স্মৃতিকথা – টুকিটাকি – বন্য মাধব

স্মৃতিকথা -   টুকিটাকি -  বন্য মাধব
আমার জন্ম ১০ নং কুমড়াখালি গ্রামে, অঞ্চলের নাম চড়াবিদ্যা, বাসন্তী থানা, সুন্দরবন, যদিও আমরা এখানের আদি বাসিন্দা নই, আমাদের আদিবাস ডিঙ্গাভাঙ্গা, শাঁকশহর, ভাঙ্গড় থানায়, ঠাকুরদা ঠাকুমা শেষ বয়সে এখানে আসেন, পাঁচ ছেলের দু’জন, আমার বাবা আর বড় জ্যাঠামশাই এবং আরেক ছেলে, মেজো জ্যাঠামশাই এর বড়ছেলেও এখানে বসবাস শুরু করেন। আরো জ্ঞাতিগুষ্ঠিও এসে একটা পাড়া, আটিপাড়া গড়ে তোলেন, অবশ্য আদি বাসস্থানও থেকে যায়, সেখানে অন্য ছেলেরা থেকে যান, ঠাকুরদার আরো একটা আবাদে জমিজমা ছিল, খোট্টার আবাদ, সেও ভাঙ্গড় থানায়।

মাঠভরা জমি, গোয়ালভরা গরু, পুকুরভরা মাছ আর বাগান ভরা গাছ আর বৎসরান্তে ঢাকঢোল পিটিয়ে মা অন্নপূর্ণার পূজো এই নিয়েই একটা সম্পন্ন চাষী পরিবার, আর সেই পরিবারে অংশ বংশ ধ্বংস হবার মুখে এই শ্রীমানের মর্ত্যে আগমন, মাননীয় পিতৃদেবের নবম সন্তান হিসাবে।আমাদের পাড়া লাগোয়া পাণিখাল, যেটা মূল বিদ্যাধরীর সঙ্গে স্লুইসগেটের সাহায্যে যুক্ত, জোয়ারে জল ঢোকে, 

ভাঁটায় বেরিয়ে যায়, আমরা খালের পাড়ে খেলি, মাছও ধরি, কাঁকড়াও, ভয়ও পাই, কারন খালপাড়ে দু’এক জায়গায় মড়া পোড়ানো হতো, আবার সামান্য একটু দূরে মামা ভাগিনার খালও ছিল, তার চরেও মড়া পোড়ানো হতো, আমরা যারা বাচ্চা ছিলাম, তাদের কাছে এসব জায়গায় যাওয়া রীতিমতো ভয়ের ব্যাপার ছিল।

গ্রামে ধর্মীয় উৎসবের সঙ্গে সামাজিক উৎসবও হতো, আবার সামাজিক উৎসবের মধ্যে ধর্মও ঢুকে থাকতো, যেমন পয়লা বৈশাখ, গাজনের সন্ন্যাসী হবার পাঠ চুকিয়ে আমরা পয়লা বৈশাখের জন্যে তৈরি হতাম, ঘরদোর, গোয়াল সাফসুতরো করা, আম পাড়া, কাঁচা হলুদ বাগান থেকে তোলা, নিমপাতা পাড়া, পুকুরে খ্যাবলা জালে তোলা মাছ কুড়িয়ে বালতিতে রাখা, আনন্দের কাজের শেষশুরু বলে কিছু ছিল না, শেষপ্রহরে নিমহলুদবাটায় একটু সরষের তেল মাখিয়ে বাটিতে দিয়ে দিত মা, 

গুরুজনদের পায়ে সেটা মাখিয়ে আশীর্বাদ নিয়ে বাদবাকীটা নিজেরা গায়ে হাতে পায়ে মুখে মেখে নিয়ে গোয়ালে ছুটতাম, বড়রা ততক্ষণে গাইগরুগুলোকে কপালে সিঁদুরের টিপ, শিং আর ক্ষুরে নিমহলুদ মাখিয়ে ফেলেছেন, ওনারা মা ভগবতী যে! বদলগুলোকে ভালো করে শিং আর ক্ষুরে পালিশ করা হয়েছে, বাচ্চাগুলোও বাদ পড়েনি, বড় জ্যাঠামশাইদের মোষ ছিল, সেগুলিও একই আদর যত্ন পেল, এবার খাল পুকুরে নিয়ে গিয়ে খড়ের নুড়ো দিয়ে সবাইকে গা ঘষে ঘষে পরিস্কারের কাজ হতো, গরুগুলোকে কসরৎ করে জলে নামানো হতো, আর মোষগুলো তো জল পেলেই আর উঠতে চায় না।

আর সবশেষে পেটপুরে খাওয়া, পয়লা বৈশাখের খাওয়া, নিমপাতা ভাজা দিয়ে যেটা শুরু হোতো আর শেষ হোতো কাঁচা আমের চাটনিতে।

ফেসবুক মন্তব্য

Published by Story And Article

Word Finder

Leave a Reply

%d bloggers like this: