হাজাম : ফজলুল হক

ছেলেটি হাতের ইশারায় দেখাল , এইদিকে । 

হতে পারে সেটি জাহাঙ্গীরের বাড়ি । জানি না । ওর সাথে ঘনিষ্ঠতা থাকলেও আমি ওর বাড়ি আসিনি  কোনোদিন । প্রয়োজনে এই কাজটি আমার ছোট ভাই করত । আমাকে পথ দেখিয়ে নিয়ে চলে কিশোরটি , কোনটি জাহাঙ্গীরের বাড়ি তুমি জানো ? ছেঁড়া প্যান্ট, নিরাবরণ শরীর, এই বয়সে তার শরীরের গঠন মুগ্ধতা বাড়িয়ে দেয় ।

ওর অপরিচ্ছন্ন হাত, মুখ,বুকের মাপ,কোমর একজন স্বাস্থ্যবান যুবকের বিজ্ঞাপনকে হার মানায় । ওর চোখ এক আশ্চর্যময় রহস্যে ভরা । স্বপ্নের আবেশে নীল উড়ানের অপেক্ষা । আর ওর অপরিপাটি সোনালি চুল গোলাকার মাথায় আভিজাত্যের পরিচয়  বয়ে চলেছে । সিংহভাগ ছেঁড়া প্যান্টের ভিতর বলিষ্ঠ পবিত্র শিশ্নটি দেখে আমার হাসি পায় । ও বুঝতে পারেনি , সে সমনের ঘরটির ভিতরে দৌড়ে  ঢুকে গেলে,আমি তার পেছনে ধীর পায়ে ।

একটি লম্বা ঘর , খোলা বারান্দা , খোলা লম্বা-চওড়া উঠোন । খড়ের চাল, আকাশ দেখা যায় । বাতাগুলি গোনা যাচ্ছে ।  বারান্দা ঘেঁসে নোংরা দুর্গন্ধময় জল গড়িয়ে বাইরে রাস্তায় মিশেছে । রাস্তার দুইপাশে আর্বজনার স্তুপ । কুচকুচে কলো মাটির কানা ভাঙা হাড়ি,কলসি,পলিথিন পেপারের রাশ ,এমন ই এক অপরিচ্ছন্ন, অস্বাস্থ্যকর  পরিবেশে এই সমৃদ্ধশালী গ্রামটির প্রান্ত সীমায় কয়েকটি পরিবারের বসবাস । জাহাঙ্গীর তাদের অন্যতম । পরে এই তথ্য জানার সুযোগ হয়েছিল ।  

কয়েকটি মুহূর্ত, ছেলেটি জাহাঙ্গীরের হাতের আঙুল ধরে টানতে টানতে নিয়ে আসে আমার সম্মুখে । জাহাঙ্গীরের চোখ বড় বড় । আমার অপ্রত্যাশিত উপস্থিতিতে বিস্ময় বোধের ছবি ফুটে উঠেছে মুখ মণ্ডলে  । আমি তাকে খালি গা , জাঙ্গিয়ার ওপর গামছা পরা দেখে কিছুক্ষণের জন্য হলেও বোবা হয়ে যাই । পরে বোকার মতো প্রশ্ন করে বসি , এটা তোমার বাড়ি ? 

আসলে মেলাতে পারছি না ।যে মানুষটা আমাদের ঘরে যখন পাম্প মেরামতের কাজ করতে যায় , তখন তার পোশাক, কথাবার্তা, চালচলন কোনোটার  সাথে আজকের ছবিটা মিলছে না । এই ভাঙাচোরা ঘরে তাকে বেমানান ঠেকছে ।

তবুও আমার এই প্রশ্নটা করা উচিৎ হয়নি । বিরক্তিপূর্ণ কিছু অশ্লীল শব্দ নিজের  আচরণের প্রতি মনের ভিতর থেকে বেরিয়ে আসতে চাইছে ।কিন্তু শব্দে নয়, নীরব উচ্চারণ করি । মনে হল তবুও নিজেকে  শেষ পর্যন্ত ক্ষমা করা গেল না । জাহাঙ্গীর আমার হাত ধরে , গরিব মানুষের ঘর আবার কেমন হবে ভাই ? 

তার হাতের স্পর্শ যেন নাভির মর্মমূল থেকে ভালবাসার বন্ধন পরিপূর্ণ করে তোলে । যেন জন্ম জন্মান্তরের স্নেহ-আদরের সুখ ,যেন  পবিত্র সম্পর্কের নির্যাস যা স্বজনরা দিয়ে থাকে । এমনটাই মনে হল আমার । 

তোমার আব্বু বলেছিল, খড় বাঁশ দেবে , কিন্তু কী করে আনব , গাড়ি ভাড়া পাব কোথায় । আনতে পারলে চালটা ছোয়ানো যেত । 

আমরা বারান্দায় এলাম ,ও তখন ব্যস্ত হয়ে পড়ল । আমাকে কীভাবে আদর যত্ন করবে , কী খাওয়াবে এই চিন্তায় তার কপালের রেখাগুলি ছবি হয়ে ফুটে উঠছে আমার চোখে । তার অস্থির চলাফেরার মধ্যে ডাক দিল, শাহজাহান ও বেটা ইধার আউ, একটা তালাই লে আউ , চাচা এসেছে , মেহমান ,জলদি । 

ওর মুখে আধা হিন্দী আধা বাংলা আর ওর ছেলের নাম উপভোগ করছি । কিন্তু বারান্দায় পা রাখা যায় না । গোটা শরীর ঘিন ঘিন করে । গোটা বারন্দাময় হাঁস-মুরগির মল, ছাগল লাদি, আখের খোসা, ছোলা কলাই এর চোকা-ডাল , তেঁতুল বীজ, বারান্দায় এক কোণে হাঁস-মুরগির ‘দরমা’ (খোয়াড়) সেখান থেকে ভেসে আসা পচা দুর্গন্ধ , বমি পাচ্ছে আমার । 

তখন ই তার ছেলে একটি সুন্দর শীতলপাটি নিয়ে আসে । জাহাঙ্গীর সেটি ঐ অপরিচ্ছন্ন মেঝেয় পেতে বলে , তোমার ভাবি ,আমার বউ বুনেছে ভাই । বসো ,আমার হাত ধরে বসায় । তারপর অন্য হাতটি ধরে বলে , কী ব্যাপার বলো তো ভাই । 

আমি ভাবছি এত সুন্দর শীতলপাটি ,সুক্ষ্ম হাতে নিপুণ শিল্পকলা , যার ব্যবহার এইভাবে ? বললাম , জলের পাম্প খারাপ , তোমাকে যেতে হবে আব্বু তোমাকে আজই যেতে বলেছে । 

অ অহ , তো একটা ফোন করে দিলেই হতো । 

তার কাছে বিষয়টির কোনো গুরুত্ব নেই  । যেন কিছুই হয়নি । বললাম, না না এদিকে একটা কাজ ছিল , তাই তোমার ঘরে  এসে বলে গেলাম । 

সে একজন ভাল পাম্প মিস্ত্রী । নাম ডাক আছে । আমার বাবা তাকে ছাড়া অন্য কোনো মিস্ত্রী কাজে লাগাবে না । সে আসে দশ বারোদিন ধরে মেসিনের কাজ করে । আমাদের বাড়িতে থাকে । বাবা তাকে আদর যত্ন করে খাওয়ায় ।

তল্লাটের লোক তাকে বেশ রসিক বলে চেনে । সে চিৎকার করে ডাকে, আকবর ও বেটা আকবর । শাহজাহানের থেকে একটু বড় আকবর এসে দাঁড়ায় বাপের সামনে । সে তার হাতে পাঁচ টাকার একটি কোয়েন দিয়ে বলে, যা বেটা চা  চিনি লে আউ । চাচাকো চা পিলা দো । 

শাহজাহান , আকবর  নাম দুটি শোনার পর আমি তার মুখের দিকে তাকালাম । সে হয়তো অনুমান করতে পরেছে  আমি কী ভাবছি , আচ্ছা তোমার কয়টি ছেলে মেয়ে ভাইজান ? 

ওর ঠোঁটের কোণে হাসি । ওর মুখমণ্ডলে ফুটে ঊঠেছে গর্বিত পৌরুষের অহংকার । গলার স্বর গম্ভীর, সাত লেড়কা ভাই , লেড়কি নেই হ্যায় । উয়াদের নাম শুনবে ভাই , শাহজাহান , আকবর, হুমায়ুন, বাবর , আলমগীর, আর ছোট’র নাম শের শা , শের কা বেটা শের । গর্বিত উচ্চারণে ছাতি ফুলে ওঠে । 

তবে আফসোস কি বাত , একটা মেয়ে হল না । আল্লার কাছে কত কেঁদেছি , হে আল্লা একটা লেড়কি দাও, পাথরচাপরির দাতা সাহেবে মাঝারে মানত করেছি মেয়ে হলে দু’টো খাসি দেব । কাল রাতে বেদনা উঠেছিল , হাসপাতালে ভর্তি করেছি ,দেখি এবারে কী হয় । মেয়ে না হলে বাপ মায়ের কদর কে করবে ? মরার সময় মাথার শিতেনে কে কাঁদবে ভাই ? 

তার নির্ভিক সরল উচ্চারণে অবাক হয়ে তাকে দেখছি , আমার শাশুড়িকে নিয়ে এসেছি , রাঁধা বাড়া করতে , তোমার ভাবি এলেই চলে যাবে । ওই দেখ । আঙুল তুলে দেখাল উঠোনে ফাঁকা উনুনে শুকনো শালপাতা পুড়িয়ে রান্না করছে এক বৃদ্ধা ।গায়ে একটি কামিজ, কোমরে ঘাগরা । সেই সময় বুড়ি  উঠে বারান্দার চালে যে ক’টি খড় লেগে ছিল , সেগুলো টেনে নিয়ে আবার উনুনের পাশ রাখল ।

পাশে একটি কানা ভাঙা মাটির ঢাকনাহীন কলসি । তার মধ্যে হাত ঢুকিয়ে আঙুলগুলো পরিষ্কার করে আমার দিকে বিরক্তি নিয়ে তাকিয়ে মুখ ফিরিয়ে বসল । এর মধ্যে জাহাঙ্গীর কত কথাই না বলে চলেছে । বললাম, এবার যদি তোমার মেয়ে না হয়ে ছেলে হয়  তো কি নাম রাখবে ? 

সে সব ঠিক করা আছে ভাই , ছেলে হলে নাম রাখব,  ঔরাঙ্গজেব খলিফা কা বেঠা খলিফা । খলিফা বুঝ ভাই ? বাদশা । আমরা খলিফা আছি । লোকে আমাদের বলে হাজাম ।খতনা দেয়ার কাজ করি তো ।  

 হাজাম ! চমকে উঠি । ছেলে বেলার স্মৃতি ভেসে ওঠে । হাজাম নামের এক বিশাল দৈত্যের মতো শরীর নিয়ে এক আতঙ্কের ছবি দৃশ্যমান হয় । আমার মায়ের কন্ঠস্বর শুনি , ও বাপ ওঠ । তখন কত বয়েস সাত আট । মনে আছে, ভোর বেলা , আমার নানি বলছে ওঠ ভাই বিয়ের সময় হল যে । বলেছিলাম না পঙ্ক্ষীরাজ ঘোড়া আসবে , লাল ‘পাখ’ আসবে । ওঠো ওঠো । 

সাতদিন আগে থেকেই তার প্রস্তুতি চলছিল , হুবহু বিয়ের মতো ,যেমনটা হয়ে থাকে । গায়ে হলুদ, পাড়া প্রতিবেশীর নাচ গান । শেষ রাতে ক্ষীর খাওয়ানো ।  আর ভোর রাতে বিয়ে । কয়েকজন লোক , একজনের হাতে মশাল, আর একজনের মাথায় খড় কাটা ।

ছানি’র (গরুর খাবার) বস্তা । সেই বস্তার ওপর আমাকে বসাবে । তারপর লম্বা গোঁফ অলা লোকটা কুচুং করে  আমার সোনার চামড়া কেটে নেবে । আমি কেঁদে পাড়া জড়ো করে দিয়েছিলাম । কালো কুচকুচে লোকটাকে অশ্লীল গালি দিয়েছিলাম । জাহাঙ্গীর বলে চলেছে ।

হাজাম মানে নাপিত । তবে এরা নাপিত নয় । এরা কেবল শিশ্নের অগ্রভাগের চামড়া কেটে সুন্নত দেয় । খ্রীষ্ঠ জন্মের পাঁচ হাজার বছর আগে হজরত ইব্রাহিম নিজের হাতে নিজের সুন্নত দিয়েছিলেন । তখন থেকে এই প্রথা মধ্যপ্রাচ্যে চলে আসছে ,  এটাই অনুসরণ করে ইসলাম ধর্ম অবলম্বী মানুষ ।

জাহাঙ্গীরের সাত ছেলে , শেষেরটি হব হব করছে ছেলে অথবা মেয়ে হতে পারে । জীব দিয়েছেন যিনি আহার দেবেন তিনি এই কেলেণ্ডারটি মাথার উপরে ঝুলিয়ে রেখে এতগুলো সন্তানের জন্ম দিয়েও সে ক্লান্ত নয় , তার আশা মেটেনি , আভাব তাকে স্পর্শ করেও করে না । মেয়ের আশায় দিন গুনছে । মাথার শিতানে মরণ কালে কাঁদবে বলে । 

খতনা দিয়ে পেট চলে না আজকাল , বেশির ভাগ মানুষ তাদের সন্তানকে নিয়ে হাসপাতালে যায় । আজকাল ডাক্তার রা খতনা দিয়ে দেয় । অনেক নিরাপদ । তাই বিকল্প হিসাবে পাম্পের কাজ করা । অথচ এমন একদিন ছিল , তার আব্বাজানের দুই’শ বাহান্ন খান গ্রাম ছিল । রোজগার যা হতো সারা বছর দুহাতে খরচ করেও জমতো কিছু । আর তখন মানুষ দিতে জানত । জাহাঙ্গীর জোরে শ্বাস নিয়ে আমার দিকে তাকায় ।

ল গাঁয়ের দাউদ মোড়ল তো বেল পুকুর’ট দিয়ে দিল , বললে , যা জাহাঙ্গীর ঐ পুকুরে হাত ধুয়ে আয় । আর আমনি আমি লেচে-লেচে হাত ধুতে চলে গেলাম । কেন জানো ভাই , ঐ পুকুরটা সেইদিন থকে আমার হয়ে গেল ।  এটাই ছিল নিয়ম  । মুখেই ছিল রেজিস্ট্রি অপিস । কতনার সময় ক্ষুর ,কাচি  যে থালাটা দিত সেটাও আমার । ওইখানে তালাই , কাঁথা , লেপ  যা থাকত সব আমার । মানে খলিফাদের ।

কত যে থালা বাসন ছিল বাপের আমলে ;অভাবে সব আবার বিক্রী করে দিলাম ভাই । গ্রাম গুলো অর্ধেক বিক্রী  করে দিলাম আমার চাচাকে । দেনার দায়ে গ্রাম ও বিচা-কিনা হতো । ওই যে সামনের দালান বাড়িটা দেখছ , আমার চাচার , ওরা এখন পাচ’শ গ্রামের যজমান । ওদেরকেই বিচে দিলাম । এ গ্রামে দুঘর হাজাম । চাচর বেটারা লেখাপড়া করে চাকরি করে আবার এ কাজও করে ।  

স্মৃতিমেদুর জাহাঙ্গীর কোথায় যেন হারিয়ে যায় । তখন আকবর দোকান থেকে চা চিনি কিনে এনে বাবাকে বলল, এ বাপ লে । জাহাঙ্গীর বাস্তবে ফিরে আসে । হাতের  ইশারায় তার শাশুড়িকে দিতে বলে ।কিছুটা ভয়ে সে মুখে কিছু বলল না , বুড়ি রেগে যেতে পারে , উপায় নেই বাড়িতে মেহমান এসেছে ।

আকবর ছুটে তার নানির কাছে যায় । আমার অস্বস্তি বেড়ে যাচ্ছে । কেমন করে এই অবাঞ্ছিত অবস্থা থেকে রেহাই পাব ভাবছি ।সেই সময় আর একজন নয় দশ বছরের কিশোর কোলে একটি শিশু ও হাত ধরে একটু বড় ছেলেকে জাহাঙ্গীরের কোলে বসিয়ে ছুটে পালিয়ে যাবার সময় বলল , লে সামাল , আমি আর লারছি । 

ছোট শিশুটি বাপের কোলে বসে তার পরনের গামছা টানতে থাকে । ওকে দেখিয়ে সে বলে , এটাই সবার ছোট । 

ওদিকে বুড়িকে ভাতের  হাড়ি নামিয়ে চা করতে হবে জেনে বিকৃত মুখে হিন্দীতে কী সব বলছে, আমি বুঝতে পারছি না । পাশে একটা ঝুড়িতে আনাজ কাটা ছিল , মুরগিতে সেগুলো ছড়িয়ে ছিটিয়ে ঝুরি উল্টে ফেলে দিল । বুড়ি রাগে চিৎকার করে উঠল, গালি গালাজ করল । সামাল দিতে জাহাঙ্গীরকে উঠতে হল ।

সে যাবার পর ছেলে দুটি আমার জামা ধরে টানাটানি শুরু করে , একজনের মুখে অদ্ভুত হাসি । মুখমণ্ডলে ছোপ ছোপ দাগ, খাবার পর মুখ না ধুলে এমন দেখা যায় । অন্য একজন যার নাম আকবর সে পিছন দিক থেকে আমার কাঁধে চাপার চেষ্টা করছে । তার পায়ের আঙুল আমার প্যান্টের কোমরপট্টির ভিতর ঢুকবে এবার ।

কিছু বলতে পারছি না । ওদের নোংরা হাতের দাগ লেগে যাচ্ছে জামায় । আমি জাহাঙ্গীরের অপেক্ষা করছি । তার মধ্যে ছায় সাত বছরের একটি ছেলে ছুটে এসে আমার জামার পকেটে হাত ভরে দেখে টাকা  আছে কি না  । আমি সাধারণত প্যান্টের পকেটে রাখি ।   এমন অবাঞ্ছিত সময়ের নির্দয় অত্যাচারের হাত থেকে রক্ষা পেতে কয়েকটি কোয়েন ওর হাতে দিলাম । পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হল ।  স্থির করলাম ,আর এক মুহূর্ত এখানে নয় । 

মুহূর্তক্ষণ পরে  মনে হল,যাপনের এই শ্বাসরোধকারী অন্ধকার অজান্তে ওদের জীবনের সাথে মিশে গেছে । আলোকিত জীবনের সন্ধান করার অবকাশ কোথায় । দুপুরের খাবারের পরে রাতের খাবারের কোনো নিশ্চয়তা নেই । তবুও জাহাঙ্গীরের মুখে হাসিটি লেগে থাকে । এতগুলি সন্তানের পরও সে একটি মেয়ের জন্য প্রর্থনা জানায় । ও ফিরে এলে বলি, আমি আজ আসি , আন্যদিন চা খেয়ে যাব । তুমি বরং আমাদের বাড়ি যেও তাড়াতাড়ি ।

তার চোখে মুখে বেদনার ছাপ স্পষ্ট হয়ে ওঠে ,  না, না ভাই তাই হয় । তুমি প্রথমবার আমার ঘরে এলে , এক কাপ চা না খেলে – আমরা গরিব মানুষ , আর কি খাওয়াবো ভাই । তুমার ভাবি থাকলে , এক’ট মুরগি জাবাই করে বিরিয়ানি করতাম । আমার শাশুড়ি বুড়ো মানুষ  :

আমি তাকে স্বান্ত্বনা দিই , তোমাকে ব্যস্ত হতে হবে না , চা খবার দিন তো পেরিয়ে যাচ্ছে না । ভাবি আসুক পরে একদিন না হয় বিরিয়ানি খেয়ে যাব ।  উঠে দাঁড়ালাম । সঙ্গে সঙ্গে সে আমার হাত ধরে টেনে বসিয়ে বলল, জানি ভাই আমার ঘরে তোমার ভাল লাগছে না । লাগবেই বা কী করে । তবে তোমার ভাবি থাকলে দেখতে সব পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকত । আমাকে বলতে হত না । তার আগেই চা চলে আসত । তুমি চলে গেলে আমি খুব কষ্ট পাব ভাই , এক কাপ চা বৈ তো নয় । 

 আমি বসতেই ও বলল, বিড়ি খাবে ভাই ?

না আমি বিড়ি খাই না ।

আমরা গরিব মানুষ সিগারেট কেনার পয়সা কোথায় ?

আরে না না আমি সিগারেট খাই না ।  

ছেলে দুটো আবার দপাদপি শুরু করেছে পিঠের ওপর । সে সব দেখে  দু থাপ্পর মারে । ওদের মধ্যে ছোটটি কাঁদতে কাঁদতে নানির কাছে চলে যায় ।

শালা ছেলে পুলে হওয়াও জ্বালা না হওয়াও জ্বালা । আমার অবস্থা দেখে সে লজ্জায় মাথা নিচু করল । বললাম , আরে না না ছোট ছেলেরা ওরকম একটু হয় । তুমি বরং ওদের নিয়ে চা খেয়ে নিয়ো । আমি এখন আসছি । কথাটা বলতেই দেখলাম সে কেমন অসহায় বিষাদ ভরা বিপন্ন চোখে আমার দিকে তাকাল । নির্বাক সেই চোখের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারি আমার  চায়ের অনিচ্ছা তাকে ভীষন ব্যাথা দিয়েছে । আমাকে চা খাওয়ানোর মধ্যে রয়েছে তার আকাশ ভরা তৃপ্তি । আমি আর উঠতে পারলাম না , বেশ তবে একটু তাড়াতাড়ি কর । 

ওর চোখে আবার খুশি দেখলাম ।

ঠিক তখন ই আকাশ ফাটানো কান্না । রান্না যেখানে হচ্ছিল সেখানে চোখ গেল, দেখলাম  একটি ছেলেক এক হাতে তুলে ধরে অন্য হাতে থাপ্পড় মারছে বুড়ি । হিন্দী বাংলা মিশিয়ে কি সব বলছে তারু একটি শব্দও বুঝলাম না । শুধু দেখছি ছেলটি লাফাচ্ছে আর আর্তনাদে ফেটে পড়ছে । 

 ওই ছেলেটি ,একটু আগে যে ছেলেটি বাপের মার খেয়ে কাঁদতে কাঁদতে তার নানির কাছে গিয়েছিল , জানতে পারি , সে কীভাবে ফুটন্ত চায়ের হাড়িতে পা ঢুকিয়ে ফেলেছে । চায়ের হাড়ি উল্টে তার দুটো পায়ে গরম চা । সেই রাগে বুড়ি ছেলেটাকে মারছে । 

ততক্ষণে দেখি বাচ্চাটার পা দুটো লাল হয়ে উঠেছে । আর ও পায়েই লাফাচ্ছে , চিৎকার করে কী বলছে বোঝা যাচ্ছে না । ওর ক্ষত যে মারাত্মক সেটা বুঝতে পারি । জাহাঙ্গীরকে বলি , কাছেই তো হাসপাতাল , চল,ওকে নিয়ে যাই ।  

সে আমার দিকে অপরাধীর মতো তাকিয়ে থাকল কিছুক্ষণ । পরে ছেলেটিকে কোলে নিয়ে হাসপাতাল দিকে রওনা দিল । 

জলুল হক// সম্প্রীতি// হেতমপুর // বীরভূম-৭৩১১২৪ //

ফেসবুক মন্তব্য

Published by Story And Article

Word Finder

Leave a Reply

%d bloggers like this: