হোটেলে হাহাকার /// চতুর্থ পর্ব // সুব্রত মজুমদার

10

এখানেই সাসপেন্স মাই ওল্ড ফেলো। “

অঘোরবাবু বিছানার উপর ধপ করে বসে পড়লেন। তারপর বললেন, ” আপনার সঙ্গে এসে অব্দি সাসপেন্স তো কম দেখলাম না মশাই, আমার থ্রিলার উপন্যাসেও এত সাসপেন্স থাকে না। তবে মশাই, ফিরে গিয়েই লিখতে বসব। গুছিয়ে নিয়েছি মনে মনে, বেস্ট সেলার নভেল। “

বিক্রম বলল,” সে নাহয় হবে, কিন্তু এখন তো দক্ষিণ হস্তের কাজটা সমাধা করতে হয়। ওবেলা বড্ড দেরি হয়ে গেছে। এখন তাড়াতাড়ি খেয়ে শুয়ে পড়তে হবে। চলুন। “

এবার বিক্রমের আবাক হওয়ার পালা। অঘোরবাবু একটা পলিব্যাগের ভেতর হতে কয়েকটা রুটি আর তড়কার পার্শেল বের করলেন।   ” আমি আমার খাবার কিনে এনেছি। ফ্রির খাবারে আমি আর নেই মশাই। “

বিক্রম আর কথা বাড়াল না। সে ডাইনিং হলের দিকে রওনা হল। রাতের রান্নাটাও দারুণ হয়েছে। পটলের রসা, ডিমের ডালনা, আলুপোস্ত, মুগের ডাল আর চাটনি। আলুপোস্তটা সম্ভবত দিনের। বিক্রম খেয়েদেয়ে যখন রুমে এল তখন অঘোরবাবু ঘুমিয়ে পড়েছেন। নাক ডাকার আওয়াজে সিলিং ফ্যানের আওয়াজ ঢাকা পড়ে যাচ্ছে। বিক্রম শুয়ে পড়ল।

                         পরদিন ভোরবেলায় স্বর্গদ্বারের রাস্তায় দেখা গেল দুজন বৃদ্ধ ভদ্রলোক লাঠি হাতে গল্প করতে করতে বায়ুসেবন করছেন। একজনের মাথায় বিশাল টাঁক আর উপরের ঠোঁটটি ঢাকা দেওয়া পুরুষ্টু গোঁফ। আর অন্য বৃদ্ধের একমাথা সাদা চুল ব্যাকব্রাশ করা। দুজনের পরনেই সাদা ধুতি পাঞ্জাবী। টাঁকমাথা বৃদ্ধ অন্য বৃদ্ধকে বললেন, ” এই যে ঘোষালবাবু, অত ধীরে ধীরে হাঁটলে হবে ! চলুন একটা গাড়ি দেখি। সকাল সকাল না বেরোলে উদয়গিরি খণ্ডগিরি দেখতে বেলা হয়ে যাবে যে।”

ঘোষালবাবু একটা পান মুখে চালান করে দিয়ে বললেন, ‘ আর মশাই, আপনার আর কি যা কেলো হচ্ছে তো আমার। পঁয়ষট্টি বছর বয়স হল মশাই বহুরুপী সাজতে হয়নি কোনোদিন।”

টাঁকমাথা বলল, ” কি হচ্ছে কি ! এখন আমি জটাধর সাহা আর আপনি ত্রিশূল ঘোষাল। ক্যারেক্টার থেকে বেরোবেন না। গাড়ি বলা আছে, এক্ষুনি চলে আসবে। “

      গাড়ি এল। এসি কার। দুইবৃদ্ধ গাড়িতে চড়ে বসলেন। গাড়িটা রওনা হতেই আরেকটা গাড়ি পিছন পিছন ফলো করতে করতে চলল। ব্যাপারটা নজরে পড়তেই ঘোষালবুড়ো  চাপা গলায় বলে উঠলেন,” আপনার ছদ্মবেশে কোন লাভ হল না মশাই। পেছনে দেখুন, একটা গাড়ি সেই শুরু থেকে আমাদের ফলো করছে। কি যে হচ্ছে মশাই আমার মাথায় তো কিস্যু ঢুকছে না।”

  সাহাবুড়ো বলল, ” মাথা কোনোদিন খাটিয়েছেন যে মাথায় ঢুকবে। ওসব অগ্রাহ্য করুন। প্রায় ঘন্টা দেড়েকের রাস্তা মাঝে কোথাও নেমে একটু চা খেয়ে নেব। “

     মঙ্গলপুরে একটা চায়ের দোকানে গাড়ি থামল। দুই বুড়ো বেরিয়ে এসে চায়ের অর্ডার করল। এই দোকানটাতে ভালো ব্রেড টোস্ট বানাচ্ছে। সাহাবুড়ো দুটো এগ-ব্রেড টোস্ট আর আরেক কাপ করে চায়ের অর্ডার করা হল। পিছনের গাড়িটা একটু এগিয়ে একটা দোকানে দাঁড়িয়েছে। ঘোষালবুড়োর নজর ওই গাড়িটার দিকে। হঠাৎ কি যেন একটা দেখে ঘোষালবুড়ো সাহাবুড়োর কানে কানে চাপা গলায় বলল, ” খুব ডেঞ্জারাস মশাই। আমি ওদের একজনের কাছে বন্দুক দেখেছি। আমার অবজার্ভেশন ভুল হতে পারে না।”

সাহাবুড়োর কোন ভাবান্তর দেখা গেল না। ইতিমধ্যে টোস্ট এসে গিয়েছে, সাহাবুড়ো টোস্টে মনোনিবেশ করল।

            গাড়ি যখন উদয়গিরি পৌঁছাল তখন সকাল আটটা। পর্যটকদের ভিড়ে পাহাড়ের তলদেশটা থিকথিক করছে। একপাশে খণ্ডগিরি জৈন মন্দির আর অন্যদিকে উদয়গিরির মনোমুগ্ধকর সব গুহা। উদয়গিরি এখন আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়ার অধীনে। টিকিট কাউন্টারে টিকিট কেটে দুই বুড়ো উদয়গিরিতে ঢুকল। উদয়গিরির গুহাগুলো বেশ উঁচু উঁচু। সাহাবুড়ো অবলীলায় উঠে গেলেও ঘোষালবুড়োর চড়াই উঠতে বেশ কষ্টই হচ্ছে।

“এ পাহাড় চড়া আমার পক্ষে অসম্ভব মশাই। আপনি চলুন আমি আস্তে আস্তে যাচ্ছি।”  ঘোষালবুড়ো বসে বসে হাঁপাতে লাগলেন। আর ওদিকে একটা বড় গুহায় ঢুকে সাহাবুড়ো কিছু খুঁজতে লাগল। মাথার উপরের একটা শিলালিপিতে চোখ পড়তেই চমকে উঠল সাহাবুড়ো।

           এই লিপি রাজা খারবেলার লিপি থেকে আলাদা। দুটোই ব্রাহ্মী লিপি হলেও অনেক পার্থক্য আছে। এই লিপি অনেকটাই পাঠযোগ্য, সংস্কৃতের টান আছে।  সাহাবুড়ো মোবাইলে ছবি তুলে নিল। এমনসময় সাহাবুড়ো দেখল গুহামুখে  বিধ্বস্ত অবস্থায় বসে আছেন ঘোষালবুড়ো। পাশে একটা লোক পড়ে আছে, লোকটার মাথা হতে রক্ত চুঁইয়ে পড়ছে। ঘোষালবুড়োর হাতের লাঠিটা রক্তে ভিজে গেছে।

সাহাবুড়ো বলল, ” কিকরে হল এসব ! অঘোরবাবু…”

ঘোষালবুড়ো একটা দম নিয়ে উঠে দাঁড়াল। তারপর বললেন , ” আর একটু হলেই আপনি ফিনিশ মশাই। আমি অনেক কষ্টে উপরে উঠে আপনাকে খুঁজে বের করলাম। দেখি কি এই হতভাগা একটা পাথর তুলে আপনাকে মারতে যাচ্ছে। আমিও দিলাম এই লাঠির গায়ে অজ্ঞান করে।”

বিক্রম এবার পরচুলা খুলে ব্যাগে ভরে নিল। “আর ছদ্মবেশের দরকার নেই অঘোরবাবু, শত্রুরা আমাদের চিনে ফেলেছে। এই ইনস্ক্রিপশন দেখছেন তো, এটা রাজা অনন্ত পদ্মণাভনের  বিশ্বস্ত দেহরক্ষীর লিপি। সম্ভবত এই শিলালিপি এখানে ছিল না। অন্যকোথাও থেকে এনে খুব নিপুণ হাতে এই গুহার দেওয়ালে  বসানো হয়েছে।”

অঘোরবাবু বললেন,” আমি আগেই বলেছিলাম আমদের একটা গাড়ি ফলো করছে, আপনি মশাই আমার কথা কানেই নিলেন না। “

বিক্রম ফোন করছিল, ফোন শেষ করে অঘোরবাবুকে বলল,” ভুল। আপনি যে গাড়িটা দেখেছেন সেটা পুলিশের গাড়ি। আমাদের গাড়িকে প্রোটেকশন দিচ্ছিল। এখানেও সাদা পোশাকে পুলিশ মোতায়েন আছে। আমি খবর দিয়েছি এখনি পুলিশ এলো বলে। “

অঘোরবাবু এবার লোকটার বুকের উপর লাঠিটা ঠেকিয়ে বললেন, “তবে যাই বলেন বিক্রমবাবু, আমি না এলে এই মর্কটটা আপনার দফা রফা করে দিত।”

বিক্রম কিছু বলার আগেই সাদা পোশাকের দুজন পুলিশ গুহায় প্রবেশ করল। তাদের মধ্যে একজন সম্ভবত এএসআই  থাকের অফিসার বললেন,” ইউ ক্যান গো নাও স্যার। আপলোগ ঘুমিয়ে ফিরিয়ে, ইহা কি সিচুয়েশন হামলোগ সাম্ভাল লেঙ্গে । ” উড়িষ্যার অনেক শিক্ষিত লোকই বাংলা জানে কিন্তু হিন্দিটাই কম্যুনিকেশনের কাজে বেশি ব্যবহার করে।

উদয়গিরি ভ্রমন শেষ করে অঘোরবাবু আর বিক্রম তাদের সাজপোষাক পাল্টে নিল। এতে গাড়ির ড্রাইভার খুব অবাক হলেও কিছু মন্তব্য করল না। ছেলেটা খুবই বুদ্ধিমান। গাড়িতে পরচুলা লাঠি ইত্যাদি রেখে অঘোরবাবু আর বিক্রম চলল খণ্ডগিরি দর্শনে। অঘোরবাবু অনেক কষ্টে সিঁড়ি চড়ে উপরে উঠলেন। মাঝপথে বাধল বিপত্তি। একটা ছোকরা মতো বাঁদর অঘোরবাবুর কাঁধে চড়ে বসল। কোনোমতেই সে নামতে চায় না।

অঘোরবাবু প্রথমে ভয় দেখালেন তারপর কলার লোভ দেখালেন, এবং শেষে কাঁদতে শুরু করে দিলেন। ব্যাপার দেখে অনেক লোক জমে গেল। সবাই নিজেরমতো করে বাঁদর তাড়াবার চেষ্টা করতে লাগল। কিন্তু কেউই সবল হল না বানরবাবাজী কাঁধে চড়ে অঘোরবাবুর সযত্নে ব্যাকব্রাশ করা চুলের দফা রফা করে ছাড়ল।

…. চলবে

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *