পাল্টা – পর্ব – ২ – শম্পা – সাহা

Spread the love

রোহিনীকে অবাক করে বের হয়ে গেল মৈনাক। রাগে, দুঃখে, অপমানে ,লজ্জায় রোহিনী ফুঁসতে লাগল আহত বাঘিনীর মত। এত বড় সাহস ওইটুকু ছেলের! এত বড় কথা বলে গেল! না ,কিছুতেই মেনে নিতে পারেনা রোহিনী। ভাবে মৃদুলকে ফোন করে যা মুখে আসে তাই বলে।  ওই নিশ্চয়ই ছেলেকে এই সব শিখিয়েছে, না হলে এত টুকু ছেলে ওকে এসব বলে কি করে! 

     সন্ধ্যে সাতটা বেজে গেল যখন, মৈনাক তখনো বাড়ি ঢুকলো না, রোহিণীর রাগ কমে এ বার চিন্তা হতে লাগল।এতক্ষণ হয়ে গেল তবু ফিরল না কেন ছেলেটা? কিছু করে বসলো না তো? এই কয় ঘন্টা রোহিনী শুধু নিজের রাগ, নিজের অপমান, নিজের দুঃখের কথা ভেবে গেছে কিন্তু এতক্ষণ কেটে যাওয়ার পরও ছেলে বাড়ি ঢুকলো না দেখে ও বাধ্য হয়ে ফোন করল মৈনাক কে। বারবার ফোন করল কিন্তু প্রতিবারই ফোনটা বেজে গেল কেউ ধরলো না। বার সাতেক  ফোন করতে, এবার ফোনগুলো কেটে দিতে লাগল মৈনাক। 

   রোহিনীর  রাগ ছাপিয়ে চিন্তা হতে লাগল, একবার ভাবলো, ‘যাক যেখানে খুশি । এত বড় বড় কথা বলতে যখন শিখে গেছে তখন, ঠিক নিজের খেয়াল রাখতে পারবে’ কিন্তু পরক্ষনেই দুশ্চিন্তা, আজকালকার ছেলে যদি কিছু করে বসে! বাধ্য হয়ে ফোন করল মৃদুল কে । দুবার রিং হতেই মৃদুল ফোনটা ধরলো। “মৈনাক রাগ করে বাড়ি ছেড়ে সেই কোন সকালে বেরিয়ে গেছে এখনো বাড়ি ফেরেনি “,শুধু এইটুকু তো । বোধহয় বছরখানেক পর রোহিনী নিজে থেকে মৃদুল কে ফোন করল! এমনিতে মৃদুল ই ফোন করে খোঁজখবর নেওয়ার জন্য কিন্তু ,যবে থেকে ছেলের ফোন হয়েছে সেটুকুও বন্ধ ! রোহিণীর ফোন পেয়ে মৃদুল বুঝল যে কিছু একটা গন্ডগোল হয়েছে। 

    রাত প্রায় এগারোটা মৈনাক বাড়ি ঢুকলো।  সাড়ে নটার সময় বাবার ফোনটা পাবার আগে পর্যন্ত ঠিক করেছিল, আর কোনোদিনই বাড়ি ফিরবে না, ওই নোংরা মহিলার সামনে আর গিয়ে দাঁড়াবে না, কোনোদিন ই ডাকবে না মা বলে, যেদিকে দুচোখ যায় চলে যাবে । কিন্তু যত সময় বেড়েছে ততো ধীরে ধীরে ওর মাথা ঠান্ডা হয়েছে , তবুও মায়ের মুখ দেখতে ইচ্ছে করছিল না ।বাবার ফোন পেয়ে বাড়ি না ফিরেও উপায় ছিল না, সত্যিই তো বাবার তো আর কোনো দোষ নেই, আর সে  ছাড়া বাবার আছেই বা কে? 

     দিন পনেরো পরেই ছুটি নিয়ে মৃদুল বাড়ি এল, যদিও রোহিনী কিছু বলার প্রয়োজন বোধ করেনি আর মৈনাক ও স্পষ্ট করে খুলে কিছু বলেনি কিন্তু  ছেলের মানসিক অবস্থাটা সহজেই মৃদুল বুঝতে পারল , যখন মায়ের কথা বলতে গিয়ে মৈনাক  কান্নায় ভেঙে পড়ে। ওর লজ্জা,ওর অপমান, ওর দম চাপা কষ্ট সব সব মৃদুল নিজের হৃদয় দিয়ে অনুভব করে ,তাই তো বহু অনুরোধ-উপরোধ করে হঠাৎ ই ছুটির ব্যবস্থা করে অসময়ে বাড়ি । এইসময় ছেলের পাশে থাকাটা খুব দরকার যে। 

    বাবা কে বাড়ি আসতে দেখে মৈনাক তো আনন্দে পাগল হয়ে গেল কিন্তু এখন ও বুঝতে শিখেছে তাই বাবার অসহায় অবস্থা মনে করে ওর খারাপও লাগে আবার  রাগ ও হয় !এমন মেরুদণ্ডহীন মানুষ কেন বাবা? 

     মা এর সঙ্গে ওর একেবারে কথা বন্ধ । আগে খাবারটা বেড়ে দিত কিন্তু আজকাল  ও নিজেই খাবার 

নিয়ে নেয়, ওই ভদ্রমহিলার সঙ্গে কোনো সম্পর্ক রাখতেই ওর ইচ্ছে  করে না। 

     মৈনাক ঠিক করে এ বিষয়ে বাবার সঙ্গে কথা বলবে তাই যেদিন বাবা এলো সেদিন রাতে ও বাবার সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলতেই জেগে রইলো অনেক রাত অবধি । মৃদুল ইচ্ছে করেই দেরি করছিল যাতে কোনো প্রশ্নের মুখোমুখি হতে না হয়, যদিও জানত যে পরিস্থিতি এড়ানো যাবে না ,কিন্তু যতটা পেছানো যায় আর কি! 

     মৃদুল পাশে এসে শুতেই মৈনাক উঠে বসে বলল ,”বাবা তোমাকে একটা কথা জিজ্ঞাসা করব ?”ওর চাপা স্বরে মৃদুল বুঝতে পারল যে কি হতে চলেছে ,কি প্রশ্ন করতে চলেছে ওর নিজের ছেলে।একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “বল”, ” বাবা  মা কেন তোমাকে ভালোবাসে না ?”এই প্রশ্নটা এত সরাসরি  মৃদুল আশা করেনি তাই অন্ধকার ঘরে চুপ করে বসে রইল উত্তর দেবার দায় এড়াতে।কেউ কারো মুখ দেখতে পারছে না অন্ধকারে যেন একটা ধৈর্যের খেলা চলছে বাবা আর ছেলেতে,এমন দৃশ্যে অভিনয় হচ্ছে যা পৃথিবীতে খুব কম লোকের জীবনেই হয়েছে। 

     মৃদুল অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে প্রশ্নটা এড়াতে চাইল, কিন্তু যখন দেখল যে মৈনাক কিছুতেই শুয়ে পড়ল না, ওই রকম বসেই রইলো, তখন আস্তে আস্তে শুরু করল ওর জীবনের এমন এক অধ্যায়ের গল্প যা কোনোদিন কারো সঙ্গে আলোচনা করবে তা  স্বপ্নেও ভাবেনি, অন্তত নিজের সন্তানের সঙ্গে তো নয় ই। 

    মৃদুল রোহিনীর সেই  স্কুল লাইফ থেকেই প্রেম ।অত্যন্ত সুন্দরী রোহিনীর প্রতি যদিও পাড়ার সব ছেলেদেরই প্রেম প্রেম ভাব ছিল কিন্তু রোহিনী মৃদুল কেই ভালোবেসেছে। তাই অন্য ছেলেরা ওর পিছনে ঘুরঘুর করলেও মৃদুল ছাড়া কোনোদিনই ও কাউকে পাত্তা দেয়নি । ওদের সম্পর্কটাকে পরিণতি দিতে উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করে মৃদুল চলে যায় আর্মির চাকরিতে কিন্তু ওদের বিয়েটা  বাড়ির লোকেরা কোনদিনই মেনে নেয়নি কারণ রোহিনীর মা ওর বাবাকে ছেড়ে অন্য একজনের সঙ্গে চলে যায় ।যেন ওর মায়ের করা দোষের দায়টা সম্পূর্ণভাবে ওর ই,তাই যেমন লোকে ওর বাবাকে বলতো, “ভেড়া,মেরা, নৃপুংসক, বউ কে কন্ট্রোল করতে পারে  না”,ঠিক তেমনি রোহিণীর সম্পর্কেও লোকে এই ধরণের কিছু বিশেষণ ব্যবহার করতো। ওর সৌন্দর্য যেন আরো বেশি করে ওর শত্রু হয়ে উঠেছিল। মা না থাকার কারণে বাবা আর মেয়ে জ্যাঠা জ্যেঠিমার  সংসারে বোঝা।  ওর মায়ের জন্য জ্যেঠিমা রোহিণীকে শুনিয়ে শুনিয়ে যেসব চোখা চোখা বাক্যবাণ প্রয়োগ করতেন রোহিনী তার প্রতিবাদ না করলেও ওর মনের ভেতরটা একেবারে ছিন্নভিন্ন হয়ে যেত। 

       রোহিনীর মায়ের সম্পর্কে  পাড়ার সবাই জানত তাই একই পাড়ার বাসিন্দা মৃদুলের পরিবার যে ওকে মেনে নেবে না এটাই তো স্বাভাবিক । চাকরি পাবার পর মৃদুলের বাড়ির লোকের অমতেই রোহিনী আর মৃদুলের বিয়ে, তারপর অনেক দূরে সবার থেকে আলাদা করে ওদের এখানে সংসার পাতা। 

চলবে …..

শম্পা_সাহা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *