সেলস্ ম্যান- পরেশ নাথ কোনার

‘চাকরি টা পেয়ে গেছি মা’–আনন্দে ডগমগ হয়ে চিৎকার করতে করতে মেন গেটটা খুলে কিছু টা সামনের উঠোন পেরিয়ে ঘরে ঢুকলো অংশু।মা চিৎকার করে উঠলেন,’ওরে, জুতোটা খোল।কী না কী মাড়িয়ে এসেছিস।’ শব্দশুনে দিদি অর্চনা দোতলা থেকে ছুটে নেমে এলো।

খবরটাশুনে সে বললো , ‘যাক বাবা, এত দিনে ভগবান তাহলে মুখ তুলে তাকিয়েছেন।’ গোটা ঘরে একটা আনন্দের বাতাস বয়ে গেল।—– ‘জানিস দিদি ,আমি ও সৌরভ দুজনেই এক সঙ্গে এক ই কোম্পানিতে।’—— ‘ও মা , কী মজা। সৌরভ কে কতদিন দেখিনি।

একবার যেতে বলিস আমার বাড়ি।’অর্চনা দুদিন হলো বাপের বাড়ি এসেছে। মায়ের শরীর খারাপ শুনে খবর নিতে এসেছে। অর্চনারা বোলপুরে শ্রীনিকেতনের জামবুনিতে বাড়ি বানিয়েছে।কাল ই ফিরেযেতে হবে । অর্চনার স্বামী অনুপমের কাল অফিস আছে।


          অংশু ও সৌরভ দুজনেই খুব ভালো বন্ধু। দুজনেই একই কলেজে পড়াশুনা করেছে।একই সঙ্গে একই বিষয়েএম.এস.সি করেছে। অবশ্য বিশ্ববিদ্যালয় দুটি আলাদা।দুজনেরই পছন্দ শিক্ষকতা করা কিন্তু এস.এস.সি কিম্বা সি.এস .সি কোথাও কিছু করে উঠতে পারেনি।এ নিয়ে দু জনেই বেশ হতাশ। তাই অগত্যা প্রাইভেট ফার্মে চাকরি টানিতে হলো দুজনকেই।   

     সেলস্ রিপ্রেজেন্টেটিভের চাকরি।কত কত শিক্ষিতছেলে মেয়ে এই একটি চাকরির জন্য লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মাঝে মাঝে নিজের প্রতি, সমাজের প্রতি,এই সিস্টেমের প্রতি ঘৃণা ধরে যায়। নিজের অক্ষমতা,পাড়ারলোকের চাউনি,বিশেষ করে আত্মীয়দের টেরাটেরা কথাঅস্থির করে তোলে অংশু কে। তবু ভালো কয়েক শ ছেলেমেয়ের মধ্যে এই চাকরি টা ছিনিয়ে নিতে পেরেছে ওরা। 

        পূজোর সময় এলেই এই কোম্পানি গুলোর তৎপরতা বেড়ে যায়। সেলস্ এর উপর ইনসেনটিভ দেয়।ছেলে মেয়েরা গ্রুপ করে করে এক একটা এলাকায় বাড়ি বাড়ি গিয়ে সার্ভে করে এবং মাল বিক্রি করে। 

            সৌরভের দায়িত্বে আছে সিউড়ি ও বোলপুর। অংশু র রূপনারায়ণ পুর ও চিত্তরঞ্জন। সৌরভ ও তার টিম সিউড়ি শেষ করে বোলপুরে এসেছে।ঘুরতে সৌরভ অর্চনা র বাড়িতে পৌঁছে যায়। কলিং বেলের সুইচ টেপে।অর্চনা তখন রান্না ঘরে। রান্না ঘর থেকেই বলে — ‘আসছি’।

সৌরভ শুনতে পায় নি সে কথা তাই আবার বেল বাজায়।অর্চনা রেগে গিয়ে চিৎকার করে ওঠে, ‘কে,কে ?”এই ভর দুপুরে রোদ্দুর মাথায় কে আবার এলো।’—— ‘সেলস্………।খুলুন।’——– ‘অপেক্ষা করুন, গ্যাসে কড়াই চাপানো আছে।’মনে মনে বলে কী জ্বালাতন ই না করে এই শয়তানগুলো।——- ‘কিছু লাগবেনা’ ।——— ‘খুলুন, আমার কথাটা শুনুন একবার।’———- ‘শোনার কিছু নেই।’ 

মনে মনে বলে এই দুপুরে আসে জানে বাড়ি র পুরুষ সদস্যরা এই সময়ে বাড়িতে থাকে না।কোপ মারতে সুবিধা হবে। যতসব অল্প শিক্ষিত, অশিক্ষিত বেকার গুলো কে কোম্পানি গুলো বাজারে দিয়েছে নামিয়ে।               অর্চনা নাইটির উপর একটা ওড়না চাপিয়ে চুলটা একটু সেট করে বক্ বক্ করতে করতে দরজা খুলতেই সৌরভকে দেখতে পায়। অর্চনা অবাক হয়ে যায়।——– ‘এ কী !

সৌরভ তুই ?’———‘ হুঁ । এটি তোমার বাড়ি বুঝি ? আগে মিশন কম্পাউন্ডে ছিলে না ?’  —— ‘ সে সব কথা পরে হবে।আয়,আয় ভেতরে আয়।বস্। মুখটা একেবারে লাল হয়ে গেছে। ভেতরের ঘরে আয় , এ .সি . টা চালিয়ে দিই।’——–‘ না থাক, এই বেশ আছি।’——– ‘ তবে যে অংশু বলছিল কী যেন এগজিগিউটিভ—‘  সৌরভ মুখ নিচু করে বলে ,’ ঐ একই।সেলস্ তো।’  —– ‘বস্। সরবত করে আনি।’ 

       অর্চনা রান্না ঘরে ঢোকে। গ্লুকোজের প্যাকেট টা আর খুলতে পারে না। সৌরভের মুখটা দেখে অংশুর রোদে লাল হয়ে যাওয়া মুখ টা মনে পড়ে।সেওতো সৌরভের মতো ই ঘুরে বেড়াচ্ছে।সে যেমন সৌরভকে না দেখে ‘শয়তান’, ‘অশিক্ষিত’,ইত্যাদি নোংরা কথা বলেছে অংশু কে ও তো অন্যরা এক ই কু কথা বলে।

অর্চনা আজ বুঝতে পারে যারা সেলস্ ম্যান তারা কারো নাকারো ভাই, দাদা কিম্বা বাবা।বাধ্য হয়েই তাদের লোকের দরজায় যেতে হয়।আত্মগ্লানিতে অর্চনার চোখের জল আর বাগ মানে না। চোখের জলে অর্চনার ওড়না ভিজে যায়।।

ফেসবুক মন্তব্য

Published by Story And Article

Word Finder

Leave a Reply

%d bloggers like this: