প্রিয় দোলনা – শ্রী রাজীব দত্ত

story and article

সকালে ঘুম থেকে উঠেই নিজেকে বেশ ফ্রেশ লাগছে। এত জ্বালা-যন্ত্রণা ভালো লাগছিলো না।

মনে হচ্ছে যেন এক নতুন সকাল আমার জন্য অপেক্ষা করছিল । আমি যদিও এত ভোরে ঘুম থেকে উঠতাম না। আজ অনেকটাই ভোরে উঠে গেছি কোনদিনই এত সকালে উঠি না। বাড়ির সবাই তখনো ঘুমোচ্ছে। তাই একা একা কি করব? মনে হল একটু দোতালার বারান্দা দোলনায় বসে ভোরের সূর্য উপভোগ করি। বেশ ভালই লাগছে দোলনায় বসে নতুন সকাল দেখতে।

হঠাৎই মনে পড়ে গেল ছোট বেলার কথা গুলো। ছোটবেলায় বিকেলে মাঠে খেলা হতো না যখন , সবচেয়ে প্রিয় জায়গা ছিল আমার এই দোলনা । এই দোলনায় বসে বিকেল দেখতাম আর পছন্দ মতন ছবি আঁকা, গান শোনা, বক্সে গান চালিয়ে চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে গানও গাইতাম।

তার জন্য নিচের ঘর থেকে মা বকা দিত, পাশের বাড়ির লোকজনের ডিসটাপ হবে বলে। একটু বড় হওয়ার সাথে সাথে,এই দোলনায় বসে গান শুনতাম ঠিকই কিন্তু ভলিয়্যুমটা খুব আসতে দেওয়া থাকতো আর হাতে থাকতো নানান ধরনের বই, সে পাঠ্যপুস্তক হোক কিংবা গল্পগুচ্ছ বা রবীন্দ্ররচনাবলী।আর যখন অনেকটাই ছোট ছিলাম, মানে শৈশবকাল তখন দুপুর বেলা করে দোলনায় বসে মা ভাত খাইয়ে দিত।

আজ এই ভোরে সব যেন পুরনো কথাগুলো বারবার আমার চোখের সামনে ভেসে উঠছে। আর যখন যৌবন কাল এই দোলনাতে বসেই কত প্রেমপত্র লিখেছি তার কোনো হিসাব নেই। সে কথা আমার স্ত্রীও জানে কারণ প্রেমপত্র গুলো তাকেই তো পাঠাতাম। এক কথায় বলতে গেলে এই জায়গাটা ছিল আমার এক স্বাধীনতার স্বাদ পূরণের স্থান।

শুধু আমি নয় বর্তমানে আমার ছেলেমেয়েরাও এখন এই দোলনা কে খুব পছন্দ করে । বেশ অনেকক্ষণ ধরেই আমার এই দোলনায় বসে, পুরনো অতীত থেকে বর্তমান সবই জানো বারবার মনের ভেতর দোলা দিয়ে যাচ্ছে। আমার সাথে সাথে দোলনারও অনেক বয়স হয়েছে লোহার শিকল গুলো এ জং পরেছে ।

নানান কথা ভাবতে ভাবতে হঠাৎ ই
চেঁচামেচি আর হট্টগোল আর কান্নার আওয়াজ নিচের ঘর থেকে শুনতে পেলাম, দোলনা ছেড়ে এক দৌড়ে নিজের ঘরের দিকে গেলাম। গিয়ে দেখলাম দাদা, ভাই , ছেলে মেয়ে, বউ, বৌদি সবাই দাঁড়িয়ে রয়েছে বিছানাটাকে ঘিরে, মনের ভেতর কেমন যেন একটা হয়ে উঠলো।

সবার চোখে জল আমার বউ আত্মনাত করছে ছেলেমেয়েরাও চেঁচাচ্ছে কাঁদছে, কান্নায় যেন পুরো বাড়ি একদম শোকাহত। আশেপাশের লোকজন পাড়া-প্রতিবেশী সবাই চলে এসেছে বাড়িতে। আমি আর একটু এগিয়ে গিয়ে খাটের দিকে তাকালাম। দেখলাম আমি চির নিদ্রায় মগ্ন হয়ে শুয়ে আছি । নিজেকেই অবস্থায় দেখে আবার যেন শরীরে প্রাণসঞ্চার করতে ইচ্ছা করছে ।

সহস্য চেষ্টা করেও কিন্তু কোন উপায় নেই । সবাইকে জড়িয়ে ধরতে চাইছি সবার সঙ্গে কথা বলতে চাইছি কিন্তু আমার অস্তিত্বকে কেউই অনুভব করতে পারছি না । তখন বুঝে গেলাম সকালে ঘুম ভেঙে দোলনায় গিয়ে বসেছিলাম তখন আমার শরীর বিছানাতে ছিল দোলনায় বসে ছিল আমার আত্মা। আর শেষবেলার পুরনো স্মৃতিগুলো বার বার ফিরে আসছিল এই কারণেই।

আপাতত সকলেই ঠিক করে ফেলছে আমার সাধের শরীরটা কোন শ্মশানে যাবে নিমতলা না রতন বাবুর ঘাট। আবার কেউ কেউ বেরিয়ে গেছে খাট, ফুল আর গাড়ি ঠিক করতে আমার শেষ যাত্রায় সঙ্গী হবে বলে। তখন আমি অঝোরে কাঁদছি কিন্তু আমার আর্তনাদ কারুর কান অব্দি গিয়ে পৌঁছাচ্ছে না সবাই শোকাহত আর আমি মর্মাহত, আর আমার শারীরিক যন্ত্রণা আজ ভোরে নিষ্পত্তি পেয়েছে চির শান্তিতে ।

Rajib Datta, Rajarhat

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *