মহাশূন্যে জুরান — সিদ্ধার্থ সিংহ – পর্ব – ২১

একুশ
ছেলেকে দেখতে পেয়ে আনন্দে লাফিয়ে উঠলেন তিতার। দৌড়ে গিয়ে বুকে জড়িয়ে ধরলেন জুরানকে। জুরানও তার বাবাকে পেয়ে একেবারে অভিভূত। দুজনেই দুজনকে পেয়ে ডুকরে কেঁদে উঠল।
মাত্র কয়েক মুহূর্ত। তার পরেই জুরানের মনে হল, সে নয় কাকতালীয় ভাবে এখানে এসে পড়েছিল। এখন যে তার বাবাও এসে পড়লেন। এ বার কি তা হলে তার মায়ের পালা! এই ভাবে পৃথিবী থেকে এক-একটা পরিবারকে লোপাট করে এখানে নিয়ে আসার পরিকল্পনা করেছে কেউ! করলে কারা! যারাই হোক, তাদের নিয়ে ও চিন্তিত নয়। ওর এখন একটাই চিন্তা— পৃথিবীতে ফিরবে কী করে!
সে এখানে এসেছে অনেক্ষণ হয়ে গেছে। তবু, যারা ওকে চিকেন রোলের মতো মুড়ে অপহরণ করার ছক কষেছিল, তাদের কারও কোনও টিকি দেখেনি ও। এমনকী মাঝপথে তাকে ওই ভাবে কেড়ে নিয়ে গেছে দেখেও সামনাসামনি তো নয়ই, চোরাগোপ্তা হামলাও চালায়নি কেউ। তার মানে, ওই কাজের সঙ্গে যারা জড়িত, তাদের দৌরাত্ম্য যতটা অঞ্চল জুড়ে, তার থেকেও অনেক অনেক অনেক দূরে, তুলনামূলক ভাবে সামান্য হলেও, একটা নিরাপদ জায়গায় ওকে নিয়ে এসেছে এই মেঘটা।
ফলে ও এতক্ষণ নিরাপদেই ছিল। কিন্তু কথা হচ্ছে, এ বার কী হবে! ও এবং ওর বাবা এখান থেকে পৃথিবীতে ফিরবে কী করে! যে ওকে এই নিরাপদ জায়গায় নিয়ে এসেছে, সেই এক চিলতে মেঘের কি কোনও এক্তিয়ার আছে ওদের জন্ম-গ্রহে যাবার! যদি থাকেও, তা হলে সে যে-ওদের বাপ-বেটাকে সত্যিই পৃথিবীতে পৌঁছে দেবে, এমন কথা কি খুব জোর দিয়ে বলা যায়!
এ ছাড়া, আর যে ওদের পৌঁছে দিতে পারে বলে ওর মনে হয়, সেই মশারির জালের মতো থলেটা তার বাবাকে এখানে টুক করে নামিয়ে দিয়ে সেই যে হাওয়া হয়ে গেছে, গেছে তো গেছেই। জুরানের ধারণা, সে আর এ জীবনে কখনও এখানে আসবে না। যদি সত্যিই তা-ই হয়, তা হলে তারা পৃথিবীতে ফিরবে কী ভাবে!
তিতার তার ছেলেকে জিজ্ঞেস করলেন, তুই এখানে এলি কী করে?
জুরান বলল, সে সব পরে হবে। তার আগে এসো, যে নির্ঘাৎ মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরিয়ে এনেছে, তার সঙ্গে তোমার আলাপ করিয়ে দিই। ইনি হচ্ছেন, সময়-কণা।
তিতার কাউকে দেখতে পেলেন না। তাই জিজ্ঞেস করলেন, কোথায়?
জুরান বলল, আছে। এখানেই আছে। আমিও ওকে দেখিনি। ওর ইচ্ছে হলে তুমি ওকে দেখতে পাবে। নচেৎ নয়।
— ও তাই? বলেই, সামনে কেউ আছে, মনে মনে ভেবে নিয়ে তিতার হাত জোড় করে বললেন, নমস্কার।
শূন্য থেকে প্রত্যুত্তর ভেসে এল, নমস্কার নমস্কার।
— আপনি আমার ছেলেকে মৃত্যুর মুখ থেকে বাঁচিয়েছেন, কী বলে যে আপনাকে ধন্যবাদ জানাব… আমি তো খুব চিন্তায় ছিলাম। ছেলেকে আর কোনও দিন দেখতে পাব কি না! যখন শেষ চেষ্টা করেও বিফল হয়েছি, সমস্ত আশা ছেড়ে দিয়েছি, তখনই একটা ধোঁয়ার কুণ্ডলি…
— না না। ওধোঁয়ার কুণ্ডলি নয়। ওর নাম— জেড সেকুরিনা।
তিতার অবাক হয়ে বললেন, জেড সেকুরিনা! আপনি ওকে চেনেন!
— চিনব না? ও তো এক কালে এখানেই ছিল।
সময়-কণার কথা শুনে আরও অবাক হয়ে গেলেন তিতার। জুরান জিজ্ঞেস করল, ও তা হলে পৃথিবীতে গেল কেন?
— ওর পতন ঘটেছিল, তাই।
তিতারের কপাল কুঁচকে গেল, পতন!
সময়-কণা বলল, হ্যাঁ, পতন। এখানে প্রত্যেকটি গ্রহবাসীরই অসীম ক্ষমতা। তাই গ্রহবাসীরা যখন বুঝতে পারল, একে অপরের পিছনে লাগলে, তারা নিজেরাই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তখন সকলে মিলে ঠিক করেছিল, কেউ কখনও কারও কোনও অনিষ্ট করবে না। কেউ কারও অসন্তোষের কারণ হবে না। কেউ কাউকে হিংসে করবে না। এবং শেষ পর্যন্ত তারা এই সিদ্ধান্তে এসে দাঁড়িয়েছিল যে, প্রত্যেকেই যদি ভাল হয়, তা হলে সকলেই ভাল থাকবে। উদ্বেগহীন থাকবে। ফলে এই মহাশূন্যটাও ভাল থাকবে।
তাই তার পর থেকে নিজে ভাল থাকার জন্য, নিজের পরবর্তী প্রজন্মদের ভাল থাকার ব্যবস্থা করে যাওয়ার জন্য, সকলেই যেন ভাল হওয়ার প্রতিযোগিতার মেতে উঠেছিল। দল বেঁধে নষ্ট করে দিয়েছিল যাবতীয় মারণাস্ত্র। যেহেতু অদূর ভবিষ্যতে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিতেই পারে, তাই মুছে দিয়েছিল শত্রুর কবল থেকে নিজেদের গ্রহকে আগলে রাখার কঠিন, কঠোর, নিশ্ছিদ্র রক্ষা-বলয়গুলিও। শপথ নিয়েছিল, এই মহাশূন্যে যদি কোনও কারণে সামান্যতম দূষণও উঁকি মারে, সঙ্গে সঙ্গে সেটাকে শিকড় সুদ্ধ উপড়ে ফেলার।
এই সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছিল, কারণ, তখনও যৎসামান্য হলেও, কেউ কেউ আমাদের গ্রহে খারাপ বীজ নিয়ে জন্মাত। তার পরেই তো দল বেঁধে একযোগে লেগে গেল ভাল মানসিকতার গ্রহবাসী গড়ে তোলার কাজে।
একেবারে থ হয়ে গেলেন তিতার। জিজ্ঞেস করলেন, মানে?
— মানে, তার পরেই এমন একটা মেশিন তৈরি করা হল, যে-মেশিন চালু করলেই তার ভিতর থেকে এক ধরনের আলোর ছটা বেরিয়ে সামনে থাকা যে কোনও কাউকে ধুয়ে তার খারাপ দিকগুলো নষ্ট করে দিত। এমনকী, নতুন কেউ জন্মালেও, টুকরিতে বসিয়ে তার ভিতর দিয়ে তাকে পাস করিয়ে নেওয়া হত। যাতে তার সমস্ত খারাপ মানসিকতা ধুয়ে-মুছে একদম সাফ হয়ে যায়। ঝকঝকে-তকতকে হয়ে ওঠে। উঠতও। এবং এ ভাবে কয়েক পুরুষ চলার পরে দেখা গেল, ওই মেশিনের আর দরকারই হচ্ছে না। কারণ, বংশপরম্পরায় ধুয়ে-ধুয়ে তাদের জিন থেকেই ফিকে হতে হতে খারাপ দিকগুলো একেবারে চিরতরে বিলীন হয়ে গেছে। ফলে একটা সময়ের পর থেকে শুধু ভাল, ভাল আর ভালত্ব নিয়েই জন্মাতে শুরু করল এই গ্রহবাসীরা।
তিতার জানতে চাইলেন, তাই যদি হবে, তা হলে জেড সেকুরিনার পতন হল কী করে?
— সেটাই তো বলছি। ওর যখন বিচ্যুতি ঘটেছিল, তখন তো ও সব ছিল না। তাই যে-কোনও কারণেই হোক না-কেন, কয়েক সেকেন্ডের জন্য হলেও, ও নাকি কী একটা কাজে গাফিলতি করেছিল। তাই সবাই মিলে ঠিক করেছিল, ওকে পিছিয়ে থাকা কোনও গ্রহে পাঠানো হবে। সেখানে গিয়ে ওখানকার অধিবাসীদের সাহায্য করতে হবে। তাদের ভাল থাকার উপায় বুঝিয়ে দিতে হবে। সমস্ত বাধাবিঘ্ন কাটিয়ে নিজেদের টিকিয়ে রাখার কৌশল শিখিয়ে দিতে হবে। তাদের মানসিক উন্নয়ন ঘটাতে হবে। আর সেই কাজে যদি সে সফল হতে পারে, তা হলে আবার তাকে ফিরিয়ে নেওয়া হবে এই মহাশূন্যে।
— তাই? ও… এ বার বুঝতে পেরেছি, আমাদের গ্রামে একবার তুমুল বর্ষা হয়েছিল। সেই বর্ষার জল বার করার জন্য সবাই মিলে একটা বিশাল নালা কেটেছিল। সেই নালার কোল জুড়ে সোনালি রঙের এক ধরনের লতানো গাছ হত। সেই গাছে ছোট ছোট জংলা ফুল ফুটত। সন্ধ্যা নামলেই সেই ফুলগুলি কচুরিপানার মতো ক্রমশ রঙিন থেকে আরও রঙিন হয়ে উঠত। তার গা থেকে কেমন যেন একটা আলো ঠিকরে বেরোত। যত সময় যেত, ততই তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ত তার সুগন্ধ। ফুলের পাশাপাশি বনকুলের চেয়েও ছোট ছোট এক ধরনের খুব সুন্দর ফলও হত। সন্ধ্যার পরেই সেগুলি হয়ে উঠত সুস্বাদু আর রসালো।
সেই ফল খাবার জন্য একদিন রাতে ঘরের খিল খুলে আমি বেরিয়ে পড়েছিলাম। হাঁটা দিয়েছিলাম সেই আধ-মানুষ গভীর, চার-পাঁচ হাত চওড়া নালাটার দিকে। তখন কত রাত কে জানে! উপরে ঝকমক করছিল তারা। চার দিকে উড়ে বেড়াচ্ছিল হাজার হাজার জোনাকি। আর সেই নালায়? মনে হচ্ছিল, ফুল নয়, সারা নালা জুড়ে যেন লক্ষ লক্ষ টুনি লাইট জ্বলছে। তার কোনওটার রং লাল। কোনওটার রং নীল। আবার কোনওটার রং সবুজ। আলোগুলো এত উজ্জ্বল, অথচ কত মায়াবী। কত মনোরম। মনে হয়েছিল, ওগুলোর দিকে তাকিয়ে তাকিয়েই সারা জীবন কাটিয়ে দেওয়া যায়।
কতক্ষণ মুগ্ধ হয়ে দাঁড়িয়েছিলাম ওঁর মনে নেই। চোখই ফেরাতে পারছিলাম না। মোহগ্রস্তের মতো ধীরে ধীরে নালাটার একদম ধারে গিয়ে বসেছিলাম। তার পর একটু ঝুঁকে খাবার জন্য যে-ই একটা ফল তুলতে গিয়েছিলাম, শুধু সেই ফলের ডালটাই নয়, আশপাশের সব ক’টা লতানো ডালই যেন মুহূর্তের মধ্যে আমার হাতটাকে সাপের মতো পেঁচিয়ে ধরে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলেছিল।
আমি তখন হাতটা ছাড়াবার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করছিলাম। আর যত ছাড়াবার চেষ্টা করছিলাম, ডালপালাগুলো ততই যেন তরতর করে বেড়ে আমার হাত, গলা, মুখ, বুক, পেট, কোমর, হাঁটু, এমনকী পায়ের পাতাকেও ছেঁকে ধরেছিল। দম বন্ধ হয়ে আসছিল আমার। তার মধ্যেই আমি টের পেয়েছিলাম, ওই নালার মধ্যে দিয়ে আমাকে কেউ হিড়হিড় করে টেনে নিয়ে যাচ্ছে।
ধপ্‌ করে আছাড় খেয়ে পড়তেই পেঁচিয়ে থাকা ডালপালাগুলো আমাকে ছেড়ে নিজেরাই গুটিয়ে সুড় সুড় করে ছোট হতে হতে একেবারে ছোট্ট এক-একটা চারাগাছ হয়ে গিয়েছিল।
সামনে তাকাতেই আমি দেখেছিলাম, লতানো নয়, ক’হাত দূরে দাঁড়িয়ে আছে একটা মাঝারি মাপের শক্তপোক্ত, সুঠাম গাছ। নীচের দিকে ছড়িয়ে আছে অজস্র শিকড়-বাকড়। সেগুলো কেঁচোর মতো শুধু কিলবিল কিলবিল করছিল। তার উপরে খানিকটা কাণ্ড মতো। সেই কাণ্ডটা যেখানে শেষ হয়েছে, সেখানে সাঁইবাবার ঝাঁকড়া চুলের মতো এক মাথা ছোট ছোট অজস্র পাতা। পাতাগুলি থেকে বিন্দু বিন্দু আলোর রশ্মি তীক্ষ্ণ বেগে আমার গায়ে আছড়ে পড়ছিল।
এ রকম কোনও গাছ আমি জীবনে কখনও দেখেননি। তাই আমি হতবাক হয়ে গাছটাকে দেখছিলাম। বুঝতে পারছিলাম, গাছটার কোনও শিকড়ই মাটি ভেদ করে নীচে ঢোকেনি। ঢুকলে গাছটা আমার দিকে ও ভাবে গুটিগুটি করে এগিয়ে আসতে পারত না। গাছটাকে এগিয়ে আসতে দেখে আমি ভয়ে সিঁটিয়ে গিয়েছিলেন।
ভাবছিলাম, ওখান থেকে আমি পালাব কী করে! চার দিকেই তো মাটির দেওয়াল। কোথাও কোনও দরজা দেখা যাচ্ছে না। মনে হচ্ছিল, এটা কোনও পাতাল ঘর!
এই সব ভাবতে ভাবতে আচমকাই দু’হাত দিয়ে গাছটাকে প্রচণ্ড জোরে ধাক্কা মেরেই উল্টো দিকে দৌড়তে শুরু করেছিলাম। থাকুক সামনে দেওয়াল। আমি থামব না। কোনও গাছের ডালপালার ফাঁসে তিলে তিলে দম বন্ধ হয়ে মরার চেয়ে কোনও দেওয়ালে ধাক্কা খেয়ে একেবারে মরে যাওয়া অনেক ভাল।
এই ভেবে দৌড়ে গিয়ে যে-ই আমি দেওয়ালে আছড়ে ফেলেছি নিজেকে, অমনি কোথায় দেওয়াল! আর কোথায় সেই ভয়ঙ্কর পরিবেশ। আমি দেখলাম, এ তো আমাদের বাড়ির চাতাল।
তা হলে কি আমি নই, সে দিন এই জেড সেকুরিনাই আমাকে ওই ভয়ঙ্কর জায়গা থেকে ঠেলে আমাদের বাড়ির চাতালে পাঠিয়ে দিয়েছিল!
সে জন্যই কি খুব ছোটবেলায় পুকুরে তলিয়ে যাওয়ার সময় এই জেড সেকুরিনাই আমাকে উদ্ধার করে নিয়ে এসেছিল!
আমি পাগলের মতো আমার ছেলের জন্য যখন হন্যে হয়ে ঘুরছি, তখন এই জেড সেকুরিনাই আমাকে আমার ছেলের কাছে পৌঁছে দিয়ে গেল!
তিতারের কথা শুনে সময়-কণা বলল, শুধু তুমি নও, তোমার মতো আরও অজস্র পৃথিবীবাসীর পাশে গিয়ে ও এই ভাবেই প্রতি মুহূর্তে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়। এবং একই সঙ্গে আরও অনেকের উপকার করার সুযোগ পাওয়ার জন্য ও নাকি এখানকার একটা পুরনো কৌশলও প্রয়োগ করছে ওখানে।
— সেটা কী?
— এখানকার যে-কেউ একটি বিশেষ পদ্ধতিতে তার ইচ্ছে প্রয়োগ করে, একেবারে হুবহু তারই আদলের যত খুশি নিজের প্রতিকৃতি তৈরি করতে পারে। সেই পদ্ধতিতেই ও ওর নিজের অসংখ্য প্রতিকৃতি তৈরি করেছে। যাতে ও একই সঙ্গে একই সময়ে বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে আরও আরও আরও অনেক লোকের কাজে আসতে পারে। যার জন্য ওকে যখন বাংলাদেশের কক্সবাজারে ডুবতে থাকা কোনও মানুষকে বাঁচাতে দেখা যায়, তখন ওই একই সময়ে পৃথিবীর একেবারে উল্টো প্রান্তে আমেরিকার কোনও গবেষণাগারে তাকে দেখা যায় পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াহীন, একেবারে একশো পারসেন্ট নির্ভেজাল জীবনদায়ী কোনও ওষুধ আবিষ্কারকের কাজে সাহায্য করতে।
— কিন্তু ও কাকে কী ভাবে সাহায্য করছে, সেটা ওখান থেকে এত দূরে, এমন একটা জায়গা থেকে আপনারা জানতে পারেন কী করে?
সময়-কণা বলল, এখানকার গ্রহবাসীরা তো প্রায়ই তোমাদের গ্রহে যায়। তাদের কারও কারও আবার পৃথিবীবাসীদের সঙ্গে নানা সম্পর্কও গড়ে ওঠে। সেই সম্পর্কের জেরে অনেক পৃথিবীবাসীর যে-সন্তান হয়, তারা হয় সবার থেকে আলাদা। তারা খুব ছোটবেলা থেকেই হয়তো বারো-চোদ্দোটা ভাষায় কথা বলতে পারে। যে-কোনও জটিল সমস্যা মুহূর্তের মধ্যে সমাধান করে দিতে পারে। কোনও স্পর্শ না-করেই যে-কোনও জিনিস এক জায়গা থেকে আর এক জায়গায় সরাতে পারে।
কুঁড়ির অনেক উপর দিয়ে হাত বুলিয়ে দিলেই ফুল ফুটে ওঠে। দুরারোগ্য রোগে ভুগতে থাকা কোনও রোগীকে একবার ছুঁয়েই নিরাময় করে দিতে পারে। তাদের চোখের ইশারায় বুলি ফিরে পায় বোবা। হাতের কারসাজিতে উঠে দাঁড়াতে পারে জন্মগত পঙ্গুও। অন্যেরা কী ভাবছে, একটু চোখ বন্ধ করলেই তারা জেনে যায় সব।
— তাই!
— হ্যাঁ।
খানিকটা অবিশ্বাসের স্বরে তিতার বললেন, এ রকম কারও কথা জানেন?
— জানি মানে? ক’জনের কথা বলব! ঠিক আছে তোমাকে না-হয় একটা তালিকাই দিয়ে দেব। কেমন?
— ঠিক আছে, আচ্ছা, আপনাদের এখানকার গ্রহবাসীরা ক’দিন পরে পরে যায়?
— শুধু এখান থেকে কেন, গোটা মহাশূন্যর কত গ্রহ থেকে কত অধিবাসী যে প্রতিনিয়ত যায়, তার কোনও ঠিক আছে?
— আপনি বলছেন যায়, কিন্তু কোথায়! আমরা তো দেখতে পাই না।
সন্দেহ করছে বুঝতে পেরে খানিকটা বিরক্ত হয়েই তাচ্ছিল্যের স্বরে সময়-কণা বলল, তোমরা দেখবে কী, তোমাদের কি সেই চোখ আছে? তোমাদের ওখানে এখন পর্যন্ত যত অত্যাধুনিক অ্যান্টেনা তৈরি হয়েছে, সেগুলি আমাদের তো নয়ই, আমাদের কোনও যানের অস্তিত্বও ধরতে পারে না।
— ওখানে গিয়ে আপনারা কী করেন?
— এই যেমন আগ্নেয়গিরির উদগিরণ ঘটাই। সমুদ্রের তলার প্লেট সরিয়ে দিয়ে সুনামির মতো প্লাবন সৃষ্টি করি কিংবা মারাত্মাক কোনও রোগের প্রকোপ ছড়িয়ে দিই।
— সে কী! এগুলো তো প্রকৃতি ঘটায়।
মুচকি হেসে সময়-কণা বলল, না না। ওগুলো আমরাই করি।
উদ্বিগ্ন হয়ে তিতার বললেন, কিন্তু কেন? আমরা তো এত দিন ভাবতাম, ঈশ্বর রুষ্ট হয়ে এ সব করান। তাই গাছে গাছে ঘষা লেগে জঙ্গলে দাবানল ছড়ালে আদিবাসীরা এখনও অগ্নিদেবকে পুজো করে। বজ্রবিদ্যুত্‌-সহ প্রবল বৃষ্টি শুরু হলে শহরের আধুনিক-মনস্ক লোকেরাও উঠোনে পিঁড়ি পেতে দেয়, বরুণদেবকে দু’দণ্ড শান্ত হয়ে বসার জন্য। সামান্য মায়ের দয়া হলেও মানুষ ছুটে যায় মনসা মায়ের মন্দিরে।
— হ্যাঁ, জানি। আর মানুষ যাদের ঈশ্বর বলে মনে করে, তারা আসলে এই মহাশূন্যেরই কোনও না-কোনও গ্রহের অধিবাসী।
তিতার বললেন, আমি তো ভেবেই পাচ্ছি না, আপনারা এ সব করেন!
— শুধু আমরা নই, কয়েক শতকের মধ্যে পৃথিবীর মানুষও বুঝে যাবে যে, আসল অস্ত্র কাকে বলে। ফলে, তারাও এত দিন ধরে ব্যবহার করা খুচখাচ অস্ত্রগুলিকে ঝেড়ে ফেলে, এই সব অস্ত্রের প্রয়োগ শুরু করে দেবে।
— দুর্যোগকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করবে! কেন?
— কারণ, তা হলে বিপদের সময় যেটাকে মারণাস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হবে, তার এক্সপায়ারি ডেট ফুরোবার আগে, সেটাকেই আবার দারুণ ভাবে জীবনদায়ী ভাল কাজে লাগানো যাবে, তাই।
— মানে এমন অস্ত্র, যেটা ধ্বংসের কাজেও লাগতে পারে। আবার সৃষ্টির কাজেও লাগতে পারে, তাই তো?
সময়-কণা বলল, একদম তাই।
— সৃষ্টির জন্য না-হয় বুঝলাম। কিন্তু ধ্বংসের জন্য কেন?
— ধ্বংস তো করতেই হবে। তোমরা ধ্বংস করো না? যখন ঘরের মধ্যে আরশোলা-ইঁদুররা উৎপাত শুরু করে, তোমরা তাদের জন্য ফাঁদ পাতো না? বিষ ছড়াও না? যখন কোনও বাড়ি জরাজীর্ণ হয়ে খসে-খসে পড়ে, ফের নতুন করে বানানোর জন্য তোমরা সেটা ভেঙে-গুঁড়িয়ে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করো না? অন্য কারও সঙ্গে জড়িয়ে পড়ায় দারুণ ঘনিষ্ঠ কোনও সম্পর্ক যখন আর বয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হয় না, তোমরা তখন তার ইতি টেনে সেটাকে ধ্বংস করো না? তবে? ধ্বংস না-করলে নতুন কিছু সৃষ্টি করবে কী করে? তোমরা তো এখনও তোমাদের গ্রহটাকে প্রয়োজন মতো সংকুচিত করে ছোট কিংবা ভার অনুযায়ী নতুবা ইচ্ছে অনুযায়ী বড়, বড়, বড়— আরও বড় করার কৌশলও করায়ত্ত করতে পারোনি।
— মানে?
— মানে, আমরা এটা পেরেছি। আমাদের এই যে মেঘটাতে দেখতে পাচ্ছ, তোমার ছেলে দেখেছে, ও যখন ক্রমশ নীচে পড়ে যাচ্ছিল, তখন আমাদের এই মেঘটা সা… করে নীচে নেমে ওকে ছোঁ মেরে তুলে আনার জন্য কী ভাবে একেবারে পুঁচকি, এইটুকুনি এক চিলতে হয়ে গিয়েছিল। আবার তুমি আসছ দেখে, তোমাকে নামাতে জেড সেকুরিনার যাতে কোনও অসুবিধে না-হয়, ছোট জায়গা দেখে যাতে হিমসিম না-খায়, ঘাবড়ে গিয়ে ভুল করে তোমাকে যাতে মহাশূনেই ফেলে না দেয়, সে জন্য এই এক চিলতে মেঘটাই অটমেটিক্যালি এত বড় হয়ে উঠেছে। না-হলে তোমার যা ভার কিংবা পা রাখার জন্য তোমার যতটা জায়গা দরকার, তার জন্য এই মেঘটা নিজেকে না-বাড়লেও কোনও অসুবিধে হত না।
— এই ভাবে কোনও গ্রহ ছোট-বড় হতে পারে!
— পারে। যেমন ধরো, এখন যদি তোমাদের পৃথিবীর সমস্ত মানুষ, সমস্ত প্রাণী এইখানে চলে আসে, তা হলে সঙ্গে সঙ্গে তোমাদের ভার বহন করার জন্য এবং তোমাদের পর্যাপ্ত জায়গা দেওয়ার জন্য হয়তো এই মেঘটাই তোমাদের পৃথিবীর থেকেও অনেক অনেক অনেক বড় হয়ে যাবে। আবার এখান থেকে যদি তুমি, তোমার ছেলে, এমনকী আমরাও চলে যাই, তখন দেখবে সঙ্গে সঙ্গে এই মেঘটাও এত ছোট্ট হয়ে যাবে যে, মনে হবে, এটা একটা জলের ফোঁটা অথবা একটা বিন্দু। এই গ্রহটাকে সেই ভাবেই আমরা তৈরি করে নিয়েছি।
চলবে   ………..

Leave a Reply