সিমেট্রি থেকে শ্মশান – সুরঞ্জন কুমার গােস্বামী

0421 – ফোনের স্ক্রিনে একটি বুকিং আইডি ভেসে উঠলাে , পিকাপ। লােকেশন – ইন্টালী থানা ও ড্রপ লােকেশন – নিমতলা মহাশ্মশান। একেই রাত ১২:৩০ , তার উপর আবার নিমতলা মহাশ্মশান। ব্যাপারটা অনেকটা গােদের উপর বিষফোড়ার মতন।

প্রবােধ দাস , একজন ক্যাব ড্রাইভার। আজ গত তিন বছর ধরে সে ক্যাব চালায়। বাঁকুড়ার এক প্রত্যন্ত গ্রাম মনতুমড়া থেকে সে কোলকাতায় আসে। প্রথমে ট্যাক্সি ও পরে এই ক্যাবের ড্রাইভার । কোলকাতার অলি-গলি প্রবােধের এখন প্রায়-ই জানা।

শিয়ালদহ নীলরতন সরকার হাসপাতালের কাছে একটি চায়ের দোকানে একটু চা ও পাউরুটি খায় প্রবােধ। বিকেল চারটের সময় ভাত খাওয়ার পর সারাদিনে আর কিছু খাওয়া হয়নি প্রবােধের। নীলরতন সরকার হাসপাতাল থেকে ইন্টালী থানা খুব কাছেই। শেষ পাউরুটিটা প্রায় পুরােটাই মুখে পুড়ে গাড়ি স্টার্ট করল বােধ।

এজেসি বােস রােডের উপর দিয়ে গাড়ি চলেছে , বাদিকে নীলরতন সরকারের সাদা রঙের বড়াে গেট , মৌলালী যুব কেন্দ্র ও ডানদিকে ড, আর আহমেদ ডেন্টাল হাসপাতাল , ছাড়িয়ে বাদিকে ড, লালমােহন ভট্টাচাৰ্য্য রােড। ও তারপর কনভেন্ট রােডের শেষে ইন্টালী থানা। কনভেন্ট রােডের উপর দিয়ে গাড়ি সােজা চলেছে। আর কিছুদূর যাওয়ার পর ইন্টালী থানা দেখতে এলাে প্রবােধ। কয়েকজন কনস্টেব পুলিস থানার গেটের কাছে দাড়িয়ে আছেন।

– ও.টি.পি 701

ব্রেকে পা দিলাে প্রবােধ , একইসাথে কান ফাটানাে ব্রেকের আওয়াজ। একটা গলার আওয়াজ পেলাে সে , একটা স্পষ্ঠ গলার আওয়াজ। গাড়ির পিছনের সিট থেকে প্রবােধ শুনতে পেয়েছে। আবার সেই এক-ই কণ্ঠস্বর

“ ওটিপি 701 )

মুহুর্তের মধ্যে পিছনে ফিরলাে প্রবােধ । ফিরে তাকাতেই ওর বুকের রক্ত পলকে হিম হয়ে গেল। একজন পিছনের সীটে বসে আছে। মাঝারি গড়ন , কোর্ট-প্যান্ট পড়া , গােফ-দাড়ি নেই , তবে মাথার চুল খুব পরিপাটি করে আসরানাে । ঠোটের কোণে ম্লান হাসি। লােকটার পাশে একটা সুটকেশ রাখা আছে। ইংরাজীতে বড়াে বড়াে অক্ষরে স্যুটকেশটায় লেখা আছে গৌতম বিশ্বাস। ওঁর চোখ দেখে ভয় লাগলাে প্রবােধের।

– লােকটা বেকসীটের গেট না খুলে গাড়ির ভিতর ঢুকলাে কিভাবে ? – প্রশ্ন ওঠে প্রবােধের মনে।

চারিদিকে একবার দেখে নিলাে প্রবােধ , তার ডানদিকে কনভেন্ট রােড সিমেট্রি । ভিতরটি ঘুটঘুটে অন্ধকার , রাস্তার সামান্য আলােতে সামনের কিছুটা অংশ দেখা যাচ্ছে I

উপরের ড্রাইভিং মিররে লােকটার দিকে তাকায় প্রবােধ। লােকটাও প্রবােধের দিকে একভাবে তাকিয়ে আছে । কিরকম অদ্ভূত দৃষ্ঠি লােকটার , চোখগুলি যেন কঠোর থেকে বেড়িয়ে আসবে , ঠোটের কোনে সেই একই হাসি।

লােকটা প্রবােধের উদ্দেশ্যে বলল – “ তাড়াতাড়ি চল। সবাই অপেক্ষা করছে।

। ??

ভারি ও কর্কশ গলায় প্রবােধকে এই কথাটা বলল লােকটা। লােকটার গলাটা অসহ্য ও অসস্বস্তিকর মনে হলাে প্রবােধের । মনে হয় কেউ যেন লােকটার গলাটা টিপে ধরে আছে ।

ভয়-ভাবটা এখনাে কাটেনি প্রবােধের। কাঁপা হাত নিয়ে সে গাড়ি স্টার্ট করল সে ।

পােবধের গাড়ি এখন সেন্ট্রাল অ্যাভিন্যিউতে দাড়িয়ে আছে , ঠিক সেন্ট্রাল মেট্রো ষ্ঠেশনটির গায়ে। সামনে সিগনাল , কলেজস্ট্রীট থেকে বড়ােবাজারের দিকে গাড়িগুলি পরপর দাড়িয়ে আছে। প্রবােধ তার সিটের পিছনে একটু স্বাভাবিক হয়ে বসেছে । ড্রাইভিং মিররে আবার চোখ পড়তেই লােকটাকে দেখতে পেলাে সে। লােকটা একিভাবে প্রবােধের দিকে তাকিয়ে আছে , মুখে সেই ম্লান হাসি। লােকটা কে যতটা সম্ভব এড়িয়ে যাচ্ছে প্রবােধ , লােকটাকে পাগল বা ভূত কোনাে কিছুর মধ্যেই ফেলতে পারছেনা সে।

ঘাড়টা পিছনের দিকে এলিয়ে একটু বিশ্রাম নেয় প্রবােধ । স্বয়ংক্রিয়ভাবে মাথার উপরে ড্রাইভিং মিররে চোখ যায় তার। প্রবােধের দৃষ্ঠি স্থির হয়ে যায় , স্নায়গুলি নিস্তেজ হতে থাকে , নিজের শরীরের ওপর আর কোনাে নিয়ন্ত্রণ থাকে না তার।

প্রবােধ দেখল , লােকটার পাশে আরেকজন লােক বসে আছে , একজন বৃদ্ধ লােক , বয়স আন্দাজ ৮০ , একভাবে প্রথম লােকটার মতন প্রবােধের দিকে তাকিয়ে আছে। হঠাৎ দুজন প্রায় একসাথে প্রবােধের দিকে তাকিয়ে বিকট আওয়াজে হেসে উঠলাে। উফফ! কি বিকট ও ভয়াবহ হাসি !

প্রবােধ স্নায়বিক উত্তেজনায় গাড়ির গতি বাড়িয়ে দিলাে। সামনের একজন বাইক আরােহীকে প্রায় ধাক্কা মেরে প্রবােধের গাড়ি ছুটতে থাকে , একিসাথে। সেই বিকট ও ভয়ানক হাসি। আহত বাইক আরােহী ও অন্যান্য লােকজন প্রবােধের গাড়ির উপর ক্রোধবর্ষণ করে। আজ পর্যন্ত কোনাে অ্যাকসিডেন্ট হয়নি ওর গাড়িতে , কিন্তু আজ অ্যাকসিডেন্ট ও এরকম বিদগুটে অবস্থায় আপনাতেই ভয়ে চোখ বন্ধ হয়ে আসে প্রবােধের।

চারিদিকের চিৎকার-চেচামেচিতেই প্রবােধ চোখ খুলল । “ উফফ ! ” – একটি যন্ত্রনাসূচক আওয়াজে চোখ খােলে প্রবােধ। মাথাটা টনটন করছে প্রবােধের , জামাটাও ঘামে ভিজে গেছে । পিছন ফিরে প্রবােধ দেখল দুজন ভদ্রলােক গাড়িতে নেই। মাথায় একসাথে দুশ্চিন্তা ও ভয় মিশে গেছে । ঠিক মনে আছে , সেন্ট্রাল অ্যাভিন্যিউতে ওই বিভৎস দৃশ্যে জ্ঞান হারায় সে , তারপর এখানে কি ভাবে ?

গাড়ির দরজাটা খুলে বাইরে বেরিয়ে আসে প্রবােধ। ডানদিকে চোখ গেলাে । | সিগ্ধ , শান্ত হুগলী নদী। একটু ডানদিকে ঘুরতেই সে দেখতে পেলাে , কপােরেশনের নীল সাইন বাের্ডে লেখা – “ নিমতলা মহাশ্মশান ” । সেন্ট্রাল অ্যাভিন্যিউ থেকে এখানে কিভাবে এলাে সে ? এটাইতাে লােকটার ড্রপ লােকেশন ছিলাে।

লােকটাই কি গাড়ি চালিয়ে প্রবােধকে এখানে নিয়ে এসেছে। ? কিছু বুঝতে পারেনা প্রবােধ। কিছুটা দূরে একটা চায়ের দোকান দেখা যাচ্ছে। হাতঘড়িতে এখন ৪:২৫, শশান এলাকায় সারারাত চায়ের দোকান খােলা থাকে । গাড়ি থেকে নেমে চায়ের দোকান থেকে দু-পেয়ালা চা খেলাে প্রবােধ।

কাছেই ভূতনাথ মহাদেবের মন্দির । চায়ের দাম মিটিয়ে সামনের দিকে হাটতে থাকে প্রবােধ। সে শুনেছে এই নিমতলা মহাশ্মনেই কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ , বিদ্যাসাগরের সমাধি আছে। মন্দির বন্ধ , সুতরাং বাইরে থেকেই ভূতনাথ মহাদেবের উদ্দেশ্যে সাষ্ঠাঙ্গ প্রনাম করে প্রবােধ।

শ্মশানের ভিতরে প্রবেশ করল সে , বৈদ্যুতিক চুল্লী , মৃতদেহ দাহ হতে প্রায় এক থেকে দেড় ঘন্টা সময় লাগে। মৃতদেহের ভিড়ে কোণায় এক জায়গায় চোখ গেলাে প্রবােধের। বুকটা ধড়াস করে ওঠে তার , দুটি মৃতদেহ…

এই মৃতদেহ দুটিই কিছুক্ষণ আগে প্রবােধের ক্যাবে ছিলাে। হ্যা ! সেই দুজন লােক। মৃতদেহদুটির কাছে গেলাে প্রবােধ। ভালাে ভাবে দেখলাে মৃতদেহদুটিকে। শরীরটা যেন নিজের বশে নেই প্রবােধের , এখন-ই মনে হয় জ্ঞান হারাবে । এক দৌড়ে নিজের ক্যাবের সামনে এলাে প্রবােধ , চোখের । সামনে সবকিছু একেকবার অন্ধকার হয়ে যাচ্ছে। গাড়ির গেটটা খুলে এসি চালিয়ে বসে আছে সে , এখন ওর চারিদিকে শুধু ভয় আর ভয়।

কাচে দুটো টোকা পড়ার শব্দে হুড়মুড়িয়ে উঠলাে প্রবােধ। একজন যুবক দাড়িয়ে আছে। সুইচটি টিপে কাচটা নামালাে।

“ আমার বাবা গৌতম বিশ্বাস ; ওনার সুটকেশটা ব্যাক সিটে আছে । সুটকেশটা পেলে খুব উপকৃত হব।” – ছেলেটি বলল।

প্রবােধ একপ্রকার রেগেই ছেলেটির উদ্দেশ্যে বলল , “ দেখুন মশাই! ঠাট্টা করবেন না। ক্যাবের ভাড়া না মিটিয়ে একপ্রকার হেনস্তা করেছেন ভদ্রলােক

“ দয়া করে আপনার গাড়িভাড়াটা বলবেন ? ” ছেলেটি বলল।

প্রবােধ ফোনেই ক্যাবের ভাড়া দেখে ছেলটিকে বলল , “ ৩০০ টাকা। ”

ছেলেটি বলল “ আপনাকে পেটিএম মারফৎ টাকাটা দিচ্ছি। আপনার কোনাে আপত্তি নেই তাে ?

প্রবােধ সামান্য ঘাড় নাড়িয়ে বলল “ না। ”

প্রবােধ ছেলেটিকে বলল – “ আপনার বাবাকে চুল্লীর লাইনে দেখলাম , উনি কিভাবে মারা গেলেন ? ”। আসল ব্যাপারটা চেপে যায় প্রবােধ , লােকে কি আদৌও তার কথায় বিশ্বাস করবে।

ছেলেটি খানিকক্ষণ প্রবােধের দিকে তাকিয়ে এক অদ্ভুতভাবে বলল “ জানতে পারবেন ।

হর্ণের শব্দে সামনে তাকায় প্রবােধ। একটি শববাহী গাড়ি প্রবােধের ক্যাবের সামনে এসে দাড়ায়। দুজন পুলিশ কনস্টেবল ও দুচারজন লােক মৃতদেহের সাথে ভিতরে ঢোকে। গঙ্গার বহমান জোরালাে বাতাসে মৃতদেহের মুখের সাদা চাদরের আবরণটা নেমে যায়। ওখানে চোখ পড়তেই , মাথার স্নায়গুলি নিস্তেজ হয়ে যায় , চোখের সামনে একগুচ্ছ ধােয়া জোমাট হতে থাকে প্রবােধের ।

আগের সেই ভূতুরে আরােহীর ছেলেটি , যে কিছুক্ষণ আগে তার কাছেই ছিলাে। কিকরে সম্ভব ? মনের সমস্ত জোর এক করে ডানদিকে তাকালাে প্রবােধ। একি ! ছেলেটি নেই।। ব্যাপারগুলি সত্যিই রহস্যজনক , গাড়িতে একটি থেকে দুটি লােক , সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউতে জ্ঞান হারানাে ও সুস্থ শরীরে এই নিমতলাতে আসা , তার উপর আবার এই ছেলেটি। আজ কার মুখ দেখে যে ডিউটিতে এসেছিলাে প্রবােধ , তা একমাত্র ঈশ্বর জানে । চিন্তা-ভাবনা।

করার মতাে কোনাে শক্তি প্রবােধের শরীরে এখন নেই। এইরকম পরিস্থিতির পর একটু ঘুমের প্রয়ােজন তার।

প্রবােধের ভাড়া বাড়ি বেলেঘাটা সরকার বাজারে। আজ সারাদিন শরীরে খুব বােকল গেছে , বাড়ি গিয়ে পর্যাপ্ত ঘুম দরকার। রাস্তা ফাকা থাকার দরুণ খুব তাড়াতাড়ি তার বাড়িতে আসে প্রবােধ।

প্রাতঃরাশ সেরে খবরের কাগজে একটি ছবি ও তার সাথে প্রতিবেদনে চোখ পড়তেই কাগজটা তার হাত থেকে পড়ে যায়। কাগজের প্রথম পাতার একটি খবর –

“ কনভেন্ট রােডে বীভৎস দুর্ঘটনা ”

গতকাল সকাল ১০ টা নাগাদ কনভেন্ট রােড কবরস্থানের কাছে ভয়াবহ দুর্ঘটনা। একটি লরির ও মারুতি গাড়ির সাথে মুখােমুখি সংঘর্ষে

দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয়েছে তিন আরােহীর – গৌতম বিশ্বাস (৬০) , ধূর্জটি মজুমদার (৮৫) , সুকল্যাণ বিশ্বাস (২৬)…

পাশে ট্যাবিলে রাখা প্রবােধের ফোনে ম্যাসেজটোন বেজে ওঠে , একপ্রকার ক্ষিপ্রতার সাথে ফোনটি নিয়ে ম্যাসেজটি দেখে সে –

Your AC XXXXXXX is credited by 300. INFO: XXXXX / SUKALYAN BISWAS.

হঠাৎ কানের কাছে মৃদু স্বরের একটি কথায় হাড় হিম হয়ে যায় প্রবােধের

“ বলেছিলাম না জানতে পারবেন ।

সেই সঙ্গে সেই বিকট পৈশাচিক হাসি প্রবােধকে চারিদিক থেকে ঘিরে ধরে।

স্পটে এলেন বড়ােবাজার থানার সাব-ইনসপেক্টর মি. চক্রবর্তী। গতকাল রাত ১:২৫ নাগাদ এম.জি.রােডের উপর একটি ক্যাব ট্যাক্সি একটি বাইককে ধাক্কা মেরে কিছুদূরে একটি ল্যাম্পপােষ্ঠে ধাক্কা মারে। রহস্যজনকভাবে বাইক আরােহীর পায়ে সামান্য চোট লাগলেও , ক্যাব-ট্যাক্সির ড্রাইভার মৃত।

কাছেই একটা অ্যাম্বুলেন্স , মৃতদেহ নিয়ে যাওয়ার জন্য। সাব-ইনসপেক্টর সাহেব মৃতদেহ , স্টিয়ারিং , ব্যাক সিট ভালােভাবে পরীক্ষা করলেন । উপরের ড্রাইভার মিররের দিকে মুখ করে লােকটার মাথাটা পিছন দিকে হেলানাে , দুটো হাত স্টিয়ারিং এর উপর , পা অ্যাস্কিলেটারে শক্তকরে চাপানাে ।

“ স্যার সিসিটিভি আর ময়নাতদন্তের রিপাের্ট চলে এসেছে। আর একটা মানিব্যাগ ও ব্যাক পকেটে একটা আই-কার্ড পাওয়া গেছে । ” – সিনিয়র পুলিশ কনস্ট্যাবল শ্রীকৃষ্ণ সাহা বললেন।

সাব-ইনসপেক্টর মি. চক্রবর্তী রিপাের্ট দেখলেন। মৃত্যুর কারণ আকস্মিক হৃদরােগ। ইতিমধ্যে সিনিয়র কনস্ট্যাব টেবিলে আই-কার্ডটি রাখলেন , সাব-ইনসপেক্টরসাহেব কার্ডটির এপিট-ওপিট দেখে একজায়গায় চোখ রেখে বললেন –

“ নাম – প্রবােধ দাস , ঠিকানা – বেলিয়াঘাটা সরকার বাজার , কোলকাতা – ৭০০০১০।

ফেসবুক মন্তব্য

Published by Story And Article

Word Finder

Leave a Reply

%d bloggers like this: