ক্যাসপার : সুনীতা বিশ্বাস

টিং টং …… দরজার বেল বাজল। চন্দ্রা রান্না ঘর থেকে বেরিয়ে এসে দরজাটা খুলে দিলো। অনীক ফিরেছে বন্ধুর বাড়ি থেকে। সাথে একটা ছোট্ট সাদা কুকুর ছানা। দেখেই চন্দ্রা রেগে গেলো, অনীক কিছু না বলেই ঘরে ঢুকলো কুকুর ছানাটাকে কোলে নিয়ে। চন্দ্রাকে চুপ থাকতে দেখে অনীক নিজেই বলল “কাল-ই তো আমাদের কথা হলো যে আজ ছুটির দিন আমি আমার বন্ধু রাতুল এর বাড়ি থেকে একটা পাপ্পি আনবো।

চন্দ্রা বলল” আমি তো বলেছিলাম যে আমি চাই না বাড়িতে কোন পাপ্পি থাকুক ।“ অনীক বলল “ কিন্তু তুমি যে পরে বললে তোমার যা খুশী তাই করো, আমি জানি না।“ চন্দ্রা বলল “হে ভগবান, কোন কথার কি মানে করলে তুমি !” চন্দ্রা বিরক্ত হয়ে রান্না ঘরে চলে গেলো। পিছু পিছু অনীকও গেলো।

বলল “রাগ কোরো না, নিয়ে যখন এসেছি, থাক এক সপ্তাহ মতো, খুব প্রবলেম হলে আমি গিয়ে ফেরৎ দিয়ে আসবো। চন্দ্রা মনে মনে বলল “ অতো সোজা নয়, একবার মায়া পড়ে গেলে আর ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভব নয়।“ রান্না টুকু কমপ্লিট করে সোফায় এসে বসলো চন্দ্রা।

অভি পাপ্পি টাকে কোলে নিয়ে এসে বলল “ দেখো না মা কি কিউট পাপ্পি।“ চন্দ্রা রেগে বলল “বেশি কিউট লাগে তো তোর নিজের কাছেই রাখ, আমার কাছে আনবি না একদম।“ অভি চুপচাপ পাপ্পিটাকে কোলে নিয়ে বাইরে বেরিয়ে যায়। চোখ বন্ধ করে সোফায় হেলান দিয়ে পুরনো স্মৃতির রাজ্যে ফিরে যায়। তার ছোট্ট বেলার জীবনের এক অধ্যায় , তাতেই মন আটকে যায়।

ছোট বেলায় চন্দ্রা পাপ্পি খুব ভালোবাসতো । বাবা মাকে খুব কষ্ট করে রাজিও করিয়েছিল, অবশ্য সে একা নয়, সাথে তার দাদা দিদিও হেল্প করেছে। বাবার এক বন্ধু কুকুর ছানা এনে দেবেন বলেছিলেন। সময় মতো এনেও দিয়েছিলেন, যেদিন উনি এলেন দরজায় বেল শুনে আমারা তিন ভাই বোন ছুটে গিয়ে দরজা খুলেছি, প্রথমে কাকুর হাতে কিছুই নেই দেখে আমরা হতাশ হয়েছিলাম, তারপর কাকু একটা বাস্কেট থেকে উলের গোলার মতো সাদা তুলতুলে একটা কুকুরছানা বের করলেন, আর সে গুটি গুটি পায়ে ঘরের ভেতর ঢুকে পড়ল। কাকু অন্য কাজ ছিল, বাই বলে চলে গেলেন উনি।

পাপ্পিকে পেয়ে আমরা খুব খুশী। প্রথমেই শুরু হলো পাপ্পির নাম রাখা নিয়ে গ্রূপ ডিসকাশন , দাদা বলল “ টাইগার নাম রাখলে কেমন হয়?” দিদি বলল “ ঐ টুকু প্রাণীর নাম টাইগার মোটেও ভালো লাগবে না, তার চেয়ে বরং জ্যাকি রাখা যেতে পারে ।“ আমি বললাম “ প্রায় সব কুকুরের নাম-ই জ্যাকি হয়, রাস্তায় বেরিয়ে যদি আমরা জ্যাকি বলে ডাকি আর বাকী সব কুকুররাও দৌড়ে চলে আসুক আর কি।

“ এইভাবে একটা করে নাম দেওয়া হচ্ছিল আর তার চেয়েও দ্রুত গতিতে নাম রিজেক্ট হচ্ছিল। অবশেষে একটা নাম সকলের পছন্দ হলো ,ক্যাসপার । আমরা ক্যাসপার নামে ডাকলেই কুঁইকুঁই করে সাড়া দিতো। পিগি ব্যাঙ্ক ভেঙে সেই টাকায় আমরা ক্যাসপার-এর জন্য একটা বেল্ট কিনে আনলাম। মায়ের কাছ থেকে একটা থালা জোগাড় করলাম ওর খাওয়ার জন্য।

বেশ ভালোই ট্রেনিং দিয়েছিলাম আমরা ক্যাসপার কে, সকালের প্রাতঃকর্ম টা বাইরেই করতে শিখিয়েছিলাম, খাবার খেতেও শিখিয়েছিলাম ভালোভাবে , খাবার নষ্ট করতো না। ক্যাসপার আসার পর আমাদের এতো পরিবর্তন হয়েছিল যে ঘুম থেকে দেরি করে ওঠার জন্য বকা খাওয়া আমরা ভোর ৫ টায় উঠে ক্যাসপারকে পার্কে নিয়ে যেতাম। দাদান ফোন করলে আমরা ক্যাসপারের কতো গল্প করতাম, একদিন হঠাৎ দাদান বাড়িতে এসে উপস্থিত।

এসেই ওনার হম্বিতম্বি শুরু, “কুকুরকে কি কেও ঘরে রাখে নাকি, কুকুর আমাদেরকে পাহারা দেবে নাকি আমরা কুকুরকে পাহারা দেবো? যাও শিগগির ওকে গেটের সাথে চেন দিয়ে বেঁধে রেখে এসো । “ আমার ভীষণ রাগ হচ্ছিল, কিন্তু করার কিছুই ছিল না , ক্যাসপার ও রেগে খুব চিৎকার করতো। একদিন চেন খোলা ছিল আর ক্যাসপার গিয়ে দাদান এর ঘর নোংরা করে দিয়েছে, দাদানের সে কি চিৎকার আর বকাবকি।

আর একদিন দাদানের বাঁধানো দাঁত ভেজানো বাটির জল খেয়ে নিয়েছে ক্যাসপার। আমরা দাদানের কাছে কতো প্রশংসা করেছি ক্যাসপার-এর, আর ক্যাসপার এইভাবে দাদানের কাছে আমাদের নাম ডুবিয়ে দিলো। দাদান বাড়ি ফেরার সময় বাবা মাকে খুব বকাবকি করে গেলেন। আমি আর দাদা দিদি হাফ ছেড়ে বাঁচলাম । ক্যাসপার ধীরে ধীরে বাবা মায়ের ভক্ত হয়ে গেলো, মা যতক্ষণ রান্না ঘরে থাকতেন ও ততক্ষণ রান্না ঘরের দরজায় বসে থাকতো ।

বাবার অফিস যাওয়ার সময় হলেই গেটের কাছে এসে দাঁড়িয়ে থাকতো। আমাদের ডাক কখনো কখনো শুনেও অগ্রাহ্য করতো, ব্যাট বল খেলার সময় বল মুখে নিয়ে দৌড় লাগাতো, আর আমরা ক্যাসপার এর পেছনে ছুটতাম । আশেপাশের বাড়ি থেকে জুতো মুখে করে নিয়ে এসে ক্যাসপার কামড়ে ছিঁড়ে নষ্ট করতো, কোথাও বেড়াতে গেলে আমাদের গাড়ির জানলার ধারের সিট টা সে দখল করে বসতো আমাকে বেদখল করে।

কুকুর পোষার যে এতো ঝামেলা তা আগে জানতাম না। এদিকে বাবা মাকে কিছু বলাও যাচ্ছে না, কিছু আগ বাড়িয়ে কিছু বলতে গেলেই শুনতে হবে “ আগেই বারণ করেছিলাম, তখন তো তোরা শুনিস নি, এরপর ১ ঘণ্টা ধরে ভাষণ দিয়ে যাবে এক-ই টপিক –এ। এভাবেই দেখতে দেখতে কেটে গেছে সময়। আমি ফ্রক জামা ছেড়ে সালওয়ার সুট-এ অভ্যস্ত হয়েছি।

তখন আমি ক্লাস টেন । ক্যাসপার অনেক বড় হয়েছে , ৫বছর বয়েস। ক্যাসপারের দুষ্টুমি গুলো ধীরে ধীরে কমে গেছে । আমি সাইকেল নিয়ে স্কুলে যাওয়ার সময় ক্যাসপার আমাকে গেট পর্যন্ত এগিয়ে দিতো ।আর যখন আমি ফিরে আসতাম স্কুল থেকে তখন আমার পায়ের কাছে এসে বসে পড়তো, আমার পা চেটে দিতো, যেন কতো বছর বাদে আমাকে দেখলো। ক্যাসপার আমাদের খুব ভালোবাসতো আর আমরাও ওকে খুব ভালবাসতাম।

কিন্তু কি যে হলো ক্যাসপারের , ধীরে ধীরে কেমন যেন ঝিমিয়ে পড়তে লাগলো , বেশি নড়াচড়া করতে পারত না, ভালোভাবে খেতেও পারতো না, ডাক্তার বলেছে ক্যাসপার আর বেশিদিন বাঁচবে না, ভালো থাকার জন্য সাময়িক কিছু ওষুধ দিলেন। কিছুদিন একটু ভালো ছিল ক্যাসপার, কিন্তু হঠাৎ একদিন দেখলাম ক্যাসপার মেঝেতে কেমন নিরবে শুয়ে আছে, কাছে গিয়ে ডাকলাম, কোন সাড়া নেই, নড়ছেও না দেখে গায়ে হাত দিয়ে ডাকলাম, ক্যাসপারের মাথাটা আমার কোলে তুলে নিয়ে আদর করলাম, এক ঝলক তাকালো আমার দিকে তারপর সব শেষ।

বাড়ির সবাই খুব কাঁদছিল, আমাকে তো থামানোই যাচ্ছিলো না। ক্যাসপারের বেল্ট আর খালি থালার দিকে তাকালেই কান্না কান্না পেতো । খুব ফাঁকা ফাঁকা লাগতো ঘর।হঠাৎ আজ এতো কিছু মনে পড়ল অনেক দিন পর, অনীক আর অভি খুব খারাপ ভাববে আমাকে, অভি হয়তো ভাববে মা খুব নিষ্ঠুর । হঠাৎ পায়ের পাতায় ঠাণ্ডা স্পর্শ পেয়ে চোখ মেলে তাকালো চন্দ্রা, চোখের পাতা ভেজা ভেজা, পুরনো স্মৃতিতে মনও ভিজেছে।

পায়ের দিকে তাকিয়ে দেখল সাদা কুকুরছানা টা তার পা চাটছে, হাত বাড়িয়ে কোলে তুলে নিলো পাপ্পি টাকে , বাচ্চাটা সামনের দুটো পা তুলে দিলো চন্দ্রার কাঁধে। অভি দূর থেকে দেখছে চুপচাপ ,চন্দ্রা চোখের জল মুছে বাচ্চাটাকে আদর করতে করতে অভিকে বলল “ কিছু নাম দিয়েছিস এর?” অভি বলল” না, কি নাম দেবো খুঁজেই পাচ্ছি না।“ চন্দ্রা বলল” এর নাম আজ থেকে ক্যাসপার।“ এই নিরীহ প্রাণীটার মধ্যেই চন্দ্রা ফিরে পেলো তার হারিয়ে যাওয়া ক্যাসপারকে ………।।

ফেসবুক মন্তব্য

Published by Story And Article

Word Finder

Leave a Reply

%d bloggers like this: