জীবন বড় বৈচিত্রময় : মিজানুর রহমান মিজান : পর্ব – ১২

Spread the love

এদিনও তিনির কথাবার্তায় আমাদের সংশয় ছিল।যদিও তিনি কথা দিয়েছিলেন ভবন করে দেবার।অভিযাত্রিক দলের প্রত্যেক সদস্যের মনে বিরুপ মনোভাব এসে যায়।মানে তিনি দিলে দিবেন, না দিলে নাই। আমাদের পক্ষ থেকে এ ব্যাপারে আর কোন গরজ থাকলো না, এক কথায় নৈরাশ্যজনকতা।অনেক দিন ভিত্তি প্রস্তরটি শোভা পাচ্ছিল মেয়েদের কমন রুম কাম তাহির আলীর রুমের সম্মুখে। স্কুলে কোন ছাত্র অনুপস্থিত হলে ঐদিনই ছাত্র পাঠিয়ে তাকে স্কুলে হাজির করার রেওয়াজ চালু করা হয়েছিল।

ছাত্রী সংখ্যা ছিল অত্যন্ত কম।তখন মেয়েদের লেখাপড়াকে মুষ্টিমেয় কয়েকজন অভিভাবক ছাড়া সবাই ছিলেন বিমুখ।মেয়েদের লেখাপড়াকে মনে করা হত নিন্দনীয়/গর্হিত/লজ্জাজনক কাজ।তারপরও যারা স্কুলে আসতেন তারা ছিলেন স্কুলের নিকটবর্তী গ্রাম সমুহের।আমি স্কুলে যোগদান করলাম ১৯৮১ সনে এবং ১৯৮২ সালে জয়নগর ও অন্যান্য দু’একটি গ্রাম থেকে ছাত্রীরা স্কুলে যাওয়া শুরু করেন।অভিভাবকমহলের আশ্বস্থতা ছিল আমার উপর।অনুরুপ আশুতোষ চক্রবর্তী ও অন্যান্য শিক্ষকদের সাথে বা আগে পিছে মেয়েরা হয় স্কুলমুখী। অর্থ্যাৎ ছাত্রী সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে থাকে দিনে দিনে।আমরা স্কুলে চালু করেছিলাম বিতর্ক প্রতিযোগিতা প্রতি বৃহস্পতিবার। পালন করা হতো বিভিন্ন দিবস।

যেমন রবীন্দ্র নাথের জন্ম-মৃত্যু, নজরুলের জন্ম-মৃত্যু দিবস। এছাড়া জাতীয় দিবসগুলি পালনের কথা তো আর বলা লাগে না। পালিত হতো।অনুষ্ঠান করে তা পত্রিকায় হয়ে যেত প্রকাশ। সংবাদগুলি আমিই প্রকাশ করতাম অত্যন্ত গোপনে এবং আমি যে সাংবাদিকতা করতাম তা কারো প্রথম দিকে জানা ছিল না। সিলেটে তখন কোন দৈনিক পত্রিকা প্রকাশ হত না। যে ক’টি প্রকাশ হতো তা ছিল সাপ্তাহিক পত্রিকা। আমি ছিলাম সাপ্তাহিক সিলেট কণ্ঠ পত্রিকার বিশ্বনাথ প্রতিনিধি।আমি ছাত্রদের উৎসাহিত করে পত্রিকার গ্রাহক করে ছিলাম বেশ ক’জন ছাত্রকে। তাদের নামে ডাকযোগে প্রতি সপ্তাহের পত্রিকা আসতো নিয়মিত। পত্রিকা পড়ে ছাত্ররা হয়ে যেতো আশ্চর্যান্বিত। আমাদের অনুষ্ঠানের সংবাদ কি ভাবে পত্রিকায় প্রকাশিত হলো।

এমন কি শিক্ষকগণও। একদিন আমার প্রিয় শিক্ষক শ্রদ্ধাষ্পদেষু প্রধান শিক্ষক মুহিবুর রহমান কিরণ স্যার আমাকে শুধালেন মিজান, আমাদের অনুষ্ঠানের সংবাদ পত্রিকায় কে বা কারা প্রকাশ করে তুমি তা অনুসন্ধান করে বের করো।স্যারের সাথে তো আর মিথ্যা বলতে পারি না।তখন আমি স্বীকার করি স্যারের কাছে আমিই তা প্রকাশ করে থাকি।

স্যার কথা শুনে হয়ে যান হতবাক।তখন স্যার আমাকে বলেন, “মিজান তুমি এ পত্রিকা ছেড়ে আমার বিশেষ পরিচিত এবং নুতন পত্রিকা সাপ্তাহিক জালালাবাদ পত্রিকায় কাজ করো।আমি সম্মত হয়ে যাই।স্যার ও আমি একদিন অন্বেষা ম্যাগাজিনের প্রুফ দেখতে সিলেটের আলমগীর প্রেসে যাই। সত্যি সেদিন গ্রুফ দেখার কাজ শেষ করে আমাকে নিয়ে যান জালালাবাদ পত্রিকার অফিসে। সেখানে বিশ্বনাথের কৃতি সন্তান হারুনুজ্জামান চৌধুরীর সাথে পরিচয় করিয়ে দেন।হয়ে গেলাম সাপ্তাহিক জালালাবাদ পত্রিকার বিশ্বনাথ প্রতিনিধি।এদিকে তিনির সহপাঠি জনাব আব্দুছ ছোবহান তখন ঢাকা থেকে বের করতেন সাপ্তাহিক এশিয়া নামক পত্রিকা। সে পত্রিকায়ও আমার নিউজ ও কয়েকটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়।


আমার পরম শ্রদ্ধাভাজন শিক্ষাগুরু জনাব মুহিবুর রহমান কিরণ স্যার মুলত: আমার লেখালেখির ও গুরুজন। আমি উত্তর বিশ্বনাথ স্কুলের ছাত্র থাকাকালীন সময়ে তিনি শিক্ষকতা করতেন উত্তর বিশ্বনাথে।তিনি বাংলা ভাষার উপর পি এইচ ডি করার নিমিত্তে ভর্তি হন রবীন্দ্র বিশ্বভারতী ইউনিভার্সিটিতে।কিন্তু দু:খজনক হলেও সত্য তিনি রোগাক্রান্ত হয়ে পি এইচ ডি সমাপ্ত না করেই চলে আসেন। তিনি যখন আমাদের ক্লাস নিতেন তখন প্রাসঙ্গিকতায় অনেক সময় বাংলা ভাষার বিভিন্ন দিক নিয়ে কথা বলতেন। তিনির এ সকল কথাবার্তা আমাকে করতো বিমোহিত। আমি ক্লাসে তিনির কথাগুলো শুনতাম একাগ্রতায়।

তা থেকে আমি অনুপ্রাণিত, উৎসাহিত হই বাংলা ভাষার প্রতি, আমার মাতৃভাষার প্রতি অত্যন্ত আন্তরিকতায়।আমি চেষ্টা শুরু করি কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ লেখায়। লিখতাম তবে তা লুকিয়ে লুকিয়ে। প্রকাশ করা হতো না। সুবর্ণ সুযোগ আসে আমার জীবনে কবিতা প্রকাশের ক্ষেত্রে উত্তর বিশ্বনাথ উচ্চ বিদ্যালয়ের অন্বেষা ম্যাগাজিনে। ম্যাগাজিনে প্রকাশিত হয় প্রথম কবিতা অনুভুতি ও একটি প্রবন্ধ জনসংখ্যা সংক্রান্ত।কিন্তু সাংবাদিকতা বা সংবাদ বিষয়ক প্রথম প্রকাশিত হয় লেখা সিলেটের একমাত্র সাহিত্য বিষয়ক তৎকালীন সাপ্তাহিক সুর নামক পত্রিকায় এবং ঢাকা থেকে প্রকাশিত মাসিক জোনাকী পত্রিকায়।অনুভুতি কবিতাটি এখানে দিলে পাঠকের হৃদয়ানুভুতি পূর্ণ হবে বিশ্বাস করি মনে প্রাণে।তাই এখানে তুলে ধরছি-
অনুভুতি
মিজানুর রহমান মিজান:-
এক বুক উচছ্বসিত করুনাশ্রু,স্বপ্নিল আবেগ
ম্রিয়মান স্মৃতি
হতাশার কালোমেঘ চেতনার আকাশে
বৃষ্টির চোখে কুয়াশার কান্না


আমি এক তৃষিত যুবক
ক্ষুধার রাজ্য দেখি সুকান্তের মত।
জীবম্মৃত অনুভুতি একান্ত আপন আমার
নিরক্ত হলুদ পলাশের রং
রক্তে আমার উদ্ভ্রান্ত যৌবন
বিক্ষিপ্ত স্মৃতির স্থবির মনুমেন্ট।
রুপের ঝংকার বেজে উঠে বৈরী স্বভাবে
গতি পেতে চায় স্থবির মনুমেন্ট।


দ্বিতীয়ত: উত্তর বিশ্বনাথ উচ্চ বিদ্যালয়ের স্বল্পকালীন শিক্ষক জনাব তপু চৌধুরী স্কুল থেকে বিদায় নেন ৬ই ডিসেম্বর ১৯৮২ সালে।এ বিদায়ের অনুষ্ঠানে তিনিকে উৎসর্গ করে আমার লেখা বিদায় নামক কবিতাটি পাঠ করি। কবিতাটি ছিল নিম্নরুপ-
বিদায়
(উৎসর্গ তপু চৌধুরীকে)
মিজানুর রহমান মিজান
হে বন্ধু,
কর্মজীবনের প্রথম সাথী হিসেবে
আগমণের পদ-ধ্বনিতে
ক্ষণিকের স্থায়িত্বে, চেনা, জানায়
কতই আপন।
হে বন্ধু
দর্শনেই যেন সুপরিচিত
কাজে, হাসি আর খুশিতে ভরে দিলে মন সারাক্ষণ
কর্তব্য পরায়নতার রৌদ্রমুর্তি-আলোকবর্তিকা
হে বন্ধু
সংসার কুরুক্ষেত্রের তুমি এক উজ্জ্বল তারকা;
আসবে ঝড়, তুফান
দু’পায়ে দলে সম্মুখে হও আগুয়ান
হে বন্ধু
বিদায়ের ক্ষণে-হৃদয় বীণার তার
অদৃশ্য হাতের স্পর্শে হল বন্ধ
অনেক কিছু বলার ছিল- র’ল অলিখিত, অব্যক্ত
অজান্তেই নয়ন অশ্রুভারা ক্রান্ত
সকরুন চিত্রে হৃদয়ফলক অঙ্কিত
তবুওতো চলে যাবে তুমি
অজানিত বিস্মৃতির পথে
স্মৃতি তায় না রহিবে
না রহিবে দায়
হে বন্ধু বিদায়।
অত:পর এক সময় আমি পেয়ে যাই ঢাকা থেকে প্রকাশিত জাতীয় একটি দৈনিক পত্রিকার নিয়োগ পত্র। মাত্র কয়েকটি লেখা প্রকাশের পরই আমার জীবন চাকা অচল হয়ে পড়ায় আর লিখিনি বেশ কিছুদিন। হাত গুটিয়ে নেই লেখালেখি থেকে। চলে যাই প্রবাসে।তবে প্রবাসে যাবার আগে মৌলভী বাজার থেকে প্রকাশিত সাহিত্য ম্যাগাজিন “মুকুল” ও কয়েকটি লিখা প্রকাশ পায়। আজ স্মৃতির পাতার পর পাতা উল্টিয়ে সে সকল পত্রিকার সম্পাদক বা ঠিকানা হারিয়ে যাওয়ায় যোগাযোগ বা তাঁদের সহিত যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতায় ভুগছি অহরহ, অনির্বার।আমার উত্তর বিশ্বনাথ স্কুলে শিক্ষকতায় থাকাকালীন সময়ের একটি ডাইরী অনেক খোজাখোজির পর প্রাপ্তি বা প্রাপ্ত হলেও সকল ঠিকানা সে ডাইরীতে পাইনি।হারিয়ে গেছে অনেক কিছু। আর তা কেড়ে নিয়েছে প্রবাস আর প্রবাসী জীবন।

(চলবে)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *