পাল্টা : শম্পা সাহা

Spread the love

রোজ অসীম কাকু মায়ের কাছে আসে।বছর সতেরোর মৈনাক বিষয়টা বোঝে সবই কিন্তু কিছু বলতে পারে না ,তবে ওর মাকে ভীষণ ঘেন্না হয় ।  বাবা আর্মিতে চাকরি করেন, বছরের বেশিরভাগ দিনই কখনো কাশ্মীর ,কখনো গুজরাট ,কখনো ব্যাঙ্গালোর আর রোহিনী নিজের জীবনে ব্যস্ত ।আজকাল অবশ্য অসীম কাকু আসে, তার আগে আসতো জয়ন্ত কাকু। বাবা বাড়ি আসতেই চায় না আসলে, শুধু ঝগড়া আর ঝগড়া ,তারপর সারাদিন মদের নেশায় ডুবে থাকা! 

    মৈনাক কিন্তু বাবাকে খুব ভালোবাসে ,বাবা রোজ

ফোনে ওর সঙ্গে গল্প করে ,ওর পড়াশোনার খোঁজ খবর নেয় এমনকি ওর বান্ধবী আছে কিনা তাও জানতে চায়।বাবার এই বন্ধু  বন্ধু ভাবটা ওর বেশ ভালো লাগে । ও ভাবে, কবে বাবা আর্মি ছেড়ে একেবারে বাড়ি আসবে তখন ওর খুব ভালো লাগবে । মা তো নিজেকে নিয়েই ব্যস্ত কখনো  আমাকে সময় দিল না, বাবা আসলে তবু তো বেশ একজন কে সব সময় সঙ্গে পাওয়া যাবে, তাহলে ওর আর এত খারাপ লাগবে না। 

      বাবা বাড়িতে আসা মানেই যেন উৎসব !আজ  চায়না টাউন তো কাল ফ্লোটেল, পরশু আ্যমিনিয়া, তরসু অন্য কোথাও ,ঐ দিন কটা যেন স্বপ্ন !সবাই বলে তাদের বাবার সঙ্গে নাকি তাদের  বনিবনা হয় না কিন্তু ওর তো পুরো উল্টো,,ওর বাবা ওর জীবনের হিরো । 

    সেদিন তখন কটা রাত এগারো টা হবে ,মৈনাক তখনও পড়ছে, স্পষ্ট বুঝতে পারল অসীম কাকু এলো তারপর মায়ের ঘর থেকে বেরিয়ে আসতে লাগল গল্প ,টুকরো-টাকরা হাসি-ঠাট্টা ,এরপর নানা ধরণের শব্দ যা শুনলে মৈনাকের মরে যেতে ইচ্ছে করে । ও ভাবে একদিন মা এর সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলবে কিন্তু আবার ভাবে যে ও কি এতটা বড় হয়েছে যে, মাকে এ বিষয়ে কিছু বলতে পারে? মৈনাক ভাবে বাবা কি কিছুই বোঝে না ?তাহলে এত ঝগড়া হয় কেন মা আর বাবার?  বাবা এতদিন বাদে বাদে আসে তাও মা বাবার সঙ্গে ভালো করে কথা বলে না, খালি জিজ্ঞাসা করে ,”তুমি কবে যাবে? “। 

      ছোটবেলায় যখন বাবার চাকরির জায়গায় যাবার সময় ছোট্ট মৈনাক বাবার গলা জড়িয়ে ধরে বলতো, “না বাবা  তুমি কখনো যাবে না”, ওর মা ওকে টেনে নিয়ে ঘরে চলে যেত । তখন বাবার অসহায় মুখটা দেখে ওর খুব খারাপ লাগতো,বাবা কে বলতো, “মা খুব দুষ্টু ! তুমি মা কে বকো না কেন? “বাবা ওর মাথায় হাত বুলিয়ে বলতো , “না  বাবা , এসব বলতে নেই, মা হয় না? “।এই যে একাকীত্ব, এই যে পরিবার না পাওয়া, তা মৈনাককে খুব কষ্ট দেয় । 

    ওর কোচিং ক্লাসের একটা মেয়ে শ্বেতাকে ওর খুব ভালো লাগে । ও ই সব থেকে ভালো, ওর মার রোহিণীর বা ক্লাসের অন্য মেয়েদের মত সেজেগুজে লিপস্টিক মেখে আসে না ,এলোমেলো বয়েজ কাট চুল ,ভালো করে আঁচড়ায় ও না,আর কেমন ছেলে ছেলে ভাব , ওকে মৈনাকের খুব ভালো লাগে । শ্বেতা প্রায়ই ফোন করে সন্ধ্যেবেলা ,বেশিরভাগ দিনই পড়ার কথা বা অন্য কোনো সাধারণ কথা ,কোন নতুন সিনেমা, ক্রিকেট এইসব নিয়ে কিন্তু রোহিনী  বিষয়টা পছন্দ করে না । কেন, তা মৈনাক বুঝতে পারে না। এমনিতে তো মৈনাককে নিয়ে রোহিণীর খুব একটা মাথা ব্যথা নেই, এদিকে শ্বেতার ব্যাপারটা কিন্তু কিছুতেই মেনে নিতে পারে না । এ ব্যাপারে মৈনাককে ও বারবার বারণ করেছে বলেছে যে মেয়েদের সঙ্গে বেশি মেলামেশা করা নাকি ভালো নয় কিন্তু তাতে মৈনাকের গোঁ আরো বেড়ে গেছে । 

     মৈনাক অবশ্য বাবাকে কিছুই লুকায় না ,শ্বেতা যে ওর ভালো বন্ধু তা বাবাকে ও অনেক দিন আগেই  বলেছে।  ওরা কত ভালো বন্ধু,শ্বেতা কিভাবে ওকে হেল্প করে এইসব ওর বাবার জানা। বাবা অবশ্য কিছুই বলেনি উল্টে বলেছে ,”বাবা বন্ধুত্ব টা বজায় রাখবি। জীবনে একজন ভালো বন্ধুর খুব দরকার, যে সব সময় তোর  পাশে থাকবে। “

    সেদিন মৈনাকের জন্মদিন, যদিও কোনো অনুষ্ঠানের আয়োজন নেই কারণ রোহিণীর এত সময় কোথায়? সকালবেলা বাবা ফোন করে উইশ করেছে ,একটা ল্যাপটপ দেবে বাড়ি এলে, সেটাও বলেছে কারণ এটা ওর পড়াশোনার জন্য ভীষণ দরকার আর প্রমিস করেছে যে এবার আসলে ওকে দারুন একটা সিনেমা দেখাবে। রোহিনী  অবশ্য ওকে এক বাটি পায়েস করে খাইয়েছে সকাল বেলা ই। মৈনাক মাকে একবার বলল ,”মা আজ শ্বেতাকে একবার আসতে বলব? ” “কেন ?” “না মানে আজ আমার জন্মদিন ,তাই ওরা সবাই ট্রিট চাইছিলো। ” এ প্রস্তাব সরাসরি নাকচ করে দেয় রোহিণী বলে, “ওসব চলবে না। বাড়িতে আমি কোন মেয়ে আ্যলাও করব না। “রোহিণীর কথায় হঠাৎই মৈনাকের মাথাটা চট করে গরম হয়ে গেল ও সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করল, “কেন ?” “কেন মানে ?”রোহিনী  বিরক্তি প্রকাশ করে, “তুমি বড় হচ্ছে তাই একটা ছেলের বাড়িতে একটা মেয়ে ঘনঘন আসাটা ঠিক নয়, সেটা মোটেই সমাজের চোখে ভালো দেখায় না। ” সঙ্গে সঙ্গে মৈনাক পাল্টা প্রশ্ন করে, “ও ,আর অসীম কাকুর তোমার কাছে আসাটা! ” রোহিনী স্তম্ভিত হয়ে যায় ,ও ভাবতে পারেনি মৈনাক কোনদিন এভাবে বলতে পারে  মাত্র সতেরো বছর বয়স! রোহিণী একবার ভাবলো, ‘টেনে একটা চড় কষাই!’ তারপর সঙ্গে সঙ্গে মাথাটা ঠান্ডা করে বলল, “বাইরে যেতে পারো কিন্তু বাড়িতে নয়! ” মৈনাক ও ঠান্ডা গলায় বলে উঠলো, “এই কথাটা যদি আমিও তোমাকে বলি? “

পলাশীপাড়া : নদীয়া

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *