সাহিত্যের আঙিনায় – রণেশ রায়

In the arena of literature – Ranesh Roy

সাহিত্যের প্রাঙ্গণ
মুখবন্ধ:

সাহিত্যের আঙিনায় কবিতা, ছড়া, প্রবন্ধ, উপন্যাস, রম্য রচনা যে যার বৈশিষ্ট্য নিয়ে হাজির হয়। সাহিত্য যেন একটা সমুদ্র মোহনা।অথবা একটা ফুলের বাগান। নানা বর্ণ গন্ধের এক সমাহার। প্রত্যেকেই নিজ নিজ বৈশিষ্ট্য নিয়ে এক একটি স্রোতস্বিনী নদী। বিভিন্ন স্রোতস্বিনী নদী এসে মেলে এই মোহনায়। একে বিভিন্ন রঙ গন্ধ বিশিষ্ট ফল ফুলের উদ্যানও বলা যায়। বিভিন্ন বর্ণ গন্ধের ফুলের স্তবক হোল সাহিত্য। আমরা আমাদের আলোচনায় সাহিত্যের বিভিন্ন অংশকে কিভাবে দেখি সেটা তুলে ধরব। উল্লেখযোগ্য যে আমার সাহিত্য চর্চা সাম্প্রতিক ঘটনা, বলা চলে ঘটনা চক্র। আমি ব্যাকরণ ধরে সাহিত্য চর্চা করি নি। সে পান্ডিত্য আমার নেই। সেই অর্থে সাহিত্যিক নই। জীবন থেকে লব্ধ অভিজ্ঞতা ধরে আমার লেখার জীবন। অর্থাৎ মেঠো সাহিত্যিকের মেঠো সাহিত্য। যেভাবে জীবনকে দেখেছি পেতে চেয়েছি তা নিয়ে ভাবনা চিন্তার প্রতিফলন পাওয়া যাবে আমার সাহিত্য চর্চায়। এ নিয়ে আমি যেভাবে সাহিত্যকে তার বিভিন্ন রূপে দেখি সেটা তুলে ধরার চেষ্টা করলাম।

সাহিত্যিকের কাজ হলো সময়টাকে ধরা তাকে উপলব্ধি করা। সময় যদি বিশেষ বার্তাবাহক হয় তবে সাহিত্যের মাধ্যমে সেই বার্তা সাধারণের কাছে গল্প উপন্যাস কবিতা প্রবন্ধের মাধ্যমে তুলে ধরার সামাজিক দায়িত্ব সাহিত্যিক অস্বীকার করতে পারেন না। ২০২০ এমনি একটা সময়কাল যা করোনা আর অর্থনৈতিক সংকটের দ্বিমুখী আক্রমণে আমাদের সমাজ জীবনকে বিশ্ব জুড়ে তছনছ করে দিয়েছে। এর স্বরূপ তুলে ধরে এর থেকে বেরোবার উপায় খুঁজে পাবার চেষ্টা করা হয়েছে এই বইতে।

এই শতাব্দীর বিশের দশকের শুরুর বছরটা শেষ হতে চলেছে। কি দেখলাম কেমন থাকলাম কি করলাম এ বছরটায়? প্রশ্ন উঠবেই কারণ অন্য বছরগুলো থেকে এ বছরের থাকা খাওয়া পরা করা দেখা সবই আলাদা। সারাবছরই কোন একটা ঘরে বন্দী থাকলাম একান্তে নিভৃতে। বুকে নিয়ে একরাশ নিরাশা। বিচ্ছিন্ন একা একা মুখোশ পরে সবার থেকে দূরত্ব বজায় রেখে বলা চলে কারাগারের কোন এক সেলে। ভয়ঙ্কর এক আতঙ্কের মধ্যে। আপাতদৃষ্টিতে এক বিশাল শূন্যতা অনিশ্চয়তা। জানতে পারি মানুষ করোনা ১৯ নামে মারণরোগে আক্রান্ত অথবা আতংকগ্রস্থ, কখন তাকে ধরে। অর্থনীতি সংকটে, বাজারে চাকুরী নেই, আজ যাদের আছে কাল থাকবে কিনা তা নিয়ে সন্দেহ। বাচ্চাদের খেলাধুলো বন্ধ। বছরটা করোনা বছর বলে চিহ্নিত। সমাজজীবন ভেঙে তছনছ। বাচ্চা বুড়ো সবাই ঘর বন্দী। একজন আরেকজনকে সন্দেহ। বোধ হয় করোনা ভাইরাস নিয়ে এসেছে। কাছে এলেই ছুলেই সংক্রমণ। তাই না আসাই ভালো। করোনা আতঙ্কের সঙ্গে জুটেছে চিকিৎসা আতংক। সত্যি করোনা হয়েছে কিনা, হলেও এর চিকিৎসা কি কত টাকার দায়, সমাজে অস্পৃশ্য হয়ে যাওয়ার ভয়, মরলে শব দাহ কিভাবে হবে কে করবে এসব নিয়ে প্রশ্ন। আর এরই মধ্যে করোনাকে সামনে রেখে রাষ্ট্র একের পর এক তথাকথিত সংস্কার নীতি অবলম্বন করে চলেছে যা কর্পোরেট রাজের ভীত শক্ত করে।

সাহিত্যের আঙিনায়
রণেশ রায়

এই সবের মধ্যে আমিও পড়ি। তবে আমার বয়স ৭৫ এর ওপর। আমার বাইরের জগৎ ছোট হতে হতে চার দেয়ালের মধ্যে আটকে গেছে। এমনিতেই নিরূপদ্রোপ একাকিত্বের জীবন। খাওয়া পরা ঘুম। জীবনের রূপ রস বর্ণ গন্ধ বিলীন হতে চলেছে। মোবাইল বা কিছুটা লেখালিখি নিয়ে সময় কাটে। স্কুল কলেজ নেই খেলাধুলো নেই, পরিচিত বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে যোগাযোগ প্রায় শূন্যে পৌঁছেছে। কোন কাজে যাবার তাড়া নেই। তাই জীবনটা শূন্যে দোদুল্যমান। অপেক্ষারত। কিন্তু যাদের জীবনে এখনও প্রানের স্পন্দন তাদের অবস্থাটা কি? ভাবা যায় না। অবশ্য ঘরে দাদু দিদা বাবা মা ছেলে মেয়ে নিয়ে পরিপূর্ণ সংসার। একজন আরেকজনকে আরো সময় দিতে পারছে যদিও বিধান আছে ‘সামাজিক দূরত্ব‘ বজায় রাখার। এই একাকিত্বের মধ্যে থেকেও মানুষ ভাবে, আশা নিয়ে বাঁচে।

আমারও এইভাবে কাটে বছরটা। এই নৈরাশ্যের মধ্যেও শিখলাম জানলাম অনেক কিছু। জানলাম সমাজজীবনে কোন ধরণের সরকারের প্রয়োজন কেন, স্বাস্থ্য শিক্ষা গবেষণার ওপর সরকারের খরচ বাড়ান দরকার কেন। উগ্র শিল্পায়নে পরিবেশ ধ্বংস কতটা ক্ষতিকর। কিভাবে এই সংকটকালেও মুনাফাবাজরা ফায়দা তোলে, ভোগবাদ কতটা অসাড়, যুদ্ধবাজরা যুদ্ধের মহড়া দেয়। জানলাম সমাজটাকে ঢেলে সাজাবার প্রয়োজন কেন। এর থেকে প্রতিভাত হওয়া মনন নিয়ে বছরটা ধরে কালি কলম নিয়ে কাটালাম। এই করোনা কালে মানব সমাজের আর্থসামাজিক ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে যা নিয়ে কলম ধরতে হয়েছে। আর এরই ফসল এই বই। এটাই এই সংকটকালে আমার প্রাপ্তি। এতদিনকার চলমান জীবন ছেড়ে এই অন্ধকারের থিতু জীবনের মধ্যে আলো। বইতে ২০২০ র সংকটকালটা তুলে ধরার যেমন চেষ্টা হয়েছে তেমনি এর থেকে প্রাপ্য শিক্ষা জায়গা পেয়েছে । আর আছে এই কালের আগের কিছু লেখা। আজ এই করোনা সংকটের সময়কালে যা আরও তাৎপর্য পূর্ণ হয়ে উঠেছে। আজ দুনিয়াজুড়ে সব দেশ যখন করোনা ১৯ আর অর্থনৈতিক সংকটের দ্বৈত আক্রমের মুখে মানব সমাজে তখন আবার সমাজ পুনর্গঠনের দাবি উঠে আসছে পৃথিবী জুড়ে।। করোনা আমাদের কাছে সেই বার্তাই পৌঁছে দিচ্ছে। সাহিত্যের মাধ্যমে সেই বার্তা পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব যাঁরা সাহিত্য চর্চা করেন তাঁদের ওপর বর্তায়।।

সাহিত্যের বিভিন্ন ধারা —- গল্প, প্রবন্ধ, কবিতা —– যার যার নিজের পথ ধরে সেই মোহনায় মেলে যেখান থেকে সমুদ্রের যাত্রা। আমার লেখা গল্প কবিতা প্রবন্ধও সাহিত্যের এই মোহনায় পৌঁছতে চায়। জীবন থেকে উপাদান সংগ্ৰহ করেই সৃষ্টিশীল সাহিত্য রচনা সম্ভব। চেতনার আঙিনায় সাহিত্যের মাধ্যমে অভিজ্ঞতার সারসংকলন ঘটে। তাই সৃষ্টিশীল হতে গেলে সাহিত্যকে জীবনমুখী হতে হয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয় কল্পনা। কল্পনার প্রচ্ছদে সাহিত্যিক ভবিষ্যতের ছবি আঁকেন । আমার এই বইয়ে তাই জায়গা পেয়েছে একই সঙ্গে গল্প, প্রবন্ধ উপন্যাস ও কবিতা। আমার জীবনবীক্ষা অনুসরণ করে যে সব গল্প, কবিতা, উপন্যাস, প্রবন্ধ বা ছড়া লিখেছি তার অনেকগুলোর সাহায্যে আমি আমার জীবনবোধকে বহুমাত্রিক করে তুলতে চেয়েছি। মেলাতে চেয়েছি তাদের সাহিত্যের মোহনায়।

গল্প প্রবন্ধ বা কবিতা কোনটাই আমার মস্তিষ্ক প্রসূত নয়। এর জন্ম আমার কল্পনায় নয়। ঘটে যাওয়া ঘটনাকে আশ্রয় করে লেখা প্রবন্ধ গল্প কবিতার মেলবন্ধন ঘটাতে চেষ্টা করেছি। আজকের এই ঘটে যাওয়া ঘটনা হলো অর্থনৈতিক সংকটের সঙ্গে করোনা ১৯ এর সংযোজন যা পৃথিবীতে মানব সভ্যতার জন্য এক অভাবনীয় সংকট নামিয়ে এনেছে। চলতি আর্থ সামাজিক ব্যাবস্থাকে ভেঙে তছনছ করে দিয়েছে। আমাদের আদর্শের প্রেক্ষাপটে গল্প কবিতা প্রবন্ধের মাধ্যমে তাকে তুলে ধরা হয়েছে। সমাজ বদলের দাবিকে সোচ্চার করে তুলেছে। ভবিষ্যতের কাঙ্খিত সমাজ গঠনে আমাদের সাহিত্য চর্চাকে এই প্রচেষ্টায় কাজে লাগাবার চেষ্টা করা হয়েছে। কাঙ্খিত সমাজ যেহেতু এখনও বাস্তবায়িত হয়নি তাই তা এখনও কল্পনায় বিরাজ করে। কল্পনায় বিরাজমান সেই সমাজের উপাদান আলাদা আলাদা করে বিভিন্ন প্রবন্ধ গল্প কবিতায় থাকলেও তাদের একটা সমন্বিত সামগ্রিক রূপ পাওয়া যেতে পারে এই গ্রন্থে। খন্ড সত্যকে অখন্ড সত্যে রূপ দেওয়ার চেষ্টা করে এই সামগ্রিক রচনা। বিভিন্ন বিষয়ের পরস্পরের মধ্যে আন্তঃ:সম্পর্ক, তাদের মধ্যে মিল অমিল, ঐক্য বিরোধ, সহযোগ অসহযোগের একটা সামগ্রিক ছবি পাওয়া যেতে পারে।

সাহিত্যের আঙিনায় ৩
রণেশ রায়

গল্প উপন্যাস কবিতা প্রবন্ধ সাহিত্যের বিভিন্ন অঙ্গ। কেউ স্নায়ু জগতে খেলা করে, কারও বাস হৃদয় প্রান্তরে, সে একান্তে নিজেকে খুঁজে ফেরে। আবার কেউ মুখের স্বাদ পেটের খিদে মেটায়। সাহিত্যের বিভিন্ন অঙ্গের মধ্যে একটা যোগসূত্র আছে। সকলেই জীবনের কথা বলে জীবনের ছবি আঁকে। জীবনকে সম্পূর্ণতা দিতে চেষ্টা করে। কাউকে বাদ দিয়ে সাহিত্য সম্পূর্ণতা লাভ করতে পারে না। এককথায় গল্প কবিতা প্রবন্ধ উপন্যাস সকলে মিলে মিশে সাহিত্যের বৈঠকখানায় আড্ডা মারে। কেউ কল্পনায় সুদূর ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখে আবার কেউ উঁকি মারে পাশের বাড়ির গৃহস্থের ঘরে আবার কেউ প্রকৃতি প্রেমের উপাসক। কেউ জীবন যুদ্ধে সৈনিক। প্রত্যেকেই নিজ ছন্দে নিজ তালে লয়ে যেন নেচে চলে। সাহিত্য যেন সমুদ্র মোহনা। গল্প উপন্যাস কবিতা প্রবন্ধ হল প্রবাহিত নদী যারা এসে মেলে সমুদ্র মোহনায়। আমি আমার গল্প কবিতা প্রবন্ধের সেই মিলন মেলায় মিলতে চেয়েছি। গল্প কবিতা প্রবন্ধ কোনটাকে ভিন্ন জাতের বলে একটা থেকে আরেকটাকে আলাদা করে রাখি নি। আমার গল্পে প্রবন্ধে কবিতা এসে মিলেছে। আবার কোন কোন কবিতাকে গল্পের আঙ্গিকে তুলে ধরার প্রয়াস পেয়েছি। চেষ্টা করেছি সবাইকে একতারায় বাঁধতে। সাহিত্যকে তার সমগ্রতায় বিভিন্ন অঙ্গের মিলনে পরিপূর্ণতায় পেতে চেয়েছি।

সাহিত্যে গল্প:

সাহিত্যের জগতে উপন্যাস যেখানে বহুমাত্রিক গল্প সেখানে এক মাত্রিক। কোন একটা ঘটনাকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয় গল্প। গল্পে চমক থাকে। খুব সহজভাবে কোন ঘটনাকে উপস্থাপন তার ভেতরে লুকিয়ে থাকা চমকটাকে সম্পূর্ণভাবে উন্মোচিত না করে ইঙ্গিতে তাকে পরিবেশন করার শিল্প সীমিত বহরে রেখে সুক্ষভাবে প্রকাশ করা হয় গল্পে। গল্প বিভিন্ন বিষয় নিয়ে হয়। এক একটা গল্প এক একটা বিষয় মুখী হয়। যেমন প্রেমের গল্প শিকারের গল্প খেলার গল্প অভিযানের গল্প মানুষের গল্প পশুর গল্প প্রভৃতি। একটা বিষয় নিয়ে একটা গল্প হয়। গল্পে চরিত্র উপস্থাপিত হয় কিন্তু উপন্যাসের মত বেশি চরিত্র একটা গল্পে স্থান পায় না। গল্পের লেখকের কল্পনা বিস্তারের সুযোগ থাকে। বাস্তবে ঘটে না তার কল্পনায় আশ্রয় করে এমন বিষয় নিয়ে লেখক গল্প বানাতে পারে। আবার বাস্তবে ঘটে যাওয়ার বিষয়কে নিজের কল্পনার রঙে রাঙিয়ে তাকে পরিবেশন করতে পারে। গল্পে প্রবন্ধের মত যুক্তি তর্কের বিন্যাস তেমন গুরুত্ব পায় না। তাও প্রতিটি গল্পে তার নিজের একটা যুক্তি থাকে। তবে গল্পটা যুক্তি দিয়ে ব্যাখ্যা করার বিষয় নয় তার রস সিঞ্চন করে তাকে উপভোগ করার বিষয়। আনন্দ উপভোগ হতে পারে বেদনার রেশ থেকে যেতে পারে গল্পে যা যুক্তি থেকে আবেগকে তাড়িত করে বেশি। গল্পে কবিতার মত ছন্দের খেলা না থাকলেও প্রতিটি গল্পের নিজের একটা ছন্দ থাকে। সেই ছন্দটা কেটে গেলে গল্পের রস আস্বাদন করা যায় না। গল্প আবার ছোট গল্প হতে পারে আবার বড় গল্প হতে পারে। ছোট গল্প স্বাভাবিক ভাবে ছোট মাপের। কিন্তু কেবল মাপ দিয়ে এ পার্থক্য বিচার হয় না। বড় গল্প যেন হাটে পরিবেশিত হয় যেখানে গল্পের উপাদান অনেক বিস্তৃত। অন্তর্নিহিত বেশি কিছু অবলা থাকে না। তার আঙ্গিক বড় হয়ে তাকে উন্মোচিত করে দেওয়া হয় বেশি করে। ছোট গল্প যেন পরিবেশিত হয় খেতে খেতে অল্প সময়ে যেন ঘরের মধ্যে আড্ডার আসরে। ছোট গল্পে অল্প কথায় ইঙ্গিত দেওয়া হয়। অনুন্ন্মোচিত থাকে অনেকটাই। চমকটা রেখে দেওয়া হয়। সেই জন্যই রবি ঠাকুরের ভাষায়:

ছোটো প্রাণ, ছোটো ব্যথা, ছোটো ছোটো দুঃখকথা
নিতান্ত সহজ সরল,
সহস্র বিস্মৃতিরাশি প্রত্যহ যেতেছে ভাসি
তারি দু-চারটি অশ্রু জল।
নাহি বর্ণনার ছটা ঘটনার ঘনঘটা,
নাহি তত্ত্ব নাহি উপদেশ।
অন্তরে অতৃপ্তি রবে সাঙ্গ করি মনে হবে
শেষ হয়ে হইল না শেষ।
জগতের শত শত অসমাপ্ত কথা যত,
অকালের বিচ্ছিন্ন মুকুল,
অকালের জীবনগুলো, অখ্যাত কীর্তির ধুলা,
কত ভাব, কত ভয় ভুল-

গল্প নিয়ে একটা প্রবাদ চালু আছে। বলা হয় যে গল্পের গরু গাছে ওঠে। অর্থাৎ খুশি মত অবাস্তব যা কিছু নিয়ে গল্প লেখা যায় যার সঙ্গে বাস্তবতার যোগ নেই, যা লেখকের কল্পনার খামারে উৎপাদিত হয়। বলা হয় গল্পে কোন মূল্যবোধ না থাকলেও চলে। গল্প নিয়ে এ ধরণের ভাবনার আমরা বিরোধী। সাহিত্যের অঙ্গ হিসেবে গল্প মানুষের সেবায় কাজ করে। মানুষের সুস্থ চিন্তা ভাবনার বিকাশে সহায়ক যদিও গল্পে লেখকের কল্পনার বিশেষ ভূমিকা থাকে। কল্পনাসৃত গল্প হলেও তা যেন অবাস্তব খেজুড়ে আলাপে পরিণত না হয় তা দেখতে হয়। কল্পনায় এমন গল্প না রচনা করাই বাঞ্ছনীয় যাতে গরু গাছে ওঠে। সুস্থ সাহিত্য সৃষ্টির জন্য এটা কাম্য নয়।

সাহিত্যে কবিতা:

কবিতায় ভাব প্রবণতা ডানা মেলে। মানুষের আবেগকে মেলে ধরে। এর হৃদয় গ্রহীতা অনেক বেশি স্পর্শ কাতর। ছন্দ সুর লয় মিলে কবিতা যেন পাখা মেলে, পাঠকের আবেগের মুর্চ্ছনায় তার প্রকাশ। শব্দের ঝংকার যেন সেতারের বাজনা। বাচিক শিল্পীর সুললিত কণ্ঠে সে ভিন্ন মাত্রা পায় যা অনুভবের দরজায় টোকা মারে শ্রবণ যন্ত্রে যেন মধু ঢেলে দেয়। মিল কবিতা হোক অমিল কবিতা হোক হোক ভিন্ন ভিন্ন মাত্রার মিলের কবিতা, অন্তর্নিহিত ছন্দের মূর্ছনা তার সঙ্গে সুর ও লয়ের সমাহার কবিতাকে হৃদয় গ্রাহী করে তোলে। যুক্তির ইন্দ্রিয় তার খেলাঘর নয় হৃদয়ের অলিন্দে সে মুর্ত হয়ে ওঠে। আবেগকে তাড়না করে। নিচের কবিতায় আমি কবিতার বৈশিষ্ট্য তুলে ধরলাম যা থেকে সাহিত্যে কবিতার স্থান কোথায় বুঝতে পারি।

কবিতা আমার

কবিতা আমার জীবন স্পন্দন
সে আমার মিলন বন্ধন
কবিতা আমার বিরহ ক্রন্দন
সে আমার সাথী প্রতিক্ষণ,
কবিতা আমার বারমাস্যা
কবিতা আমার জীবনের ভাষা।

সেজে ওঠে কথার বিন্যাস
শব্দের ঝংকার কবিতায়
কবিতা আমার সুরের পিয়াস,
খুঁজি অলংকার উপমায়
কাব্যে ছন্দ আমার তিতাস,
যতিতে গতি কবিতায়
তাকে পাই চেতনায়,
লয়ে চলন কবিতার
সে বাঁচে বিরহ বেদনায়
বিরহে অন্তর তার,
মিলনে সে মহিয়সী
সুর ছন্দ লয়ে কবিতা আমার
কলম আমার কবিতা প্রত্যাশী,
কবিতা প্রেম আমার
কবিতা আমার প্রেয়সী
কবিতা আমার বাঁচার প্রয়াস
কবিতায় খুঁজি মুক্তির আশ
কবিতা আমার শ্বাস।

এই প্রসঙ্গে বলে রাখা আধুনিক কবিতার নামে বিমূর্ত দুরূহ অস্পষ্ট কবিতা অর্থবহন করে না বা দুরূহ এমন কবিতায় সাহিত্যের মাধ্যমে সমাজের সেবা করার দিকটা উপেক্ষিত হয়। আধুনিক গদ্য কবিতা খুব উচ্চ মানের হতে পারে। ছন্দ সুর লয়ে ভরপুর হতে পারে। এমন অর্থ বহন করতে পারে যা মানুষের মূল্যবোধকে মর্যাদা দেয়। যান্ত্রিক বস্তুবাদের দর্শন আধুনিক কবিতার বিকৃতি ঘটায় যা কোন বার্তা বহন করে না। সুর ও ছন্দ নিয়ে গবেষণা সাপেক্ষে আধুনিক কবিতা খুবই উচ্চমানের হয়। হাসি ঠাট্টা তামাশাও তার মধ্যে থাকে। কিন্তু বিমূর্ত ভাবে অর্থহীন হয়ে ওঠা বা বিকৃত রুচির প্রকাশকে সত্যিকারের আধুনিক কবিতা সমর্থন করে না।

সাহিত্যে ছড়া:

ছড়া বিশেষ করে শিশুছড়া শিশু মননকে প্রদক্ষিণ করে। সে যেন তার ঘুমের মাসি ঘুমের পিসি। মায়ের কোলে শুয়ে ছড়া শুনতে শুনতে সে ঘুমিয়ে পড়ে। ছড়া তাকে স্বপ্ন দেখায়। ছড়ার ছন্দ শিশুমনকে উত্তাল করে তোলে, স্মৃতিকে ভাস্বর করে, মনকে উদার করে। তাকে কল্পনার জগতে নিয়ে যায়। ছড়ার ছন্দের সঙ্গে শিশুমন খেলা করে। খেলার সঙ্গে শিশুমন পুষ্টি পায়। তার স্মৃতিশক্তি বেড়ে ওঠে। পরবর্তী জীবনে তার চলার পথে এটা মস্ত বড় পাথেয়। যে জগৎটাকে সে চিনতে জানতে চায় সেটা চিনিয়ে দিতে ছড়ার জুড়ি নেই। যে ছড়া হ য র ল ব, আপাতদৃষ্টিতে অর্থহীন, সেটা কল্পনাশক্তি বাড়াতে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ন। ছড়া যেমন শিশুর অনুভূতিগুলোকে উদ্দীপ্ত করে তেমনি ছড়া শিক্ষার বাহন। ছড়া কেবল হাসির খোরাক নয়, সন্তান সন্ততিকে গড়ে তোলার সহায়ক।

ছড়াকে কেন্দ্র করে হাসি কান্না সুখ দু:খে আজও আমরা এই বৃদ্ধ বয়সেও শৈশবের ছোঁয়া পাই। শিশুমননে মাতৃ ভাষার মাধ্যমেই ছড়া সবথেকে ক্রিয়াশীল। তাই বাবা-মাকে মুখে মুখে মাতৃভাষায় ছড়া কেটে গান গেয়ে শিশুমনকে জাগিয়ে তুলতে দেখা যায়।

শৈশবে ছড়া শিশুর শ্রবণে খেলা করে। ছন্দ ও সুরের ঝংকারে শ্রবণ বীণায় বেজে ওঠে। ছড়া শুনতে শুনতে হেসে নেচে নিজে সেটা আবৃত্তি করার প্রচেষ্টার মাধ্যমে শিশু তার প্রতিক্রিয়া জানায়। গোটা বাড়িতেই যেন একটা উৎসব লেগে যায়। নিরানন্দের সংসারেও আনন্দের ঢেউ ওঠে। দাদু -দিদা বাবা-মা দাদা-দিদিদের কোলে বসে ছড়া শুনতে শুনতে শিশুর স্মৃতির দরজা খুলে যায়। ছড়া শিশুর কাছে ঊষার আলো, ভোরের আগমনী । ছোট্ট ছোট্ট মজার ছড়া আগমন বার্তা। শ্রবণ দরজায় কড়া নেড়ে স্মৃতির ঘর খুলতে বলে। শৈশবের এই প্রাথমিক স্তরের পর যখন শিশুর অক্ষরজ্ঞান হয় তখন সে নিজে পড়ে তা স্মৃতির ভান্ডারে জমা করে। পাঁচ ছ বছরে শিশু এই স্তরে প্রবেশ করে। একই সঙ্গে তার চেতনার জগৎ ক্রিয়াশীল হয়ে ওঠে। স্মৃতি ও চেতনার আকাশে ভোরের আলো ফোটে। ছড়া তখন শিশুর ভোরের সূর্য। তখন শূধু শ্রবণে খেলা করা, স্মৃতির ভাণ্ডার গড়ে তোলা নয়, সমাজ বোধ ও বিজ্ঞান মানস গড়ে তুলতে ছড়া অভাবনীয় ভূমিকা পালন করে। নিভৃতে নীরবে মানব সমাজে ছড়া আমাদের অজান্তেই এই কাজ করে যায়। এর পর বাল্য কৈশরে যখন ছড়ার মেলায় শিশু মেলে তখন সেটা তার পরিণত শৈশব। এই বয়সে সে শৈশবের স্পর্শে থাকে। বাল্য কৈশরের ইশারার ডাক তাকে পাগল করে দেয়। সে ছটফট করে। বয়সের সঙ্গে সঙ্গে সে হয়তো ছড়া থেকে আরো কিছু দাবি করে। বয়সের সন্ধিক্ষণে সে নতুনের স্পর্শ পায় । এই দাবি মেটাতে শৈশব বাল্য আর কৈশরের তিনটে স্তরে ছড়ার ধরণকে ভিন্ন হতে হয়।

শিশু থেকে বৃদ্ধ বৃদ্ধা সবার কাছেই ছড়া খুব আদরণীয়। দেখলাম যে বয়স এবং তার সঙ্গে মানসিক গঠনের ফারাক থাকে বলে শৈশব থেকে কৈশোর বিভিন্ন বয়সীদের জন্য ছড়ার ধরন আলাদা হতে হয়। বুড়োরা শিশু ছড়ায় আনন্দ পেলেও শিশুদের চাহিদা পৃথক। সেই অনুযায়ী ছড়াকারকে ছোট্ট শিশুদের জন্য শিশু ছড়া আলাদা করে লিখতে হয়। কাজটা বিভিন্ন কারণে খুব কঠিন। ছড়াকারের ছড়া কাটার বিশেষ দক্ষতা থাকা দরকার যা ছোট্ট বয়েসের শিশুমননকে স্পর্শ করে । তাকে জয় করতে পারে। এর জন্য শিশুমানস বুঝতে হয়। তবে ছোট্ট শিশুদের জন্য লেখা হলেও শিশুছড়া বয়স্কদেরও আনন্দ দেয় কারন `শিশুমন ঘুমিয়ে থাকে সব বুড়োরই অন্তরে`। ছড়া সেই মননকে জাগিয়ে তোলে। সেই জন্যই বড়দের জন্য লেখা ছড়া শিশুদের উপযুক্ত না হলেও শিশুদের জন্য লেখা ছড়া বুড়োদেরও উপযুক্ত। এই অর্থে শিশুছড়া সার্বজনীন সন্দেহ নেই। সত্তর বছর বয়সেও পাঁচ বছরের জন্য লেখা ছড়াও আমাদের অনাবিল আনন্দ দেয় । দাদু-দিদা বাবা-মায়ের কোলে বসে ছড়া শুনতে শুনতে শিশুর স্মৃতির দরজা খুলতে থাকে। শিশুর সঙ্গে তার চারপাশের পরিচিতি ঘটে। এক কথায় সামাজিকরণে শিশু ছড়ার ভূমিকা অনবদ্য।

ছড়া দিয়ে অক্ষর পরিচয়ে শিশু উৎসাহ পায়। সে দিক দিয়ে এটা একইসঙ্গে বর্ণ পরিচয়। দু’তিন বছর বয়সে যখন অক্ষর জ্ঞান হয়নি তখন ছড়া শিশুর কাছে উষার আলো, ভোরের আগমনী। ছোট্ট ছোট্ট মজার ছড়া ভোরের আগমন বার্তা। শ্রবণ দরজায় কড়া নেড়ে স্মৃতির ঘর খুলতে বলে। ছড়া দিয়ে অক্ষর পরিচয়ে শিশু উৎসাহ পায়। খেলার ছলে শিক্ষা চলে।

উল্লেখযোগ্য যে মাতৃভাষার মাধ্যমে ছড়া সব থেকে বেশি ক্রিয়াশীল থাকে। শিশুমনে সাড়া জাগায়। শিশুর কল্পনা শক্তি বাড়াতে সাহায্য করে। ভাষা শিক্ষায় সবচেয়ে সহায়ক। মুখে মুখে মাতৃভাষায় ছড়া কেটে শিশুকে বশে রাখার প্রচেষ্টা সমস্ত সমাজেই বহু প্রাচীন সংস্কৃতি। অক্ষরজ্ঞান নেই এমন খেটে খাওয়া মানুষেরা মুখে মুখে যে ছড়া কেটে যান তা ভাবলে বিস্মিত হতে হয়। এটা থেকে বোঝা যায় মাতৃভাষায় ছড়া সমাজের আদিমতম সাহিত্য সংস্কৃতির অঙ্গ। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় ভারতের মত দেশগুলো এখন-ও ইংরেজের বশীভূত। বাঙালি ঘরে বাংলা শেখার ও বলার প্রবণতা কমছে। ইংরেজি ছড়ায় নিজেদের প্রচার করার প্রবণতা যে ভাবে বাড়ছে তাতে ছড়ার প্রকৃত ভূমিকা লোপ না পায়, ভয় হয়। এক ধরণের দাসত্বের বন্ধনে যেন আমরা বাঁধা পড়ে যাচ্ছি। এতে নিজেদের স্বতন্ত্র অস্তিত্ব বিপন্ন হয়। শিক্ষা হয়ে দাঁড়ায় আনুষ্ঠানিক, ব্যবসা জগতের বাজারি উপাদান । এর থেকে বাঁচতে গেলে মাতৃভাষা চর্চায় ছড়াকে তার জায়গায় স্থান করে দিতে হয়। মাতৃভাষায় ছড়া জাতীয় মননকে বাঁচিয়ে রাখতে পারে। ছড়া সম্পর্কে উপরোক্ত কথাগুলোকে আমি নিচের ছড়ায় ধরার চেষ্টা করেছি:

ছড়ায় কাঁদি ছড়ায় হাসি
ছড়ায় বাজাই বাঁশি,
ছড়ায় করি মজা
যা বলি তা সোজা ।

ছড়ায় চলন ছড়ায় বলন
ছড়ায় শুনি কত কথন,
ছড়ায় গাঁথা মোদের জীবন
ছড়া চাঁদের কিরণ,
ছড়ায় ভাসে ভেলা
ছড়ায় মজার মেলা।

ঘুরি ছড়ার দেশে
ছড়া নিয়ে ভালো আছি
কতরকম বেশে।
যা মন চায় বলি তা
ছড়ায় আমরা বলি
যেথায় ইচ্ছা সেথায় যাই
ছড়ার ছন্দে চলি।

ছড়ায় আমরা উল্টোপাল্টা
ছড়ায় আবোল-তাবোল
ছড়া আমাদের হাসি ঠাট্টা
ছড়া মোদের বোল।

সাহিত্যে উপন্যাস:

মানব জমিন অত্যন্ত উর্বর,তাকে নানা বর্ণে গন্ধে শোভিত করাই এ মানব জীবনের সার্থকতা। উপন্যাস সেই বর্ণময় জীবনের শব্ধময় আলপনা। নানা রঙ্গে রঞ্জিত। বিভিন্ন বর্ণ গন্ধে সুশোভিত জীবন উদ্যানই হোল উপন্যাসের প্রাঙ্গণ। এ যেন নানা ফুলের সমাবেশে এক পুস্ত স্তবক।

মানুষের জীবন জটিল, ঘটনা বহুল। বাদ বিবাদ আনন্দ নিরানন্দ ঐক্য ও দ্বন্দ্বের সমাবেশে প্রস্ফুটিত। তাই একই চরিত্রের বিভিন্ন এমন কি বিপরীত অবস্থান প্রতিফলিত হয় বিভিন্ন সময়ে তার জীবন যুদ্ধে। আমার উপন্যাসের নায়ক তাই বহুমুখী চরিত্রের রক্তমাংসে গড়া একজন মানুষ। ঠিক ভুল নীতি দুর্নীতি সাহস ভয় জড়িয়ে থাকে তার জীবনকে কেন্দ্র করে। কখনও সে প্রেমিক কখনও প্রেমে বৈরাগ্য, কখনও বিপ্লব কখনও প্রতিবিপ্লবের ছোঁয়া তার জীবনে। নিঃস্বার্থ তার জীবনের ব্রত হলেও স্বার্থের বেড়াজালে সে জড়িয়ে যায়। যৌবনে সে আগ্রাসী বার্ধক্যে তার সন্যাস। আর এই বিভিন্ন অবস্থানের জন্য স্ববিরোধিতা জীবনের একটা বৈশিষ্ট। এ নিয়ে জীবনের ঘাত প্রতিঘাত। সে যখন প্রেমিক সে তখন জীবনকে একভাবে দেখে আবার যখন সে বিদ্রোহী তখন আরেক ভাবে দেখে। দুটো অবস্থানের মধ্যে মানিয়ে চলা খুব কঠিন। এর জন্য তার নিজের মনোজগতে যেমন যুদ্ধ বাইরের জগতে তেমনি যুদ্ধ। সিদ্ধান্ত গ্রহণ একটা কঠিন বাস্তবতা। উপন্যাসের বৈশিষ্ট্য হল এই ঘাত প্রতিঘাতকে প্রাণবন্ত করে তুলে ধরা। পাঠক যেন নিজেকে দেখতে পান উপন্যাসের চরিত্রের আয়নায়। উপন্যাস কোন নিদৃষ্ট বাঁধা পথে চলে না। চড়াই উৎরাই সে পথ, সে পথ কণ্টকাকীর্ণ। এই বৈচিত্রের মধ্যে মূল চরিত্রে একটা মূল সুর পাওয়া যায় যেটা তার জীবন বোধকে উন্মোচিত করতে সাহায্য করে। অসংখ্য বৈচিত্রময় ঘটনার মধ্যে একটা চরিত্র সে নিজেকে খুঁজে পেতে চায়। আর মূল চরিত্রকে কেন্দ্র করে যে নানা ঘটনার জাল বোনা হয় তাদের মধ্যে আন্তঃসম্পর্কটি বেরিয়ে আসে লেখকের শিল্প গুনে। অনেক সময় দেখা যায় মূল চরিত্রকে নানা দিক থেকে ছাপিয়ে যায় পার্শ্ব চরিত্র। বিশেষ করে আত্মজীবনী মূলক উপন্যাসে এই দিকটা সত্যের স্বার্থে তুলে ধরতে হয়, তাকে স্বীকৃতি দিতে হয়। মূল চরিত্রকে অকারণে কল্পনার বিন্যাসে মাহাত্ম্য দানের চেষ্টা করা সাহিত্যিকের কাজ নয়। জীবন থেকে শিক্ষা পেতে সত্যনিষ্ঠ হতে হয়। সাহিত্য হলো জীবনের আয়না আমি যেভাবে আমার সাহিত্য চর্চাকে দেখি সেটা তুলে ধরলাম। কবিতা প্রবন্ধ ছড়া সব কিছুতে সাহিত্য চর্চায় বাস্তব জীবনের উপাদান বিশেষ গুরুত্বপূর্ন। সেই জন্য আমি অন্যত্রও লিখেছি সাহিত্যের জন্য সাহিত্য নয়। সাহিত্য মানুষের সেবার জন্য। জীবন যুদ্ধের অন্যতম হাতিয়ার হল সাহিত্য।

অনুবাদ সাহিত্য:

অনুবাদ সাহিত্য দেশ কালের পরিচয় বুঝতে আয়নার কাজ করে। অর্থাৎ কবিতার আয়নায় অতীত ও বর্তমানকে অনুধাবন করা। তার বিবর্তন প্রক্রিয়াটা বোঝার চেষ্টা করি। বিদেশী বিভিন্ন ভাষায় লেখা কবিতাগুলোর অনুবাদ বাংলায় ভাষান্তরের কাজে হাত দেওয়া হয়। অনুবাদের সঙ্গে অনুবাদকারীর ভাবের সমন্বয় ঘটেছে। ভাবানুসারে বাংলায় লেখা কবিতাতেও সেটা অব্যাহত থাকে সন্দেহ নেই।বিদেশি শব্দগুলোর সঠিক প্রতিশব্দ পাওয়া যায় না। অনেক শব্দ কবিতায় চলতি অর্থে ব্যবহৃত হয় না। পুরো লেখাটা ধরে তার অর্থ বুঝে নিতে হয়। আমরা যারা অনুবাদ করি তারা শব্দ ধরে করি না । ভাবটা ধরে অনুবাদ করতে হয়।ভাবটাকে ধরে রাখার জন্য সঠিক শব্দ চয়ন জরুরি । অনুবাদ বুঝতে হয় তার ভাব দিয়ে। শব্দের আভিধানিক অর্থ দিয়ে সেটাকে উপলব্ধির স্তরে নিয়ে যাওয়া যায় না। সেই অর্থে বাংলায় লেখা এই কবিতাগুলো ঠিক অনুবাদ কবিতা নয় ভাবটা বজায় রেখে যে কবিতা লেখা হয় তাতে লেখকের সৃজনশীলতা প্রকাশ পায়। আর এই আত্মস্ত করার প্রক্রিয়াটা সম্পূর্ণ হয় মাতৃ ভাষায়। তাই আমরা বলি বিদেশী ভাষা শিখতে গেলে তার রস পেতে গেলে মাতৃভাষার চর্চা করতে হয় ।

ভাষান্তরিত তথা অনুবাদ সাহিত্যের একটা বৃহত্তর দিক আছে যেটা নিয়ে দুচারটে কথা বলে নেওয়া যেতে পারে। আমি সাহিত্যের লোক নই। কোন বিদেশি ভাষায় পন্ডিত নই। তাও যেটা ভাবি সেটা বলার স্পর্ধা দেখাচ্ছি। এছাড়াও নিজে কিছু কবিতার ভাষান্তরের চেষ্টা করেছি। সেগুলো পরিবেশন করার আগে নিজের কয়েকটা কথা নিজে বলে নিচ্ছি।

যেমন কোন কবিতার ভাষান্তর করা হলেও যিনি এটা করেন তাঁর ভাবনাটা নিজের অজান্তে হলেও জুড়ে যায় ভাষান্তরিত কবিতাটিতে কবির ভাবের সঙ্গে। কবিতাটি অন্য মাত্রা পায়। স্বাদটা বদলায়। এখানে যিনি ভাষান্তর করেন তাঁর স্বাতন্ত্র্য প্রতিষ্ঠিত হয়। সেটা আরও ভালো হতে পারে আবার কারও ভালো নাও লাগতে পারে। এই প্রক্রিয়ায় সাহিত্য সৃষ্টিতে দুটো সংস্কৃতির মধ্যে বিরোধ ও মিলনের মধ্যে দিয়ে এক নতুন সংস্কৃতির সৃষ্টি হয়। যাকে সংস্কৃতায়ন বলা চলে। এক ভাষাভাষীর মানুষ অন্য ভাষাভাষীর মানুষের সঙ্গে মননের দিক থেকে একাত্ম হয়। মাইকেল, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, সুভাষ মুখোপধ্যায়ের অনুবাদ ধর্মী তথা ভাষান্তরিত কবিতায় সেটা আমরা পাই। বোধ হয় এটাকেই সংস্কৃতায়ন বলা হয়। ইংরেজিতে একে সিন্থেসিস বলা চলে। রবীন্দ্রনাথের ‘দুঃসময়’ এমনি একটা অসাধারন কবিতা যেটাতে ইংরেজ কবি কিটসের ‘Ode To A Nightangle’ কবিতার ভাবটি রবীন্দ্রনাথের স্বকীয়তায় প্রস্ফুটিত। মধুসূদনের কবিতার ভান্ডারও এই স্বকীয়তায় সমৃদ্ধ। নজরুলের কবিতায় উর্দু ভাষার অসাধারণ সমন্বয় ধরা পড়ে। সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের ‘জেলখানার চিঠি’ তুরস্ক কবি নাজিম হিকমতের কবিতার অসাধারণ ভাষান্তর। আমরা যারা রাজনৈতিক কারণে জেলে ছিলাম তাদের এই কবিতাটা হৃদয় স্পর্শ করে যায়। মনে হয় আলিপুর প্রেসিডেন্সি বা বহরমপুরের কোন জেলে বসে আমাদের কোন কমরেড এই কবিতা লিখে গেছেন। এখানেই অনুবাদ কবিতার তাৎপর্য, সার্থকতা। সাহিত্যের আন্তর্জাতিকরণের মাধ্যম হলো এই ধরণের অনুবাদ সাহিত্য সে কবিতাই হোক গল্প হোক প্রবন্ধ হোক বা ছড়া হোক । আন্তর্জাতিকতাবাদের সাংস্কৃতিক ভিত্তি এটা। একে নেহাৎ অনুবাদ কবিতা বলে নকল বলে উপেক্ষা করার একটা প্রবণতা অনেক উন্নাসিক ব্যক্তির মধ্যে আছে। তাঁরা এর মধ্যে লেখকের স্বতন্ত্র অস্তিত্ব দেখেন না। সাহিত্যকে মানবতার মহাসাগরের মোহনায় মিলতে দেখেন না। এটা খুব দুর্ভাগ্যের। এক ধরনের অহং এর পেছনে কাজ করে।

সাহিত্যে প্রবন্ধ:

সাহিত্যে প্রবন্ধ বিশেষ গুরুত্বপূর্ন উপাদান। মানুষের বৈষয়িক জীবনকে বেষ্টন করে থাকে তার অর্থনীতি রাজনীতি ক্রীড়া প্রাঙ্গণ জীবন দর্শন শিক্ষা স্বাস্থ্য প্রযুক্তি প্রভৃতি অসংখ্য বিষয়। প্রাত্যহিক জীবনে এই বিষয়গুলো সুস্থ জীবনযাপনের জন্য খুবই প্রয়োজনীয়। এগুলো কোন সময়কালে কোন সমাজে কি ভূমিকা পালন করছে তাদের কি ভুমিকা পালন করা উচিত তা প্রতিটি মানুষকে বস্তুনিষ্ঠ ভাবে যুক্তি দিয়ে বুঝতে হয়। এর জন্য দরকার বিষয়গুলোর তথ্যভিত্তিক যুক্তি নিষ্ঠ অবতারণা। আর সাহিত্যে সেটা করে প্রবন্ধ। মানুষের মূল্যবোধকে ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে বস্তুনিষ্ঠভাবে তুলে ধরা প্রবন্ধের কাজ। প্রবন্ধ মানুষের স্নায়ুজগতে যুক্তির জগতে বাস করে যেখানে আবেগের জায়গা কম। যদিও জীবনবোধের সঙ্গে নীতিবোধ কাজ করে সেখানে আবেগকে একেবারে বাদ দেওয়া যায় না। প্রবন্ধ জীবনের কঠিন বাস্তবের উপস্থাপনা বলে সাহিত্যে তাকে আকর্ষণীয় করে তুলতে হলে পাঠককে উৎসাহী করতে হলে তার শৈল্পিক উপস্থাপন খুব জরুরি। এই কাজটা খুব কঠিন। সত্যকে তুলে ধরতে গেলে অনেক সময় রূঢ় হতে হয়। সত্য প্রায় সময়ই কঠিন। তাই তাকে সাবলীলভাবে রসসিক্ত করে প্রবন্ধের মাধ্যমে তুলে ধরা সহজ ব্যাপার নয়। আর সত্যটাকে জানার জন্য গবেষণায় লেখককে নিয়োজিত থাকতে হয়। নিজের ভাবনা অনুযায়ী মনগড়া প্রবন্ধ লিখলে চলে না। এখানে লেখকের স্বাধীনতা সীমাবদ্ধ। অনেক রস কষ হীন বিষয়কে রসালো করে তোলার শিল্পের মধ্যে প্রবন্ধের মহাত্মা নিহিত থাকে।

উপসংহার :

আমি আমার ভাবনা আমার সীমিত বিদ্যা বুদ্ধি দিয়ে সাহিত্যের প্রাঙ্গণ নিয়ে সীমিত পরিসরে কিছু আলোচনা করলাম। দেখলাম যে সাহিত্যের প্রাঙ্গণ যেন সমুদ্রের মোহনা বা ফুলের বাগান বা খেলার মাঠ বা মানুষের দেহ। একটা সমগ্র যার মধ্যে তার বিভিন্ন অঙ্গ কাজ করে।একে সাহিত্যের আঙ্গিক বলা যেতে পারে। গল্প কবিতা প্রবন্ধ ছড়া হল বিভিন্ন অঙ্গ। এই প্রতিটি বিষয় নিজ নিজ বৈশিষ্ট্য নিয়ে এই প্রাঙ্গণে উপস্থিত হয় যাকে আমরা সাহিত্য প্রাঙ্গণ বা আঙ্গিক বলেছি। প্রতিটি বিষয় তথা অঙ্গ যা নিজস্ব ছন্দ সুর লয়ে খেলা করে অথবা প্রতিটি স্রোতস্বিনী নদী এসে মোহনায় মেলে। বিভিন্ন বর্ণের গন্ধের ফুলের এ যেন বর্ণাঢ্য একটা বাগান। একটা সমগ্র । ঠিক যেমন হাত পা মাথা মুখ এসব নিয়ে একটা সমগ্র মানুষ যার দেহে আশ্রয় করে বিভিন্ন অঙ্গগুলো কাজ করে। আমিও আমার একটা বইএর নাম দিয়েছি ‘সাহিত্যের প্রাঙ্গণ‘ যার মধ্যে আমার লেখা গল্প কবিতা প্রবন্ধ ছড়া উপন্যাস জায়গা পেয়েছে। একই আঙ্গিকে বিভিন্ন বিষয়কে প্রত্যেকের নিজস্বতা অনুযায়ী জায়গা করে দেওয়া হয়েছে। সব কটার মধ্যে আমার কেন্দ্রীয় ভাবনাটা যদি এক তারায় বেজে উঠতে পারে সুর ছন্দ লয়ে তবেই আমার প্রচেষ্টা সফল বলে আমি মনে করব। আমি বহুত্বের মধ্যে একের মিলন খুঁজেছি আমার সাহিত্য চর্চায়।

1 thought on “সাহিত্যের আঙিনায় – রণেশ রায়”

  1. গৌরাঙ্গ সরকার

    সাহিত্যের আঙ্গিনায় একটি অনবদ্য রচনা ।
    এটি একটি মনোগ্রাহী প্রবন্ধ । এই বয়সে লেখকের এই অদম্য প্রয়াস কে জানাই স্যালুট ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *