ফর্সা কালচার ও দেবী কালিকা – পুলক মন্ডল

Spread the love

‘লাল কালিতে ছাপা হল্‌দে চিঠির মত / আকাশটাকে মাথায় নিয়ে / এ গলির এক কালোকুচ্ছিত আইবুড়ো মেয়ে / রেলিঙে বুক চেপে ধরে / এইসব সাত-পাঁচ ভাবছিল / ঠিক সেই সময় / চোখের মাথা খেয়ে গায়ে উড়ে এসে বসল / আ মরণ! পোড়ার মুখো লক্ষ্মীছাড়া প্রজাপতি!’(সুভাষ মুখোপাধ্যায়)
  সুতরাং কালো মেয়ের গায়ে প্রজাপতি বসবে! সাহস তো কম নয়! কালো মেয়েকে কি কখনো রোমান্টিক হতে হয়! বালাই ষাট!

দেবীকুলের মধ্যে কালীর রূপ ও চরিত্র সর্বাধিক রোমাঞ্চকর। একদিকে ঘোর অমাবস্যায় তাঁর পূজা অন্যদিকে তিনি ভীষণদর্শনা, ক্রোধান্বিতা এবং একইসাথে লজ্জাহীনাও। একসময় জনাকীর্ণ মধ্যরাতের পূজাতেই ছিল তাঁর অধিকার।

কালী মূর্তি কল্পনায় অনার্য সংস্কৃতির প্রভাব সর্বজনবিদিত। তন্ত্রশাস্ত্রে কালো একটি রঙ এবং দেবী কৃষ্ণবর্ণ। পদ্মপুরাণ অনুযায়ী দেবী শুম্ভ-নিশুম্ভের সাথে যুদ্ধ করার সময় ক্রোধে কৃষ্ণবর্ণে রঞ্জিত হয়ে যান। শাক্ততত্ত্ব অনুযায়ী এই কৃষ্ণবর্ণা দেবী কালিকাই সকল সৃষ্টির কারন। সেইজন্য সকল দেবতার উপরে তাঁর স্থান। আবার মহাভারতের সৌপ্তিক পর্বে দেবী কালিকাকে দেখানো হয়েছে, অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে প্রতিনিয়ত লড়াই করতে করতে তিনি নিজের শরীরে বিষের নির্যাস ধারন করতে করতে কৃষ্ণবর্ণা হয়েছেন। ‘কালিপ্রদীপে’ উল্লেখিত আছে কলিযুগে কলি নামক ভয়ঙ্কর আসুরিক প্রভাব থেকে ভক্তদের রক্ষা করতে তিনি কৃষ্ণবর্ণা রূপে পূজিতা হন।


হরপ্পা-মহেঞ্জদারো সভ্যতায় মাতৃপূজা প্রচলিত ছিল বলে জানা যায়। যেহেতু এই সভ্যতা ছিল মাতৃতান্ত্রিক তাই অনেকেই এই সভ্যতায় পূজিত দেবীর সাথে কালিকার সাদৃশ্য খুঁজে পান। আবার কেউ কেউ একে আদিবাসী সম্প্রদায়ের দেবীরূপে বর্ণনা করে থাকেন। সপ্তম-অষ্টম শতকে কবি বানভট্টের ‘কাদম্বরী’-তে দেবী চণ্ডীর উপাখ্যানে পাওয়া যায় ‘কালিকা’ শবরদের আরাধ্যা। তিন’শ থেকে ছ’শ খ্রীষ্টপূর্ব সময় পর্যন্ত কালী মুলতঃ যুদ্ধের দেবীরূপে পূজিতা হতেন। বৈদিক দেবী হলেও সনাতন হিন্দুধর্মের মূল স্রোতে তিনি কিছুটা হলেও ব্রাত্য ছিলেন। প্রধানত নিম্নবর্ণ বা অবৈদিক সমাজেই তিনি ছিলেন জনপ্রিয়।

      কালী নারীসত্ত্বার এমন একটা রূপ যা স্বয়ংসম্পূর্ণ, প্রচলিত স্ত্রী ভাবনার পরিপন্থী, অনন্য। আবহমান কাল ধরেই ভক্তিমার্গে তাঁর আসনে উপেক্ষার ছায়া। বেদ ও পুরাণের অকুণ্ঠ সমর্থন সত্ত্বেও তাঁর ঐশী অস্তিত্বের সামগ্রিক গ্রহণীয়তা দীর্ঘসময় ধরে অবহেলিত। এ যেন এক লড়াইয়ের কাহিনী, আপস না করার লড়াই। অতি প্রাচীনকাল থেকেই কালী আধুনিক। তাঁর বলিষ্ঠ ব্যাক্তিত্বকে কখনোই আরোপিত মনে হয়না। যুদ্ধক্ষেত্রে প্রবল পরাক্রমে অসুর নিধন তাঁকে কখনোই অ-সহজ করে তোলেনা। এই স্বাচ্ছন্দ্য-ই হয়তো নারী ক্ষমতায়নের প্রথম সোপান।  

একথা আজও অত্যন্ত সত্য যে দেবী কালিকা সাধারনভাবে অভিজাত পূজায় তেমন একটা স্থান করে নিতে পারেননি। একটা সময় শ্মশান কালী, ডাকাতে কালী ইত্যাদি নামকরনের মধ্যে দিয়ে সহজেই অনুমেয় যে তিনি কার্যত সমাজের পিছিয়ে পড়া শ্রেণী অথবা দুর্বৃত্ত বলে চিহ্নিত কিম্বা আইন ভঙ্গকারী বিপ্লবীদের প্রেরনাদাত্রী ছিলেন।


      তবে অভিজাত সমাজে তেমন একটা পাত্তা না পাওয়া কি তাঁর কৃষ্ণবর্ণের জন্যই! ‘কালো, তা সে যতই কালো হোক’, তাঁর হরিণ চোখ কি তেমন ভাবে ধরা পড়ল না! প্রাচ্যের দেশগুলিতে বিশেষ করে আমাদের দেশে ফর্সা রঙের গুমরই আলাদা। ফর্সা কালচারের ব্যাপক মার্কেট বিয়েতে। ফর্সা মেয়েকে কে না বিয়ে করতে চায়! বিয়ের বিজ্ঞাপনে ‘পাত্রী গৌরবর্ণা’ যেন আভিজাত্যের অহংকারী প্রকাশ! যেন নারী সৌন্দর্যের একমাত্র মাপকাঠি তাঁর ‘গৌরবর্ণ’। আর কালো মেয়েও যেন কেমন হীনমন্যতায় ভোগে! তাঁর সকল গুণকে সে নিজেই ঢাকতে চায় কালো রঙের হতাশ উচ্চারনে- ‘আমি যে কালো’! আশ্চর্য! কেন যে সকল গুণবতী অথবা অ-গুণবতী(কিসের মাপকাঠিতে কে জানে!) কৃষ্ণবর্ণা সোচ্চারে বলেনা, ‘আমি কালো এটাই আমার অহঙ্কার’। কেননা কালোই হল একই সাথে পৃথিবীর আদিম ও নবতম সৌন্দর্য।

          কালিকা যেন এক উপেক্ষিতা নির্জন নারীসত্তা যিনি একক অথচ আত্মবিশ্বাসী। পুরুষ নির্ভর নয়। বরং পুরুষের নির্ভরতাকেই তিনি বহন করেন। কালী নামের অর্থ কালো। আবার ‘কালো’ শব্দটা এসেছে কাল বা সময় থেকে। তাই দেবী কালী কাল বা সময়ের দেবী। পরিবর্তনের দেবী। পরিবর্তন সবসময়ই নতুন শক্তির নতুন ভাবনার ধারাকে জাগ্রত করে। পরিবর্তন তাই আস্থারও প্রতীক। কালো রঙ সকল রঙকে শোষণ করতে পারে। অর্থাৎ সকল রঙকে যখন একত্রে সমপরিমানে মিশ্রিত করা হয় তখন তা কালো রঙের চেহারা নেয়। পৌরাণিক সূত্রানুযায়ী দেবী কালিকার গায়ের কালো রঙের তাৎপর্য হল- মহাবিশ্বের সকল কিছুই তিনি তাঁর নিজের দেহে ধারন করতে পারেন। যেমন করে মহাভারতে শ্রীকৃষ্ণ তাঁর দেহে সকল কিছুকে ধারন করে অর্জুনকে বিশ্বরূপ দেখিয়েছিলেন।

বহুদিনকার একটি প্রবাদ আছে-‘কালো জগতের আলো’। কালোবর্ণা নারীই তো তাঁর আলোকধারায় ধুইয়ে দিতে পারে পুরুষের যত মলিনতা। পুরানের তত্ব অনুযায়ী সেই কবে কোন কালেই ফর্সা কালচারের বিরুদ্ধে রীতিমত তোপ দেগে নিজের স্বামীকেই পরীক্ষা করে নিয়েছিলেন দেবী কালিকা, যা কার্যত নারীর আত্মমর্যাদা যাচাই করার-ই চিত্র।


নারীর নিজস্বতা বলিষ্ঠভাবে প্রকাশের জন্য দেবী কালিকা কিন্তু নিজের ইচ্ছাতেই ‘গৌরবর্ণা’ থেকে ‘কৃষ্ণবর্ণা’ হয়ে উঠেছেন। ‘শিব’ কি শুধুই তাঁর ফর্সা রঙে মুগ্ধ না কি আরও অন্যকিছু এমন ভাবনাতে ‘সতী’ নিজেই ধীরে ধীরে দেহের বর্ণের পরিবর্তন ঘটিয়ে হয়ে উঠেছিলেন ঘোর কৃষ্ণবর্ণা ‘শ্যামা’। এমনটা আমরা ‘পদ্মপুরাণে’ দেখতে পাই। আর শিব কি তখন শ্যামাকে ডিভোর্স দিয়েছিলেন? কই না তো! বরং তাঁর ব্যক্তিত্বে মুগ্ধ হয়ে তাঁকে আরও বেশি কাছে টেনেছেন, আরও বেশি ভালবেসেছেন……….

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *