সেই কান্নার শব্দ —— সুমিত মোদক

সেই কান্নার শব্দ ------ সুমিত মোদক
মাঝরাতে কান্নার শব্দে ঘুম ভেঙে গেল ;
ঘর থেকে বেরিয়ে আসি ;
হাঁটতে শুরু করি  , 
খুঁজতে শুরু করি কান্নার উৎস .. 
সেই যে হাঁটা শুরু করেছি , আজও হাঁটছি …
সেই যে কান্নার শব্দ শুনতে পেলাম , আজও পাই …
সেখান থেকে যেন আমার মুক্তি নেই ;
যেদিন তুমি আমার সঙ্গে  পা মেলালে  ,
সেদিন থেকে দুজন , 
দুজন থেকে দশজন ,দশজন থেকে হাজার …
আজ , হাজার হাজার মানুষ হাঁটছে রাতের অন্ধকারে  ;
কেবলমাত্র কান্নার উৎস সন্ধানে ;
প্রথম প্রথম ভেবেছিলাম আমি একা ;
এখন আর একা নই ;
যখন দেখি , এতো মানুষ সেই কান্নার শব্দ শুনতে পায় !
অথচ , কেউই খুঁজে পাচ্ছে না ;
আমিও নই .  ..
একটা যুগ থেকে আরেকটা যুগে ;
একটা সভ্যতা থেকে আরেকটা সভ্যতায় 
ঢুকে পড়ছি ; খুঁজে চলেছি …
খুঁজছি আপ্রাণ চেষ্টায় .. 
অজন্তা-ইলরা থেকে খাজুরাহ ;
খাজুরাহ থেকে মহেঞ্জদর-হরপ্পা ,সূর্যমন্দির , নালন্দা . .
সব , সব খানেই খুঁজে চলেছি বারবার ;
প্রাচীন স্থাপত্যের গায়ে কান পেতে শুনতে চেয়েছি ;
কোথাও কোনও কান্নার শব্দ নেই ;
চারিদিকে শুধুই অন্ধকার  ;
সে অন্ধকার ভেদ করে হেঁটে চলেছে কিছু মানুষ ;
মানুষের মিছিল  …
পাহাড় থেকে নদী ,নদী থেকে জঙ্গল , জঙ্গল থেকে লোকালয় . ..
সবখানে আমি , আমরা , 
আপসহীন কিছু মানুষ , সত্যবাদী কিছু মানুষ , সত্য সন্ধানী কিছু মানুষ , 
কিছু আবার ঐতিহাসিক  …
হেঁটে চলেছি ক্লান্তিহীন এক অনুসন্ধানে  ;
রাত গভীর হলেই একে একে ইতিহাসের চরিত্র গুলো জেগে উঠে ; 
কথা বলে চুপিচুপি ;
সে সময়ের কথা , এ সময়ের কথা ,আমাদের কথা ..
নালন্দার আশেপাশে এখনও ভেসে বেড়ায় 
হাজার হাজার পুঁথি পোড়ানোর গন্ধ  ;
সে গন্ধে সারারাত বাতাস ভারী হয়ে থাকে ;
একটা সভ্যতার ইতিহাস পুড়িয়ে ফেলার গন্ধ ;
একটা গোটা দেশের ইতিহাস পুড়িয়ে ফেলার গন্ধ ;
হাজার হাজার বছরের সাধনার ফসল পুড়িয়ে ফেলার গন্ধ ;
একটা জাতির শিক্ষা-সংস্কৃতি পুড়িয়ে ফেলার গন্ধ ;
সে এক অস্পষ্ট যন্ত্রণা ;
দমবন্ধ হয়ে আসা গন্ধ , দমবন্ধ হয়ে আসা অন্ধকার :
হটাৎ এক রাতে তোমার কি মনে হল !
তুমি আমার বুকে কান পাতলে ;
শুনতে পেলে সেই কান্নার শব্দ !
চমকে উঠে ছিলে !
একে একে সকলকেই শুনিয়ে ছিলে ;
এমনকি সকলেই শুনতে পায় একে অপরের বুকে কান পাতলে ;
সেদিন থেকে আমার বুঝলাম 
আমাদের শরীর জুড়ে হাজার হাজার পুঁথি পোড়ার গন্ধ ;
আমাদেরই বুকে জমে আছে নালন্দার কান্না ।।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *