নীল পরী – সমৃদ্ধি মৌলিক

দুদিকে কেবল উদ্বেলিত বারিসমূহ ,ছাপিয়ে চলেছে দিগন্তজুড়ে -রাশে রাশে নীল জল ।

 কত নীল পরী ,কত বাহারি তাদের ডানা…. লুকিয়ে রয়েছে সেই মাতঙ্গ তরঙ্গের তলায়। কয়েক হাজার -কোটি বছর ধরে তারা অবলুপ্ত হয়ে রয়েছে বিশ্বজগতের থেকে । কোন এক অবলুপ্ত কোনে তারা বিচরণ করে…..পাখায় পাখায় -লহরে লহরে তাদের দিন কাটে । কিন্তু এই দুরান্তর প্লাবিত লহরীমার বুক ভেদ করে উঠেছে একটা  চোঙাকার কালো পাথর- যেন আক্রমণের সবুজ পতাকা দেখাচ্ছে যে কোনো দুষ্ট জাহাজকে যে কিনা নষ্ট করতে চাইবে এই অখ্যাত অজ্ঞাত কোনের স্বচ্ছতাকে – দূষিত করতে চাইবে এখানকার মলিন মহিমাকে -আতঙ্কে ক্লান্ত করে দেবে নীল পরীদের। রহস্য উদঘাটন করে প্রথমা হবে এক কোটি বছরের গাম্ভীর্যকে ভঙ্গ করে

 তাই কোন জাহাজ আসে না এই দিকটায়|

 সূর্যের প্রথম রশ্মি যখন এসে পড়ে ভু- নীলিমার উপরে ,জলের উপরে লাফিয়ে ঝাঁপিয়ে খেলা করে সেই নীল পরীরা ……উছ্লে উছ্লে ,উৎলে-উৎলে ফুলে-ফেঁপে ওঠে জল । ব্যস্ত জগত কাকে বলে তারা জানে না । মানুষ কোনোদিন তারা দেখেনি । শুধু দেখেছে ওই কালো পাথরটাকে – যে শীর্ষকে  আগমন জানাচ্ছে।

Vastly expansed, through decades, 

Stretched with fineness without facade, 

Awashing shores, beguiling venoms, 

Beautifying depths, soothing storms, 

Horizon lies clad, with betwiched eyes, 

As if a dream, layered with lies, 

End without beginning, beginning without end, 

Where all tonalities are suppressed, 

Fathomlessly unmistakable, here lies the irony, 

Defeated minds, hearts freed from monotony, 

Playing and juggling, with logic and science, 

Caressing harmony, valouring pride, 

Lies the ocean, untamed and wide, 

An unpardonable imagination, yet kept aside.

সকালের হালকা আভা এসে পরল মন্দাকিনীর চোখের উপর ।ঘুম ভাঙলো তার । ভোর তখন ছটা। বর্ষাকাল -তবুও হঠাৎই কদিনের মেঘ কেটে গিয়ে কেমন একটা মেঘফাটা রোদ্দুর এসে পড়েছে -ওই প্রাতের ভিম রতি । 

ভিম রতি কী আর প্রকৃতির হতে পারে না? 

রুদ্রপ্রয়াগ তখনো ওঠেনি । একটু পরে হয়তো উঠবে । মন্দাকিনী বিছানা ছাড়লো । নটার সময় বেরোতে হবে তাকে । কাছেই একটা স্কুলে সে পড়ায় । ফিজিক্সের শিক্ষিকা  । আজ অবশ্য স্কুলের ফাউন্ডেশন ডে । ছাত্র-ছাত্রীরা তাড়াতাড়ি এসে পড়বে,  পতাকা উত্তোলন হবে ,স্কুল   anthem হবে, খেলাধুলা ও নাটক দিয়ে শেষ হবে দিনটা । প্রতিবছর এই দিনটা খুব ধুমধাম করে উদযাপন করা হয় । 

এইসব নানা কথা ভাবতে ভাবতে মন্দাকিনী দাত  মাজছিল। 

“মা “

হঠাৎই ডাক শুনল মন্দাকিনী। 

পিছনে দাঁড়িয়ে ছয় বছরের পালক। 

“কীরে? উঠে পড়েছিস এত তাড়াতাড়ি ?”

“ঘুম ভেঙে গেল” চোখ কচলাতে কচলাতে বলল পালক। 

বাইরে তাকিয়ে দেখল মন্দাকিনী। সত্যিই খুব জোরে বৃষ্টি নেমেছে। কিন্তু একটু আগেই যে রোদ ছিল- ওই যে প্রভাতের ভীমরতি । 

মন্দাকিনী আর পালক একসাথে স্কুলে যায়। মন্দাকিনী পড়ায়  আর পালক পরে। 

সারাদিন ক্লাসের ফাঁকে, টিফিন  টাইমে দেখা সাক্ষাৎ হতেই থাকে তাদের। 

কখনো বা ক্লাসরুমের অন্য দরজা দিয়ে হঠাৎই দেখা দেয় মন্দাকিনী…উঁকি মেরে দেখে নেয় পালককে…দুষ্টুমি করছে- নাকি মন দিয়ে পড়া শুনছে । মাঝে মাঝে ক্লাসের ফাঁকে বাথরুমে যাবার নাম করে ইলেভেন টুয়েলভ এর ক্লাসরুমের সামনে গিয়ে টুক করে দরজা দিয়ে উঁকি মেরে মাকে দেখে নেয় পালক । ইলেভেন টুয়েলভের দাদা-দিদিরা হাসে ঠিকই কিন্তু ক্লাসের মাঝখানে মাকে একটু দেখে নেওয়ার মজাটাই আলাদা। 

আজ ক্লাস হবে না। তাছাড়া পালক একদম শেষে আবৃত্তি করে শেষ করবে দিনটাকে। তাই মন্দাকিনী আরো অনেক বেশি খুশি।

ভাত উৎলানোর সময় রুদ্রপ্রয়াগ পেছন থেকে এসে চোখ ঢেকে দিল দুই হাত দিয়ে। 

“আজ নটায় বেরোবে?“…….

“হ্যাঁ ,তবে ফিরব তিনটের অনেক আগে…………মশাই, আপনি যদি একটু তাড়াতাড়ি আসতে পারেন তবে কিন্তু বিকেলে পালককে নিয়ে একটা বেশ ভালো প্ল্যান করা যায়- সিনেমা দেখে বাইরে থেকে খেয়ে ফিরব না হয় ।”

একটা বেসরকারি কোম্পানিতে সিনিয়র ইঞ্জিনিয়ার পদে ভূষিত রয়েছে রুদ্রপ্রয়াগ। বাড়ি থেকে বেশ কিছুটা দূরে তার অফিস। যেতে আধ ঘন্টা মতন লাগে। গাড়ি চালিয়ে যায় আর  গাড়ি চালিয়ে ই ফেরে।

বাড়ি থেকে বেরোনোর সময় মন্দাকিনী আর পালক কে স্কুলে ঢুকিয়ে সাড়ে নটার সময় অফিসে পৌঁছে যায় । আর অফিস ছুটি হয়ে পাঁচটার সময়, বাড়ি ফেরে 5:30। এই নিয়ে সাজানো সংসার ওদের । সময় মতন রুদ্রপ্রয়াগ, মন্দাকিনী ও পালক কে নিয়ে বেরিয়ে গেল ও ওরাও তিনটের অনেক আগেই ফিরে এলো । রুদ্রপ্রয়াগও

বেশ তাড়াতাড়ি ফিরে এল। কিন্ত পালককে নিয়ে ওদের সেই ভালো প্ল্যানটা আর করার সময় থাকলেও সুযোগ এলো না। একটা ফোন এসে গেল বিকেল সাড়ে চারটে নাগাদ । মন্দাকিনীর কাকিমার ফোন । কাকুর শরীরটা খুব খারাপ ,কাল রাত থেকে জ্বর আর বমি, একবার ডাক্তার দেখিয়ে কোন লাভ হয়নি।  বিমর্ষ হয়ে গেল মন্দাকিনী । 

ছোটবেলা থেকে বাবা-মা  কে কোনদিন চেনেনি সে ,কাকু কাকিমা ও খুড়তুতো বোন হল অন্তপ্রাণ। মা বলতে কাকিমা আর বাবা বলতে কাকু , তার আসল বাবা মাকে কোনদিন সে দেখেনি। কাকু কাকিমা তো বলেছিল ওড়াও দেখেনি। তাকে কোথা থেকে যেন ওরা নিয়ে এসেছে । বলে নি তাকে কোনদিন এই কথা । বলতে চায়নি ওরা। জানতে দিতে চাইনি মন্দাকিনী কে যে ওরা ওর কাকু কাকিমা। যতদিন মন্দাকিনী ওদের কাছে  থেকেছে যতটা ভালো করে রাখা সম্ভব তার চেয়েও অনেক ভালো করে রেখেছে ।কোনদিন টের পেতে দেয় নি ওকে  বাবা-মার অনুপস্থিতিটা। আর ওরও কোনদিন মনে হয়নি নিজের আসল বাবা মার পরিচয় জানার কথা। দরকার নেই তো জেনেই বা কি করবে । 

কাকুর শরীরটা খারাপ শুনে খুব বিষন্ন হয়ে গেল মন্দাকিনী। স্কুলের সারাদিনের হট্টগোলের আনন্দটা কোথাও যেন হারিয়ে গেল। ভুলেই গেল পালককে নিয়ে ঘুরতে যাবার কথা। তখনই ভেবে  ফেলল রুদ্রপ্রয়াগ কে নিয়ে সেদিন রাতের বেলা যাবে কাকিমার বাড়িতে থাকার জন্য। যেমন ভাবনা তেমনি কাজ। পৌঁছে গেল সময় মতন। কাকুর এবেলা শরীর টা কিছুটা ভালো আছে । আলোক এসেছে ভগ্নিপতি অর্ক কে নিয়ে । ওরাও দুদিন থাকবে… বহু বছর পরে দুই বোন মন্দাকিনী আর আলোক একসাথে সময় কাটানোর সুযোগ পেল। বেশ হইহই করে কাটল সন্ধ্যা বেলাটা। শরীরটা বেশ ভালো হয়ে গেলো কাকুর ।কথায় বলে মন ভালো থাকলে শরীর ভালো হয়ে যায় । 

রাতে শোয়ার সময় মন্দাকিনী নিজের ঘরে চলে এলো ,রুদ্রপ্রয়াগ এখন খেলা দেখছে অর্কর সাথে। কখন ফিরবে তা জানা নেই- আদৌ আসবে নাকি তাও জানা নেই । 

“মা নীলপরী কী গো ?”

উত্তেজিত কণ্ঠে প্রশ্ন করল পালক । 

“কে বললো তোকে নীল পরীর কথা?” মাথায় হাত বুলিয়ে জিজ্ঞাসা করল মন্দাকিনী  ।

“মেসোমশাই যে গল্প বলছিল ,সে অনেকগুলো নীলপরী একসাথে ডাঙার উপর উঠে খেলা করে ,আবার সন্ধ্যে হয়ে গেলে জলে চলে যায় ?”

পালকের কথা শুনে আগের দিন রাতের স্বপ্নটার কথা মনে পড়ে গেল মন্দাকিনীর।

“তুই নীলপরী দেখবি? “

” হ্যা মা………… কিন্তু ওরা কি আমাকে দেখা দেবে ? আমায় দেখে আবার টুপ করে জলের তলায় লুকিয়ে পরবে না তো ?”

“পাগলী………তুই ঘুমো” 

এখন বেশ কয়েক দিন ধরেই পুজোর ছুটিতে কোথাও ঘুরতে যাবে এমনটাই মনে মনে স্থির করেছিল মন্দাকিনী । কাকু- কাকিমা ,আলোক- অর্ক সঙ্গে রুদ্রপ্রয়াগ- মন্দাকিনী ও পালক । বোনের সাথে কথা বলে পরিকল্পনাটা পরেরদিন ফাইনাল করে ফেলবে এই ভাবল সে। বেশ ভালোই হবে সমুদ্রতটে একসাথে আবার ভ্রমণ কাহিনী। পরের দিন সকালে কথাটা পেরে ফেলল মন্দাকিনী আর কেউ কোন রকম আপত্তি জানালো না । বিদায় বেলার    ঠিক হলো যে জায়গা ঠিক  করা  আর টিকিটের ব্যবস্থা করবে মন্দাকিনী ও রুদ্রপ্রয়াগ। আজকাল সব সমুদ্রতটে লোকসমাগম । সেই ঠান্ডা ভিজে  সামুদ্রিক হাওয়া কোথাও পাওয়া যায় না। দীঘা পুরী বিশাখাপত্তনম যেখানেই যাবে সেখানে ভিড় । সমুদ্রে যাওয়াটা যেন একটা মহামারীর মতন…… সবার হচ্ছে– সবাই যাচ্ছে । তাই দেখে শুনে এমন কোন জায়গা বার করতে হবে যেটার কথা এখনো লোকেরা জানেনা, জানলেও সবাই জানে না । ভিড়ভাট্টা কম -সমুদ্রকে তার পূর্ণরূপে উপলব্ধি করা যাবে । তার শুভ্র ফেনা সমূহে দৃষ্টি ও ভাবনাকে স্বচ্ছ করা যাবে । ভাবনা-চিন্তা করে শেষে ঠিকই করে ফেলল মন্দাকিনী ও রুদ্রপ্রয়াগ কার্নাটাকার গোকর্না যাবে ওরা । সেখানে ওম বীচ আছে। লোকেরা খুব একটা যায় না । তেমন একটা চেনেই না । সেখানে মহাবালেশ্বর মন্দির আছে, ওখানে দুদিন থাকবে ওরা। নামে বোঝা যায় ,রুদ্রপ্রয়াগের রুদ্রভক্তিটা বেশি । তারপরে মন্দির দেখা হলে সোজা চলে যাবে ৬ কিলোমিটার দূরে  ওম বিচে ,তারপরে আরো খানিকটা এগোবে, হাফ মুন  ও প্যারাডাইস বীচে।

আলোক- অর্ক রাজি হয়ে গেলেও কাকু কাকিমা কিন্তু বেশ ঝামেলা করলো। কাকুর শরীরটা যেহেতু খারাপ তাই ওরা দুজন একটু সমস্যা করছিল ,কিন্তু শেষে আলোক মন্দাকিনী দুজনেই অনুরোধ করাতে রাজি হয়ে যায় ওরা । 

দেখতে দেখতে পালকের half-yearly হয়ে গেল। বর্ষাকালের বর্ষণ বাদল মেঘের আড়ালে ঢাকা পড়ে নীল আকাশে সাদা মেঘের ভেলা ভাসিয়ে চলে এলো শরৎকাল । মাঠভরা কাশফুল ও মনে মনে মহালয়ার জয়ন্তী মঙ্গলা কালী ভদ্রকালীর সুরে তালে মেতে উঠল পালক ও মন্দাকিনী। দুর্গা ষষ্ঠীর দিন বিকেল পাঁচটার সময় ওদের ফ্লাইট । আগের দিন রাতে ওরা সবাই আলোকের দমদমের বাড়িতে চলে যাবে -যাতে যাত্রাপথের কোন  সমস্যা ওদের বিব্রত  না করতে পারে। কথা মতন পঞ্চমীর দিন সকালে পুজো মণ্ডপ থেকে সোজা পালক ,মন্দাকিনী ও রুদ্রপ্রয়াগ ওদের বাড়ির দরজায় তালা ঝুলিয়ে মালপত্রসহ বেরিয়ে পড়ল দমদম । রুদ্রপ্রয়াগ ই চালিয়ে নিয়ে যাবে আর আলোকের বাড়ির গ্যারেজেই রাখবে গাড়িটা । আলোকের শ্বশুরবাড়ি খুবই ভালো,  অতিথি আপ্যায়ন হল ,5 জন অতিথির খাওয়া-দাওয়া ঘুম কোন কিছুতেই কোন ত্রুটি রাখল না তারা। কথা মতন পরের দিন দুপুর তিনটে নাগাদ পৌছে গেল দমদম এয়ারপোর্ট । একদম কাছে হলেও পূজার দিনে কি আর রিস্ক নেওয়া যায়।  বেশ নবাবী কায়দায় যাত্রা হল ওদের । 

পরিষ্কার ঝলমলে কাচের জানালা দিয়ে দেখা যাচ্ছে ,আকাশে মেঘ করেছে স্তরে স্তরে। 

ওই রবি ঠাকুরের কবিতার  মতন 

“মেঘের উপর মেঘ করেছে ,

রঙের উপর রং “

কালো মেঘ দেখে বোঝা যাচ্ছে একটু পরেই বৃষ্টি নামলো বলে। মহাবালেশ্বর মন্দির আজ বিকেলে যাবার কথা । ওরা এসে পৌঁছেছে অনেক রাত্রে ।  রুদ্রপ্রয়াগ  এখনো নিদ্রারত । কৃষ্ণ কালো মেঘ গুলো দেখে ওদের স্তরে স্তরে লুকোচুরি খেলতে লেগেছে মন্দাকিনীর মন । কে জানে ঐ মেঘের ওপারে কি রয়েছে! 

অপার সাগর ….নাকি একরাশ পর্বত বুক চিতিয়ে দণ্ডায়মান। 

কাঁচের মধ্যে দিয়ে একমনে চেয়ে থাকতে থাকতে হঠাৎই ফিজিক্সের শিক্ষিকার ফিজিক্সের সত্তাটা  চারা দিয়ে উঠলো “আচ্ছা আমি যদি চোখে আতশকাচ লাগাই তবে কি আমি ঐ মেঘের কোলে কোলে রোদ খুঁজতে পারতাম ?”

মেঘের কোলে খুঁজেছি রোদ, 

হাজার অন্তিমে, হাজার দ্বিধায়, 

করিনি তবু শোক, 

বাকের ফাকে বেঁধেছি গান, 

সুর তার অবিকল, তাল অচল ,

দেইনি তবু পরিত্রাণ ।।।

মনে মনে কোথায় যেন হারিয়ে গিয়েছিল ও । বড্ড ইচ্ছা করে এই রকম হারিয়ে যেতে। এক একটা নতুন গল্পের নিজেকে ভূষিত করতে । হঠাৎই কাঁধের কাছে একটা যেন নিঃশ্বাস পেল মন্দাকিনী। ঠান্ডা বাতাস -মনে হয় যেন শীতকালে এসি চালিয়েছে। যেন পাথরের মতন জ্বলজ্বলে চোখ চেয়ে রয়েছে ওর দিকে আক্রোশ নিয়ে । 

 পাশে মাথা ঘুরিয়ে চমকে গেল মন্দাকিনী । 

ও চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছে রুদ্রপ্রয়াগ দাঁড়িয়ে রয়েছে। চুল গুলো উস্কখুস্ক ,চোখ গুলো এখনো  ঢুলু ঢুলু ।ঘুম এখনো কাটেনি পুরোটা । 

“আমাকে এই রকম ভয় দেখাও কেন গো ?”

“আমি তো শুধু তোমার পাশে এসে দাঁড়ালাম !”

“আমার মনে হলো কে যেন রক্ত জল করা দৃষ্টিতে আমার দিকে চেয়ে রয়েছে”

” দূর-পাগলী “

সকাল নটার সময় খেয়েদেয়ে ওরা বেরিয়ে একটু আশেপাশে দেখে নিল। বিচে খুব ভীড়- তাই যাবে না । ওরা শহরটা ঘুরে বেড়াবে দুইদিন তারপর তো চলেই যাবে। ছোট্ট শহর খুব একটা গাড়ি ঘোড়া আছে তা নয় । অন্তত ঐরকম চল্লিশটা শহর ঢুকে যাবে কলকাতায় । 

বাজারে পাওয়া যায় কিছু মুক্ত ,শঙ্খ, ঝিনুক ,ঝিনুক এর পর্দা  ইত্যাদি যেমন পাওয়া যায় সমুদ্র তটে । বিকেলে মহাবালেশ্বর এর মন্দিরে মন্দাকিনী বা আলোকে কেউ ই গেল না । ওরা দুই বোন ছোটবেলা থেকেই নাস্তিক। ঠাকুর-দেবতায় বিশ্বাস করেনা। আর তাও যদি বা মন্দির দর্শনার্থে যাবে এত ভিড় যে ওদের ভালো লাগলো না। কাকু কাকিমা সহ রুদ্রপ্রয়াগ পালক  ও অর্ক চলে গেল । ওরা একটু সরে এসে দাঁড়াল । একটু বিচের দিকে ঘুরে আসবে ঠিক করল। সোজা হেঁটে চলে এল ওরা বিচে ,বেশ কিছুটা হেঁটে যেখানটায় জন অরণ্য বেশ কম সেখানে পৌঁছে গেল|

“ জানিস আলো ,আমার কেমন যেন মনে হচ্ছে নীলপরী দেখতে এসেছি!”

“কি সব বলিস বলতো !!তোর ছেলে বেলার ভাবনাগুলো এখনো গুছিয়ে নিতে শিখিস নি !”

হালকা হাসল আলোক |

“পালক একদিন বলছিল নীল পরীদের কথা ………………….ওরা সন্ধ্যা হলে জলে চলে ,যায় আবার মানুষেরা কাছে এলেও সরে যায় …..ধরা দেয় না !”

“উফফ মনটা এখনো সেই ছোট্টবেলার মতনই হয়ে রয়েছে ,তুই এসব বলে আমায় ঘুম পাড়াতিস  মনে পড়ে ?”

“পড়বে না !!!!তুইতো ঘুমোতে চায়তি না খালি দুষ্টুমি করতিস” 

দুই বোন বেশ অনেকক্ষণ সাগরের ঠান্ডা বাতাস খেতে খেতে গল্প করল|

 মন্দির থেকে বেরিয়ে রুদ্রপ্রয়াগ ফোন করল ,তখন ওরা চলে গেলো|

 দেখতে দেখতে 2 দিন কেটে গেল |ওরা বাক্স পত্র নিয়ে  চলে গেল ওম বিচে । বেশি থাকার জায়গা নেই অল্প   কটা শান্তি রয়েছে । ওই তিন রাত থাকার মতন ব্যবস্থা ,এরপরে ওদের  ট্রেকিং শুরু হবে  হাফ মুন বিচ যাওয়ার জন্য । কাকু কাকিমাকে এখানে রেখেই ওরা দুদিন ঘুরে আসবে হাফ মুন বীচ থেকে । ওই সব দুর্লভ জায়গা ,কোন হোটেল বা ঘর কিছুই নেই সমুদ্রতটে । তাঁবু খাটিয়ে থাকতে হবে ।

তাই কাকু কাকিমাকে নিয়ে না যাওয়াই ভাল। ওরা ও দুটো দিন নিজেদের মতন থাকতে পারবে।

রাতের বেলা বাথরুমে মন্দাকিনী দাঁত মাজছে,এমন সময় জানলার বাইরে থেকে একটা দমকা হাওয়া এসে  দুটো পাল্লা খুলে দিল। ওই অকুল বারি সমূহ দেখা যাচ্ছে ,দূরে আকাশের চাঁদটা ঝলমল করছে ,তার শুভ্র স্পন্দন ছুঁয়ে যাচ্ছে  নিঃপ্রান্তর সাগরে। ঢেউ গুলো দেখে যেন মনে হচ্ছে হাজার হাজার নীলপরী লাফিয়ে লাফিয়ে যেন পাথরের ফাঁকে লুকিয়ে পড়ছে । ওরা কাছেই থাকে -গভীর জলের স্তরে কাতারে ওরা ভয় পায় থাকতে । সারি সারি নারকল গাছ গুলোর ছায়া এসে পড়েছে জলের উপরে -সব কিছু মিলিয়ে যেন একটা অদ্ভূৎ রহস্যমাখা মায়াবী পরিবেশ তৈরি হচ্ছে । 

“কিরে আসবি না ?এই অভিমানের খেলা আর বজায় রাখতে ইচ্ছা করে না রে ….বেলা যে পড়ে এল চলে আয় !”

স্তম্বিত হয়ে দাঁড়িয়ে রইল মন্দাকিনী  

।তার তো গলাটা  চেনা নয়। একটা খুব পরিচিত কম্পন লক্ষ্য করলো -যেন  একজন বয়স্ক মানুষ কথা বলছে।

কাজকর্ম সেরে তাড়াতাড়ি চলে এলো মন্দাকিনী। আর একা থাকা উচিত হবে না তার। সে দিশেহারা -কিছুই বুঝতে পারছে না- কি করবে । পরের দিন সকালে চকচকে রোদের, সমুদ্রের বুকে ঝলসানি দেখতে দেখতে মন্দাকিনীর ঘুম ভাঙলো, মনে হচ্ছে বেরিয়ে যাই, একটু ঘুরে আসি । কিন্তু গতকালের ঘটনাটা মনে দাগ কেটেছে ওর । 

সকাল আটটা নাগাদ সবাই মিলে ঘুরে দেখবে বলে বেরোলো । আশেপাশে একটা ঝাউবন আছে সেটাও দেখার মতন । একটা মন্দির আছে। এইসব ছোটখাটো জিনিস দেখতে দেখতে ওদের তিন দিন কেটে গেল । 

ওদের ট্রেকিং এর সময় এগিয়ে এলো । ওদের গাইড আসবে সকাল দশটা নাগাদ । তার আগে কাকু কাকিমার সাথে একটু কথা বলা দরকার । দুদিন ওরা একা থাকবে । তার জন্য কিছু ব্যবস্থা করে যেতে হবে । 

একটা কৌটো ভরে রেখে দিল আলোক গোটা 4 দিনের ওষুধ । ও নিজেই দায়িত্ব সহকারে রোজ কাকুকে দেয় । ওষুধটা এই দুই দিন ,যখন ও থাকবে  না, যাতে কাকুর খেতে কোনো রকম ভুল না হয় । তাই জন্য

কাকিমা কেও বলে দিলো । এছাড়া কোথায় থাকবে ,কি খাবে ,কোথা থেকে খাবে, কতদূর ঘুরতে যাবে ,কটায় ঘুমাবে ,এসব বিভিন্ন ধরনের কথাবার্তা বলে ওদের বুঝিয়ে দিল আলোক ও মন্দাকিনী । হাফ মুন বিচ থেকে হয়তো আর ওদের ফোন করতেও পারবে না। ওদের ফোনের টাওয়ার পাওয়া যাবে নাকি সেই ব্যাপারে ওদের সন্দেহ আছে । তাই সব রকমের পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত করে যেতে হবে কাকু কাকিমাকে । ওদের ফিরতে যদি দেরিও হয় তাহলেও যেন ওরা দুশ্চিন্তা না করে । 

কথামতো সকাল দশটায় ওদের গাইড চলে এলো । তার নাম মহাদেব। দক্ষিণ ভারতীয় -গায়ের রং কালো – হিন্দিতে না বলতে পারলেও মোটামুটি ভাঙ্গা ভাঙ্গা ইংরেজিতে কথা বলতে পারে । ওদের রাস্তা দেখিয়ে নিয়ে যাবে। তবে হাফ মুন বিচে পৌঁছে শুধু কোথায় তাবু পাতা উচিত হবে সেটা দেখিয়ে দিয়ে চলে যাবে । এ ছাড়া আর কোন কাজ নেই তার। 

ওম বীচ থেকে হাফ মুন বিচ যেতে লাগে আধঘণ্টা মতন। 

কিন্তু ওরা রাস্তায় একটু বসে বসে যাবে ।তাই জন্য একটু দেরি হবে। 

পাহাড়ের উপর ডলফিন ক্যাফে আছে । ওইখানে বসে খাবে । তাই ওরা বেশ কিছুটা সময় হাতে নিয়ে যাবে । ওম বিচের দক্ষিণ দিক থেকেই যাওয়া যায় হাফ মুন বিচে । প্রথমে একটা পাহাড়ে উঠে যেতে হয় । ডান দিক দিয়ে তাকালে সমুদ্র ,তার অকূলে নীলিমার প্রতিফলন -ঝকঝক করছে -চিকচিক করছে জল- মনে হচ্ছে ওই দূর আকাশের তারা- যেন সব কিছুই আরেকটু কাছে চলে এসেছে। নীল আকাশে যেমন ছোট্ট ছোট্ট আলোর বিন্দু অনেক দূরে থেকেও চকচক করে, তেমনি অভ্র প্লাবিত লহরী খচিত দিগন্ত বিস্তৃত বারি ছড়িয়ে রয়েছে ওদের সামনে । এত উপর থেকে তার সোনালী বালি টাও দেখা যাচ্ছে না। মনে হচ্ছে এই বারি প্রবাহের যেন কোনো সমাপ্তি নেই -শুরু আর শেষ মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে -ঠিক একটা গোলক এর মতন । 

আর একটু এগিয়ে গিয়ে এবার নিচে নামতে হবে । একধারে সারি সারি নারকেল গাছ অন্যদিকে কিছু পাথর বুক উঁচিয়ে রয়েছে, চোঙ আকারের তাদের কোনা ,ওদেরকে চেয়ে চেয়ে দেখছে -পা হড়কে পড়ে গেলে মুশকিল হবে । 

“হইউ …কের ফুল “

ভাঙ্গা ইংরেজি ভাষাতে বলে উঠল মহাদেব । 

এবার একটু সমতলভূমি, তারপরেই আবার পাহাড় । আর তার অপার নীল নীড়ের অকুল সৌন্দর্য। সেই সৌন্দর্য যাকে ধরে রাখা যায়না ,মাপা যায় না, না দেখলে ভাবাও যায় না ।।

মেঘের ফাঁকে মেঘ ,

কালোর স্তরে আলো ,

দিতে কি পারবে সেই খোঁজ, 

কৃষ্ণ যে পানে ভালো ,

তার চেয়ে বরং নীলিমার নীল ,

এনে আমায় দিও ,

বায়ুর চেয়ে ও স্বচ্ছ -শিথিল ,

আর্তের বড়ই প্রিয়।।

খানিকটা এইরকমই সেই অপরূপ বিস্ময় সূচক সৌন্দর্য। 

হাফ মুন বীচের আকার হলো একটা আধ ফালি চন্দ্রের মতন। দুই দিকে চোখা হয়ে গেছে আর শেষের দুটো দিক এর পেছনে বাকি সমুদ্রটা লুকিয়ে রয়েছে । এতটাই চোখা ,কিছুই দেখা যাচ্ছে না, তারপরে কি রয়েছে । মন্দাকিনীর খুব ইচ্ছা করছিল ওই জায়গায়ই যেতে। ওটা যেন একটা আলাদা ভূস্বর্গ -কেউ প্রবেশ করেনি- ওইখানে তার আগে। কিন্তু যাবার রাস্তা নেই যে ।

এই বিচটার বালির কণা গুলো যেন এক একটা হিরে । তার চমকানিতে চোখ ঝলসে যায়। উপর থেকে দেখে মনে হচ্ছিল সোনা বিছানো আছে । যেন সাক্ষাৎ সোনার খনি তে এসে পড়েছে ওরা । 

তাবু খাটিয়ে খাওয়া-দাওয়া সেরে ,একটু ঘুরে নিয়ে ওরা সেদিন ঘুমিয়ে পড়ল। খুব ক্লান্ত বোধ করছিল । 

 সবুজ তাঁবুর বাইরের পাতলা আস্তরণ ভেদ করে প্রখর সূর্যের তাপ আসছে । সেই রোদের  তাপে ঘুম ভেঙ্গে গেল মন্দাকিনীর। সকালে ওঠা টা বরাবরই ওর অভ্যেস। রুদ্রপ্রয়াগ আর পালক এখনো নিদ্রারত । আলোক ও অর্ক রয়েছে  পাশের লাল তাবুটায়। এত তাড়াতাড়ি ওদেরও ঘুম ভাঙ্গেনি । 

তাঁবুর চেনটা খুলে বাইরে গেল মন্দাকিনী। এটা যেন একটা লেলিহান প্রকৃতি ওর সামনে বিস্তারিত হয়ে রয়েছে ।মলিন দূরদূরান্ত হীন নীল সাগর, তার লহরী সমূহের উপর থেকে পিছলে যাচ্ছে সূর্যের রশ্মি, দূর নীলিমায় পাখি গণ এখন আস্তে আস্তে খাদ্যের সন্ধানে উড়ে যাচ্ছে । ভোর হয়ে গেছে । সাড়ে পাঁচটা বাজে । 

এগিয়ে গেল মন্দাকিনী ,সমুদ্রের দিকে। বড্ড ইচ্ছা করছে একটু একা একা ঘুরে আসতে। সমুদ্রের শীতল জল ছুঁয়ে গেল তার  পাদদেশে। হিমালয়ের শীর্ষ যেমন তুষার সজ্জিত, তেমনি এই নিরন্তর জলাশয়ের পাদুকা শুভ্র ফেনা কুসুমিত। সেই শূভ্র ফেনার কিছুমাত্র রেশ ই এসে ধুয়ে দিয়ে যাচ্ছে মন্দাকিনীর পাদুকাযুগলকে । এত দিনের ক্লান্তি, শহুরে ব্যস্ততা ,আস্তে আস্তে বেরিয়ে যাচ্ছে তার শরীর থেকে । খুব পুলকিত লাগছে । শরীর-মন সবই তাজা মনে হচ্ছে। বেড়াতে আসা সার্থক । এই লুপ্ত বিচে কেউ সচরাচর আসে না -ওরা এসেছে আর আরেকটা হিপিদের দল এসেছে । তারা তাবু খাটিয়েছে একটু উপরে । 

আপাতত এখন অনন্ত সাগর, দিকভ্রষ্ট লহরীগন ও স্বর্ণচুম্বিত বালুকা রাশির  সাথে সে একা । কিছু কিছু একাকিত্বের সাথে একাত্ম হওয়াই শ্রেয়। 

তরঙ্গ গুলো যেন নীলপরী লাফিয়ে উঠে আবার লুকিয়ে পড়ছে নিঃশেষ গাম্ভীর্যে এর আড়ালে । আর দেখা দেবে না তারা –

এবারে মন্দাকিনীর চোখ পড়ল  বাঁদিকে। 

ওই তো দূরে দেখা যাচ্ছে উচু পাহাড় । তারপরে আর একটা অন্য সত্য লুকিয়ে রয়েছে -বিশ্ব জগতের মায়ার বাঁধন এর বাইরে -সেই সত্য। আজও কেউ তাকে দূষিত করতে পারেনি। পাহাড় ও সমুদ্রের মিলনস্থলে জলের উপর ভেসে রয়েছে অনেক অনেক নীলপরী । তারা যেন হাতছানি দিয়ে ডাকছে মন্দাকিনী কে। আজ তো তাকে দেখার  কেউ নেই । সে হারিয়েই যাবে ওই পাহাড়ের পিছনে । কাল যাওয়ার বড় শখ হচ্ছিল সেই দূষণ বিহীন অবলুপ্ত কোনায় । 

প্রবেশ করতে আর দেরী করলো না সে । এগিয়ে চলল সেই পাহাড়ের খা৺জে । পাহাড়ের পাশে জল -কি করে যাবে ওপারে -এক টুকরো বালির কণাও নেই যে প্রবেশ করা যাবে । আর তীরে কোন তরীও নেই যে জলের উপর দিয়ে যাবে । তাও পিছিয়ে গেলো না সে । এগিয়ে যেতে লাগল নিজের অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে। যেন একটা ঘোরে আছে সে । কেউ হাত ধরে নিয়ে যাচ্ছে। 

হঠাৎই একটা জিনিস চোখে পড়ল ওর । একরাশ কালোর মধ্যে এক টুকরো আলো দেখলে যে রকম লাগে ঠিক সেরকম । বেশ খানিকটা কাছে গিয়ে দেখা যাচ্ছে ওটা একটা ছোট্ট গুহা -যার মধ্যে দিয়ে ওই দিকটায় যাওয়া যাবে। খুব কাছে না এলে দেখা যায় না । তাই মনে হয় কেউ দেখেনি আজ অবধি। সেই প্রথম । 

গুহার ভিতরটা ভেজা ও শৈবালে আব্রিত। একটা সোদা গন্ধ আছে। আর দুদিকে প্রাচীরে সবুজ সবুজ শ্যাওলা লেগে রয়েছে। হাত দিলে পিছলে যায় । তবে যাই হোক ওপারের খোলা মুখটা কিন্তু বেশ ভালো বোঝা যাচ্ছে । এখন একটু মাথা নিচু করে যেতে হবে ঠিকই । কিন্তু যাওয়া যাবে। উত্তেজনা আর সামলাতে না পেরে এগিয়ে চলল মন্দাকিনী । খুব বড় বড় পা ফেলছিল । কেমন একটা অদ্ভুত লাগছিল মনে হচ্ছিল ওই পারে রয়েছে আসল সমুদ্র । কেউ দেখেনি, যার কথা কেউ শোনে নি ,এমন সমুদ্র যার কথা গল্পের বইও পাওয়া যায়না । অবলুপ্ত  ও সম্পূর্ণ । একবার দেখতে পেলে দৃষ্টি সার্থক হবে । 

টিপ টিপ বুকে বড় বড় পায়ে এগিয়ে চলল ,সে মাথা নিচু করে গুহা থেকে বেরোল |

দু দিকে  ছেয়ে  রয়েছে উদ্বেলিত বারি সমূহ, ফুলে ফুলে উঠছে আবার নেমে যাচ্ছে। সূর্যের ঝকঝকে রোদ আরো স্বচ্ছ করে তুলেছে সেই অসম্ভব পরিবেশকে । নীলিমার ন্যায় নীল, স্বচ্ছ ও জীবনের মতন স্পন্দিত। একধারে পাহাড়টা উঠে গিয়ে তাকে বন্দনা করছে। আর গাছপালা সবই হেলে হেলে সেই বারি সমূহকে , প্রণাম ্জানাচ্ছে আর সেই গাছের ফুল ঝরে পড়ছে সমুদ্রের উপর। সে অর্চিত হচ্ছে ,ভূষিতা মাতৃরূপে। 

তরঙ্গ গুলো যেন সত্যি সত্যি নীলপরী । আর কিছু বলা যায় না তাদের । এছাড়া বালিতে কোন রকমের পা এর ছাপ নেই। কেউ আসেনি এর আগে মনে হয়। মলিন বালি কিছুদূর বয়ে গেছে জল প্রবাহের মতন ,তারপরেই  জলদেবী তাকে গ্রাস করেছে। আর দেখা যাচ্ছে না তাকে । ওই অবধি দেখা যাচ্ছে আর ওই অব্দি যেতে পারবে মন্দাকিনী । 

ওই দূরে দেখা যাচ্ছে একটা চোঙমুখি পাথর বুক চিতিয়ে রয়েছে। মন্দাকিনীর মনে পড়ে গেল তার স্বপ্নের কথা। এটা যেন স্বপ্ন- বাস্তবে নেমে এসেছে। একটু দূরে একটা জায়গায় স্থির হয়ে গেল মন্দাকিনীর দৃষ্টি । ওটা কি দেখা যাচ্ছে?……..

এখান থেকে দেখে মনে হয় কিছু পুরনো ভেজা কাঠ  । আর একটু দূরে কিছু ছোট আকৃতি যার সাথে মাটির  ঘরের  মিল পাওয়া যায়। এককালে বাড়ি ছিল হয়ত  ।  এইখান থেকে উপরে তাকিয়ে দেখা যায় যে একটা হালকা রাস্তা উঠে গেছে ,পাহাড়ের উপরের দিকে । কিন্তু সেই রাস্তায় বেশ কিছুটা অংশ ভাঙ্গা । বোঝা যাচ্ছে যে কোন এক কালে এখানে লোকেরা বসবাস করত। 

খানিকটা এগিয়ে গিয়ে দেখল মন্দাকিনী। একটা কালো হয়ে যাওয়া পচা কাঠ হাতে তুলে নিল সে। দেখে মনে হল বেশ অনেকটাই পুরনো ।  তিরিশ চল্লিশ বছরের পুরনো। 

“আয় …..আয়”

 আবার সেই একই গলা। 

সেদিন রাতে যে গলাটা বাথরুমে থাকতে শুনেছিল মন্দাকিনী । এবারে শুনে মনে হল একটা মহিলার কণ্ঠস্বর । একটা জরাজীর্ণ, মৃদু কম্পন রয়েছে তাতে । 

বুঝতে না পেরে অনুসন্ধিৎসা নিয়ে এগিয়ে গেল সে। যেখানে ওই ছোট  আকারের কিছু বস্তু রয়েছে। ওদেরকে দেখে বোঝা যায় পরিষ্কার, যে ওরা বাড়ি ছিল, লোকেরা থাকত ,ওই রকম বস্তু বেশ কয়েকটা রয়েছে । তারই মধ্যে ঘোরাফেরা করতে লাগল মন্দাকিনী । 

কোথা থেকে যে গলাটা আসছে তাই বুঝতে পারছে না ও । মনে হয় কোন বৃদ্ধ মহিলা থাকেন  বা সেই ভগ্নাবশেষে আটকে পড়েছেন হয়তো। 

“এখনো দেখতে পেলি না পাগলি? “

আবার …………আবার আসছে গলাটা। 

একটা বাড়ি থেকেই আসছে মনে হলো এবার। মন্দাকিনী এবার পিছনে ঘুরে একবার দেখে নিল। কেউ নেই । সব নিস্তব্ধ নিঝুম ,কোথাও কেউ নেই আবার এগিয়ে গেল একটা বাড়ির দিকে। 

“এই মান অভিমানের খেলাটা  বন্ধ কর এবার। 35 বছর তো হয়ে গেল….আর কত শাস্তি দিবি….”

কি বলে চলেছে এইসব মহিলাটি ?স

কাকে উদ্দেশ্য করে বলেছে সে ? 

কিছুই ঠাউরে উঠতে পারল না । 

বাড়িটার কাছে গিয়ে দাঁড়ালো ও। 

দরজা বলে কিছু নেই…………

কিন্তু ……………ভিতরে তো কাউকে দেখা যাচ্ছে না ।

কে কাকে কথাগুলো বলছে ?

তবে কি সে অবচেতন মনে শুনে চলেছে এই সব!

বুদ্ধি কী তবে লোপ পেয়েছে ?

বাড়ি টার ভিতরে ঢুকে দুটো জিনিসই দেখতে পেল মন্দাকিনী । একটা বেবী কট, যার মধ্যে কিছুই নেই । অবশ্য বাড়িটার চাল প্রায় নেই বললেই চলে। পুরনো টিনের চাল একটা দিকে কোন রকমে আটকে রয়েছে। বাড়িটার মধ্যে সূর্যের আলো  ঢুকছে। তাতেই বোঝা যাচ্ছে কি রয়েছে ভেতরে। একটা খাট, বাচ্চাদের, একছটা আলো পড়ছে তার উপরে। একটা পুরনো কম্বল ছাড়া আর কিছু নেই সেটায়। আর একটা বস্তু হল একটা পাথর, সেটার দিকে তাকিয়ে পার্থিব হয়ে গেল মন্দাকিনী । 

 তারই নাম লেখা রয়েছে পাথরে । 

খোদাই করা লেখা রয়েছে …….তিনটে নাম……হিন্দিতে……

‘কেদার- চোরাবারী -মন্দাকিনী

 1985 ‘

তবে কি এটা তারই বাড়ি? 

সে কি তবে এখানে জন্মেছিল..এই সমুদ্র তটে …..একটা মারাঠি ঘরে ? তাই জন্য কি সে সমুদ্র এত ভালোবাসে ?এটাই কি তার জন্মভূমি ?  হাজার প্রশ্ন জাগলো তার মনে! 

“আমি তোর মা চোরাবারী “

 আবার সেই মহিলার কণ্ঠস্বর শুনতে পেল সে । 

এখন আর প্রশ্নগুলো তার কাছে প্রশ্ন থাকলো না, সব পরিষ্কার হয়ে গেল তার কাছে । কেদার ও চোরাবারী কোনভাবে মন্দাকিনী কে কাকু কাকিমার হাতে দেয়। 

 সেইজন্যই কাকু কাকিমা ওকে কোনদিন জানাতে চাইনি ওর আসল বাবা-মার কথা। ওকে আগলে মানুষ করেছে। তবে মন্দাকিনী নামটা যে তার  বাবা-মায়ের দেওয়া সেই ব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই । 

তিন হাজার m উঁচুতে কেদারনাথ মন্দিরের পেছনে চোরাবারী তাল থেকে মন্দাকিনী নদীর উৎস। চোরাবারী তাল ও চোরাবারী গ্লেসিয়ার তাকে ধারণ করে রেখেছে এত বছর ধরে । লুকিয়ে পড়তে দেয়নি । ঠিক সেরকমই কোন এক অজানা সুত্রের জন্য মন্দাকিনীও ফিরে এসেছে তার মা-বাবার কাছে। যদিও তাদের বিরহ সে কোনদিন বোধ করেনি, তার আসল বাবা মাকে জানতে চাওয়ার কোনো চেষ্টাও করেনি ,কারণ করতে লাগে নি । 

তবে আজ যা হল তা সত্যি । হঠাৎ একদিন নিজের জন্মভূমি এসে পড়ে এ রহস্য জানতে পারবে  সে এটা কোনদিনও আশা করেনি । 

ঘর থেকে বেরিয়ে এল মন্দাকিনী । 

পাথরটা তখনও হাতে রয়েছে তার । পাথরটা খুব বড় যে তা নয় ,কিন্তু ভারী, তবে যাই হোক সেই ভার বহন করার অনুভূতি আলাদা । মনের জোরে পাথরটা অনেকটাই হালকা হয়ে গেছে। কথায় বলে না…নাড়ীর টান…সত্যি তাই। নাড়ির টানে ছোট্ট মন্দাকিনী আবার ফিরে এসেছে হারিয়ে যাওয়া বাবা মায়ের কোলে ।

ফিরে কাকু কাকিমাকে ডেকে, দেখালো মন্দাকিনী পাথরটা । 

কাকিমা কেঁদেই ফেলল। সত্যিই কোনদিন জানতে দিতে চায়নি মন্দাকিনীকে বেদনাদায়ক সত্যি কথাটা। 

কাকিমা বলল “সেদিন রাত্রে সমুদ্র উত্তাল হয়ে উঠেছিল ,আমি আর তোর কাকু বসে ছিলাম, তখন এত হোটেল ছিল না ,আমরা এসেছিলাম একটা রাতের জন্য। পরের দিন ভোরে নৌকা করে আবার বেরিয়ে যেতাম। হঠাৎই কেদার ও চোরাবারী এল তোকে কোলে নিয়ে।তোর তখন 3 মাস বয়স । ওদের দেখে খুব মায়া লাগলো আমার । কেদারের মাথা  থেকে রক্ত বেরোচ্ছে গল গল করে । চোরাবারীর জামাকাপড় পুরোটাই ভিজে । শাড়ির আঁচলে তোকে শুকনো করে রেখেছে কোনোক্রমে ।তখন আমরা চারজন ছাড়া আর কেউ ছিল না । দুজনকে দেখে খুব ক্লান্ত মনে হচ্ছিল । ওদেরকে আমাদের কাছে থেকে যেতে বললাম সেদিন রাতটা। এখানে তখন কোন ডাক্তার-খানা  কিছুই নেই । পরের দিন সকালের আগে কেদার কে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া যাবে না। তোর কাকু ওর আহত জায়গায় ডেটল লাগিয়ে বেঁধে দিল। কিন্তু রক্ত বন্ধ হল না। সেদিন রাত্রে প্রচন্ড রক্তপাতে কেদার মারা গেল। 

ভেঙে পড়লে চোরাবারী। 

আমাদেরকে ও তোর দায়িত্ব নিতে বল্ল। আমরা তখন সবে তিন বছর হলো বিয়ে করেছি । এখন কি দায়িত্ব নেব! 

কিন্তু চোরাবারীর করুণ অবস্থা দেখে আমরা না বলতে পারলাম না। কঠিন পরামর্শ ছিল তবে আমরা যে সঠিক কাজ করেছিলাম তার প্রমাণ পরের দিনই পেয়ে গেলাম । সকালে চোরাবারী মারা গেল হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পথে । আমরা এসেছিলাম একা..ফিরলাম তোকে নিয়ে। আমার মা ,বাবা, তোর ঠাকুরমা সবাইকে বলেছিলাম কেদার ও চোরাবারীর কথা।আমরা প্রতিজ্ঞা করেছিলাম তোকে কোনদিন জানতে দেব না ওদের কথা। নিজের সন্তানের চেয়ে আরো ভালো করে মানুষ করব ।”

কলকাতায় ফিরে আসলো ওরা। 

মন্দাকিনী ঠিক করলে পরের বছর  মহালয়ার দিন ভোরবেলা গঙ্গার ঘাটে গিয়ে ওর বাবা মায়ের নামে অর্পণ করবে। ভগবানে তো কোনদিন বিশ্বাস করেনি । তবে বাবা-মাকে ভগবান  জ্ঞান করতে তো কোনো ক্ষতি নেই।। 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *