হোটেলে হাহাকার // সপ্তম পর্ব // সুব্রত মজুমদার

100

বিক্রম উত্তর দিল, “হ্যাঁ অঘোরবাবু, সেই কালাপাহাড়। পুরাণে কোনার্ক সন্মন্ধে একটা গল্প আছে। একবার ভগবান শ্রীকৃষ্ণ তার রানীদের নিয়ে জলক্রীড়া করেছিলেন। সে সময় আড়াল হতে শ্রীকৃষ্ণ পুত্র শাম্ব তা দর্শন করে। এ কথা জানতে পেরে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ তার পুত্র শাম্বকে কুষ্ঠরোগগ্রস্থ হবার শাপ দেন। শাম্ব অনুনয়বিনয় করলে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ তাকে দ্বাদশ মাস দ্বাদশ নদীতে ভগবান সূর্যের তপস্যা করতে বলেন।

শাম্ব সেইমতো ভগবান সূর্য্যের তপস্যা করেন এবং সূর্য্যের বরে কুষ্ঠরোগমুক্ত হন । এই দ্বাদশ নদীর মধ্যে অন্যতম হল কোনার্কের পাশে বয়ে যাওয়া চন্দ্রভাগা নদী। আর কোনার্ক মন্দিরের প্রথম প্রতিষ্ঠাতা অবশ্যই শাম্ব। প্রথম নরসিংহদেব সম্ভবত জীর্ণোদ্ধার করেন। “

অঘোরবাবু মন দিয়ে শুনছিলেন কাহিনী। তিনি বললেন,” আচ্ছা মশাই, এটা যখন মন্দির তখন মূর্তিও নিশ্চয়ই থাকবে। “

” হ্যাঁ, ঠিকই বলেছেন। এই মন্দিরে আগে ভগবান সূর্য্যের একটা মূর্তি ছিল, যেটা পরবর্তীকালে পুরির রাজারা নবগ্রহ মন্দিরে স্থানান্তরিত করেন। “

অপরাহ্নের আলোয় কোনার্ক যারা দেখেননি তারা বুঝবেন না সে দৃশ্য কত  সুন্দর কত মনোহর। আস্তে আস্তে রাত্রি নেমে আসছে। বিক্রম অঘোরবাবুকে সঙ্গে নিয়ে গাড়িতে উঠলেন। কিছুটা যাওয়ার পর ড্রাইভার বলল,” স্যার, এখানে একটা ভালো দোকান আছে, চাইলে টিফিন করে নিতে পারেন। “

বিক্রম কিছু বলার আগেই অঘোরবাবু পেটে হাত বোলাতে বোলাতে বলে উঠলেন, “সেই কোন দুপুরে খেয়েছি মশাই, পেটে আমার বিশটা ছুঁচোয় ছু-কিতকিত খেলছে।”

অগত্যা গাড়ি দাঁড় করাতে হলো। দোকানটা ছোট কিন্তু খুব পরিস্কার পরিচ্ছন্ন। দোকানদার জানাল যে বললেই খুব নরম নরম আর গরম গরম ডালপুরি ভেজে দিতে পারে। অর্ডার হল। গরম ডালপুরির সাথে ঝাল ঝাল আলুর দম বেশ ভালোই জমল।

খাওয়া দাওয়া সেরে গাড়িতে উঠে বসল বিক্রম। অঘোরবাবু বললেন, “বেশ জম্পেশ করে খেলাম বলুন। কি বলব মশাই এমন নরম পুরি আর সুস্বাদু আলুর দম অনেকদিন পরে খেলাম।”

এরপর গাড়ি চলতে শুরু করলো। রাতের ঠাণ্ডা হাওয়ায় ঘুম পাচ্ছিল দুজনেরই । চোখ জড়িয়ে আসছে বিক্রমের , মনে হচ্ছে যেন কালো একটা ব্ল্যাকহোলে ডুবে যাচ্ছে।

                             – – পাঁচ–

   বিক্রম যখন চোখ মেলল তখন অনুভব করল যে মাথাটা ভারি হয়ে আছে। হাত পায়ে প্রচণ্ড যন্ত্রণা। একি ! সচকিতে সে নিজের হাতের দিকে লক্ষ্য করল, হাত পা বাঁধা। পাশেই অঘোরবাবু একইভাবে হাত পা বাঁধা অবস্থায় পড়ে আছেন। জায়গাটা একটা মাটির ঘর বলেই মনে হচ্ছে। মেঝেতে একটা জলের কুঁজো আর তার উপর একটা স্টেনলেশ স্টিলের গ্লাস। ঘরে আর কোনো আসবাবপত্র নেই।

বিক্রম ভাবছিল যে তারা এখান থেকে কি করে বেরোবে, ঠিক এমনসময় দুজন লোক ঘরে ঢুকল। একজন মোটাসোটা আর অন্যজন রোগা গড়নের। দুজনের হাতেই পিস্তল । বিক্রম বলল, ” এই যে ভাই, একটু বাথরুমে যাব, হাতের দড়িটা খুলে দেবে !”

মোটাটা একজন বলল, ” না, তুমি খুব চালাক। যেকোনো সময় পালিয়ে যেতে পারো।”

বিক্রম বলল, ” তুমি ভুল ভাবছ, পালাবার মতো শক্তি আমার শরীরে নেই। তাছাড়া আমার সঙ্গি ভদ্রলোককে ছেড়ে কোথায় যাব !

দুজনে খানিকটা আলোচনা করে নিল, তারপর রোগা লোকটা বলল, “ঠিক আছে, তবে বেশি চালাকি করার চেষ্টা করবে না। চালাকি করলে এই যন্তরটা দেখছ তো, এর ছ’ছটা দানাই ভেজাতে গুঁজে দেব।”

বিক্রম কাঁদো কাঁদো গলায় বলল, “যা বলবে তাই করব, শুধু একটু….” বিক্রম কড়ি আঙুল দেখাল। এরপর রোগা লোকটা এসে বিক্রমের হাতের দড়ি খুলে দিল। এরপর বিক্রমের মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে ঘরের বাইরে নিয়ে চলল।

ঘরটা একটা জঙ্গলের মাঝখানে। আশেপাশে ঘরবাড়ি তো দুরস্ত জনমানবের চিহ্নও নেই। মাটি পাথুরে, মনে হচ্ছে জঙ্গলের ভেতরে কোন টিলার উপরে বাড়িটা বানানো হয়েছে। চারিদিকে অজস্র গাছের সমাবেশ। গাছগুলোর তলায় ঝোঁপঝাড় আর সেই ঝোঁপঝাড় হতে কঠবেড়ালী আর খরগোশের মতো জীবেরা বের হয়ে আবার অন্য কোন ঝোঁপে মিলিয়ে যাচ্ছে। বিক্রম একটা ঝোঁপের সামনে প্রস্রাব করতে লাগল।

অনেকক্ষণ হয়ে গেলেও বিক্রমের হচ্ছে না দেখে লোকদুটো বিক্রমের কাছে এল। মোটা লোকটা মেজাজ চড়িয়ে বলল, “এই শালা, কতক্ষণ লাগে তোর। জলদি কর।”

কথা শেষ হবার মাত্রই বিক্রম পিছন ফিরে দুজনের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। দুজনেই  একে অপরের কাছাকাছি ছিল।  বিক্রমের ধাক্কায় দুজনেই মাটিতে পড়ে গেল। ওদের হাত হতে পিস্তলদুটো ছিটকে পড়ল মাটিতে। বিক্রম এক ঝটকায় উঠে পিস্তলদুটো কুড়িয়ে নিল। এবার দু’হাতে দুটো পিস্তলকে লোকদুটোর দিকে তাক করে ধরে বলল,”কোনো চালাকি করবি না। চুপচাপ ঘরের ভিতরে চল।”

লোকদুটো ঘরের ভেতরে যেতেই দড়ি দিয়ে ওদের হাত পা বাঁধল। তারপর বলল, “এবার বলতো বাছাধন কে তোমাদের বাপ ! সেই লোকটার নাম বল যে তোদের পাঠিয়েছে।”

লোকদুটো বিক্রমকে সব কথা খুলে বলল। বিক্রম লোকদুটোর ঘাড়ে রদ্দা মেরে অজ্ঞান করে দিল। এবার অঘোরবাবুকে জাগাতে হবে। কুঁজো হতে জল নিয়ে অঘোরবাবুর মুখে ছিটা মারতেই তিনি চোখ খুললেন। চোখ খুলেই বলে উঠলেন,” এই দেখেছেন, কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম মশাই…. তা হোটেলে পৌঁছতে আর কতক্ষণ ?”

বিক্রম বলল, ” আপনার কি মনে হয় যে আপনি গাড়িতে আছেন ?”

– গাড়িতে নেই  !!

– না। আপনি গাড়িত নেই।

– “তবে..”  অঘোরবাবুর মুখটা বিবর্ণ হয়ে পড়ে।

বিক্রম বলল, “আপনি গাড়িতে ঘুমিয়েছিলেন গতকাল রাতে, আর এখন সকাল আটটার মতো। আমরা আছি জঙ্গলের ভেতরে শত্রুদের আড্ডায়।”   এরপর বিক্রম অঘোরবাবুকে সমস্ত ঘটনা খুলে বলল। সব শুনে অঘোরবাবু বললেন, “তাহলে উপাই !”

বিক্রম আশ্বাস দিয়ে বলল, “ভয় নেই। মোবাইলের জিপিএস অন করে দিয়েছি। আর আপনাকে জাগানোর কিছু আগে পুলিশে ফোন করেছিলাম। ওরা এলো বলে।  “

অঘোরবাবু মাথায় একবার হাত বুলিয়ে বললেন, “আমার মাথায় মশাই একটা কথা ঢুকছে না যে ওরা আমাদের এখানে আনল কিভাবে !”

বিক্রম হাঁসল । ” কোনার্ক হতে বেরোবার সময় একটা দোকানে পুরি আর আলুর দম খেয়েছিলাম মনে আছে ? ওই পুরি-আলুরদমেই ছিল ঘুমের ওষুধ। আমার দৃঢ় বিশ্বাস ড্রাইভার ছেলেটাও এই কাজে জড়িত। “

… চলবে

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *