেল শাশ্বতীর নতুন ঠিকানা। চিত্রাঙ্গদার মাসীর কাছে থাকতে পেয়ে বেশ ভালো থাকত। আর রোহিণী সে তো পরম নিশ্চিন্ত। যে কর্পোরেট হাসপাতালে শাশ্বতীর চিকিৎসা চলত, সেই হাসপাতালে একই ডক্টর এর সেক্রেটারি হিসেবে প্রমোশন পেয়েছিল শাশ্বতী।

.

.

দীর্ঘ চিকিৎসার পর ডক্টর যোগমায়া ম্যাম জানালেন যে একটা সময় পর বেবি কে অন্য গর্ভে স্থানান্তরিত করতে হবে; পুরো দু’শ আশি দিন শাশ্বতীর গর্ভে সন্তান প্রতিপালন করা যাবে না। উপায়? বড় অসহায় লাগছিল প্রদ্যুম্ন আর শাশ্বতীকে। শাশ্বতীর অসহায় , করুণ চোখের অব্যক্ত ভাষা রোহিণী হৃদয়ঙ্গম করে শুধু ডাক্তার যোগমায়া ম্যাম কে  বলল, আমি কি এ ব্যাপারে কিছু সাহায্য করতে পারি?

.

.

       “After some medical test, I can confirm that” , ডাক্তার যোগমায়া যাদব ঐ হাসপাতালের কর্মী তথা তাঁর বর্তমান সেক্রেটারি রোহিণী আচার্যকে জানালেন। রোজ একই ধরনের চিকিৎসা, ঘটনা পরম্পরা দেখেও রোহিণী কেমন যেন নার্ভাস হয়ে গেছিল ; এ যেন তার নিজের বোনের চিকিৎসা চলছে। পরের দিন ফের অ্যাপয়নমেন্ট নিল ওরা। অনেক টেস্টের পর ডক্টর যোগমায়া যাদব তাঁর সেক্রেটারি, রোহিণী ও পেশেন্ট শাশ্বতী এবং তাঁর বর প্রদ্যুম্ন কে জানালেন যে সারোগেট মাদার হিসেবে রোহিণী আচার্য কে ব্যবহার করা সম্ভব এবং শাশ্বতী ও প্রদ্যুম্নর ভালোবাসার চিহ্নকে রোহিণীর গর্ভস্থ করা যাবে।

.

.

                      সেদিন চিত্রাঙ্গদা ওর মাসীর বাড়িতে অন্যান্য দিনের মতোই ছিল। ফিরে এসে শাশ্বতী রোহিণী কে জড়িয়ে ধরে  হাউমাউ করে কেঁদে উঠলো। জীবন যুদ্ধে ক্ষতবিক্ষত রোহিণী শাশ্বতীকে জড়িয়ে ধরে বলল, ‘ তুমি না চিত্রাঙ্গদার মাসী; কাজেই তোমাদের সন্তান, আমার বনপো কে আমি আমার জঠরে বাস করতে দেব।’ তুমি সত্যি বলছ, রোহিণী! আমি নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছি না, কান্না ভেজা গলায় বলে উঠল শাশ্বতী।

.

.

                           সত্যি,সত্যি,সত্যি। হল , বিশ্বস? আমি এখনই ওকে ফোন করে বলছি। বেশ! প্রশস্ত হাসি হেসে বলল রোহিণী। ওদিকে ফোনে প্রদ্যুম্ন বলে বসল, রোহিণীকে বলো, ড যোগমায়া ম্যাম এর সাথে কালকে আর্লি মর্নিং এ যেন অ্যাপয়ন্টমেন্ট ফিক্স করে দেয়। ওকে! জানু। রোহিণী কাল যখন ড এর কাছে যাব , তখন চিত্রাঙ্গদাকেও সঙ্গে নিয়ে যাব, আর কাল তো তোর অফ্ ডে, সো নো প্রবলেম ।

.

.

                     শুক্রবার সকালে ঘুম থেকে উঠে শাশ্বতী মা সন্তোষীর ব্রত পালন করে, চিত্রাঙ্গদা কে কোলে নিয়ে সামনের সিটে বসল । কারণ, সোনা মেয়ে গাড়ির ভেতর থেকে চলমান ঘর , বাড়ি, মানুষ সব দেখতে দেখতে যাবে। সেদিন, প্রদ্যুম্নই ড্রাইভ করে নিয়ে গেল। আর রোহিণী গাড়ির মাঝের সিটে বসে আকাশ পাতাল ভাবতে লাগল। ড. যোগমায়া যাদব যথেষ্ট বয়স্ক এবং দূরদৃষ্টি সম্পূর্ণ।

.

.

কাজেই , রোহিণী যে সারোগেট মাদার হিসেবে থাকবে, তা যথাসম্ভব গোপন করে রাখার জন্য ডে কেয়ার ইউনিটের ছ’তলায়,  যেখানে ভি আই পি দের ট্রিটমেন্ট হয় , সেখানেই দেখার ব্যবস্থা করলেন। এবং খুব স্বাভাবিক ভাবেই প্রদ্যুম্ন,শাশ্বতীর নিষিক্ত ভ্রূণ রোহিণীর গর্ভস্থ হল। মা সন্তোষীর ভক্ত শাশ্বতীর সন্তান , রোহিণীর গর্ভ থেকে প্রসূত হল সোমবার।

.

.

রোহিণীর একটা আবদার ছিল শাশ্বতীর কাছে ; ওদের সন্তানের নাম রোহিণী রাখবে। হসপিটালের সুইট্ এ শুয়ে হিরণ কে খুব মিস্ করছিল রোহিণী। প্রদ্যুম্ন আর শাশ্বতীর সামনেই রোহিণী বলে উঠল , “ওর নাম স্যমন্তক রাখলে কেমন হয়? “

.

.

                এখন রাজারহাটের ঐ পশ্ এলাকার বাংলোতেই থাকে শাশ্বতী, রোহিণী, চিত্রাঙ্গদা , স্যমন্তক ও প্রদ্যুম্ন। ধীরে ধীরে দুই ভাই বোন এক সাথে বড় হতে লাগল । চিত্রাঙ্গদা যেহেতু স্যমন্তক এর থেকে বছর তিনেকর বড় , তাই ঠিক সময়েই প্রদ্যুম্ন ওকে এক নামী বেসরকারি প্লে স্কুলে ভর্তি করে দিল। দিন দিন প্রদ্যুম্নর ব্যবসা ফুলেফেঁপে উঠতে লাগল। ওর নতুন কনস্ট্রাকশান কোম্পানির নাম হল ‘ চিত্রাঙ্গদা – স্যমন্তক এন্টারপ্রাইজ ‘।

.

.

.

.

   তৃতীয় অধ্যায়

.

        কর্পোরেট ওয়ার্ল্ড এ এক নতুন তারকা ‘ চিত্রাঙ্গদা – স্যমন্তক এন্টারপ্রাইজ ‘ । কিন্তু, সব সুখ,বোধ হয় ভগবান , একসাথে মানুষকে দেন না । উন্নতির সাথে সাথে শত্রু সংখ্যা বেড়ে গেল। একদিন রাতে সিন্ডিকেটের এক গোপন বৈঠক শেষ করে রাত এগারোটার সময় পরমা আইল্যান্ড এর কাছে এসে দাঁড়াল। হঠাৎই , কয়েকজন দুষ্কৃতী প্রদ্যুম্নকে পয়েন্ট ব্ল্যাঙ্ক রেঞ্জ থেকে ছয়টা গুলি মারল।

.

.

                       আবার সব ভেঙে চুরমার হয়ে গেল । প্রদ্যুম্ন যখন মারা গেলো, তখন চিত্রাঙ্গদা সিক্স এ পড়ে ; আর স্যমন্তক থ্রি তে পড়ে। জীবন যুদ্ধে আহত বাঘিনী, রোহিণী এবার হাল ধরল ‘ চিত্রাঙ্গদা – স্যমন্তক এন্টারপ্রাইজ ‘ এর । প্রখর বাস্তব বোধ সম্পন্ন রোহিণী ব্যবসা সামলে আন্ডার ওয়ার্ল্ড এর থেকে জেনে নিল , কে বা কারা প্রদ্যুম্ন কে খুন করেছিল ।

.

.

প্রদ্যুম্নর চরম শত্রু, এক সময়ের তোলাবাজ আজকের নামী ঠিকাদার  ল্যাংড়া বিশু। সুতরাং , আর দেরি নয় ; এবার এনকাউন্টার । শাশ্বতীকে কিছু না জানিয়েই, এক সময়ে ওর ফার্স্ট ফ্যান্টাসি , প্রদ্যুম্নর মৃত্যুর বদলা নিতে এক কোটি টাকায় সুপারি দিল , রোহিণী । ঘটনার দিন, নিজে উপস্থিত থাকল , ইন্ডিয়ান চেম্বার অফ কমার্স এর এক সম্মেলনে । প্রশাসন ওটাকে একটা অ্যাক্সিডেন্ট বলে ধামাচাপা দিয়ে দিল।

.

.

                  দেখতে দেখতে চিত্রাঙ্গদা এম আই টি থেকে এম টেক করে দেশে ফিরল। খুব ধুমধাম করে এক বিজনেস ম্যাগনেট এর ছেলের সাথে চিত্রাঙ্গদার লাভ কাম অ্যারেঞ্জ ম্যারেজ সম্পূর্ণ হল। দিদির বিয়ের তিন বছর পর হার্ভার্ড বিজনেস স্কুল থেকে এমবিএ করে দেশে ফিরে স্যমন্তক  ‘ চিত্রাঙ্গদা – স্যমন্তক এন্টারপ্রাইজ ‘ এর ভার নিজের কাঁধে তুলে নিল। ওকে ভীষণ ভাবে গাইড করল ওর মাসী রোহিণী ।

.

.

       স্যমন্তক এর কোনো অ্যাফেয়ার ছিল না । তাই পাত্রী জোগাড় করতে মাঠে নামল শাশ্বতী আর রোহিণী । ওদের বৈভব দেখে অনেক উঠতি  মডেল, বি গ্রেডেড্ অ্যাকট্রেস , বিত্তবান বাড়ি থেকে যোগাযোগ করা শুরু হয়ে গেল। কিন্তু, শাশ্বতী , রোহিণী খুব ভালো করে জানত যে ওদের একটা ঘরোয়া, সংস্কৃতি মনস্ক , উচ্চ শিক্ষিত বউমা দরকার ।

.

.

যে এক কথায় ভালো মেয়ে ‘ মানুষ ‘ । শেষমেশ, বোটানি তে এম এস সি রাধিকা রায়চৌধুরী, বয়স তেইশ, উচ্চতা পাঁচ ফুট, দুধে আলতা গায়ের রঙ, সৌখিন, গান বাজনা জানা এবং সোজাসাপ্টা ভাবে বললে কোনো অ্যাফেয়ার্ না থাকা সহজপুর গ্রামের একান্নবর্তী পরিবারের মেয়ে পাত্রী নির্বাচিত হল। জ্যোতিষী শ্রী অংশুমান শাস্ত্রী যোটক বিচার করে জানালেন যে যোটক বিচারে পয়েন্ট পঁচিশ;  সুতরাং যথেষ্ট মিলমিশ হবে।

.

.

                বাড়ির ছেলের বিয়ে, তার উপর আবার কর্পোরেট ওয়ার্ল্ডের বাসিন্দা; সেইজন্য একদিকে যেমন রাজনীতি জগতের কেষ্টবিষ্টু , তেমনি কর্পোরেট জগতের, সিন্ডিকেটের, পূর্ত দফতরের, জেলা পরিষদের, পঞ্চায়েত সমিতির বিভিন্ন পদাধিকারী তার সঙ্গে নিজেদের কোম্পানির কর্মীবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন হায়াত রিজেন্সির ব্যাঙ্কোয়েট হলে। আত্মীয় স্বজন, কন্যে পক্ষ এসব সামালে নিল শাশ্বতী । আর বাইরের সমস্ত লোকজন আপ্যায়ন করল একা হাতে রোহিণী ।

.

.

                     বেশ কয়েক বছর বেশ শান্তিতেই কাটল ওদের । চিত্রাঙ্গদার ছেলের আট বছর বয়স হল ; আর স্যমন্তক এর মেয়ের পাঁচ বছর বয়স হল। এখন রোহিণী অনেকটা ঝাড়া- হাত- পা ; আর শাশ্বতীর ও সংসারের জোয়াল টেনে টেনে এবার ছুটি চায়। কিন্তু, ওরা কেউই বৃদ্ধাশ্রমে থাকতে রাজি নয় ; আর এটাও বলতে রাজি নয় যে চিত্রাঙ্গদা বা স্যমন্তক এর পরিবার ওদেরকে অবহেলা করে।

.

.

                    এই জীবন সায়াহ্নে ভগবৎ ধামে যাওয়ার কথা ভেবে হরিদ্বারে ক্ষীরোদ আশ্রমে মাতাজী ব্রহ্মময়ী দেবীর আশ্রমে জীবনের শেষ দিনগুলো ভাগবৎ চর্চা করে কাটানোর জন্য চলে গেলেন দুই সিঙ্গেল পেরেন্ট। পিছনে ফেলে গেলেন এক বর্ণময় অতীত আর এক বিশাল আর্থিক সাম্রাজ্য ।

.

.

.

.

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *