হোটেলে হাহাকার – দ্বিতীয় পর্ব // সুব্রত মজুমদার

1

বিজনবাবু আবার বলতে শুরু করলেন।  ” ঘটনার পর যতজনকে ওই রুম ভাড়া দিয়েছি কেউই একরাত্রির বেশি ওই রুমে থাকতে পারেনি। বাচ্চা ছেলেমেয়ের আওয়াজ  শুনতে পাওয়া যায় । হোটেলের উপার্জনে আমার সংসার চলে, সুতরাং বুঝতেই পারছেন যে আমার কাছে এটা কতবড় একটা সমস্যা।”

 বিক্রম বিজনবাবুর দিক তাকিয়ে বলল, ”  আমি  রুমটা একবার সরেজমিনে দেখতে চাই, আপনার কোন আপত্তি নেই তো ! “

বিজনবাবু মাথা নেড়ে বললেন,” না না, আপত্তি করব কেন, আপনি যে ব্যাপারটাটে উৎসাহ দেখাচ্ছেন সেটাই আমার বড় পাওনা। ”  এরপর উঠে গিয়ে ৩০৮ এর চাবি আনলেন। ” চলুন বিক্রমবাবু।”

বিক্রম  বিজনবাবুর সঙ্গে দ্রুতপায়ে উঠে এল তিনতলায়। অঘোরবাবু পেছন পেছন এলেন বটে কিন্তু তাকে বেশ নার্ভাস নার্ভাস মনে হচ্ছে। তিনি বারবার চোখবুজে বিড়বিড় করে কি যেন বলছেন। মনে হচ্ছে যেন পরীক্ষার আগে কোন অমনোযোগী ছাত্র শেষের পাঠটা ঝালিয়ে নিচ্ছে। বিজনবাবু তালা খুলে ঘরে ঢুকলেন।

           ঘরে ঢোকার আগেই ঘরের মেঝেটায় চোখ বুলিয়ে নিল বিক্রম। না পায়ের ছাপ নেই কোথাও। ঘরটির চারিদিকে অব্যবহারের ছাপ স্পষ্ট। খাটের উপর, মেঝেতে, পর্দায়, – – সর্বত্র পুরু ধুলোর আস্তরন। ঘরের কোথাও পুরানো রক্তের দাগ নেই। বিক্রম ফ্যানের দিকে তাকাল। না, ফ্যান অবিকৃত আছে।

” পোস্টমর্টেম রিপোর্টে কি বলেছে বলতে পারবেন।” বিক্রম খাটের উপর হতে গদিটা সরাতে সরাতে প্রশ্ন করে।

বিজনবাবু বললেন, ” হ্যাঁ, সবার পেটেই বিষ পাওয়া গেছে। কি যেন একটা মাছের বিষ…… হ্যাঁ মনে পড়েছে, – ফুগু।”

বিক্রম সবিস্ময়ে ঘুরে তাকাল, ” ফুগু ! পুরি বা তার আশেপাশের বাজারে এই মাছ পাওয়া যায় ? “

বিজনবাবু বললেন, ” আমি যতদূর জানি এই মাছ এখানে পাওয়া যায় না। এমনকি বিক্রমবাবু আমি এই মাছের নামটাও এই প্রথমবার শুনলাম। “

অঘোরবাবু আর চুপ করে থাকতে পারলেন না। তিনি খিঁক খিঁক করে হেঁসে উঠলেন। তারপর বললেন,” মশাই মাছের কাঁটা গলায় আটকে লোক মরে শুনেছি তাবলে মাছের বিষ ! কি নাম যেন বললেন জুগু না সাগু, এরকম মাছের নাম মশাই আমি বাপের জন্মে শুনিনি। “

বিক্রম বলল,” জুগুও নয় সাগুও নয়। ফুগু, – একটা জাপানী মাছ। এর পিত্তথলিতে বিষ থাকে। অন্যান্য মাছের পিত্ত গলে গেলে আমরা তেঁতোয় থুথু করি, আর ফুগু মাছের পিত্ত গলে গেলে জাপানীরা কফিন কিনতে যায় । “

বিজনবাবু বিস্ময়ে বিক্রমের দিকে তাকালেন। অঘোরবাবু লাফিয়ে উঠলেন। তার মুখ দিয়ে অস্ফুটভাবে বেরোল,” উরিব্বাস. !!! “

    বিক্রম অঘোরবাবুকে বলল,” অঘোরবাবু, এখন থেকে মাছটাছ সাবধানে খাবেন। বলা যায় না আপনি  কাতলা মাছের পেটি ভেবে যেটাতে কামড় বসিয়েছেন সেটা আসলে…..”

” ফুগু..” অঘোরবাবু বিক্রমের কথা শেষ হবার আগেই বলে উঠলেন। বিজনবাবু মুখ নামিয়ে হাঁসতে লাগলেন।

বিক্রম এবার মোবাইল বের করে দ্রুত কিছু ছবি তুলে নিল তারপর বলল,” চলুন বিজনবাবু, আমার কাজ এখনকার মতো শেষ। চলুন অঘোরবাবু স্নান সেরে নিই চটপট, মন্দিরে যাবো। “

      স্নান করে বিক্রমেরা গেল জগন্নাথ দর্শনে। বিজনবাবু আগে থেকেই পাণ্ডা ঠিক করে রেখেছিলেন। অঘোরবাবু তো মন্দির দেখে অবাক। তিনি তার নিজ স্টাইলে মন্দির পরিদর্শন করে বেড়াতে লাগলেন। এবার তার প্রশ্নবাণের মুখে পড়লেন পাণ্ডাপ্রবর।

” আচ্ছা ঠাকুরমশাই, এই মন্দির কে করুচি ?”

আমাদের পাণ্ডা ভালোমতো বাংলা জানেন। তিনি অঘোরবাবুর ‘করুচি’ শুনে কিছুটা ক্ষুব্ধ হলেন বোধহয়, কারন অঘোরবাবুর প্রশ্নের কোনো উত্তর দিলেন না। মন্দিরে পুজো দিয়ে বিক্রমরা ফিরে আসছে এমন সময় বিক্রমের নজর গেল পেছনের অটোটার দিকে। ওই অটোর আরোহী নিল রঙের গেঞ্জি পরা একটা লোক। লোকটাকে বিক্রম বহুবার দেখেছে। আজ সকাল হতেই এই লোকটা বিক্রমদের সর্বত্র ফলো করে বেড়াচ্ছে। কি অভিপ্রায় এর ?

ব্যাপারটা অঘোরবাবুও লক্ষ্য করেছেন। তিনি বললেন, ” কিডনাপের মতলব মশাই ! চোর খুনে ধরে ধরে আপনি যে টাকার পাহাড় জমিয়েছেন সেটাতে এবার নজর পড়েছে। যা কৃপণ আপনি, আপনার পাল্লায় পড়ে আমার জীবনটাও না যায় !”

অঘোরবাবু আর বিক্রম যখন হোটেলে ঢুকল তখন বেলা একটা। রুমের তালা খুলে চমকে উঠল বিক্রম। অঘোরবাবু চেঁচিয়ে উঠলেন, ” মার্ডার ! খুন হয়েছে খুন !”

অঘোরবাবুর চিৎকারে আশেপাশের রুম থেকে দু’চারজন এসে জড়ো হল। কিছুক্ষণের মধ্যেই রিসেপশন হতে বিজনবাবুও উঠে এলেন। বিক্রমের বিছানার উপরে চিৎ হয়ে পড়ে আছে সেই নিল গেঞ্জির লোকটা। লোকটার কপালে একটা গোল ক্ষতচিহ্ন, সেখান থেকে গড়িয়ে পড়ছে রক্তের ধারা।

বিক্রম সাবধানে দেহ পরীক্ষা করে বলল, ” মারা গেছে। বিজনবাবু, পুলিশে খবর দিন। আর ডেডবডিতে কেউ হাত দেবেন না। “

পুলিশে খবর দেওয়া হল। কিছুক্ষণের মধ্যেই পুলিশের গাড়ি এল। ডিউটি অফিসার বেশ খোলামেলা লোক। বড় বড় গোঁফ আর পরিপাটি করে আঁচড়ানো চুল। কপালে চন্দনের তিলকটা বেশ বড়সড়, বোঝাই যায় অফিসার একজন ধর্মপ্রাণ মানুষ। পান চিবোতে চিবোতে বিক্রমের দিকে এগিয়ে এসে ডানহাত বাড়িয়ে দিলেন, ” হ্যালো মিস্টার গোয়েন্দা ! আমি কমলদল মহাপাত্র। এখানকার অফিসার-ইন-চার্জ।”

বিক্রমও হাত বাড়িয়ে হ্যান্ডশেক করল। বোঝা গেল এই মহাপাত্র বিক্রমকে চেনেন। বিক্রম অফিসারকে বলল, ” দেখুন অফিসার, রুমটা যেহেতু আমার আর তা বাইরে থেকে তালাবন্ধ ছিল তাই আমিও একজন সাসপেক্ট। ইউ ক্যান ডু অ্যানিথিং। “

অফিসার আঙুল দিয়ে দাঁত থেকে পানের টুকরো বের করতে করতে বললেন, ” কি যে বলেন বিক্রমবাবু, আপনাকে সন্দেহ করার কোনো ইচ্ছাই আমার নেই। আজ বিশ বছর এই প্রফেশনে আছি, আমার চোখই ফরেন্সিক ল্যাবরেটরি। আমার ইচ্ছা আপনি এই কেসে পুলিশকে সাহায্য করুন। “

বিজনবাবু কিছু বলতে গিয়েও বললেন না। দেহ মর্গে নিয়ে যাওয়া হল। বিক্রম গ্লাভস পরে রুমটি পর্যবেক্ষণ শুরু করল। বেডের কাছাকাছিই বুলেটের খোলটা পাওয়া গেল। মার্ডার ওয়েপন কোথাও পাওয়া গেল না। বিক্রম অফিসারকে বলল,” অনেক কাছ হতে গুলি করা হয়েছে। তারমানে আততায়ী নিহতের পরিচিত।”

” বিক্রমবাবু, একটা জিনিস লক্ষ্য করেছেন কি ? পাশের ফাঁকা রুম থাকতেও মার্ডার হল আপনার রুমে। এর মানেটা কি !” অফিসার বিক্রমের দিকে তাকাল।

বিক্রম এবার হাঁসল। ” অফিসার, খুনি আমাকে ফাঁসাতে চায়। হয়তো আমার কারনে তার কোন ক্ষতির সম্ভাবনা আছে। আর নিহত লোকটা আজ সকাল থেকেই আমার পিছু নিয়েছিল। স্বর্গদ্বারে অটো থেকে নেমে আমি আর অঘোরবাবু মিষ্টির দোকানে গিয়েছিলাম। সেই সময়টাই কাজে লাগিয়েছে খুনি।”

… চলবে

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *