স্মৃতির সরণি বেয়ে // ৪ পর্ব // সুব্রত মজুমদার

0120

তন্ত্রে আছে দ্বারকা নদী যেখানে যেখানে উত্তরবাহিনী হয়েছে সেখানে সেখানেই সিদ্ধপীঠ, দেবী সেখানে সর্বদা অবস্থান করেন। দ্বারকা নদী দু’জায়গায় উত্তর বাহিনী হয়েছে, – তারাপীঠ ও দ্বারবাসিনী।  দ্বারবাসিনী আমার মাতামহের কুলদেবী এবং মা তারা আমার শ্বশুরমহাশয়ের কুলদেবী। দুই দেবীপীঠেই পৌরহিত্যের তথা সেবা পুজার সৌভাগ্য আমার হয়েছে।

                              দ্বারবাসিনীর প্রতিষ্ঠা নিয়ে অনেক মত প্রচলিত আছে। লোকপ্রবাদে আছে শিয়ারশোল স্টেটের সীমানা এখান পর্যন্ত। একটা মতে, দুটি রাজ্যের ( রাজা শাসিত) সীমানা বা দ্বারে অবস্থিত বলে দেবী দ্বারবাসিনী। বীরভূমের হেতমপুর স্টেটের রাজারা বহুদিন পর্যন্ত এই দেবীর সেবার ভার বহন করেছেন।

          সাঁওতাল বিদ্রোহের সময় দেবী সাঁওতালদের নির্মিত বাঁশের ছাতা ঢাকা থাকতেন। মন্দির নির্মাণের সাহস কোন রাজারই হয়নি। সর্বপ্রথম আমার বাবা দেবী দ্বারবাসিনীর ক্ষুদ্র আকারে মন্দির নির্মাণ করেন। বাবা পুলিশে চাকরি করতেন। বাবার এই কাজে বাবার ডিপার্টমেন্টের ডিএসপি সাহেব সহ অন্যান্য অফিসারেরা অর্থ ও শ্রমদান করেছিলেন। সেটা ছিল নিয়ম ভেঙ্গে নতুন কিছু করে দেখানোর উৎসাহ। পরে ওই মন্দিরে ভেতরে রেখে বড় আকারের মন্দির নির্মিত হয়।

                 আমি ছোটবেলায় যে গ্রামের পরিবেশ দেখেছি অনেক গ্রাম্যলোকের কাছেও তা কল্পনা। আদিগন্ত মাঠ, নদীর স্বচ্ছ জলে পেঁড়া মাছেদের অনায়াস বিচরন, গ্রাম্য রাখালের গাঁইতো পাল নিয়ে বাড়ি ফেরা – – আরো কত কি। উপনিষদে ঈশ্বরকে কবি বলা হয়েছে। সত্যিই তো তিনি কবি, এই সুন্দর মাঠ ঘাট বনানী একজন কবির কল্পনা ছাড়া আর কি !

                           শ্রাবণের কোন এক অপরাহ্নে যখন ঝিরিঝিরি বৃষ্টি সবুজ ধানের চারার উপর ঝরে পড়ছিল অতি আদরে তখনই বাঁড়ুজ্জেদের ঘরে আসে তাদের একমাত্র দৌহিত্র। হাসপাতাল অনেকটাই দূরে, তাই তারা গরুর গাড়িতে রওনা হলেন প্রসূতিকে নিয়ে। কিছুটা যাবার পর একটা গ্রাম পড়ে – – দেবগ্রাম। দেবগ্রাম ঢোকার মুখেই ব্রাহ্মণী নদী। নদীগর্ভ পেরোতেই প্রসব হল। গরুর গাড়ির জোয়ালের যে বাঁশ তার ধারালো অংশ দিয়ে নাড়ি কাটা হল। বড়োরা বললেন, “শিশু রথে জন্ম নিয়েছে, জন্মে শনি রাহু ও কেতু তুঙ্গস্থ এবং বৃহস্পতি স্বক্ষেত্রী।

এ শিশু বড় হয়ে খ্যাতিমান হবে।”

          খ্যাতি কপালে জোটেনি, বরং মানুষের বিশ্বাসঘাতকতার বলি হয়েছি বহুবার। কেউ কথা রাখেনি। তবে তিনি রেখেছেন। তিনি কে আমি জানি না, জানার চেষ্টাও করিনি। তবে যখন আমি যে সমস্যায় পড়ি, যে কষ্টেই পড়ি তিনি অলক্ষ্যে আমার সমস্ত ক্লেশ দূর করে চলে যান নিঃশব্দে।

                    আমার স্মৃতিকথার পাঠক যদি ভেবে থাকেন যে আমার অন্যান্য লেখার মতো এতেও রস পাবেন তবে তিনি ভুল ভাবছেন। সাহিত্য হল কল্পনার ফসল, এতে রসের উৎস্রোত থাকে। পাঠক পান করে তৃপ্তি লাভ করেন। আর জীবন হল নিরস ঝামা পাথরের মতো, হাজার বছর জলে রাখলেও শুকনোকে শুকনোই থেকে যায়।

          আমি জীবনের পাঁচটা বছর বই-শ্লেটের মুঠো দেখিনি। মামার সাথে মাঠ দেখতে যেতাম। লখিজোল, মাইশুলি, রাজারবেড়া, ফাঁসিডাঙ্গাল আরো কত নাম জমিগুলোর। উঁচু জায়গা বলে ধান হত বছরে একবার, বর্ষার সময়। ধান মাঠে জমে থাকা জলে আর পাশের সেচডোবাতে মাছ ধরতাম। চ্যাং, চিমুড়ি, শোল, পুঁটি – – কত রকমের মাছ।

                 নদীর ধারে বসে থাকতাম ঘণ্টার পর ঘণ্টা। কি সুন্দর ছিল সেইসব দিনগুলো। স্বল্প পরিসরে সব লেখা সম্ভব নয়। যদি বেঁচে থাকি আর যদি কোনোদিন জীবনী লেখার যোগ্যতা অর্জন করি তবে লিখব সেইসব মুছে যাওয়া দিনগুলোর কথা।

… চলবে

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *