মন – স স আলম শা্

 

 

 

 

পরম সত্ত্বার আর এক নাম মন । যাকে দেখা যায় না, ছোঁয়া যায় না । তাই তাঁর আস্হিত্ব বলে কিছু থাকতে পারে না এমনটাই ভাবা স্বাভাবিক । তবে থাকে দেহের মধ্যে শুধু অনুভব করা যায় যে, মন বলতে অদৃ্শ্য বস্তু বলে কিছু আছে । আর বস্তুবাদীরা মনে করেন, মন বলতে কিছুই নেই । কারণ মন হল ধরা ছোয়ার বাহিরে । সেহেতু নিরপেক্ষ বিচারে এটা মেনে নেয়া যায় না । এ প্রসংগেই আমরা যদি চিন্তার একটু গভীরে যাই, তাহলে প্রশ্ন জাগে বস্তুর উৎস কি ? বস্তুবাদী বিজ্ঞানীরা বিশ্বাস করেন, শুধু যে বিশ্বাস করেন এমন নয়, প্রমান করছেন বস্তুকে শক্তিতে রূপান্তর করা যায়। কিন্ত বস্তুর উৎস কোথায় ?

প্রকৃত পক্ষে শক্তি বস্ততে রূপান্তিত হয় বলেই বস্তুকে শক্তিতে রূপান্তরিত করা যায় । বস্তুবাদীরা যে শক্তির কথা উল্লেখ করেছেন সে শক্তি কি ধরা ছোয়া যায় ? সে শক্তি সাকার না নিরাকার ? সাকার হলে সেটা শক্তি নয়, সেটা হচ্ছে বস্তু । আর নিরাকার হলে স্বীকার করতে হবে সেটা ভাবের বিষয় । জ্ঞান কথাটা বাস্তবাদী এবং ভাববাদী । অথচ আমরাও বলতে পারি, যাকে ধরা যায় না, ছোঁয়া যায় না, সেই জ্ঞানের অস্হিত বলতে কিছু নেই । এজন্যই বলা হয়েছে বস্তর বেলায় বস্তুগত প্রমান দেয়া সন্ভব । কিন্ত ভাবের বেলায় বস্তুগত প্রমান দেয়া সন্ভব নয় । ভাবের বেলায় যুক্তি হচ্ছে প্রধান । কাজেই বাস্তবাদীরা যদি কোন বস্তুর মধ্যে আত্মা বা মনের অস্হিত্ব খুঁজতে থাকেন সেটা হবে তাদের মূর্খতা ।

অতএব বস্তুবাদীদের এ মূর্খতার অংশীদার আমরা হতে পারি না । মন বলতে কিছু নেই এটা আমরা বিশ্বাস করি না । কারণ মনই দেহের ষড়রিপুকে পরিচালিত করে । উদারণ স্বরূপ আমরা যখন খাবার খাইতে চাই, তখন মূখ দিয়ে খাই । কিন্ত যখন খাবার খাইতে অনিচ্ছা পূষণ করি তখন বলি যে, আমার মনে চায় না উক্ত খাবার খাইতে । আমরা কিন্ত বলি না যে, আমার মূখ খাবার খাইতে চায় না । ঠিক একই ভাবে হাটতে পায়ের প্রয়োজন হয় । কিন্ত যখন হাটতে ইচ্ছা না করি তখন বলি মনে চায় না হাটতে, মনে চায় না দেখতে, মনে চায় না শুনতে, সবই মনের ব্যাপার । এ থেকেই বুঝা যায় মন হচ্ছে দেহের রিপু গুলির পরিচালক । আর মনের নিয়ন্ত্রক হল পরম সত্ত্বা । তবে মন ও আত্মা এক নয় ।


দেহ আত্মা মন প্রত্যেকটির আলাদা বৈশিষ্ট্য রয়েছে । কিন্ত প্রত্যেকটির সাথে প্রতিটির ত্রিভূজ আকৃতির সর্ন্পক রয়েছে । যেমন দেহের সাথে মন ও আত্মার সর্ন্পক রয়েছে । একটা দেশের সরকার বলতে যেমন নিদিষ্ট কোন এক ব্যাক্তিকে বুঝায় না, ঠিক তেমনি মন বলতে একক কোন সত্ত্বাকে বুঝায় না । ইচ্ছা, জ্ঞান এবং অনুভুতি এই তিনটির ভাবগত উপাদান নিয়ে মন । আত্মা থেকেই মনের উৎপত্তি । মন হচ্ছে দেহের পরিচালক । সরকার কে যেমন জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন করা যায় না, ঠিক তেমনি মন থেকে দেহ আত্মাকে বিচ্ছিন্ন করা যায় না । একটা রাষ্ট্রের যেমন নিদ্দিষ্ট ভুখন্ড না থাকলে সরকারের কোন অস্হিত্ব থাকে না ঠিক তেমনি দেহ ছাড়া আত্মা ও মনের কোন অস্হিত্ব খুঁজে পাওয়া যায় না । চারটি উপাদানে যেমন রাষ্ট্র গঠিত হয়, ঠিক তেমনি দেহ, আত্মা, মন, ও মনের স্বাধীনতা নিয়েই হয় মানুষ । ইচ্ছা আছে বলেই চাওয়া আছে । জ্ঞান আছে বলেই খারাপ কাজে মন সারা দেয় না এবং অনুভুতি আছে বলেই দুঃখ কষ্ট অনুধাবন করে । যারা ইচ্ছা অনুভুতি, আবেগ, চিন্তা, বিচার, সূখ, দুঃখ, আলো, অন্ধকার, ইত্যাদির কথা উল্লেখ করেছেন । মনের তিনটি উপাদানের মধ্যে এসবের সন্ধান পাওয়া যায় । আলো, অন্ধকার বা উষ্ণ ঠান্ডা, এটা একটা অভিজ্ঞতার যোগফল, যা জ্ঞান দ্বারা নির্ণয় করতে হয় । আমরা অনেক সময় কথায় কথায় বলি এই লোকটার মন বলতে কিছু নেই ।


তা হলে লোকটা কি মন ছাড়া ? না লোকটারও মন আছে তবে মনের আবার শ্রেনী ভাগ আছে । একটি ভাল দিক অন্যটি খারাপ দিক । মন যদি ভাল কাজ করে তবে বুঝতে হবে তাঁর মনের মধ্যে জ্ঞানের উপাদ্য গুলি বিদ্যমান । আর যদি খারাপ কাজ করে তবে বুঝতে হবে তাঁর মনের মধ্যে জ্ঞানের উপাদ্যের অভাব আছে । কাজেই দেখা যায় মন ও জ্ঞান একে অপরের সহায়ক । যদি মন থাকে জ্ঞান না থাকে তখন আমরা বলি লোকটা বোকা । অর্থাৎ জ্ঞানহীন কিন্ত মন আছে । এই জ্ঞানকে দুটো ভাগে ভাগ করা যায় । একটি আধ্যাত্মিক জ্ঞান বা দাশর্নিক জ্ঞান অপরটি বৈষয়িক জ্ঞান । আধ্যাত্মিক জ্ঞানকে আবার দুই ভাগে ভাগ করা যায় , যেমন যারা দাশর্নিক জ্ঞানের অধিকারী তাদেরকে দাশর্নিক বলে, এবং ওলি, পীর, ফকির, দরবেশ যে জ্ঞানের অধিকারী সেটাকে বলে আধ্যাত্মিক জ্ঞান । মূলতঃ দুটোই কিন্ত আধ্যাত্মিক জ্ঞান । আধ্যাত্মিক জ্ঞান থেকেই ঐশ্বরিক শক্তি সঞ্চয় হয় ।


র্ধম দর্শন, বিজ্ঞান, শিল্পী, কবি, সাহিত্যক প্রত্যেকই কিন্ত আধ্যাত্মিক জ্ঞানের অধিকারী । র্ধম, দর্শন, বিজ্ঞান প্রত্যেকটি ভিন্ন ভিন্ন শাখা হলেও মূলত একটা সর্ন্পক আছে । কাজেই দেখা যায় মন থেকেই সকল কিছুর উৎপত্তি এবং মন দ্বারাই সকল কিছু ধারন করতে হয় । মনের মাঝেই ভাবের সৃষ্টি হয় এবং সেই ভাবজগতে ডুবে গিয়ে অনেক অজানা রহশ্যের পথ পারি দিয়ে পরম সত্ত্বার সানিন্দ্য লাভ করতে হয় । এই জন্য চাই স্হির মন ও কোমলতা যা নিজের ইচ্ছামত চলার জ্ঞান যার মধ্যে বিদ্যমান থাকে । সকল ধর্মেই এবং সকল দাশনির্করাই নিজকে চিনার পর তার র্কম পন্হা ঠিক করে র্প্রাথনা করতে বলেছেন । এখন প্রশ্ন জাগে নিজকে চিনার উপায় কি ? সেটাই প্রশ্ন । আমাদের দেহের সুরত যদি আয়নার মধ্যে দেখি তবে কি নিজকে চিনা যাবে ? হয়ত যাবে নিজের দেহের অঙ্গ প্রতঙ্গ গুলি এবং মূখ মন্ডল খানির সুন্দর বা বিকৃত অবস্হা । তাহলেই কি নিজকে চেনা গেল ? এভাবে নিজকে চিনলে কি আর দাশর্নিকদের উপদেশ লাগে ? কিন্ত দাশর্নিকরা কি আয়নায় চেহারা দেখার কথা বলেছেন ?


কখনো না । দাশর্নিকরা বলেছেন নিজের মনকে জিজ্ঞাসা করে দেখার জন্য যে, আমি মানুষ কিনা ? আমার জ্ঞানের পরিধি কতটুকু ? আমার ব্যক্তিত্বের মাপকাঠি কি ? আমার সমাজ, আমার পরিবার, আমার রাষ্ট্র, আমাকে অবজ্ঞা করে কিনা ? যদি করে তার প্রতিকারের উপায়ের জন্য আমার কি করণীয় ? আমার দ্বারা মানুষের কল্যান হয় কিনা ? এরকম অসংখ্য প্রশ্নে মনকে জর্জরিত করলে যদি নিজ থেকে উত্তর পাওয়া যায়, আর সে উত্তর গুলি যদি জ্ঞানের সমুদ্রের মধ্যে পেলে দেওয়া যায় এবং উত্তর গুলি যদি সমুদ্রের মধ্যে বেসে বেড়ায় ও তা দ্বারা মানুষ, জীবজগত, প্রানীজগত, বস্তুজগত, জড়জগত, তথা সৃষ্টি জগতের কল্যান করে তবেই নিজকে জানা বা চিনার অনুভব জগ্রত হবে । যদি এই গুলির উত্তর থেকে দুর্গন্ধ ছড়ায়, যদি খারাপ র্কমের প্রেরনা যোগায়, যদি সৃষ্টি জগতে অকল্যান হয়, যদি জ্ঞান সমুদ্রে পেলে দেয়ার পর না বাসে, তবে বুঝতে হবে নিজকে জানা ও চিনা সন্ভব হয় নাই ।


তার জন্য কঠোর অনুশীলন, সাধনার মাধ্যমে মনকে নিজের আয়ত্বের মধ্যে রেখে মনকে বশীকরণ করতে হবে । তাই মানুষ সৃষ্টির আদিকাল থেকে মনকে বুঝানোর চষ্টা করে আসছে যেমন, প্রেমিক প্রেমিকা, ভাবুক, বাউল, সাধক, কবি, সাহিত্যেক, পীর, ফকির, দরবেশ থেকে শুরু করে সাধারন মানুষ ও পাগল পর্যন্ত এই মনের দ্বারস্ত হয়ে মনকে বুঝানোর চেষ্টার কজ চালিয়ে যাচ্ছেন । যদি মন চায়, সেই জন সবই পায় । এমন অনেক কাব্য, বচন, গান, কবিতা, ছড়া এই মনকে উদ্দেশ্য করে লেখা হয়েছে । তবুও মনের খুঁজ নাহি পায় । মন আবার অনেক রূপকারেও প্রকাশ পায় যেমন, আমরা অনেক সময় বলে থাকি নরীর মনের খবর স্বয়ং আল্লাহ ছাড়া কেহ জানে না। কাজেই মনের আর এক নাম হল গোপন রহশ্যের ভান্ডার । যার খবর এক মাত্র সেই জানে যদি মনে মনে মিলন ঘটে । মনের মিলন না হলে ভালবাসা হয় না তাঁর সনে ।


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *