সমাজ বদলেছে! – শম্পা সাহা

মধ্যরাতের ঘাতক
আমরা মানুষেরা বিশেষ করে ভারতীয়রা সবচেয়ে বড় হিপোক্রিট। তারমধ্যে মহিলারা সবচেয়ে বেশি । আমরা বোকা না বোকা সাজতে ভালোবাসি কে জানে? আমার তো নিজেকে দেখে মনে হয় আমরা বোকা সাজতে ভালোবাসি।

সতীদাহ যখন প্রচলিত তখন গলায় মালা পড়িয়ে, সিঁদুর লেপে জ্বলন্ত চিতাকাঠে তুলে দেওয়া হতো। কিন্তু তৎকালীন সাহিত্যে দেখা যায় অনেক নারীচরিত্র ঐ ভাবে সতী হতে চাইতেন। সাহিত্য সমাজের দর্পণ।

 বিধবা হলে তার চুল কেটে , তার পরণে সাদা থান আর হাজার গন্ডা একাদশী, বারব্রত পালনে বাধ্য করা হত। অনেকে আবার এটাকেই নিয়ম বলে পালনে করতেন।এমনকি আমার শাশুড়ি মা পর্যন্ত হাজার বারণ করা সত্বেও এইসব পালন করেন আর অসুস্থ হয়ে পড়েন।

  কিন্তু কেন এ নিয়ম? কই পুরুষদের ক্ষেত্রে তো এ জাতীয় কোনও নিয়ম নেই। তাদের ক্ষেত্রে তো বউ মরলে দুনিয়া শুদ্ধ লোক তার দুঃখের কথা ভেবে দ্বিতীয় বা তৃতীয় বিয়ের জন্য ব্যস্ত হয়ে পরেন।

 আমরা মেয়েরাই এগুলো সমর্থন করি বোধহয় সবথেকে বেশি! কেন?  আমরা কি সত্যি বুঝি না যে নিয়মের নামে আসলে তার থেকে তার যাবতীয় সৌন্দর্য কেড়ে নেবার ব্যবস্থা করা হতো। একবেলা খেয়ে, দুর্বল শরীরে যাতে তার পেটের খিদে ছাড়া অন্য প্রবৃত্তি না জাগে,থান আর ছোট চুলে তার চেহারা কুশ্রী করার প্রয়াস যাতে তাকে দেখে অন্য কারো অন্য চাহিদা না জাগে। অন্য কারো জন্য ফাঁসিকাষ্ঠে সেই মেয়েটি ই।

  আগে তো পৈতৃক সম্পত্তির ভাগ ও মেয়েরা পেত না। মহামান্য আদালত সে ব্যবস্থা করেছেন, কিন্তু বুকে হাত দিয়ে বলুন তো সব পরিবার কি এটা খুব খুশি মনে মেনে নেন। একবার  ও কি বোনকে ভাগ দেবার সময় তার বিয়েতে করা খরচের হিসেবটা খচখচ করে না?

  এখনো বিধবা মেয়ে যদি দ্বিতীয় বিয়ে করে, তাকে আলাদা করে চিহ্নিত করা হয়! এখনো লাল শাড়ি পরা বিধবা সম্পর্কে ফুসফুস গুজগুজ চলে। শহরে জানি না,কিন্তু গ্রামে তো চলে ভীষণ ভাবে।এখনো মেয়েদের জিন্স পড়লে তার গায়ে নাকি, খোলা টিভি ঢাকা না দেওয়া থাকলে যেমন ধুলো পড়ে এমন উদাহরণ দেওয়া ভিডিও ভাইরাল হয়। এবং তার কমেন্ট বক্স প্রশংসায় ভরে যায়।

  এখনো স্যান্ডো গেঞ্জি পরা ছেলে নর্মাল, আর ক্রপ টপ পড়া মেয়েরা অশালীন। এখনো হ্যাঁ এখনো। স্বাধীনতার এতোগুলো বছর পর ও মেয়েরা রাতে বাড়ি থেকে বের হলে মা চিন্তায় থাকেন, মেয়েকে বলেন, ঝামেলা এড়িয়ে চলতে।

 এখনো আমাদের সমাজে সতী লক্ষ্মী মেয়ের কনসেপ্ট সবচেয়ে খায় পাবলিক। সেই গল্প গুলো সবচেয়ে প্রশংসিত যেখানে মেয়েরা সব ত্যাগ করে, সব মেনে নেয়, শরৎ চন্দ্রের আমলের মেয়েরা এখনো রোল মডেল।

 এখনো আমরা মেয়েরাই ভালো মেয়ে বলতে যে নিজের সব পরার্থে ত্যাগ করে এমন মেয়েই বুঝি। এখনো সব মুখ বুজে মেনে নেওয়া মেয়েটাকে ই আমরা বৌমা বা মেয়ে হিসেবে পছন্দ করি। না হলেই দজ্জাল,মুখরা, জাঁহাবাজ। এখনো ধর্ষিত মেয়েদের চরিত্রে দোষ আছে কিনা আগে তার খোঁজ করি।

  সমাজ বদলেছে, সমাজ বদলেছে, সমাজ বদলেছে! কোথায়? কখন? কিভাবে?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *