বই রিভিউ – সাজেদা আক্তার জেরিন

story and article

বই: সেপিয়েন্স (মানুষের ইতিহাস) লেখক: ইউভাল নোয়া হারারি অনুবাদক: সুফিয়ান লতিফ, শুভ্র সরকার ও রাগিব আহসান।

সাজেদা আক্তার জেরিন

ইতিহাস বলতেই আমাদের মনে ভেসে ওঠে কোন রাজা কত সালে সিংহাসনে আরোহণ করেন, তাঁর আমলে কতটি যুদ্ধ সংগঠিত হয় এবং তিনি কাকে উত্তরাধিকার বানিয়ে মারা যান এসব বর্ণনা। ‘সেপিয়েন্স’ বইটির কাহিনি ভিন্ন। লেখক এখানে একদম আদি মানুষের উদ্ভব থেকে শুরু করে একবিংশ শতাব্দী হয়ে মানুষের অনাগত ভবিষ্যত সম্পর্কে একটি সার্বিক ধারণা দিতে চেষ্টা করেছেন। ভিত্তি ছিলো এভোলিউশনারি বায়োলজি এবং কালচার।

বইটির মূল বিষয়গুলোর একটি হচ্ছে মানুষ কিভাবে পৃথিবীতে রাজত্ব করতে পেরেছে যেখানে ৭০,০০০ বছরের আগেও মানুষের চেয়ে বন-মানব বা শিম্পাঞ্জির শক্তি অনেক বেশি ছিল এবং বুদ্ধিও প্রায় সমান পর্যায়ে ছিল। মানুষের কী সেই গুণ যার দ্বারা মানুষ অন্য সব পশু পাখি এবং পুরো পৃথিবীকেই তাদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে এসেছে?

প্রায় ৪৫০ কোটি বছর আগে পৃথিবীর জন্ম। পৃথিবীর জন্মের প্রায় ১০০ কোটি বছর পর পৃথিবীতে থাকা মাল-মশলার ক্রিয়া-বিক্রিয়ায় প্রাণের সৃষ্টি। সেই প্রাণ থেকে বিবর্তনের ফলে আদি মানুষের আবির্ভাব ঘটে প্রায় ২৫ লক্ষ বছর পূর্বে। শুধু আমরা হোমো সেপিয়েন্সরাই যে একমাত্র মানুষ এমনটা নয়। মাত্র দেড় লাখ বছর পূর্বেও পৃথিবীতে ৬ ধরনের মানুষ ছিলো। হোমো সেপিয়েন্সের সাথে হোমো ইরেক্টাস, হোমো নিয়ার্থান্ডাল, হোমো রুডলফেনসিস এরাও হোমিনিনি গোত্রের প্রাণী ছিলো। বিবর্তনের ফলে এরা ধীরে ধীরে পৃথিবী থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে, অথবা আমরাই এদের নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছি। এদের ফসিল এখনও ভূতত্ত্ববিদগণ খুঁজে পাচ্ছেন। ওরা নিশ্চিহ্ন হয়ে গেলেও আমরা কিভাবে এখনো স্বগর্বে পৃথিবীর বুকে দাপিয়ে বেড়াচ্ছি?

ইউভাল নোয়া হারারি এর উত্তর দিয়েছেন এভাবে: মানুষের রুপকথা(myth) বা গল্প বানানো এবং সেই গল্প অন্যকে বিশ্বাস করানোর মধ্যেই রয়েছে মানুষের সাফল্যের মূলমন্ত্র। পুরো বই জুড়ে তিনি এর অসংখ্য উদাহরণ দিয়েছেন। বিপুল-সংখ্যক অপরিচিত ব্যক্তির সাথে মানুষ কীভাবে মিলেমিশে কাজ করতে পারে, যেখানে একটা হাতি বা শিম্পাঞ্জি নিজের দলের বাইরে কারোর সাথেই মিশতে পারে না? লেখকের মতে, এর কারণ হলো মানুষ ‘কাল্পনিক বাস্তবতা’ তৈরি করতে শিখেছে। কোম্পানি, সাম্রাজ্য, এমনকি টাকার মূল্যমান—সবই মানুষের দলবদ্ধ কল্পনার ফসল। আপনি-আমি দুজনই কাগুজে নোটের মূল্যমানে ‘বিশ্বাস’ করি। সম্পূর্ণ অপরিচিত হয়েও তাই আমাদের মাঝে লেনদেন সম্ভব হচ্ছে। অথচ নৈর্ব্যক্তিক বাস্তবতায় এগুলো কয়েকটা কাগজের টুকরো ছাড়া কিছুই না। সিইও থেকে ঝাড়ুদার পর্যন্ত সকলে একটি কোম্পানির অস্তিত্বে ‘বিশ্বাস’ করে বলেই মিলেমিশে কাজ করতে পারে। টেকনাফ আর তেঁতুলিয়ার দুটি সম্পূর্ণ অপরিচিত মানুষ নিজেদের মধ্যকার দেড় লাখ বর্গকিলোমিটার মাটিকে বাংলাদেশ বলে ‘বিশ্বাস’ করে।

একইভাবে লেখক দেখিয়েছেন যে, গণতন্ত্র, পুঁজিবাদ, জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র ও মানবাধিকার—সবই একেকটা ‘বিশ্বাস’ বা একেকটা ‘ধর্ম’। বিজ্ঞান দিয়ে এই প্রতিটা ধর্মকেই প্রশ্ন করা যায়। বস্তুবাদী বিজ্ঞান কখনও ‘আমেরিকা’, ‘জাতিসংঘ’ বা ‘মানবাধিকার’-এর অস্তিত্বে বিশ্বাস করে না। এই নামগুলোর অস্তিত্ব শুধুমাত্র মানুষের মনে। সরকার নামে একটা মিথের মাধ্যমে আমরা কোম্পানী নামের একটা মিথ এর আইনগত একটা অস্তিত্ব বজায় রাখি। সেই আইনও আরেকটা মিথ!

প্রফেসর হারারির মতে আমরা মানুষেরা যে এক সাথে মিলে মিশে কাজ করতে পারি এর মূল কারণ হচ্ছে আমরা একদল অপরিচিত মানুষ মিলে একটা মিথ বানিয়ে বিশ্বাস করতে পারি এবং সেই বিশ্বাসের ছায়াতলে সবাই এক সাথে মিলে মিশে কাজ করতে পারি। ধর্ম, জাতীয়তাবাদ, কোম্পানী ইত্যাদি হচ্ছে শক্তিশালী কিছু মিথের উদাহরণ। মানুষ ছাড়া অন্য কোন প্রাণী এভাবে গল্প বানিয়ে সেটাকে অন্যদের দ্বারা বিশ্বাস করাতে পারে না। একটা বানরকে কি কেউ মৃত্যুর পর স্বর্গে যাবে বলে তার হাত থেকে কলা নিয়ে নিতে পারবে?

মানুষের এই যোগাযোগ দক্ষতার পেছনেই রয়েছে মানুষের শ্রেষ্ঠ হবার রহস্য। এ থেকে যে ব্যাপারটি উপলব্ধি করা যায় তা হচ্ছে এসব ছোট ছোট ধর্ম, বর্ণ, গোত্র ভেঙে গ্লোবালাইজেশনের জোয়ারে পুরো পৃথিবীর মানুষ একদিন একটি গোষ্ঠীতে পরিণত হবে। জৈবপ্রযুক্তি মানুষের ক্ষমতা কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেবে। এবং হাজার হাজার বছর আগে মানুষ যে ঈশ্বরের ধারণা আবিষ্কার করেছিলো মানুষ ধীরে ধীরে সেই ঈশ্বরের কাছাকাছি ক্ষমতা অর্জন করবে।

ব্যক্তিগতভাবে বললে এই বইটি আমার পড়া শ্রেষ্ঠ বইগুলোর মধ্যে একটি। হারারির মূলবইয়ের সহজবোধ্য ভাষাশৈলী অনুবাদের মধ্যেও খুঁজে পেয়ে আমি সত্যিই বিমোহিত। অন্তত বাংলা ভাষায় এমন চমৎকার অনুবাদ খুব কমই পড়েছি।

সাজেদা আক্তার জেরিন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *