স্মৃতির সরণি বেয়ে // তৃতীয় পর্ব // সুব্রত মজুমদার

12

আমার উপরে যার প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়েছে তিনি হলেন আমার মাতামহী বা দিদা। আমার দিদা হলেন তৎকালীন বিহারের বোকারো জেলার মেয়ে। বোকারো জেলার নূতনডিহি গ্রামে তার জন্ম। আমার মাতামহের দু’বার বিয়ে। প্রথমপক্ষের স্ত্রী এক ছেলে ও এক মেয়ে রেখে মারা যাওয়ায় মাতামহ আমার দিদাকে বিয়ে করেন। আমার দিদা সতীনের ছেলে মেয়েকে নিজের সন্তানের মতো মানুষ করেন। মৃত্যুর আগে পর্যন্ত আমার বড়মামা দিদাকে যথেষ্ট শ্রদ্ধা করতেন। বড়মামার উদ্যোগেই দিদা সারা ভারত তীর্থভ্রমণ করেন।

                      আমি এক বছর আট মাস বয়স হতে মামার বাড়িতে থাকতে শুরু করি। প্রধানত দিদার সাহচর্য্যেই আমার শৈশব অতিবাহিত হয়। দিদা ব্রাহ্মণের বিধবা, মাছ মাংস পেঁয়াজ রসুনের গন্ধও তিনি সহ্য করতে পারতেন না। আমিও নিরামিষই খেতাম। মাছ মাংসের আলাদা হেঁসেল ছিল। ভাত আর তরকারি রান্না হত নিরামিষে। আমার বড়মামার ছেলেকে আমি ‘ভাইয়া’ বলে ডাকতাম। ভাইয়া কেঁন্দুসরাইল হতে খাঁসির মাংস কিনে আনত।

পরিবারের তেরো-চৌদ্দ জনের সদস্যের জন্য কিলো তিনেক মাংস আনা হত। রান্নার পর মেজোমামা তেরো-চৌদ্দটা বাটি সাজিয়ে রেখে তাতে মাংস আর ঝোল চুলচেরা ভাগ করে দিতেন। এজন্য বাড়ির সবাই মেজোমামাকে ‘আমিন’ বলে পরিহাস করত। কারণ আমিনেরা যেমন জমিজমার সূক্ষ্ম ভাগ করেন মেজোমামার মাংস বণ্টনে তেমনি দক্ষতা ছিল।

                    দিদা একটু শুচিবায় গোছের। কারোর হাতে যেমন খান না তেমনি কারোর ছোঁয়াও পছন্দ করেন না। তবে প্রণামের প্রতি একটা দূর্বলতা আছে। একবার একজন লোক আমার মামার সাথে দেখা করাতে এলেন। তিনি যাবার সময় দিদাকে প্রণাম করলেন সষ্টাঙ্গে। দিদা তাকে প্রাণভরে আশীর্বাদ করলেন। লোকটা চলে গেলে দিদা কলতলায় স্নান করে কাপড় কেচে ঘর ঢুকলেন।

            দিদার বাবা ছিলেন  ঠিকাদার। রাঁচি হাজারিবাগ প্রভৃতি স্থানে রেলপথ নির্মানের জন্য জঙ্গল কেটে পথ তৈরি করতেন। তখনকার ব্রাহ্মণেরা কারোর হাতে খেতেন না। তাই তিনি দিদাকে নিয়ে যেতেন রান্নার প্রয়োজনে। এই জঙ্গলে থাকার সময় দিদা অনেকবার বাঘ দেখেছিলেন।

একবার হল কি দিদার বাবা শ্রমিকদের কাজ দেখতে সাইটে গিয়েছেন, এমন সময় দিদা একটা বোটকা গন্ধ পেলেন। জঙ্গলে এই গন্ধ খুবই স্বাভাবিক কারন জঙ্গলে বাঘের কোন অভাব নেই। কিন্তু গন্ধটা খুবই বেশি পরিমাণে আসছে। মনে হচ্ছে যেন নাকের কোষগুলো ছিন্নভিন্ন করে দেবে।

অস্থায়ী ঘরের টিনের দরজা, বাঘ যেকোন মূহুর্তেই ভেঙ্গে ফেলতে পারে। দিদা তখন তুলে নিলেন বন্দুক। জঙ্গলে যারা ঠিকাদারের কাজ করত তাদের আত্মরক্ষার জন্য বন্দুক রাখতেই হত। দিদা বন্দুক হাতে দরজা খুলে দেখলেন কিছু দুরেই কুসুম গাছের তলায় বাঘ বাবাজী পায়চারি করছে। ট্রিগার টানতেই গুলি বেরিয়ে এল সশব্দে আর সেই শব্দেই বাঘবাবাজী মারল টেনে দৌড়। বন্দুকের ধাক্কায় আমার দিদা পেছন দিকে উল্টে পড়ে অজ্ঞান।

                               অল্প বয়সে দিদার গানের গলা ছিল খুব সুন্দর। কিন্তু পরবর্তী কালে সংসারের চাপে আর গান বাজনা হয়নি। আমি তার খালি গলায় গাওয়া একটা গান মোবাইলে রেকর্ড করেছিলাম। জীবন সায়াহ্নে এসে বার্ধক্যজড়িত কণ্ঠের সেই গানেও যেন আলাদা একটা ফিলিংস আছে।

দিদার জ্যেঠামশাইয়ের ছিল রামায়ণ গানের দল, সেই দলে দিদা দোহারা ছিলেন। তারপর জ্যেঠামশাই মারা যেতেই দল ভেঙ্গে গেল। দিদার বিয়ে হল। দিদা এলেন দামোদর বরাকরের দেশ থেকে সোজা ময়ূরাক্ষী কোপাই দ্বারকার দেশে।  তিনি এলেন আর নিয়ে এলেন বোকারো-ঘাঘড়াবুড়ির পাড়ের অনেক উপকথা।

…. চলবে

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *