সেই মূর্তিটি – বৈদ্যনাথ চক্রবর্তী

 মূর্তিটার প্রতি এক অদ্ভুত আকর্ষণ জন্মেছে তাঁর। এক মুহূর্তের জন্যও মূর্তিটা ভুলতে পারছে না। সঞ্জয় বেড়াতে এসেছে পুরুলিয়া জেলায় এক প্রত্যন্ত গ্রামে। সে অকৃতদার, বাবা মা গত হয়েছেন অনেক দিন আগে। পারিবারিক সঞ্চয় এবং একটা প্রাইভেট ফার্মে কাজ করে যেটুকু সাই তাঁর একলা লােকের দিব্যি চলে যায়। প্রত্যেকবার পুজোর দুটি পড়লেই সে একলাই।

বাড়ি থেকে চলে আসে বহুদূর। নেই কর্মব্যস্ততা, মানুষের কোলাহল, ট্রাম বাসের শব্দ। জীবিকার জন্য শহরতলিতে থাকলেও বরাবরই গ্রাম ভালােবাসে সো সবুজ বনানীর স্নিগ্ধ ছায়া বরাবরই ভাঁকে টালে। সে এবাবে এসেছে পুরুলিয়ার এই গ্রামে। কি সুন্দর গ্রাম, চারিদিকে সবুজের মেলা, আদিবাসী সম্প্রদায়ের নৃত্য , পাখিদের কোলাহল , মৃদুমন্দ শীতল বাতাস সব কিছু নিয়ে ভালােই লাগছে তাঁর।

একটা বাড়িও সে বেশ কয়েক দিনের জন্য ভাড়া নিয়েছে, রান্না করার লােকও টেগেছে একজন এই গ্রামে সপ্তাহে দুই বার একটা হাট বসে প্রচুর লােক সমাগম এবং জিনিসপত্রের আমদানি রপ্তানি হয়। শাক সবজি , আনাজপত্র, মুখােশ এবং মাটির মূর্তি এইসব নানান জিনিস বিক্রি হয়।

সেই হাটে ঘুরে বেড়াবার সময় এক বুড়ােকে দেখতে পায় সঞ্জয় , কিছু মুখােশ এবং মাটির মূর্তি নিয়ে বসে আছে সে। শীর্ণকায়, ময়লা ঘেঁড়া জামা কাপড় পড়লে, তাঁর খনা গলায় সময়কে বলে কি লাগবে বাবু। ঐ মূর্তি গুলাের মধ্যে সময়ের চোখ আকর্ষণ করে একটা ছােট্ট মাটির মূর্তি। সঞ্জয় মূর্তিটি হাতে তুলে নেয়। কি অপরূপ শিল্পকলা, কি সুন্দর হাতের কাজ।

মূর্তিটি একটা সাদা কাপড়ের থান পড়া বুড়ির, ফোকলা দাঁত বের করে হাসছে, হাতে একটা লাঠি। চোখ গুলাে যেন জ্বল জ্বল করছে , যেন জীবন্তু। কী অদ্ভুত মূর্তিটা। এই মূর্তি গুলাে সব তােমার তৈরি। বুড়াে খ্যাঁক খ্যাঁক করে হেসে বলল , আঙ্গে বাবু এই সব মূর্তি গুলাে আমার হাতের তৈরি, শুধু আপনার হাতে যে মূর্তিটা আছে সেটা বাদ দিয়ে। তাহলে এই মূর্তিটা কে বানিয়েছে। আঙ্গে বাবু এই মূর্তি অনেক পুরােনাে, এই মূর্তিটা আমি ছেলে বেলা থেকেই আমাদের বাড়িতে দেখছি। আমরা তাে বংশপরম্পরায় মাটির মূর্তি বেঁচে আসছি।

আমার বাবা বলতেন এই মূর্তির অনেক ইতিহাস আছে। সময় অবাক হল, লােকটা বলে কি , মূর্তিটা দেখে মনে হচ্ছে এই কদিন আগে তৈরি হয়েছে। যদি মূর্তিটা অনেক প্রাচীন হয় তাহলে তাঁর রং এতাে উজ্জ্বল থাকে কি করে? নিশ্চয়ই এবুড়াে ভালাে খরিদ্দার সেযে আজগুবি গল্প বানাচ্ছে দাম বাড়ানাের জন্য।

তা বাপু এর দাম কতাে৷ আঙ্গে বাবু ও জিনিস বিক্রি নেই, ও আমার বাড়ির লােক আছে। আপনি চাইলে অন্য কিছু নিতে পাবেন। মাটির মূর্তি বাড়ির লােক, কৌতূহল বাড়ল সঞ্জয়ের, কিন্তু এদিকে বেলাও বাড়ছে, কাজের লােককে বাজার না পৌঁছালে বান্না হবে না। তাই আর কথা না বাড়িয়ে একটা কাঠের কলমদালি হাতে তুলল মূর্তিটা বেধে দিল। এর দাম কত ?

জিজ্ঞেস করল। সঞ্জয়। বুড়াে বলল আঙ্গে বাবু আপনার যা ভালাে মনে হয় তাই দেন। সঞ্জয় পকেট থেকে পঞ্চাশ টাকার একটা নােট বের করে তাঁকে দিল, বুড়াে খুশি হয়ে নমস্কার করলাে। সঞ্জয় হাটে সবজি মাছ নিয়ে ফিরে এল।

স্নান সেরে ফেরার পর, কাজের লােক খাবার লাগালাে। দুপুরের খাবার খেয়ে একটু শুয়ে পড়ল সে। কিন্তু ঘুম হলাে ৷ ঐ বুডির মূর্তিটা সব সময় চোখের সামনে ভেসে উঠছে তাঁর। অবাক ব্যাপার বেলা যত বাড়ে মূর্তির প্রতি আকর্ষণ বেড়েই চলেছে। রাতে যখন বিছানায় শুয়ে আছে, তাঁর মনে হল বুডির মূর্তিটা তাঁর চোখের সামনে ফোকলা দাঁত বের করে তাঁর দিকে চেয়ে খ্যাঁক খ্যাঁক করে হাসছে।

এ মূর্তি তাঁর , বুড়াের এতাে সাহস মুখের ওপর বলল। এ মূর্তি সে নেবেই , তাঁর জন্য যত টাকা লাগবে সে দেবে। দরকার পড়লে ঐ বুড়ােকে খুন করেও মূর্তি সে নেবেই। এ কি হয়েছে সমযের , সে এসব কি আবােলতাবােল বলছে।

একটা মাটির মূর্তির মধ্যে কি জাদু আছে তাঁর জন্য মানুষ খুন করতে হবে। সারারাত এসব চিন্তা করে ঘুম হলাে না তাঁর। পর পর কয়েক দিন এভাবেই কাটল তাঁর। মূর্তিটা পাওয়ার জন্য অধীর হয়ে উঠলাে সে। আজ আবার হাট বসবে , সে সকাল বেলায় ঘুম থেকে উঠে তৈরি হয়ে বেরিয়ে পড়ল মূর্তিটার খোঁজে। বুড়াে আজ সেই আগের জায়গায় বসে আছে ।

আগের দিনের মতাে অন্যান্য মূর্তির সঙ্গে ঐ বুড়ির মূর্তি টাও রয়েছে। সঞ্জয় ঐ মূর্তিটা আবার কিনতে চাইল,কিন্তু বুড়াে আগের দিনের মতােই বেঁচতে অস্বীকার করল। আজ সঞ্জয়ের মনে জেদ চেপে গেছে, মূর্তি সে আজ নিয়ে যাবেই সে যেভাবেই হউক। সে বলল তােমায় আমি পাঁচ হাজার টাকা দেব মূর্তিটা আমায় দাও। বুড়াে গরিব মানুষ অতাে গুলাে টাকা সে একসাথে কখনাে দেখেনি, কাঁচুমাচু কবে শেষ পর্যন্ত রাজি হল। শুধু বলল মূর্তিটা সাবধানে রাখবেন বাবু৷ সময় মনের আনন্দে ঘরে ফিরে এসেছে, এসেই মূর্তিটাকে শােবার ঘরে সাজিয়ে রেখেছে।

মন তাঁর বেজায় খুশি, কিন্তু বিপদ বাড়লাে রাতে। ঘরের সব আলাে বন্ধ করে ঘর। অন্ধকার করে তবেই তাঁর ঘুম আসে । আলাে জ্বললে ঘুম আসে না। তাই সব আলাে বন্ধ করে ঘর অন্ধকার করে সে শুয়ে পড়েছে। হঠাৎ ঘুম ভাঙল ঠক ঠক আওয়াজ এবং মাঝে মাঝে খ্যাঁক খ্যাঁক বিদঘুটে একটা হাসি কালে আসছে। সে লাইট জ্বালিয়ে দিল, কিন্তু অবাক ব্যাপার কোথাও কিছু নেই। মনের ভুল ভেবে আবার লাইট বন্ধ করে শুয়ে পড়ল সে।

কিছুক্ষণ সব নিঃস্তব্ধ, হঠাৎ সেই ঠক ঠক আওয়াজ এবং মাঝে মাঝে খ্যাঁক খ্যাঁক বিদঘুটে হাসি। আওয়াজটা মূর্তির কাছ থেকে আসছে চোখ খুলল সে অন্ধকারেই মূর্তির দিকে তাকিম চমকে উঠল , একি মূর্তি টা আর মাটির মূর্তি নেই, যেন জীবন্তু হয়ে উঠেছে। চোখ তাঁর স্বল জ্বল করছে, বুড়ি ফোকলা দাঁতে খ্যাঁক খ্যাঁক করে তাঁর দিকে চেয়ে হামদ , আর তাঁর হাতের লাঠিটা দিয়ে মেঝেতে ঠক ঠক করে আওয়াজ করছে। সঞ্জয়ের পায়ের তলা থেকে মাটি সরে যেতে লাগল, সে বুঝতে পারলাে আর কিছুক্ষণ এভাবে চললে সে সঙ্গা হারাবে।

তাই মরিয়া হয়ে লাইটের সুইচ টিসল। আশ্চর্য মূর্তির কোনাে হেলদোল নেই, সে যেখালে থাকার সেখানেই আছে। পরপর বেশ কযেকদিন এইভাবেই চলল, অন্ধকার হলেই স্বালাতন শুরু , তাঁকে কোনওমতে ঘুমাতে দেইনা। এতাে মহা মুশকিল হল, বেড়াতে এসে একি বিসদ। আর কিছুদিন এভাবে চললে সে পাগল হয়ে যাবে। তাই সে ঠিক করল এই আপদকে বিদেয় করতেই হবে। তাই সে পরেরদিন মূর্তিটা নিয়ে দুটল হাটে লােকটার খোঁজে।

কিন্তু হাটে আজ লােকটা আসে নি। অন্য আর একজনের কাছে খবর নিয়ে জানতে পারে লােকটা কয়েক সপ্নাহ হাটে আসছে না তাঁর শরীর খুব খারাপ। তাঁর কাছে লােকটার। বাড়ির সন্ধান নিয়ে, সঞ্জয় তাঁর বাড়িতে উদয় হল। সত্যিই লােকটার শরীর খারাপ, তাঁকে দেখে বিছানা থেকেই সমস্থার করল। কি শরীর খারাপ বলল সঞ্জয়, লােকটা ঘাড় নেড়ে উওর দিল। আমি তাে তােমার খোঁজে হাটে গেছিলাম কিন্তু তােমায় না পেয়ে এখানে চলে এলাম।

লােকটা বলা গলায় বলল কি হয়েছে বাবু? আরে তােমার মূর্তির জন্য আমি আজ তিল চারদিন ঘুমাতে পারিনি। বাবু আমি তাে আপনাকে ঐ মূর্তিটা বেঁচতে চাইনি। তা যা হবার হয়েছে এবার তােমার মূর্তি তুমি ফিরিয়ে নাও বলল সঞ্জয়। বুড়াে হেসে বলল তা তাে আর হবে না বাবু৷ কেন হবেনা? বলল সঞ্জয়। সঞ্জয় মনে মনে ভাবল বুড়াে বােধহয় টাকাটা ফেরত দিতে হবে তাই বলতে হবেনা। সময় বলল ও টাকা তােমায় ফেরত দিতে হবে না, তুমি শুধু মূর্তিটা রাখাে। লা বাবু আমি তাঁর জন্য বলেনি।

এই মূর্তিটা আমার কাছে আর থাকবেনা, ঐ মূর্তি আর আপনার পিছু ছাড়বে না বাবু। সয় একটা ধমক দিয়ে মূর্তিটা রেখে বলল তােমার আজগুবি গল্প বন্ধ করাে। ফিরে এলাে সয়, কিন্তু সে জানতাে না কি ঘটতে চলেছে তাঁর সঙ্গে। ঘরে এসে রীতিমতাে স্নান খাওয়া দাওয়া সেরে যেই শােবার ঘরে ঢুকেছে চক্ষু স্থির হয়ে গেল তাঁর, মাথার ওপর। যেন আকাশ ভেঙে পড়ছে।

সে আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না। খাটের ওপর ঢস করে বসে পড়ল। এও কি সম্ভব, যে মূর্তিটা ঘণ্টা খানেক আগে ফেরত দিয়ে এসেছে , সেটা আগের মতােই সাজানাে রয়েছে শােবার ঘরে। সে মনে মনে ভাবল এক ভয়ঙ্কর বিপদ আসছে তাঁর।

সে স্থির করল কালই এখান থেকে চলে যাবে , দুটি কাটানাে অনেক হলাে। কিন্তু মূর্তি কি তাঁর পিছু ছাড়বে। সে তাে নমুনা পেয়েই গেছে। সঞ্জয় ভাবলাে মূর্তির থেকে মুক্তির উপায় বাড়িতে গিয়ে ভাববে। তাঁর আগে মূর্তিটার সম্বন্ধে সব কিছু জানা দরকার। তাই সে সকাল বেলায় ঘুম থেকে উঠে তৈরি হয়ে বেরিয়ে পড়ল বুড়াের সাথে দেখা করার জন্য।

বুড়াের শরীর আজ ভালােই আছে, উঠে বসেছে। সময়কে দেখে হাত জোড় করে বলল বসুল | বাবু বসুন, আমি জানতাম আপনি আবার আসবেন । সে দিন আপনি রাগ করে চলে। গেলেন। সত্যিই সেদিনের ঘটনার জন্য খুব লজ্জা পেল সময়। মনে মনে ভাবল আজ যে দুর্ভোগ পােহাতে হচ্ছে তাঁর জন্য কোনাে ভাবেই বুডােকে দায়ি করা যায় না।

সে তাে মূর্তিটা তাঁকে বেঁচতে চাইনি,সময় একপ্রকার জোড় করে কিনেছে। সঞ্জয় বলল আচ্ছা ঐ মূর্তিটা কচিল তুমি জানাে। আঙ্গে না বাবু তা জানিনা, তবে আমার বাবা বলতেন তিনি এই মূর্তি ছােট বেলা থেকে দেখলে, এর কোন পরিবর্তন নেই। তবে বাবু প্রথম দিন

আপনাকে বলেছিলাম যে এই মূর্তি টার একটা ইতিহাস আছে। আমার বাবার কাছ থেকে শােনা গন্তু, তিনি কোথা থেকে শুনে ছিলেন তা আমি বলতে পারবনা। অনেক কাল আগে এই গ্রামে একটা বুড়ি বাস করতাে। মাটির পুতুল মুখােশ তৈরি করে হাটে বাজারে বিক্রি করত, সম্ভবত এই মূর্তি তাঁরই তৈরি। বুডি সামান্য তন্ত্র মন্ত্বও যানতাে।

সেই সময় গ্রামে মরক দেখা দেয়, অনেকে তাঁর জন্য বুড়িকে দায়ি করে।বুড়িকে ডাইনি অপবাদ দিয়ে তাঁর বাড়িতে আগুন দেওয়া হয় এবং সেই আগুনে তাঁকে জ্যান্ত পুড়িয়ে মারা হয়। অনেকের বিশ্বাস এই বুড়ির আত্মা ঐ মূর্তির মধ্যে রয়ে গেছে।

পরবর্তীকালে এই মূর্তি কোনাে ভাবে তাঁদের বংশের কাবার হাতে আসে৷ আচ্ছা এই মূর্তিভাে এই কদিন আমাকে ঘুমাতে দেয়নি,তােমার বাড়িতে তাে অনেক দিন ধরে আছে, তাে তােমাদের জ্বালাতন করে নি। কি বলব বাবু প্রথম প্রথম ওর জ্বালাভনে আমার ঘবের কেউ ঘুমাতে পারতােনা।

আমার ছােট মেয়ে অনেকবার ভয় পাই রাতের বেলায়। একবার রাগে গজগজ করতে করতে আমার বউ বাড়ির বাইরে মূর্তিটা ফেলে দিয়ে আসে। কিন্তু ফেললে কি হবে ও মূর্তির একটা বিশেষত্ব আছে , যে সেচ্ছায় মূর্তিটা একবার আসবে, এই মূর্তি তাঁর পিছু ছাড়বে না, তাঁর নমুনা তাে আপনি দেখেছেন। তাই আমার গিন্নি।

যতবার ফেলে এসেছে রাতের বেলা আবার বাড়ির ভেতরে যথাস্থানে পেয়েছে। আমরা গরিব মানুষ বাবু, বাড়ি ছেড়ে তাে আর চলে যেতে পারিনা। এখন আমার বাড়ির সবাই তাকে মেনে নিচ্ছে, ও বুড়ি এখন আমাদেরই একজন হয়ে গেছিল। ওকে বাড়ির কেউ আর ভয় পেতােনা, ধাতে সয়ে গেছিল আর কি। তবে বাবু ও বুড়ির দোড় এখন ঐটুকুই, লাঠি দিয়ে ঠক ঠক করা আর খ্যাঁক খ্যাঁক করে হাসা।

ওটাই বা কম কিসের, ঐ বিদঘুটে হাসি, আর লাঠির ঠক ঠক আওয়াজ কালাে ঘুম হয়। এ মূর্তি থেকে তাঁর মুক্তি চাই বলল সঞ্জয়। বুড়াে বলল বাবু স্বেচ্ছায় যদি কেউ এই মূর্তিটা চাই আপনার কাছ থেকে তবেই এই মূর্তি আপনার পিছু ছাড়বে, তাঁর আগে নয়। অগত্যা, সঞ্জয় বুড়াের হাতে কিছু টাকা দিয়ে। বিদায় নিল।

তাড়াতাড়ি স্নান খাওয়া সেরে জামাকাপড় গােছাতে লাগল, বিকেলের ট্রেনে রওনা দেবে সে। সঞ্জয় ভাবলাে মৃর্তিটা সঙ্গে নিলেও সে যাবে, না নিলেও মূর্তিটা তাঁর সাথে যাবে, তাই কি আর করা যায়, ব্যাগের এক কোণে মূর্তিটা ভরে নিল সে৷ তাঁরপর সে যখন বাড়িতে পৌঁছালাে, এক অদ্ভুত বুদ্ধি মাথায় এলাে তাঁর। মূর্তিটা সে এবার শােবার ঘরে রাখবে না, মূর্তিটা রাখবে বাইরে বসার ঘরে।

এতে দুটো কাজ হবে, এক বুড়ির জ্বালাতন অনেকটা কমবে, আর দ্বিতীয়টা হল বাইরে থেকে কেউ এলে বাইরে বসার ঘরে বসতে দেয় সে। তাই মূর্তিটা কাবাের তা কারাের চোখে পড়বেই। হলও তাই একদিন তাঁর ছেলে বেলার বন্ধু মাধব রবিবার দুটির দিনে বেড়াতে এলাে। প্রায় আসে সে, দুই বন্ধু মিলে আড্ডা গল্প গুজব হয়। আজ মাধব এসেছে এবং বাইবের ঘৰে মূর্তিটা দেখছে।

কি সুন্দর মূর্তিটা ভাই কোথায় পেলি ? ভাই তুই তাে অনেক জায়গায় ঘুরে বেড়াস, এই ধরনের মূর্তি তুই আবার পেয়ে যাবি, তুই মূর্তিটা আমায় দে, যা দাম লেগেছে আমি দিয়ে দিচ্ছি। সঞ্জয় বিড়ম্বনায় পড়লাে, প্রিয় বন্ধুকে সত্যি ভা বললে সে বিশ্বাস করতে চাইবে। না,ভাববে মূর্তি দিতে হবে বলে সে গল্প ফাঁদছে। আবার না বললেও বন্ধুকে ঠকালাে হবে। অবশেষে অনেক ভেবে এখনকার মতাে সে পুরাে ব্যাপারটা চেপে গেল, মাধব মূর্তিটা নিয়ে চলে গেল।

কিন্তু সঞ্জয়ের মলে অনুশােচনা হতে লাগল, এটা সে কি করল। তাঁর বন্ধুকে ঠকালাে, এটা সে ঠিক কাজ করেনি। বেশ কয়েকদিন কাটার পর মাধবকে ফোন করল সে। ফোন তুলেই মাধব বলল ভাই খুব বিপদে আছি, একবার বাড়িতে আসতে পারবি। সঞ্জয় বিকেলের দিকে মাধবের বাড়িতে হাজির হল। এই কয়েক দিলে কি অবস্থা হয়েছে মাধবের।

চোখের তলায় কালি , শরীর রুগ্ন, চুল উসকোখুসখাে। মাধব বলল ভাই খুব বিপদে আছি। তুই বিশ্বাস করবি না ভেবে তােকে বলিনি। ভাই এই কয়েক দিন ঘুমাতে পারিনি, শুধুই কানে আসছে বুড়ির খ্যাঁক খ্যাঁক হাসি আর লাঠির ঠক ঠক আওয়াজ। সঞ্জয় বলল ভাই তুই আমাকে ক্ষমা কর, আমি সত্যিটা তােকে গােপন করেছি। সে মাধবকে সমস্ত কিছু খুলে বলল।

তারপর দুই বন্ধু মিলে এই মূর্তি থেকে নিস্তার পাবার উপায় খুঁজতে লাগল। উপায় তাঁরা একটা বের কল, সবের দিন অফিসে দুটি নিয়ে তাঁরা দুইজনে মূর্তিটা ব্যাগে ভরে বেড়িয়ে পড়ল বাসে চেপে। তাঁরা দুইজনে গঙ্গার ঘাটে উপস্থিত হল , মা পতিত পাবলি গঙ্গাকে প্রণাম করল এবং মনে মনে ভাবল মায়ের কোলে সবার মুক্তি এবং পাপনাশ হয়। তাই তাঁরা মূর্তিটা ব্যাগ থেকে বের কবে গঙ্গার জলে নিক্ষেপ করল এবং তাঁরা দেখল জলে পড়ার সময় বুড়ি সেই ফোকলা দাঁতে খ্যাঁক খ্যাঁক করে হাসছে।

Published by Story And Article

Word Finder

Leave a Reply

%d bloggers like this: